ভূ-গাঠনিক রূপরেখা


ভূ-গাঠনিক রূপরেখা (Tectonic Framework)  যে মৌলিক ভূ-গাঠনিক পরিকাঠামোর ওপর বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে, সে সম্পর্কিত তথ্যাবলি। তেল ও গ্যাসসহ খনিজ সম্পদসমূহের সম্ভাব্যতা মূল্যায়নের প্রয়োজনে বাংলাদেশের ভূ-গাঠনিক রূপরেখা সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা থাকা অপরিহার্য।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম ভূ-গাঠনিক মানচিত্রটি ১৯৬৪ সালে প্রণীত হয়। পরের বছর অর্থাৎ ১৯৬৫ সালে সাবেক পূর্ব পাকিস্তান ও পার্শ্ববর্তী এলাকার মৌলিক ভূ-গাঠনিক উপাদানসমূহের বৈশিষ্ট্যাদি প্রণয়ন করা হয়। তবে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ব্যাপক ভূ-গাঠনিক উপাদানগুলি সংকলিত হয় ১৯৬৬ সালে। আসামের ভূ-গাঠনিক মানচিত্র প্রকাশিত হয় ১৯৬৪ সালে এবং বাংলাদেশের ভূ-গাঠনিক শ্রেণীবিন্যাস প্রণয়ন করা হয় ১৯৭২ সালে। অপরদিকে বাংলাদেশের ভূ-গাঠনিক রুপরেখা এবং তেল ও গ্যাসের সম্ভাব্যতা প্রকাশিত হয় ১৯৭৮ সালে। বাংলাদেশ অতীত ও বর্তমান শীর্ষক ভূ-গাঠনিক মানচিত্র উপস্থাপিত হয় ১৯৮৩ সালে।

TectonocFramework.jpg

বাংলাদেশ দুটি প্রধান ভ-ূগাঠনিক ইউনিটে বিভক্ত: (ক) উত্তরপশ্চিমের সুস্থিত প্রাকক্যাম্ব্রীয় প্ল্যাটফর্ম ও (খ) দক্ষিণপূর্বের মহীখাতীয় বেসিন। হিঞ্জ অঞ্চল (Hinge zone) নামে পরিচিত সংকীর্ণ উত্তরপূর্ব-দক্ষিণপশ্চিমমুখী একটি তৃতীয় ইউনিট দেশের প্রায় মধ্যভাগে অবস্থান নিয়ে উপরোক্ত দুটি প্রধান ইউনিটকে বিভক্ত করে রেখেছে। এই হিঞ্জ অঞ্চল বর্তমানে প্রাচীন মহাদেশীয় ঢাল (Paleo-continental slope) নামে পরিচিত।  [সিফাতুল কাদের চৌধুরী]

সুস্থিত প্রাকক্যাম্ব্রীয় প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশে বঙ্গীয় অববাহিকার সুস্থিত সোপানকেই সুস্থিত প্রাকক্যাম্ব্রীয় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। অববাহিকার এই অংশটি কলকাতা ও ময়মনসিংহকে যুক্তকারী রেখার পশ্চিম ও উত্তরপশ্চিমে অবস্থিত। কলকাতা-ময়মনসিংহ অভিকর্ষীয় উচ্চভূমি (Gravity High) নামে প্রায়শ উল্লিখিত এই রেখা অববাহিকার বা সুস্থিত সোপানের অববাহিকামুখী সম্প্রসারণের হিঞ্জ অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করে। বঙ্গীয় অববাহিকার বাংলাদেশ অংশে অবস্থিত সুস্থিত সোপানকে তিনটি প্রধান বলয়ে ভাগ করা যায়। সেগুলি হচ্ছে দিনাজপুর ঢাল (Dinajpur slope), রংপুর স্যাডেল (Rangpur Saddle) ও বগুড়া নতি (Bogra slope)। ক্রিটেসিয়াস (১৪৪ থেকে ৬৬ মিলিয়ন বছর পূর্বে) থেকে সাম্প্রতিক যুগের অবক্ষেপ অধিশায়িত মহাদেশীয় ভূত্বকে এটি গঠিত। অবশ্য সুস্থিত সোপানের কিছু কিছু বিচ্ছিন্ন অববাহিকায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কয়লাসহ পার্মোকার্বোনিফেরাস (৩৬০-২৪৬ মিলিয়ন বছর পূর্বে) অবক্ষেপ রয়েছে। বঙ্গীয় অববাহিকার সুস্থিত সোপানের উপরিস্থিত পাললিক স্তম্ভের পুরুত্ব নিম্নে ২০০ মিটার থেকে ঊর্ধ্বে ৮০০০ মিটার পর্যন্ত। অববাহিকার একটা বড় অংশ ইয়োসিন যুগীয় (৫৮ মিলিয়ন থেকে ৩৭ মিলিয়ন বছর পূর্বে) সিলেট চুনাপাথরে (Sylhet limestone) পূর্ণ। ভূকম্পীয় প্রতিফলনে সিলেট চুনাপাথর সুস্থিত সোপানের অববাহিকামুখী বিস্তারের নির্দেশক। সোপানের বাংলাদেশ অংশে কয়লা, চুনাপাথর ও কঠিন শিলা গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ বলে বিবেচিত। তবে ভারতীয় সোপানের মূল্যবান ধাতু ও অবর ধাতুও (Base metal) এখানে বিদ্যমান থাকার প্রমাণ রয়েছে। এখানে তেল ও গ্যাসের সন্ধান লাভের সম্ভাবনাও রয়েছে। কারণ অন্যান্য বহু পাললিক অববাহিকার ক্ষেত্রে দেখা গেছে তেল ও গ্যাস অববাহিকার অগভীর অংশে স্থানান্তরিত হয়। এছাড়া সুস্থিত সোপানে সিলেট চুনাপাথর, তেল ও গ্যাস মজুদের জন্য উৎস শিলা ও আধারি শিলা হিসেবে কাজ করে।  [মাহমুদ আলম]

