ভূমি সম্পদ প্রযুক্তি


ভূমি সম্পদ প্রযুক্তি (Land Resources Technology)  স্বাভাবিকভাবে শস্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে সরাসরি এই প্রযুক্তির ব্যবহারের কথা ভাবা হয় না। এখনও পর্যন্ত অন্যান্য কৃষি প্রযুক্তিসমূহের স্থানান্তরের বাহন হিসেবেই এর গুরুত্ব বিবেচিত হয়। কৃষিক্ষেত্রে সাফল্য বা উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকৃতপক্ষে দুই ধরনের ব্যাপক বিস্তৃত প্রযুক্তিসমূহের যুগপৎ ব্যবহারের ফলস্বরূপ। ভূমি ও মৃত্তিকা ভিত্তিক প্রযুক্তি এবং শস্যভিত্তিক প্রযুক্তি কৃষি ক্ষেত্রে ব্যাপক সাফল্য এনেছে। ভূমি এবং মৃত্তিকা ভিত্তিক প্রযুক্তি প্রকৃতপক্ষে শস্যভিত্তিক প্রযুক্তিকে সফলভাবে প্রয়োগ করার ক্ষেত্রটি তৈরি করে দিচ্ছে।

মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (Soil Resources Development Institute-SRDI) কর্তৃক পরিচালিত প্রাথমিক মৃত্তিকা জরিপের প্রধান লক্ষ্য ছিল কৃষি উৎপাদনে সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতার নিরিখে দেশের ভূমি সম্পদের দ্রুত মূল্যায়ন করা। এই অনুসন্ধানের পিছনে প্রধান উদ্দেশ্য ছিল আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে স্বল্প সময়ে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা। অনুসন্ধান কর্মের অর্জিত ফলাফল ভূমির উচ্চ মাঝারি, নিম্ন এবং অত্যন্ত নিম্ন কার্যকারিতা বা সম্ভাবনাময় অঞ্চল চিহ্নিত করণে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করে এবং জাতীয়, আঞ্চলিক ও জেলাপর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ফলপ্রসূভাবে সহায়তা করতে পারে।

ভূমি সম্পদ তালিকার প্রাপ্ত উপাত্ত/তথ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ, বিশ্লেষণ এবং ব্যাখ্যা থেকে প্রধান যে দিকসমূহ চিহ্নিত করা যায় তা হলো: ক) ভূমির ধরন, খ) ভূমির সামর্থ্য, গ) শস্য উপযোগিতা এবং ঘ) বর্তমান ভূমি ব্যবহার।

ভূমির ধরন  বাংলাদেশের বৈশিষ্ট্যসূচক কৃষি প্রতিবেশ অবস্থায় শস্য এবং শস্যের ধরন নির্বাচনে প্রধান বিবেচ্য বিষয় হলো ভূমির প্রকৃতি বা ধরন। শস্যের ধরন নির্বাচন সম্পূর্ণতই ভূমির ভূ-সংস্থানিক অবস্থান এবং এর সাথে সম্পর্কিত বর্ষাকালীন প্লাবন গভীরতা ও ব্যাপ্তি কালের উপর নির্ভর করে। স্বাভাবিক বন্যায় প্লাবিত হয় না এমন ভূমির যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে বারমেসে এবং বাৎসরিক উভয় ক্ষেত্রের শুষ্কভূমির শস্যের ফলনে ব্যাপক সুযোগ রয়েছে।

