ভূষণা


ভূষণা  সুলতানি আমলের সতেরোটি টাকশাল শহরের মধ্যে অন্যতম একটি। বর্তমানে অঞ্চলটি মাগুরার অল্প কয়েক কি.মি. পূর্বে অবস্থিত। একসময় এটি যশোর জেলার অংশ ছিল।  মুর্শিদকুলী খানের রাজস্ব ব্যবস্থায় ভূষণাকে একটি চাকলায় পরিণত করা হয়। বর্তমান ফরিদপুর জেলার একটি অংশও এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। জেলার বাকি অংশ জাহাঙ্গীরনগর (ঢাকা), মুর্শিদাবাদ, যশোর এবং ঘোড়াঘাট চাকলাসমূহের অন্তর্ভুক্ত ছিল। আঠারো শতকে বর্তমান ফরিদপুর জেলা একাধিক চাকলার অন্তর্গত থাকার কারণে এবং পরবর্তীকালে পুনর্বিন্যস্ত হওয়ায় ভূষণার অবস্থান সম্পর্কে বিভ্রান্তি দেখা দেয়।

বাংলার পূর্বাঞ্চলে মুগল আক্রমণ প্রতিহতকারী বারো ভূঁইয়াদের একজন স্থানীয় প্রধান রাজা মুকুন্দ রায়ের প্রশাসনের কেন্দ্র হিসেবে ভূষণা বিখ্যাত হয়ে ওঠে। মুকুন্দ রায়ের পুত্র সত্রাজিৎ রায় সতেরো শতকের প্রথমদিকে রাজকীয় বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিলেন। সত্রাজিতের পুত্র সীতারাম মুগলদের আধিপত্য স্বীকার করে নিলে ভূষণা এবং ফতেহাবাদের (ফরিদপুরে) জমিদারি ফিরে পান এবং অবশেষে ক্ষমতা ও সম্পদ লাভ করেন। ভূষণা হতে ১৬.০৯ কিমি. দূরে বাগজানীতে রাজধানী স্থাপন করে তিনি এটিকে দীর্ঘ মাটির বাঁধ এবং পরিখা দ্বারা সুরক্ষিত করেন। ভূষণার ফৌজদারের সঙ্গে সীতারামের দ্বন্দ্ব-সংঘাত এবং অবজ্ঞাসূচক মনোভাবের ফলে মুর্শিদকুলী খানের সময়ে (১৭১৪) তাঁকে দমন করা হয়। তাঁর জমিদারি বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং তা রাজশাহী জমিদারির রামজীবনকে প্রদান করা হয়।

ভূষণা দুর্গ  বর্তমানে ধ্বংসপ্রাপ্ত এবং ফরিদপুর জেলার নোয়াপাড়া ইউনিয়নের অন্তর্গত কালিবাড়ি গ্রামে অবস্থিত। ফরিদপুর শহর থেকে প্রায় ২৫কিমি. দক্ষিণ-পশ্চিমে মধুমতি ও বরসিয়া নদীর মিলনস্থলে এর অবস্থান। আকবরনামায় ভূষণাকে একটি সুদৃঢ় দুর্গ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

ভূষণার সর্বপ্রথম শাসনকর্তা হিসেবে ধেনুকর্ণের নাম জানা যায়, যিনি যশোরের উত্তরাংশ অধিকার করে ‘বঙ্গভূষণ’ উপাধি ধারণ করেন। এ থেকেই তাঁর রাজ্যের নামকরণ হয় ‘ভূষণা’। সুলতান নুসরত শাহের সতেরোটি টাকশাল শহরের অন্যতম হিসেবে ভূষণা গুরুত্ব পায়। কৌশলগত গুরুত্বের কারণে দুর্গটি শোল শতকের শেষ দুই দশকে মুগল ও বারো ভূঁইয়াদের মধ্যে প্রবল সংঘাতের বিষয় হয়ে ওঠে। সম্রাট  আকবরের সময় এটি  সরকার  ফতেহাবাদ এর অন্তর্ভুক্ত হয় এবং মুর্শিদকুলী খান কর্তৃক বাংলার রাজস্ব পুনর্বিন্যাসকালে এটি ছিল তেরোটি চাকলার (রাজস্ব এলাকা) একটি।

ভূষণা দুর্গটি আয়তাকার। উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ৩৯৬.৩৪ মিটার লম্বা এবং পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় ৩৫৬.৭১ মিটার চওড়া। চারদিকে উঁচু মাটির প্রাচীর দ্বারা দুর্গটি সুরক্ষিত ছিল। প্রাচীরের ভেতর ও বাহির উভয়দিকেই ২৪.৪ মিটার চওড়া পরিখা ছিল। দক্ষিণ দিকে ছিল দুর্গের একটি মাত্র প্রবেশদ্বার। ব্যাপক চাষাবাদের কারণে দুর্গের চারপাশে নির্মিত মাটির উঁচু প্রাচীরের কিছু অংশমাত্র বর্তমানে বিদ্যমান আছে, যা বড়জোড় ৩ মিটার উঁচু, আর পরিখাটি শনাক্ত করা বেশ কষ্টকর। আজও দুর্গের ভেতরে প্রবেশদ্বারের পশ্চিমাংশে ইটের টুকরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অবস্থায় একটি ঢিবি দেখা যায়; এটি সম্ভবত প্রহরী অথবা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বাসস্থান ছিল। প্রবেশদ্বারের ৩০ মিটার পূর্বে এখনও একটি মসজিদের ভিত্তি লক্ষ্য করা যায়। এই ভিত্তির উপর সম্প্রতি একটি ঢেউ টিনের মসজিদ তৈরি করা হয়েছে। মসজিদের ৩০ মিটার উত্তর-পূর্ব দিকে ইটের তৈরী পুরানো ও ধ্বংপ্রাপ্ত একটি কূপ রয়েছে এবং এর পাশেই রয়েছে ইট নির্মিত একটি জলাধার।

প্রত্নতত্ত্ববিদগণ মসজিদের নির্মানের কাল নির্ধারণ নিয়ে বিভিন্ন মতপোষণ করেন। তবে অধিকাংশই মনে করেন যে, মসজিদটি সুলতানি আমলে নির্মিত। মসজিদের সামান্য পশ্চিমে এবং প্রবেশদ্বারের পূর্বদিকে মাটির একটি নিচু ঢিবি রয়েছে, যা স্থানীয় লোকজন ভূষণা দুর্গের মুগল সেনাপতি আবুতোরাবের সমাধি বলে চিহ্নিত করে। দক্ষিণ প্রাচীরের পূর্বদিকে অনেকগুলি মাটির সূতপ ও কিছু ইমারতের ধ্বংসাবশেষ এখনও দেখা যায়। দুর্ভাগ্যবশত বেশির ভাগ ইট এখান থেকে অপসারিত হয়েছে এবং এই প্রক্রিয়া এখনও চলছে। এমতাবস্থায় অচিরেই মধ্যযুগীয় ভূষণা দুর্গটি সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে।  [শিরীন আখতার এবং শাহনাজ হুসনে জাহান]