রংপুর স্যাডেল (Rangpur Saddle)  ভারতীয় প্ল্যাটফর্মের প্রতীক। এটি শিলং ম্যাসিফ (Shillong massif) ও মিকির হিলস (Mikir hills)-এর সঙ্গে ইন্ডিয়ান শিল্ডকে (Indian Shield) যুক্ত করেছে। শিলং ম্যাসিফ হচ্ছে ইন্ডিয়ান শিল্ডের একটি বৃহৎ ঘাতস্তূপ (Thrust)। রংপুর স্যাডেলে ভিত অংশ সবচেয়ে উত্থিত এবং পাতলা পাললিক অবক্ষেপে আবৃত। দিনাজপুরের মধ্যপাড়া অঞ্চলে ভিত অংশ ভূ-পৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১৩০ মিটার গভীরে, যা প্লায়ো-প্লাইসটোসিন যুগের ডুপিটিলা বেলেপাথর ও মধুপুর কর্দম দ্বারা অধিশায়িত। রংপুর স্যাডেল তিনভাগে বিভক্ত- রংপুর স্যাডেল, রংপুর স্যাডেলের উত্তরাঞ্চলীয় ঢাল ও রংপুর স্যাডেলের দক্ষিণাঞ্চলীয় ঢাল। ১৯৬৩-৬৪ সালে রংপুর-দিনাজপুর জেলায় ওজিডিসি (Oil and Gas Development Corporation) কর্তৃক আহরিত ভূকম্পীয় উপাত্তে (Seismic data) পরিষ্কার দেখা যায় যে, রংপুর স্যাডেলের উত্তরাঞ্চলীয় ও দক্ষিণাঞ্চলীয় উভয়ত ঢালই বেশ আলতো। এর ভিত মধ্যপাড়া থেকে দক্ষিণপূর্ব অভিমুখে রংপুর স্যাডেলের দক্ষিণাঞ্চলীয় ঢাল নামে পরিচিত হিঞ্জ অঞ্চল পর্যন্ত আলতোভাবে নেমে গেছে। উত্তরাঞ্চলীয় ও দক্ষিণাঞ্চলীয় ঢালের সঙ্গে রংপুর স্যাডেলের অনুমান ভিত্তিক সীমানাটি ভিতের প্রায় ৭০০ মিটার সমোন্নতি রেখায় (Contour line) চিহ্নিত করা গেছে। এটি বঙ্গীয় পুরঃখাত (Bengal Foredeep) ও হিমালয়ী পুরঃখাতকে (Himalayan Foredeep) বিভক্ত করেছে।

রংপুর স্যাডেলের উত্তরাঞ্চলীয় ঢাল, যা দিনাজপুর ঢাল নামেও পরিচিত, রংপুর-দিনাজপুর জেলার উত্তর পশ্চিমাঞ্চল জুড়ে রয়েছে এবং ৩°-৪° নতিমাত্রায় ক্রমান্বয়ে অধোহিমালয়ী পুরঃখাত অভিমুখে নেমে গেছে। অবশ্য তেঁতুলিয়া অঞ্চলে এই নতিমাত্রা আকস্মিক বৃদ্ধি পেয়েছে। তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য শেল (Shell) ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশের সর্বশেষ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় বিন্দু সালবনহাটে (Salbanhat) যে একমাত্র কূপটি খনন করেছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল একটি কার্বোনেট বলয়ের অস্তিত্ব খুঁজে দেখা, তা মায়ো-প্লায়োসিন স্তরক্রম ভেদ করে ভিতের ২৫১৮ মিটার গভীরে গিয়ে শেষ হয়। কিন্তু তাতে ইয়োসিন-চুনাপাথরের (Eocene Limestone) কোন হদিস মেলে নি। দিনাজপুর ঢাল ও অধোহিমালয়ী পুরঃখাতের সংযোগস্থলের প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা এখনও পরিষ্কার নয়।  [ডি.কে গুহ]

