ভূমিজ


ভূমিজ  বাংলাদেশের একটি আদিবাসী জনগোষ্ঠী। আদিনিবাস বিহার ছেড়ে তারা ভূমির সন্ধানে পূর্বদিকে পাড়ি জমায় এবং কৃষি কাজকে পেশা হিসাবে বেছে নেয়। ফলে তাদের নতুন নাম হয় ভূমিজ অর্থাৎ ভূমির সন্তান। বিশ শতকের প্রথম দিকে ভূমিজরা সিলেট অঞ্চলে আসে এবং এখানকার চা বাগানগুলিতে কাজ শুরু করে। বর্তমানে মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলে চা-শ্রমিক হিসেবে তারা বাস করছে। ভূমিজদের সংখ্যা প্রায় তিন হাজার।

ভূমিজরা নিজেদের মধ্যে মুন্ডারী ভাষা ব্যবহার করে থাকেন। ধর্মবিশ্বাসে ভূমিজরা সনাতনপন্থী হিন্দু। তবে তারা তাদের আদি ধর্মের কিছুকিছু ঐতিহ্যকে এখনও পর্যন্ত সযত্নে লালন করে চলেছে। আদি দেবদেবীর মধ্যে রয়েছে বরম দেওতা, ধরম দেওতা, সিংবোঙ্গা, জাহুবোড়া এবং উৎসবগুলি হচ্ছে বন্দনা, টুসু, কারাম। পৌষ সংক্রান্তির দিনে অর্থাৎ পৌষ মাসের শেষ দিনে ভূমিজরা টুনু পর্ব পালন করে। ভাদ্রমাসে তারা পালন করে কারাম উৎসব। বিভিন্ন পূজা পার্বণে এবং উৎসব আয়োজনে তারা তাদের ঐতিহ্যবাহী লোকগাঁথা পরিবেশন এবং সমভাবে নারী পুরুষ এতে অংশগ্রহণ করেন। বাধ্যযন্ত্র হিসেবে বাঁশি তাদের নিকট খুব প্রিয় এবং তাদের বাঁশি বাজানোর দক্ষতাও ভাল। পূজা-পার্বণে তারা হিন্দু ব্রাহ্মণদেরকেই পৌরোহিত্য করার জন্য আমন্ত্রণ জানায়। আদিধর্মের দেবদেবী পূজার বেলায় তারা নিজ সম্প্রদায়ের পুরোহিত অর্থাৎ ‘লাভা’কে কাজে লাগায়।

ভূমিজ সমাজ বিভিন্ন গোত্র যেমন: বান, বাউন্দ্রা, ভুগল, গরুড়, কাছিম, কাইট্টা, নাগ, ষাড়, সোনা, ট্রেশা প্রভৃতিতে বিভক্ত। নিজ গোত্রমধ্যে বিবাহ ভূমিজ সমাজে নিষিদ্ধ। ভূমিজরা নিজেদেরকে ক্ষত্রিয় বলে মনে করে। ভূমিজ সমাজে পুত্রসন্তানরাই সম্পত্তির উত্তরাধিকারী। এ সমাজ অসম প্রথা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের দ্বারা বিবাহবিচ্ছেদের প্রথা রয়েছে। ছোটখাটো সামাজিক ও পারিবারিক সমস্যা প্রবীণ এবং নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের মধ্যস্থতায় নিষ্পন্ন হয়।

ভূমিজরা মৃতদেহ দাহ করে। তবে ছয়মাসের কম বয়েসী শিশুকে তারা সমাহিত করে। মৃতব্যক্তির নিকটাত্মীয়েরা এগারোদিন অশৌচকাল পালন করে।  [সুভাষ জেংচাম]