ভূতাত্ত্বিক শিলাদল-স্তরসমষ্টি


ভূতাত্ত্বিক শিলাদল-স্তরসমষ্টি (Geological Group Formation)  শিলাদল হচ্ছে ভূতাত্ত্বিক স্তর অনুক্রম, যা থেকে পরবর্তীতে সম্পূর্ণ অংশ অথবা অংশবিশেষ স্তরসমষ্টিতে বিভক্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। স্তরসমষ্টি হচ্ছে শিলালক্ষণ বৈশিষ্ট্যাদি এবং স্তরীয় অবস্থান দ্বারা শনাক্তকৃত একটি শিলার সমষ্টি, যাকে ভূ-পৃষ্ঠে মানচিত্রায়ণ করা সম্ভব অথবা ভূগর্ভে চিহ্নিত করা যায়। নিম্নে স্তরতাত্ত্বিক দিক থেকে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ শিলাদল-স্তরসমষ্টি প্রবীণতম থেকে নবীনতম হিসেবে সজ্জিত করে আলোচনা করা হলো:

গন্ডোয়ানা শিলাদল (Gondwana Group) পার্মিয়ান (২৮ কোটি ৬০ লক্ষ থেকে ২৪ কোটি ৫০ লক্ষ বছর পূর্বে) যুগের গন্ডোয়ানা শিলাদল হচ্ছে বাংলাদেশের প্রবীনতম পাললিক শিলা একক। এই শিলা একক প্রিক্যাম্ব্রিয়ান কেলাসিত ভিত্তিশিলার উপর অসংগতভাবে (unconformably) অধিশায়িত। কংগ্লোমারেট, ফেল্ডস্পারজাতীয় বেলেপাথর, অঙ্গারীভূত বেলেপাথর, ধূসর ও অঙ্গারীভূত কর্দমশিলা এবং কয়লাস্তর দ্বারা এই শিলাদল বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। এ সকল পলল চ্যুতিগ্রস্ত প্রিক্যাম্ব্রিয়ান অববাহিকায় সঞ্চিত হয়েছে এবং উল্লেখযোগ্য পুরুত্ব অর্জন করেছে। গন্ডোয়ানা শিলাদলে বিদ্যমান পুরু কয়লাস্তর এবং অঙ্গারীভূত কর্দমশিলা তেল অথবা গ্যাসের কোন সম্ভাবনা নির্দেশ করে না। কুচমা স্তরসমষ্টি এবং পাহাড়পুর স্তরসমষ্টি - এই দুইভাগে গন্ডোয়ানা শিলাদল বিভক্ত।

PhysiographyGroupFormation.jpg

কুচমা স্তরসমষ্টি  মানচিত্রে দেখানো যায় বঙ্গীয় অববাহিকার এমন প্রবীণ পারমিয়ান শিলাস্তর। এটিকে শিলার বৈশিষ্ট্য ও স্তরতাত্ত্বিক অবস্থানের ভিত্তিতে নির্ণয় করা হয়। টি আহমেদ ও এম.এ জাহের কর্তৃক বগুড়া জেলার কুচমা অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ শিলাস্তরের নামকরণ কুচমা স্তরসমষ্টি করার প্রস্তাব করেন। এটির প্রতিশব্দ হলো বরাকর সোপান ও বরাকর সিরিজ। টাইপ সেকশন হলো বগুড়া জেলার কুচমা অঞ্চলের (২৪°৪২´ উত্তর অক্ষাংশ, ৮৯°১৬´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ) ২,৩৬৪ মিটার থেকে ১,৮৫৮ মিটার গভীরে প্রাপ্ত শিলাস্তর। স্তরসমষ্টিটি বেলেপাথর, গ্রিট ও সামান্য পরিমাণে কর্দমশিলা ও অন্তঃস্তরায়িত কয়লা দ্বারা গঠিত। ৬ মিটার, ২২ মিটার, ১৩ মিটার, ৪ মিটার ও ৬ মিটার বিশিষ্ট পাঁচটি কয়লাস্তর টাইপ সেকশনে রয়েছে। স্তরসমষ্টিটি ৪৯৫ মিটার পুরু। কুচমা স্তরসমষ্টি ভিত্তিশিলার উপরে অসংগতভাবে অধিশায়িত এবং সংগতভাবে পাহাড়পুর স্তরসমষ্টির নিচে অবস্থান করছে। শিলা এককটিকে ভারতের প্রবীণ গন্ডোয়ানা শিলাদলের প্রবীণ পারমিয়ান বরাকার সোপানের সঙ্গে মোটামুটিভাবে সম্পর্কযুক্ত করা যায়, যদিও এই সম্পর্ককরণ কোন প্রকার জীবাশ্মস্তরতত্ত্ব ভিত্তিক নয়। শুধুমাত্র শিলাভিত্তিক সম্পর্ককরণ সমস্যাবহুল হতে পারে। এই সমস্ত বিষয় বিবেচনা করে ক্লাচ আলরিখ রায়ম্যান এই এককটিকে পরবর্তী উচ্চ স্তরতাত্ত্বিক একক অর্থাৎ ডামুড্যা সোপানের সঙ্গে সম্পর্ককরণ করেছেন।