বগুড়া সোপান (Bogra Shelf)  রংপুর স্যাডেলের দক্ষিণাঞ্চলীয় ঢালের নমুনাস্বরূপ। বগুড়া একটি আঞ্চলিক সোপানশ্রেণী যা দক্ষিণপূর্বে আলতোভাবে হিঞ্জ অঞ্চল অভিমুখে নেমে যাচ্ছে। এই অঞ্চল অবক্ষেপণ ও গাঠনিক উভয় অর্থেই রংপুর স্যাডেল ও বঙ্গীয় পুরঃখাতের মধ্যে সন্ধিস্থল। হিঞ্জ অঞ্চল পর্যন্ত বগুড়া সোপানের প্রস্থ ৬০ থেকে ১২৫ কিমির মধ্যে। এখানকার পাললিক স্তরক্রমের পুরুত্ব দক্ষিণপূর্বভাগে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়। কুচমা ও বগুড়ার দুটি কূপ খননের সময় স্ট্যানভ্যাক অয়েল কোম্পানি মধ্য পঞ্চাশের দশকে ঐ অঞ্চলে বায়ু চৌম্বক ও ভূকম্পীয় জরিপ পরিচালনা করে। ইয়োসিন চুনাপাথরের (বগুড়া চুনাপাথর) ওপর ভূকম্পীয় রেখাচিত্রে আঞ্চলিক নতি ২°-৩° দেখা যায়। এছাড়া বেশ কিছু উত্তরপূর্ব-দক্ষিণপশ্চিম প্রবণ চ্যুতিও লক্ষ্য করা যায়, যার মধ্যে বগুড়া চ্যুতি সবচেয়ে লক্ষণীয়। সিলেট চুনাপাথরের প্রতিন্যাস খুব সম্ভবত আর্কিয়ান বেজমেন্টের (Archean Basement) পৃষ্ঠদেশই প্রতিফলিত করে। এই ভূ-গাঠনিক অঞ্চলে কোন আবদ্ধ ঊর্ধ্বভঙ্গ নেই। বগুড়াচ্যুতি কুচমা ও বগুড়ার গাঠনিক প্রবণতায় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে হাইড্রোকার্বন মজুত রাখার জন্য কোন ‘সিল’-এর উপস্থিতির প্রমাণ উপস্থাপন করে নি।  [ডি.কে গুহ]

কলকাতা-ময়মনসিংহ অভিকর্ষিক হাই (Calcutta-Mymensingh Gravity High)  হিঞ্জ অঞ্চল নামে একটি গাঠনিক উপাদানের প্রতীক, যা অতি সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশের ভূতত্ত্বে ‘প্রাচীন মহীঢাল’ হিসেবে পরিচিত। হিঞ্জ অঞ্চলটি একটি প্রায় ২৫ কিমি চওড়া জটিলভঙ্গ (Complex flexure zone) অঞ্চল, যা বঙ্গীয় পুরঃখাতকে সোপান অঞ্চল থেকে পৃথক করেছে। এটি কলকাতা-পাবনা-ময়মনসিংহ অভিকর্ষিক হাই বরাবর আনুমাণিক উত্তর ৩০° পূর্ব দিকে বাঁক খেয়ে ডাউকি চ্যুতির পশ্চিমাঞ্চলীয় শেষ বিন্দু পর্যন্ত প্রসারিত। ভিত শিলার নতিতে আকস্মিক পরিবর্তন ও একই সঙ্গে চ্যুতিসমূহে গভীর প্রোথিত স্থানচ্যুতি দ্বারা এই অঞ্চল বৈশিষ্ট্যমন্ডিত, অভিকর্ষীয় ও চৌম্বক অসঙ্গতিসমূহে যা প্রতিফলিত।

এই অঞ্চলে ইয়োসিন চুনাপাথর সোপান অঞ্চলের ২° থেকে ৩°  তুলনায় প্রায় ২০০ গভীরে প্রোথিত। ভূকম্পীয় তথ্য ব্যাখ্যানে দেখা যায় সিলেট চুনাপাথরের গভীরতা, যা একটি শক্তিশালী ভূকম্পীয় প্রতিফলক, ২৫ কিমির সংকীর্ণ বলয়ে ৪০০০ মিটার থেকে ৯০০০ মিটারে বৃদ্ধি পায়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের অন্তর্ভূপৃষ্ঠ ব্যাখ্যানের সময় সিলেট চুনাপাথরের শীর্ষে একটি ভঙ্গিল বলয় শনাক্ত করা গেছে, যা ভারতের হিঞ্জ বলয়েরই সম্প্রসারিত অংশ।

