ভ্যান্সিটার্ট, হেনরী


ভ্যান্সিটার্ট, হেনরী (১৭৩২-১৭৭০)  ২৭ জুলাই ১৭৬০ থেকে ২ ডিসেম্বর ১৭৬৪ পর্যন্ত বাংলায় ফোর্ট উইলিয়ম এর গভর্নর ছিলেন।১৭৩২ সালের ৩ জুন লন্ডনে জন্মগ্রহণকারী ভ্যান্সিটার্ট ছিলেন ইংল্যান্ডের বার্কশায়ারের আর্থার ভ্যান্সিটার্টের তৃতীয় পুত্র। তাঁর পরিবার রাণী অ্যানের রাজপরিবারের প্রধান হিসাবরক্ষক (Comptroller) বার্কশায়ারের স্যার জন স্টোনহাউসের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।

হেনরী ভ্যান্সিটার্ট

ভ্যান্সিটার্টের পরিবার ছিল মূলত ওলন্দাজ এবং লিমবার্গের সিটার্ট শহর হতে তাঁদের নামের সূচনা হয়। তাঁর পূর্বপুরুষগণ প্রথমে জুলিচ এবং পরে ডানজিগে চলে যান। সেখান থেকে তাঁর পিতামহ পিটার ভ্যান্সিটার্ট ১৬৭০ সালে লন্ডনে আসেন। পিটার ছিলেন একজন ব্যবসায়ী এবং ব্যবসায়ের মাধ্যমে তিনি বিপুল সম্পদ অর্জন করেন। অবশেষে তিনি রাশিয়ান কোম্পানির গভর্নর এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন পরিচালক নিযুক্ত হন। হেনরী ভ্যান্সিটার্টের পিতা আর্থার ভ্যান্সিটার্টও বিপুল বিত্তের অধিকারী এবং রাশিয়ান কোম্পানির একজন পরিচালক ছিলেন।

রিডিং গ্রামার স্কুল ও উইনচেস্টার কলেজে হেনরী শিক্ষা লাভ করেন। তারপর তাঁর পিতা তাঁকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাদ্রাজ প্রতিষ্ঠানে চাকরিতে পাঠান । ১৭৪৫ সালে তাঁকে মাদ্রাজ (ফোর্ট সেন্ট ডেভিস) প্রেরণ করা হয় এবং তিনি একজন কেরানি (রাইটার) হিসেবে নিয়োজিত হন। মাদ্রাজে অবস্থানকালে তিনি ভারতের তৎকালীন সরকারি ভাষা ফারসি শেখেন। তিনি রবার্ট ক্লাইভের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পরে ক্লাইভ তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং পৃষ্ঠপোষক হন। ১৭৫০ সালে ভ্যান্সিটার্ট পরবর্তী উচ্চতর ‘ফ্যাক্টর’ পদে পদোন্নতি লাভ করেন। পরের বছর তিনি ইংল্যান্ড যান এবং প্রায় তিন বছর সেখানে উচ্ছৃঙ্খল জীবন যাপন করেন। ১৭৫৪ সালে তিনি ভারতে ফিরে আসেন এবং ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দূতাবাসে নিয়োজিত হন। শীঘ্রই তিনি ‘জুনিয়র মার্চেন্ট’ এবং পরে ‘সিনিয়র মার্চেন্ট’ মর্যাদায় পদোন্নতি লাভ করেন। ১৭৫৭ সালে তিনি মাদ্রাজ কাউন্সিলের সদস্য হন। ১৭৫৯ সালের নভেম্বর মাসে ক্লাইভের সুপারিশে তিনি বেঙ্গল কাউন্সিলের সভাপতি এবং ফোর্ট উইলিয়মের গভর্নর পদে নিয়োজিত হন। কিন্তু তখন ফোর্ট সেন্ট জর্জে প্রতিকূল অবস্থা বিরাজ করায় তাঁর বাংলা অভিমুখে যাত্রা কয়েক মাস বিলম্বিত হয়। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, গভর্নর হিসেবে তাঁকে পদোন্নতি দেওয়া হলে কলকাতায় ভারপ্রাপ্ত গভর্নর জে.জেড হলওয়েলসহ কাউন্সিলের প্রবীণ সদস্যগণ এর বিরোধিতা করেন। কিন্তু কোম্পানির পরিচালকগণ তাদের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন এবং যারা ভ্যান্সিটার্টের বিরোধিতা করেছিলেন, পরবর্তীকালে তাদেরকে কোম্পানির চাকরি হতে বরখাস্ত করা হয়।