মৌসুমি প্লাবনের সময় এর আওতাভুক্ত ভূমিতে বারমেসে এবং শুষ্কভূমির খরিপ শস্য ফলে না। এ ভূমি খরিপ মৌসুমে আর্দ্রভূমির শস্য এবং রবি মৌসুমে শুষ্কভূমির শস্যের ভেতরেই সীমাবদ্ধ, তবে সবকিছুই নির্ভর করে বর্ষা মৌসুমের প্লাবনের গভীরতা এবং ব্যাপ্তিকালের উপর। নিম্নে ভূমির প্রকৃতি বা ধরনের সাথে সম্পর্কিত শস্যের ধরন বা নমুনা উল্লিখিত হলো: ১(ক) ভেদ্য মৃত্তিকা সম্বলিত উচ্চভূমি: ফলজ ও বনজ বৃক্ষ; ইক্ষু, তুলা, আদা, হলুদ, আনারস মৌসুমি সবজি ইত্যাদি; (খ) অভেদ্য মৃত্তিকা সম্বলিত উচ্চভূমি: খরিপ-১ মৌসুমে আউস ধান, পাট, ভুট্টা এবং খরিপ-২ মৌসুমে আমন; এবং সেচের মাধ্যমে রবি মৌসুমে উফশী (উচ্চ ফলনশীল) বোরো ধান। ১(ক) ভেদ্য মৃত্তিকা সম্বলিত মধ্যম উচ্চতা বিশিষ্ট ভূমি: খরিপ-১ মৌসুমে আউস, পাট, ভুট্টা এবং রবি মৌসুমে শুষ্কভূমির রবি শস্য; (খ) অভেদ্য মৃত্তিকা সম্বলিত মধ্যম উচ্চতাবিশিষ্ট ভূমি: খরিপ-১ মৌসুমে আউস; খরিপ-২ মৌসুমে আমন; রবি মৌসুমে সেচ সহযোগে উফশী বোরো। ১(ক) ভেদ্য মৃত্তিকা সম্বলিত মধ্যম পর্যায়ের নিম্নভূমি: খরিপ মৌসুমে আউস এবং বীজ ছড়িয়ে যে আমনের চাষ হয়; এবং রবি মৌসুমে শুষ্কভূমির রবি শস্য; (খ) অভেদ্য মৃত্তিকা সম্বলিত মধ্যম পর্যায়ের নিম্নভূমি: i) খরিপ মৌসুমে গভীর পানির আমন এবং রবি মৌসুমে সেচ সহযোগে বোরো; ii) রবি মৌসুমের শুরুতে প্রথম দিকে সরিষা এবং মৌসুমের শেষদিকে বোরো ধান; iii) সেচ সহযোগে এক ফসলি বোরো। ১(ক) ভেদ্যমৃত্তিকা সম্বলিত নিম্নভূমি: খরিপ মৌসুমে ছড়ানো আমন এবং রবি মৌসুমে সরিষা, খেসারি; (খ) বিলম্বে অপসারিত পানির নিম্নভূমি: সেচ সহযোগে এক ফসল, বোরো। ১(গ) অত্যন্ত নিম্নভূমি: রবি মৌসুমে বোরোর স্থানীয় প্রজাতির একটি ফসল।

উপরের উদাহরণসমূহ থেকে এটা স্পষ্ট যে গাছপালা এবং অন্যান্য বারমেসে শস্য যেসব জলাবদ্ধতার কারণে সহজে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তা শুধুমাত্র উচ্চভূমি অবস্থার ক্ষেত্রে সীমিত, শুষ্কভূমির রবি শস্যের ফলন মৌসুমি প্লাবিত ভূমিতে ঘটতে পারে, যদি বীজ বপনের সময়ের যথেষ্ট পূর্বে প্লাবনের পানি নেমে যায়।

আর্দ্রভূমির শস্য অবশ্য বন্যামুক্ত এবং বন্যাপ্লাবিত উভয় ভূমিতে ফলতে পারে, কিন্তু শস্যের ধরন বা প্রকৃতি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নির্ভর করবে প্লাবনের ব্যাপ্তি কাল ও গভীরতার উপর।

প্রয়োগের প্রধান ক্ষেত্রসমূহ: ক) একটি এলাকার জন্য শস্যের প্রজাতি ও প্রকার নির্বাচন, খ) একটি এলাকার জন্য শস্যের ধরন বা নমুনা নির্বাচন।