হিঞ্জ বলয় গভীর ভিত চ্যুতির মাধ্যমে বঙ্গীয় পুরঃখাতের সঙ্গে সংযুক্ত, যা সম্ভবত গন্ডোয়ানাল্যান্ডের ভেঙ্গে পড়ার সঙ্গে শুরু হয়। সেই থেকে চ্যুতিগুলি বারংবার সক্রিয় হয়েছে। বাংলাদেশের উত্তরপূর্বে হিঞ্জ অঞ্চল পূর্ব দিকে বাঁক নিয়েছে এবং সম্ভবত অনুক্রমিক পূর্ব-পশ্চিম ধারা প্রবণ চ্যুতির দ্বারা ডাউকি চ্যুতির সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। [আ.স.ম উবাইদউল্লাহ]

মহীখাতীয় অববাহিকা (Geosynclinal Basin)  দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মহীখাতীয় অববাহিকা বিচূর্ণিত পাললিক শিলার ব্যাপক পুরুত্বের দ্বারা (অববাহিকা কেন্দ্রের কাছে সর্বাধিক প্রায় ২০ কিমি) বৈশিষ্ট্যমন্ডিত, যার অধিকাংশই বেলেপাথর ও টারশিয়ারী যুগের কর্দমশিলা। এটি বৃহত্তর ঢাকা, ফরিদপুর, নোয়াখালি, সিলেট, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম এলাকা জুড়ে বিদ্যমান। অববাহিকায় বিপুল অবক্ষেপের কারণ এই অঞ্চলের ভূ-গাঠনিক গতিশীলতা বা অস্থিতি, যা তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত ভূতাত্ত্বিক সময়ের মধ্যে দ্রুত অবনমন ও অবক্ষেপণের সৃষ্টি করছে। মহীখাতীয় অববাহিকা দুটি অংশে উপবিভাজিত  পূর্বাঞ্চলের বলিত বলয় এবং পশ্চিমের পুরঃখাত।

বঙ্গীয় পুরঃখাত হিঞ্জরেখা ও আরাকানইয়োমা বলিত ক্রমের মধ্যবর্তী বিশাল এলাকা জুড়ে রয়েছে এবং বঙ্গীয় অববাহিকার ভূ-গাঠনিক ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ভূ-গাঠনিকভাবে বঙ্গীয় পুরঃখাতকে দুটি প্রধান অঞ্চলে ভাগ করা যায়: (ক) পশ্চিমাঞ্চলীয় উন্নীত সমতল ও (খ) পূর্বাঞ্চলীয় বলিত বলয়। পশ্চিমাঞ্চলীয় উন্নীত সমতল আবার (ক) ফরিদপুর খাদ, (খ) বরিশাল-চাঁদপুর হাই, (গ) হাতিয়া খাদ, (ঘ) মধুপুর গড় ও (ঙ) সিলেট খাদে উপবিভাজিত।

হিঞ্জ অঞ্চল সংলগ্ন ফরিদপুর খাদ একটি সাধারণ অভিকর্ষিক লো (Low) দ্বারা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত, যা নিওজিন (Neogene) স্তরক্রম দ্বারা গঠিত। পদ্মা এবং যমুনার সঙ্গমস্থল থেকে দক্ষিণে সিলেট চুনাপাথর ৬৫০০ মিটার গভীরে রয়েছে। চালনা ও বাগেরহাট অতি কম ব্যাপ্তির লক্ষণীয় গাঠনিক হাই (structural high)।