১৭৬০ সালের জুলাই মাসের শেষদিকে ক্লাইভের উত্তরাধিকারী হিসেবে ভ্যান্সিটার্ট বাংলায় পৌঁছেন এবং অবনতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অস্থায়ী সভাপতি হলওয়েলের কাছ থেকে দায়িত্ব বুঝে নেন। বাংলা সুবাহর তৎকালীন নওয়াব মীরজাফর নিজেকে চরম ব্যর্থ বলে প্রমাণিত করেন এবং প্রশাসনের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। একই সময় মীর জাফরের উপর থেকে কোম্পানি সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়। কারণ, সন্দেহ করা হচ্ছিল যে, তিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। ভ্যান্সিটার্ট মীর জাফরের জামাতা মীর কাসিমকে নতুন নওয়াব নিযুক্ত করেন। ভ্যান্সিটার্ট, হলওয়েল, সমরু প্রমুখ ব্যক্তিকে মীর কাসিম প্রচুর পরিমাণে নগদ অর্থ প্রদান করেন। তিনি একটি চুক্তির মাধ্যমে বর্ধমান, মেদিনীপুর এবং চট্টগ্রাম জেলার রাজস্ব কোম্পানিকে প্রদান করেন।

বাংলা সুবাহর নওয়াব হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই কোম্পানির কর্মকর্তাদের সঙ্গে মীর কাসিমের ভীষণ মতপার্থক্য দেখা দেয়। কোম্পানির কর্মকর্তারা অভ্যন্তরীণ শুল্ক দিতে অস্বীকার করে এবং তারা নওয়াবের কর্মকর্তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার শুরু করে। পাটনায় নিযুক্ত নওয়াবের রাজস্ব কর্মকর্তা রামনারায়ণ হিসাব বিবরণী জমা দিতে গড়িমসি করে তাঁর বিরাগভাজন হন (দৃশ্যত, কতিপয় ইংরেজ সামরিক কর্মকর্তার প্ররোচনায়)। কিন্তু ভ্যান্সিটার্টের সমর্থন লাভ করে মীর কাসিম রামনারায়ণকে বন্দি করতে সক্ষম হন। পরে রামনারায়ণকে হত্যা করা হয়। ইতোমধ্যে কোম্পানির কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত ব্যবসায়ে অবৈধ সম্পৃক্ততার ফলে তাদের বাণিজ্যিক সুযোগ-সুবিধার ব্যাপক অপব্যহার ঘটতে থাকে এবং এর ফলে শুল্ক খাত হতে সরকারের রাজস্ব আয় হ্রাস পায়। এ অপব্যবহার রোধ করতে মীর কাসিম দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। কিছু সময়ের জন্য ভ্যান্সিটার্ট কোম্পানির কর্মকর্তাদের দায়িত্বহীন কর্মকান্ড রোধ করার জন্য নওয়াবের প্রচেষ্টাকে সমর্থন দিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর ক্ষমতাও ছিল সীমিত। তিনি কোম্পানির কর্মচারীদের মালামালের ওপর শুল্ক ধার্যের ব্যবস্থা করার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলির মধ্যে একটি অস্থায়ী বন্দোবস্তের মধ্যস্থতা করেছিলেন। কিন্তু ভ্যান্সিটার্টের আপত্তি সত্ত্বেও কাউন্সিল এ সমঝোতা বাতিল করে দেয়। রাজকীয় ফরমান এবং পরিচালনা পরিষদের আদেশের কর্তৃত্ববলে ভ্যান্সিটার্ট বারবার কাউন্সিলকে বলেন যে, ইংরেজগণ তাদের সীমা অতিক্রম করছে। অতঃপর নওয়াব নিজেই ব্যবস্থা গ্রহণ করেন এবং ভীষণ বিরক্ত হয়ে সমগ্র শুল্ক ব্যবস্থা বিলুপ্ত করেন। ইংরেজগণ নওয়াবের পদক্ষেপকে চরম ব্যবস্থা এবং চুক্তির বাধ্যবাধকতার খেলাপ বলে বিবেচনা করে। এমনকি গভর্নর ভ্যান্সিটার্টও অসহায় বোধ করেন এবং নওয়াবের সঙ্গে অধিকতর ভদ্রভাবে আচরণ করতে তার সহকর্মীদের প্রভাবিত করতে ব্যর্থ হন। এর ফলে কোম্পানি ও নওয়াবের মধ্যে ধারাবাহিকভাবে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে সাফল্যের পর ১৭৬৪ সালের অক্টোবর মাসে মীর কাসিম চূড়ান্তভাবে ক্ষমতাচ্যুত হন এবং দেশ থেকে পালিয়ে যান। ভ্যান্সিটার্ট এরপর ১৭৬৪ সালের ২৮ নভেম্বর সভাপতির পদ হতে পদত্যাগ করেন এবং ইংল্যান্ড ফিরে যান।