ভূমির উৎপাদন ক্ষমতার শ্রেণি এবং উপশ্রেণী  এ বিষয়টি নির্ধারিত হয় ভূমির উৎপাদিত ফসলের সাথে মৃত্তিকার গুণাগুণ ও পরিবেশগত বিষয়াবলির পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ ভিত্তিক প্রযুক্তির মাধ্যমে, যা এক বৎসরে সাধারণ কৃষি শস্য উৎপাদনের জন্য ভূমির বিভিন্ন মাত্রার কার্যক্ষমতা নির্দেশ করে। এই প্রযুক্তি অনুযায়ী ভূমির শ্রেণি বিন্যাস নিম্নরূপ: ১) অত্যন্ত উর্বর কৃষিভূমি: ক) ভাল কৃষিভূমি, খ) মধ্যম কৃষিভূমি, গ) অনুর্বর কৃষিভূমি, ঘ) অত্যন্ত অনুর্বর বা অকৃষিভূমি।

এই শ্রেণীসমূহ কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতার বিভাজনের সাথে সম্পর্কিত। সর্বাপেক্ষা নিম্ন পৃথকীভবন দেখা যায় শ্রেণি ১-এ এবং সর্বোচ্চ পৃথকীভবন দেখা যায় শ্রেণি ৫-এ।

ভূমির উৎপাদন ক্ষমতা নির্ধারণ প্রক্রিয়া প্রাথমিকভাবে ঋতুগত প্লাবন বা ঋতুগতভাবে ভূমি প্লাবিত কিনা তার সাথে সম্পর্কিত। এতদনুসারে অপ্লাবিত ভূমিকে চিহ্নিত করা হয় ‘D’ দ্বারা এবং ঋতুগতভাবে প্লাবিত ভূমিকে চিহ্নিত করা হয় ‘W’ দ্বারা। পুনর্বার এইসব বিন্যস্ত শ্রেণীর মধ্যে গৌণ বিষয়াবলি সমন্বিত করা হয়েছে নির্ধারণ প্রক্রিয়াটির উন্নয়নের জন্য। শেষাবধি খরা দীর্ঘকালীন বা স্থায়ী জলমগ্নতা, ভূমির বন্ধুরতা, মৃত্তিকা ক্ষয়, ভূমিধসের ঝুঁকিসহ প্রতিকূল ঢালের নতিমাত্রা, লবণাক্ততা, বন্যা, নদী তীরের ভাঙন/বালুময় পলি দ্বারা আচ্ছাদিত হওয়া প্রভৃতি বিষয়ে বিবেচনায় নিয়ে আসা হয়েছে। এসব বিষয়কে যথাক্রমে ‘d’, ‘w’, ‘ir’, ‘e’, ‘s’, ‘z’ এবং ‘x’ দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। এইসব দ্বিতীয় পর্যায়ের সীমাকে প্রাথমিক সীমার পরে যুক্ত করা হয়। যেমন- ক) Dd, Dr, De স্বাভাবিক প্লাবন সীমার উপরে অবস্থিত মৃত্তিকার ক্ষেত্রে ব্যবহূত হয়; খ) Wd, Ws, Wz, Wx, Ww ঋতুগত প্লাবনের আওতাধীন আছে এমন মৃত্তিকা চিহ্নিতকরণে ব্যবহূত হয়।

প্রয়োগের প্রধান ক্ষেত্রসমূহ হলো: ক) বিভিন্ন পর্যায়ের কৃষি সম্ভাবনাযুক্ত এলাকা; খ) আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে দ্রুত কৃষি উৎপাদনের জন্য অগ্রাধিকার এলাকা চিহ্নিতকরণ; গ) কৃষি এবং অকৃষিগত উন্নয়ন সম্ভাবনার দিক থেকে ভূমির বিভক্তিকরণ; ঘ) বৃষ্টিপাত এবং সেচের মাধ্যমে ফসলের উৎপাদনের সম্ভাবনার ভিত্তিতে ভূমির বিভক্তিকরণ; ঙ) বিরাজিত শস্যের ধরন বা নমুনার পরিবর্তন/খাপ খাওয়ানোর জন্য কার্যকরী এলাকা চিহ্নিতকরণ ও পরিমাপ; চ) ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা/দুর্যোগ প্রস্ত্ততি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয় এলাকা চিহ্নিতকরণ ও পরিমাণ নির্দিষ্টকরণ: বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা, নদীতীর ভাঙন, জলাবদ্ধতা; ছ) অপরিকল্পিত আবাসন স্থাপনা, অপরিকল্পিতভাবে শহরের বিস্তৃতি, শিল্পের বিস্তার প্রভৃতি ভূমি আঞ্চলিকায়ন প্রক্রিয়া ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবেশ সংরক্ষণ; জ) অন্যান্য সংস্থাকৃত উন্নয়ন পরিকল্পনার মূল্যায়ন, তত্ত্বাবধান এবং সমন্বিতকরণ বিশেষ করে মৃত্তিকা-শস্য সম্পর্কিত বিষয়াবলি।