হাতিয়া খাদ বঙ্গীয় অববাহিকার সবচেয়ে গভীর খাদ যেখানে চূর্ণিত অবক্ষেপের বৃহত্তম মজুত জমা হচ্ছে। বঙ্গীয় পুরঃখাতের অক্ষ হাতিয়া খাদের শীর্ষবিন্দুর মধ্যদিয়ে অতিক্রম করছে। শাহবাজপুর (ভোলা), কুতুবদিয়া, সাঙ্গু ও অন্যান্য উপকূলীয় ভূগঠনসমূহ এখানে অবস্থান করছে, যার মধ্যে সাঙ্গু বর্তমানে গ্যাস উৎপাদন করছে এবং শাহবাজপুরু ও কুতুবদিয়া উৎপাদনের অপেক্ষায় রয়েছে। মধুপুর গড়ের প্লাইসটোসিন সোপানের প্রতিক মধুপুর হাই ফরিদপুর খাদকে সিলেট খাদ থেকে (সুরমা অববাহিকা) পৃথক করেছে। এখানে ভিত তুলনামূলকভাবে উত্থিত, যা অভিকর্ষিক ও বায়ুচৌম্বক উপাত্তে প্রমাণিত। ভূ-রূপতাত্ত্বিক জরিপে মধুপুরের পূর্বে সম্প্রতি একটি উল্লেখযোগ্য প্রাকৃতিক উৎক্ষেপের প্রমাণ পাওয়া যায়। এছাড়া টাঙ্গাইলের দক্ষিণে নাগরপুর ডোম (Dome) ও নান্দিনা হাই থেকে প্রমাণ মেলে যে, ভিতের এসব অংশ ভূতাত্ত্বিক বৈচিত্রের উপর অধিশায়িত পাললিক স্তরক্রমের আকৃতিগত পরিবর্তন সাধন করছে না। একটি অভিকর্ষিক ও চৌম্বক অসংগতি হিসেবে বর্ণিত বরিশাল-চাঁদপুর হাই অতি গভীরে ম্যাগমীয় পদার্থ দ্বারা সৃষ্ট। বঙ্গীয় পুরঃখাতের ফরিদপুর খাদ ও হাতিয়া খাদের মধ্যে এই বলয়ের অবস্থান। বলয়টির পাশ প্রায় ৬০ কিমি এবং পাললিক আচ্ছাদকটির অনুরূপ বলে আপাতভাবে প্রতীয়মান হয়। বেশ কিছু অভিকর্ষিক অসংগতি এই অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। বরিশাল-চাঁদপুর হাই থেকে উত্তরপূর্ব পাশে প্রসারিত একটি প্রাচীন হাই রয়েছে ধরে নিয়ে শৈলশিরাটি উত্তর-দক্ষিণ অভিমুখে বরিশাল-চাঁদপুর হাইয়ের দক্ষিণে বাঁক নিয়ে নাইনটি ইস্ট রিজের সঙ্গে মিলিত হয়েছে বলে কল্পনা করা হয়েছে। বঙ্গীয় পুরঃখাতকে দুভাগে বিভক্তকারী কোন শৈলশিরার অস্তিত্বের স্বপক্ষে কোন সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই। পাথরঘাটা, মুলাদি, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, মুন্সিগঞ্জ, কামতা ও দাউদকান্দি এই বলয়ের প্রধান প্রধান ঊর্ধ্বভঙ্গীয় গঠন। মুলাদির কূপসমূহ উত্তরাঞ্চলীয় ক্লোজারের ঘাটতির কারণে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে হাইড্রোকার্বন মজুত অনুসন্ধানে ইতিবাচক ফলাফল প্রদানে ব্যর্থ হয়। ভূকম্পীয় জরিপের মাধ্যমে এই অঞ্চলে যথেষ্ট অনুসন্ধান চালানো হয় নি।

এই বলয়ের পূর্ব দিকে অবস্থিত বঙ্গীয় অববাহিকার সবচেয়ে গভীর খাদ হাতিয়া খাদ দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের দিকে উন্মুক্ত রয়েছে। এখানকার পাললিক স্তরক্রম ২০ কিমি অধিক পুরু। উপকূলীয় গ্যাসক্ষেত্র কুতুবদিয়া ও সাঙ্গু এবং শাহবাজপুর (ভোলা) ও বেগমগঞ্জের স্থলভাগের গ্যাসক্ষেত্রসমূহ হাতিয়া খাদের অন্তর্ভুক্ত। একইভাবে হিঞ্জ অঞ্চলের বাইরে ফরিদপুর খাদেও অবক্ষেপের বিরাট মজুত রয়েছে। দুটি গভীর অবনমিত খাদের মাঝখানে অবস্থিত বরিশাল-চাঁদপুর হাই বিশেষ করে হাতিয়া খাদে অবস্থিত কয়েকটি গ্যাসক্ষেত্র আবদ্ধ ভূ-গঠনে (Closed structure) সম্ভাবনাময় তেল ও গ্যাসক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত। এই ভূ-গাঠনিক বলয়ে সম্প্রতি উত্তরপূর্ব-দক্ষিণপশ্চিম প্রবণ বেশ কয়েকটি ভূপ্রাকৃতিক উত্থান হয়েছে- আমতলী এলাকা ও বরিশাল-মুলাদি বলয় যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য।  [ডি.কে গুহ]