ইংল্যান্ডে তিনি তাঁর বিরোধীদের দ্বারা তীব্রভাবে সমালোচিত হন। ক্লাইভ মীর জাফরের পদচ্যুতিকে নীতি বহির্ভূত বলে মনে করতেন এবং এতে তিনি ইতোমধ্যেই বিরক্ত হয়ে উঠেছিলেন এবং ভ্যান্সিটার্ট থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। এর পরিবর্তে ভ্যান্সিটার্ট ‘ইন্ডিয়া হাউসে’ লরেন্স স্যুলিভান প্রমুখ কয়েকজন ক্লাইভ বিরোধীর সমর্থন লাভ করেছিলেন।

১৭৬৪ সালে তাঁর বন্ধুগণ ‘Original Papers Relative to disturbance in Bengal’ নামে বাংলায় তাঁর শাসনামলে লন্ডনে প্রেরিত চিঠিপত্র দুখন্ডে প্রকাশ করেন। ১৭৬৬ সালে তিনি তাঁর রচনাটি অতিরিক্ত বর্ণনা সংযোজন করে ‘A Narrative of the Transactions in Bengal from 1760-1764’ নামে তিন খন্ডে পুনর্মুদ্রণ করেন। এগুলি হচ্ছে তাঁর মেয়াদকালে বাংলায় সংঘটিত ঘটনাবলির নির্ভরযোগ্য উৎস।

১৭৬৮ সালের মার্চ মাসে রিডিং বরো হতে ভ্যান্সিটার্ট পার্লামেন্টে নির্বাচিত হন। অতিরিক্ত ক্ষমতাসহ বাংলায় প্রেরিত ক্লাইভের স্বদেশে পাঠানো প্রতিবেদনে বাংলায় কোম্পানির কর্মচারীদের মধ্যে বিরাজমান দুর্নীতি প্রকাশিত হলে ভ্যান্সিটার্টের গৃহীত পদক্ষেপের যথার্থতা প্রমাণিত হয়। ১৭৬৯ সালের প্রথম দিকে তিনি কোম্পানির একজন পরিচালক নির্বাচিত হন। ১৭৬৯ সালের ১৪ জুন ল্যুক স্ক্রাফটনসহ দুজন কর্মকর্তার সঙ্গে তাঁকে ভারতের প্রশাসনিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করার জন্য নিয়োগ করা হয়। তিন সদস্যের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এ কমিটি ১৭৬৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে অরোরা ফিগ্রেট যোগে পোর্টসমাউথ হতে যাত্রা শুরু করে ২৭ ডিসেম্বর কেপ টাউন ছেড়ে যায়। এরপর তাঁদের সম্পর্কে আর কিছু জানা যায়নি। গভর্নর পদে দায়িত্ব পালন শেষে ভারত হতে ভ্যান্সিটার্ট ইংল্যান্ডে প্রত্যাবর্তন করেন।

ক্লাইভের সঙ্গে তাঁর বিরোধের কারণে ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাস লেখকদের দ্বারা ভ্যান্সিটার্ট সমালোচিত হয়েছেন। বাংলার নওয়াবদের সঙ্গে তাঁর আচরণ এবং কর্মপন্থা কূটনীতিক সুলভ ও মধ্যপন্থী হিসেবে অভিহিত হয়েছে, যার জন্য তিনি তাঁর উত্তরাধিকারীদের দ্বারা প্রশংসিত হয়েছেন। দুর্ভাগ্যবশত, বিরোধীদের মোকাবিলা করার মতো যথেষ্ট শক্তি তাঁকে অর্পণ করা হয়নি এবং ১৭৭০-এ ওয়ারেন হেস্টিংস এর মতো তিনি কাউন্সিলের শত্রুভাবাপন্ন সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের করুণার পাত্রে পরিণত হন এবং একটি সঠিক বিষয়ও বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হন নি। তা সত্ত্বেও তিনি একজন সুপন্ডিত, বহু ভাষাবিদ এবং প্রাচ্য দেশীয় কয়েকটি অনূদিত গ্রন্থের সম্পাদনা করেন।  [কে.এম মোহসীন]