উপযুক্ততা বিষয়ক শস্যের উপযুক্ততার শ্রেণীসমূহ- শস্য উপযুক্ততা নির্ণয়ের প্রযুক্তি ভূমির উৎপাদন ক্ষমতার শ্রেণীসমূহের মতো নয়। এটি হলো একটি বিশেষ মৌসুমে একটি বিশেষ শস্য প্রজাতি বা প্রকার চাষের জন্য একটি এলাকাধীন মৃত্তিকার সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতার মাত্রা নির্ধারণের ভিত্তিস্বরূপ। শস্য উৎপাদনের সাথে সম্পর্কিত মূল নিয়ামকগুলো, যেমন বর্ষা মৌসুমের ব্যাপ্তিকাল ও গভীরতা, ভূমির প্লাবন, সময়গত বিস্তৃতি যার মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে মৃত্তিকা গাছপালার জন্য প্রয়োজনীয় আর্দ্রতার সর্বাপেক্ষা অনুকূল পরিমাণ সরবরাহ করতে পারে, জলবায়ুগত এবং অন্যান্য নিয়ামকসমূহ ছাড়াও মৃত্তিকার প্রাকৃতিক উর্বরতার অবস্থা শস্য উপযুক্ততা মূল্যায়নে বিশেষভাবে বিবেচিত হয়েছে।

পাঁচ ধরনের শস্য উপযোগী ভূমি চিহ্নিত করা হয়েছে শস্যের ফলনের উপর ভিত্তি করে, যা নিম্নে উল্লেখ করা হলো: ক) অত্যন্ত উপযুক্ত, খ) উপযুক্ত, গ) মধ্যম উপযুক্ত, ঘ) প্রান্তীয় উপযুক্ত ও ঙ) অনুপযুক্ত।

উল্লিখিত শ্রেণীবিভাগ কৃষিউন্নয়ন পরিকল্পনাবিদ, গবেষণা বিজ্ঞানী এবং সম্প্রসারণ বিশেষজ্ঞদের স্ব স্ব ক্ষেত্রে বাস্তবানুগ কার্যক্রম গ্রহণে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে পারে; দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় ও আঞ্চলিক পরিকল্পনা এবং স্বল্পমেয়াদী স্থানীয় পরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্দেশ্যে উৎপাদন পরিকল্পকদের প্রচলিত শস্য বা নতুন শস্যপ্রজাতি বা প্রকারের প্রচলন সম্প্রসারণের জন্য উপযোগী ভূমি চিহ্নিত করণে এবং কৃষিপ্রতিবেশগত বৈচিত্র্য উপযোগী শস্য প্রজাতি সমূহের/প্রকারের উন্নয়ন ও খামার পর্যায়ে তাদের অভিযোজন/প্রচলন/ সম্প্রসারণে সাহায্য করতে পারে।

বর্তমান ভূমিব্যবহার  বর্তমান ভূমিব্যবহার সম্পর্কিত তথ্য দেশের প্রধান প্রধান শস্যের ধরনের ফলন বৃদ্ধির ব্যাপক মূল্যায়নের লক্ষ্যে সংগৃহীত হয়েছে এবং প্রধানত কৃষিক্ষেত্রে ভূমি ব্যবহারের উপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এরূপ ভূমি ব্যবহারের ধারা অনুযায়ী ভূমির শ্রেণি বিন্যাস হলো: তিন ফসলী ভূমি দ্বিফসলী ভূমি এবং এক ফসলী ভূমি।