মধুপুর বা ময়মনসিংহ হাই (Madhupur or Mymensingh High)  অঞ্চলটি তরঙ্গিত ভূ-প্রকৃতির প্রতীক, যা সংলগ্ন সক্রিয় প্লাবনভূমি থেকে সামান্য উঁচুতে অবস্থিত। মধুপুরে ভূ-গাঠনিক জটিলতা সহজেই পরিদৃশ্যমান, যেখানে মধুপুর স্তরসমষ্টির নিচে ডুপি টিলা বালু প্রকটিত। অধিকাংশ গবেষকের বিশ্বাস, মধুপুর গড় ভূ-গাঠনিকভাবে উত্থিত ভূপৃষ্ঠের প্রতীক এবং অতি সাম্প্রতিক কালে এলাকাটির উত্থান ঘটে। তারা ১৭৬২ সালের ভূমিকম্পকে এর কারণ বলে উল্লেখ করেন। এর একটা কারণ চট্টগ্রাম ও ঢাকার মধ্য দিয়ে উত্তর-পশ্চিম অভিমুখে বিস্তারিত ‘আগ্নেয়-ক্রিয়াশীল’ (volcano active) বলয়ের অক্ষে মধুপুর গড় অবস্থিত। তারা মনে করেন মধুপুর গড়ের উত্থানের প্রতিক্রিয়ায় যে অবনমন ঘটে তারই ফলশ্রুতিতে সিলেটে অসংখ্য নিচু হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে। তাদের ধারণা মতে মধুপুর গড়ের উত্থানের কারণে ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে যায়।

বেশ কিছু গবেষকের পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েছে যে, একটি ধারাক্রমিক এন-এশেলন চ্যুতি (সংখ্যায় ছয়) উত্থিত মধুপুর গড়ের পশ্চিম দিক ঘিরে রেখেছে। তাঁদের মতে মধুপুর গড়ের এন-এশেলন চ্যুতি হয় আঞ্চলিক ব্যবর্তনের কারণে, নয় একটি স্বীকৃত সমাহিত চ্যুতি বরাবর স্পর্শক পীড়নের প্রভাবে অথবা উভয়বিধ কারণে ঘটে থাকবে।

বর্তমানে তেজস্ক্রিয় অঙ্গারের মাধ্যমে বয়স নির্ণয়ের (radiocarbon dating) ভিত্তিতে মনে করা হচ্ছে যে, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া (যেখানে স্থানীয় ভূমি উত্থান বেশ প্রকটিত) সামগ্রিকভাবে মধুপুর ভূমিপৃষ্ঠের উচ্চতা বাহ্যত প্রতীয়মান। উত্তর-প্লাইসটোসিন মৌসুমি জলবায়ু পূর্ববঙ্গীয় সমভূমি অঞ্চলে প্রচন্ড স্রোত প্রবাহের সৃষ্টি করেছিল, যা প্রাথমিক মধুপুর ভূ-পৃষ্ঠের ব্যবচ্ছেদের জন্ম দেয়। মৌসুমি বৃষ্টিপাতের মাত্রা অত্যধিক পর্যায়ে গেলে ব্যবচ্ছিন্ন উপত্যকাসমূহ হলোসিন অবক্ষেপে পূর্ণ হয়ে যায়। এর ফলে প্রাথমিক ভূ-প্রাকৃতিক পৃষ্ঠের বদলে কিছুটা নিম্ন অবস্থানে ভূ-প্রাকৃতিক স্তর সৃষ্টি হয়।  [মো. হোসেন মনসুর]

সিলেট খাদ  শিলং ম্যাসিফের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত সিলেট খাদ অসংখ্য বিল-হাওর সম্বলিত সুরমা উপত্যকার ব্যাপক নিম্ন এলাকার অনুরূপ। এখানকার সর্বোচ্চ উচ্চতাও সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে নিচে। এটি উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় বাংলাদেশে বঙ্গীয় পুরঃখাতের একটি উপ-অববাহিকা এবং ৮৪ এমজিএল (milligal) পর্যন্ত একটি অতিসুস্পষ্ট বিশাল বদ্ধ ঋণাত্মক অভিকর্ষী অসংগতি দ্বারা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। শিলং ম্যাসিফ দ্বারা সিলেট খাদের উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্ত গঠিত এবং সুবৃহৎ ডাউকি চ্যুতি ম্যাসিফের থেকে খাদটিকে পৃথক করেছে। খাদটি ইন্দো-বার্মা রেঞ্জের সম্মুখবর্তী অঞ্চলের পরিবর্তিত আকৃতির মতো পূর্ব ও দক্ষিণ পূর্বে আসাম ও ত্রিপুরার উপ-মধ্যরৈখিক প্রবণ বলিত বলয় দ্বারা আবদ্ধ।

ইন্ডিয়ান প্ল্যাটফর্ম খাদটিকে পশ্চিম দিক থেকে বেড় দিয়ে রেখেছে। অপরদিকে দক্ষিণপশ্চিম দিকে এটি বঙ্গীয় অববাহিকার প্রধান অংশের দিকে উন্মুক্ত। এটি প্রায় ১৩০ কিমি লম্বা ও ৬০ কিমি চওড়া একটি ডিম্বাকৃতি খাদ। চট্টগ্রাম-ত্রিপুরা বলিত বলয়ের উপ-মধ্যরৈখিক প্রবণ ঊর্ধ্বভঙ্গ ধীরে ধীরে উত্তর অভিমুখে সিলেট খাদে নেমে গেছে। তুলনামূলকভাবে মৃদু দক্ষিণাঞ্চলীয় ও খাঁড়া চ্যুতি বিশিষ্ট উত্তরাঞ্চলীয় ঢাল সহযোগে আড়াআড়িভাবে সিলেট খাদ সুস্পষ্টভাবে অপ্রতিসম। ৫ কিমি প্রস্থ বিশিষ্ট ডাউকি চ্যুতি অঞ্চল শিলং ম্যাসিফ ও সিলেট খাদের মধ্যে সংযোগ রক্ষা করছে। সিলেট খাদের বিবর্তন ইতিহাসের মধ্যে রয়েছে: (ক) নিষ্ক্রিয় মহাদেশীয় উপান্ত (প্রাক-ওলিগোসিন), (খ) ইন্দোবার্মা রেঞ্জের সঙ্গে সংযুক্ত একটি পুরঃতটভূমি অববাহিকা (Oligocene ও Miocene) এবং (গ) শিলং মালভূমির দক্ষিণ অভিমুখী ভেদকের সঙ্গে সংযুক্ত একটি পুরঃতটভূমি অববাহিকা (Pliocene-Holocene)। সিলেট খাদের দক্ষিণাঞ্চলীয় বেড় জুড়ে থাকা হবিগঞ্জ, রশিদপুর, বিবিয়ানা, মৌলভীবাজার, কাটালকান্দি, ফেঞ্চুগঞ্জ, হারারগঞ্জ, পাথারিয়া, বিয়ানীবাজার (মামাভাগ্না) ও কৈলাস টিলা ঊর্ধ্বভঙ্গ সমূহের ছাতক, জালালাবাদ, সিলেট, ডুপি টিলা ও জাতিংগা ভূ-গঠনের (Structure) উপ-অক্ষাংশীয় গতিধারার বিপরীতে উপ-মধ্যরৈখিক গতিধারা রয়েছে। এই দুই গাঠনিক প্রবণতা সিলেট খাদের উত্তরাঞ্চলীয় শীর্ষে একটি ব্যাকরণসম্মত বিন্যাসের সৃষ্টি করেছে। সিলেট খাদে নিওজিন অবক্ষেপের বিকাশ অতি উত্তম হলেও প্যালিওজিন অবক্ষেপ আরো অনেক গভীরে প্রোথিত।

সিলেট খাদ বাংলাদেশের সবচাইতে সম্ভাবনাময় পেট্রোলীয় প্রদেশ। ইতিমধ্যেই এখানে ১০টি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। সেগুলি হচ্ছে ছাতক, জালালাবাদ, সিলেট, কৈলাস টিলা, বিয়ানীবাজার, ফেঞ্চুগঞ্জ, রশিদপুর, মৌলভীবাজার, বিবিয়ানা ও হবিগঞ্জ। এগুলির মধ্যে জালালাবাদ, সিলেট, কৈলাস টিলা, রশিদপুর ও হবিগঞ্জ থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলিত হচ্ছে। এই গ্যাস বহুলাংশে কলকারখানা, বাণিজ্যিক ও গার্হস্থ্য চাহিদা পূরণ ছাড়াও বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সার তৈরির কাজে ব্যবহূত হচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে এই সব গ্যাসক্ষেত্রের অবদান।

বলিত বলয় (Folded Belt) বঙ্গীয় পুরঃখাতের সর্বপ্রধান ভূ-গাঠনিক উপাদানের প্রতীক। এখানে রয়েছে আরাকান ইয়োমা বলিত ধারার সমান্তরাল সাধারণ উপ-মধ্যরৈখিক প্রবণ পাহাড় শ্রেণি। উত্তর-দক্ষিণে ৪৫০ কিমি ও চওড়ায় প্রায় ১৫০ কিমি এই বলিত বলয় বাংলাদেশের স্থলভাগে ৩৫,০০০ বর্গ কিমি এলাকা জুড়ে রয়েছে। আরাকান ইয়োমা বলিত ধারার পশ্চিমে এই বলিত বলয়ে রয়েছে বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চল (সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগ), ত্রিপুরা, আসামের দক্ষিণাঞ্চল, মিজোরাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের দক্ষিণপূর্ব সংলগ্ন মায়ানমার ভূখন্ডের অসংখ্য সংকীর্ণ, দ্রাঘিত উত্তর-দক্ষিণ প্রবণ ভাঁজ। ভাঁজগুলির বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে ভূশিরা গঠনকারী, আড়াআড়িভাবে বাক্সসদৃশ, বিভিন্ন প্রস্থবিশিষ্ট উচ্চব্যাপ্তি এবং সংলগ্ন ভূ-গঠনের সাথে এন-এশিলন সংযুক্তি।