প্রয়োগের প্রধান ক্ষেত্রসমূহ উল্লিখিত তথ্যসমূহ এলাকা সমূহ তাদের কার্যক্ষমতার তুলনায় কম/অধিক পরিমাণে ব্যবহূত হচ্ছে কিনা সে সম্পর্কিত নির্দেশনা দেয়; আরও অধিক এলাকা নির্বাচনের জন্য যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করে; একটি এলাকায় নতুন শস্য প্রজাতিসমূহ এবং প্রকারসমূহের সম্প্রসারণ এবং/অথবা প্রচলনে চাষীদের ভবিষ্যৎ সম্মতি/অসম্মতি উপলব্ধির ক্ষেত্রে নির্দেশনা দেয়; বাস্তবানুগ বাৎসরিক এবং দীর্ঘমেয়াদী উৎপাদন পরিকল্পনা প্রণয়নে, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আকাঙ্ক্ষিত শস্য, শস্যের ধরনের আবাদের জন্য এলাকার বাৎসরিক বৃদ্ধির হার সম্পর্কে ধারণা করতে নির্দেশনা দেয়; কৃষি ও অন্যান্য ধরনের ভূমি ব্যবহারে স্থান সংক্রান্ত ও সময়গত পরিবর্তনসমূহ চিহ্নিত করণে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করে এবং অকৃষি কর্মকান্ডসমূহের জন্য কৃষিজমি হ্রাস পাওয়ার হার নির্ধারণে প্রয়োজনীয় সূত্র সরবরাহ করে।

থানা নির্দেশিকা  থানা ভূমি ও মৃত্তিকা সম্পদ ব্যবহার নির্দেশিকা যা ‘থানা নির্দেশিকা’ নামে বহুল পরিচিত। এটি সুনির্দিষ্টভাবে মৌজা, ইউনিয়ন চিহ্নিতকরণ এবং থানা পর্যায়ে কৃষি উন্নয়ন পরিকল্পনায় সহায়তা করে। এই নির্দেশিকাটি কারিগরি বিশেষ জ্ঞানের সাথে স্থানীয় জনসাধারণের অভিজ্ঞতা ও আকাঙ্খার সমন্বয়ের মাধ্যমে বাস্তবসম্মত উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নে কার্যকর ভিত্তি হিসেবে কাজ করে, যা পূর্বের পরিকল্পনা প্রক্রিয়ারসমূহে অনুপস্থিত ছিল। যেসব ক্ষেত্রে এই থানা নির্দেশিকার তথ্য সমূহ অধিক কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে তা হলো: i) ব্লক, মৌজা, ইউনিয়ন এবং থানা ভিত্তিক স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী কৃষি উন্নয়ন কর্মসূচি এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নে; ii) শস্যের চাহিদা এবং ভূমির মানের উপর ভিত্তি করে সার ব্যবহার ও সেচের জন্য স্থল নির্বাচনের প্রস্ত্ততি; iii) নতুন শস্য বা শস্যের ধরনের প্রচলন এবং/বা সম্প্রসারণের জন্য নির্দিষ্ট স্থান নির্বাচনের প্রক্রিয়া; iv) কৃষি-প্রতিবেশগত বৈচিত্র্য এবং সমরূপ ক্ষেত্রে সৃষ্ট প্রযুক্তির স্থলান্তর অনুসারে শস্য ও সার সম্পর্কিত মৌলিক ও ফলিত গবেষণা পরিচালনা, পরীক্ষা এবং প্রদর্শনের জন্য প্রতিনিধিত্বমূলক স্থান নির্বাচন; v) স্থানীয় পর্যায়ে কৃষি, বনায়ন, মৎস্য, পশু সম্পদ, নগর আবাসন এবং অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রকল্প নির্বাচন, প্রণয়ন, বাস্তবায়ন, পরিচালনা, মূল্যায়ন এবং অভিযোজন; vi) ঝুঁকিপ্রবণ এলাকা চিহ্নিতকরণ এবং প্রাক-দুর্যোগ প্রস্ত্ততিমূলক কর্মকান্ড ও দুর্যোগ পরবর্তী পুনর্বাসন পরিকল্পনাসমূহের উন্নয়ন।