বাংলাদেশে এইসব দ্রাঘিত ঊর্ধ্বভঙ্গের উচ্চতা ১০০ মিটার থেকে ১০০০ মিটার পর্যন্ত। এর মধ্যে কিছু ঊর্ধ্বভঙ্গ চ্যুতিবিশিষ্ট এবং ভাঁজের মাত্রা পশ্চিম থেকে পূর্বে ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। ফলে পূর্বাঞ্চলীয় ঊর্ধ্বভঙ্গসমূহ ঘন বলিবিশিষ্ট এবং দুইয়ের মধ্যে অবতলভঙ্গ (syncline) সংকীর্ণ।

এখানে বিকশিত নিউজিন পাললিক স্তরক্রম প্রধানত জীবাশ্মবর্জিত এবং মাঝে মাঝে আন্তঃস্তরীয় পিন্ডজ শিলাসহ প্রধানত কর্দমশিলা, কর্দম, পলিশিলা ও বেলেপাথরের বিকার জনিত পরিবর্তন দ্বারা গঠিত, যাকে শিলালক্ষণের ভিত্তিতে ৯টি স্তরসমষ্টিতে উপবিভাজিত করা যায়। সাম্প্রতিক গবেষণায় সীতাপাহাড় ঊর্ধ্বভঙ্গের ভুবনশিলায় ঘোলাটে অবক্ষেপের (Turbidity facies assemblage) উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। তবে এটি প্রমাণে আরও ব্যাপক অনুসন্ধান প্রয়োজন।

প্যালিওসিন অবক্ষেপসমূহ অনেক গভীরে অবনমিত এবং আটগ্রাম IX কূপ ছাড়া অন্যকোন কূপে এটি পাওয়া যায়নি। আটগ্রাম IX কূপ বড়াইল গ্রুপের রেনজি স্তরক্রমের ৮৬০ মিটর ও জেনাম স্তরক্রমের ২৬০ মিটার অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। এখানকার ভিতশিলার গভীরতা জানা যায় না, তবে সম্ভবত ২০ কিমি নিচে নয়।

বলিত বলয়, ভাঁজ ও অন্যান্য গাঠনিক বৈশিষ্ট্যের তীব্রতা অনুযায়ী দুটি ভূ-গাঠনিক বলয়ে উপবিভাজিত পশ্চিমাঞ্চলীয় বলয় ও পূর্বাঞ্চলীয় বলয়। পশ্চিমাঞ্চলীয় বলয় সহনীয় দৃঢ় বলিত ঊর্ধ্বভঙ্গ যেমন বাছিয়া, লংত্রাই, বারমুরা, অথরামুরা, ধুমবুড়া, তুলামুরা, চ্যাংগোতাং, সারদেঙ, গোবামুরা, সীতাপাহাড়, বান্দরবান, মাতামুহুরী, ওলাটাং, দক্ষিণ নীলা ইত্যাদি এবং মায়ানমারের মায়ু, পিংনা ও সিন ছাড়াও বিয়ানিবাজার (মামা-ভাগ্না), কৈলাস টিলা, ফেঞ্চুগঞ্জ, কাঠালকান্দি, মৌলভীবাজার, রশিদপুর, হবিগঞ্জ, তিতাস, রোমিয়া (সালদানদী), লালমাই, তৃষ্ণা, আগরতলা, লম্বুছড়া, গজালিয়া, ফেনী, সেমুতাং, হালদা, লাম্বাঘোনা, মহেশখালি, পটিয়া, ইনানী ও সেন্ট মার্টিনের মতো তুলনামূলকভাবে কম জটিল ভূতাত্ত্বিক গঠন দ্বারা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত।

পূর্বাঞ্চলীয় বলয়ের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে পাথারিয়া, হারারগজ, চরগোলা, কাঞ্চনপুর, মাছলিথুম, সারখান, লঙ্গাই, বদরপুর, ছত্রচূড়া, মাসিমপুর, রেংতে, ভুবন, ভৈরবী, হাচহাক, সেনটেট, যানলন, যাবওয়াক, মলভম, জামপাই, ভয়াছড়ি, শিশক, কাসালং, বরকল, উঠানছত্র, বেলাসরি, গিলাসরি, মওডক, ল্যাংসেন, থুয়ামফুই, মওরাওয়াপ, ফালফাং ও কালেটওয়া।

পশ্চিমাঞ্চলীয় বলয় বাংলাদেশে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ও গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস প্রদেশ। এই অঞ্চলের উত্তর থেকে দক্ষিণ অংশ জুড়ে রয়েছে ১২টি গ্যাসক্ষেত্র। সেগুলি হচ্ছে কৈলাস টিলা, বিয়ানিবাজার, ফেঞ্চুগঞ্জ, মৌলভীবাজার, রশিদপুর, বিবিয়ানা, হবিগঞ্জ, তিতাস, বাখরাবাদ, রুখিয়া, ফেনী ও সেমুতাং। [ডি.কে গুহ]