এসব বিষয়সহ মৃত্তিকা পরীক্ষা এবং শস্যের ফলনের সহসম্পর্কের ভিত্তিতে ব্লক, মৌজা, ইউনিয়ন ও থানা পর্যায়ে কৃষি উৎপাদন কর্মসূচি এবং সার ব্যবহারের জন্য জমি নির্বাচন হলো থানা নির্দেশিকা ভিত্তিক মৃত্তিকা প্রযুক্তি প্রয়োগের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। স্থানীয় পর্যায়ে কৃষি উৎপাদন কর্মসূচি প্রণয়নের এ প্রযুক্তি প্রয়োগের একটি উদাহরণ নিম্নে দেয়া হলো। উদাহরণটি স্থানীয় পর্যায়ে কৃষি উৎপাদন পরিকল্পনা প্রণয়নে ‘থানা নির্দেশিকা’ ভিত্তিক মৃত্তিকা প্রযুক্তির প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটি ধাপ-ভিত্তিক উদাহরণ।

ধাপ-১ শস্য/শস্যের ধরন নির্বাচন, যার সম্প্রসারণ/প্রচলন করা হবে।
ধাপ-২ স্থানসমূহের নির্বাচন যেখানে এসব শস্য/শস্যের ধরন আবাদ করা হবে।
ধাপ-৩ মৃত্তিকা association-সহ একটি ছক তৈরি করণ। নির্বাচিত স্থান জুড়ে মৃত্তিকা সিরিজ এবং ভূমির ধরণকে বিবেচনায় আনা।
ধাপ-৪ পূর্বাহ্নে তৈরিকৃত আদর্শ শস্য উপযুক্ততা ছকের সহায়তায় আকাক্সিত শস্যের উপযোগী মৃত্তিকা ও ভূমির ধরন প্রদর্শন করে এমন একটি ছক তৈরি করা।
ধাপ-৫ আকাক্সিত শস্যের জন্য মৃত্তিকা association অনুসারে সর্বমোট উপযোগী এলাকা (হেক্টরে) প্রদর্শন করে এমন একটি ছক তৈরি করা।
ধাপ-৬ প্রতিটি মৃত্তিকা association-এ উপযোগী মৃত্তিকা ও ভূমিধরন সম্বলিত এলাকার (হেক্টর) পরিমাণ নির্ধারণ।
ধাপ-৭ একটি নির্দিষ্ট শস্যের জন্য মৃত্তিকার বিভিন্ন পর্যায়ের উপযোগিতার স্থানগত বণ্টন দেখিয়ে স্বতন্ত্র শস্যের কার্যকর শস্য উপযুক্ততা নির্দেশক মানচিত্র প্রস্তুত করা।
পূর্বকৃত relevant শস্য উপযুক্ততার মানচিত্রের সহায়তায় আকাঙ্খিত শস্যের জন্য স্থান নির্বাচনে অগ্রাধিকার নির্ণয়।
আকাক্সিত স্বতন্ত্র শস্যের জন্য উপযোগী সর্বমোট এলাকার (হেক্টর) প্রাক্কলন।
প্রচরিত চর্চা, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা শস্য এবং কৃষকের পছন্দকে বিবেচনায় রেখে মোট এলাকার চূড়ান্তকরণ।
ব্যবহারকারীদের দ্বারা নির্বাচনের জন্য শস্য উপযুক্ততা Rating ভিত্তিক ভবিষ্যৎ শস্য/শস্যের নমুনা বা ধরনের জন্য কিছুসংখ্যক বিকল্পের সুপারিশ করা।
ধাপ-৮ উৎপাদনের জন্য ভূমিতে প্রয়োগকৃত এবং ভূমি সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় দ্রব্য বিষয় নির্ধারণ: গৃহীত এলাকা (হেক্টর) এবং শস্য প্রজাতিসমূহ/প্রকারসমূহ অনুযায়ী বীজ, সার, কীটনাশক, ভূমি প্রস্তুতকরণ এবং সেচ যন্ত্রপাতি ইত্যাদি।
বান্তবায়নের জন্য বিস্তারিত কর্ম পরিকল্পনা (বাৎসরিক, স্বল্প মেয়াদী, বা দীর্ঘমেয়াদী) প্রস্তুতকরণ।

[মোঃ সিরাজুল ইসলাম]