পাহাড়পুর স্তরসমষ্টি অঙ্গারময় এই এককটি বাংলাদেশের উত্তরপশ্চিমে নওগাঁ জেলার পাহাড়পুর-জামালগঞ্জ কয়লাক্ষেত্রে খননকালে আবিষ্কৃত হয়। এটি ভিত্তিশিলা কমপ্লেক্সের (basement complex) উপরে এবং অসংগতভাবে মেসোজোয়িক যুগের ক্ষারীয় আগ্নেয়শিলায় (basalt) গঠিত রাজমহল শিলা সোপানের (Rajmahal Trap) নিচে অবস্থিত। স্তরসমষ্টির শিলাসমূহ (৫১২ মিটার) গাঢ় ধূসর কর্দমশিলার পাতলা লেন্সের সঙ্গে ধূসর, মাঝারি থেকে খুবই মোটা দানাবিশিষ্ট বেলেপাথর এবং ৪টি বিটুমিনাস কয়লাস্তরে গঠিত। কয়লার নির্দিষ্ট অঙ্গারের পরিমাণ ৩৩% থেকে ৫৪% যার গড় ৪৭%, ভস্মের পরিমাণ ১০% থেকে ৬০% যার গড় ২২.৪% এবং উদ্বায়ী পদার্থ ৩০-৪০%। এককটির স্তরীয় অনুক্রম অংশত শিলাতত্ত্ব, জীবাশ্মতত্ত্ব ও পরাগতত্ত্বের দ্বারা এবং অংশত জ্ঞাত অঞ্চলের সঙ্গে স্তরীয় ও শিলালক্ষণ পারম্পর্যের দ্বারা নির্ণীত হয়েছে। পাহাড়পুর স্তরসমষ্টি একটি প্রশস্ত অগভীর স্বাদুজলীয় অববাহিকায় অবক্ষেপিত ছিল। পরবর্তীতে এর বিস্তৃতি চ্যুতি ও ক্ষয়ের ফলে হ্রাস পায়। স্তরসমষ্টিটি উত্তর পারমিয়ান যুগের সহগোত্রীয় এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গের প্রবীণ গন্ডোয়ানা শিলাদলের রাণীগঞ্জ স্টেজের সমকক্ষ বলে মনে করা হয়।

রাজমহল সোপান (Rajmahal Stage)  ভারতের রাজমহল পাহাড়ের (২৪°৩০´ উত্তর, ৮৭°৩০´ পূর্ব) অনুকরণে এই নামকরণ। রাজমহল আবদ্ধিক সোপান (Rajmahal Traps Stage) নামেও এককটিকে উল্লেখ করা যায়। খাসিয়া পাহাড়ে দৃশ্যমান সিলেট শিলাসোপানকে (Sylhet Trap) রাজমহল সোপানের পূর্বমুখী সম্প্রসারণ বলে মনে করা হয়। টাইপ সেকশনে রাজমহল সোপান ৪৫০-৬০০ মিটার ব্যাসল্টিয় লাভা এবং অন্তঃস্তরায়িত কর্দম ও কর্দমস্তর দ্বারা গঠিত। এগুলোর মধ্যে কিছু সিলিকায়িত ও কিছু পোরসিলেনয়েডে রূপান্তরিত হয়েছে। প্রবাহগুলির মধ্যে দুটি পিচস্টোন (Pitchstone)। ব্যাসল্টিয় লাভার সঙ্গে পাললিক স্তরসমূহের মোট পুরুত্ব মাত্র ৩০ মিটার এবং প্রতিটি স্তর ১.৫-৬ মিটার। নিম্নবর্তী ৫টি ব্যাসল্টিয় প্রবাহের মধ্যে ৪টি প্রবাহের মধ্যকার আন্তঃট্র্যাপীয় অবক্ষেপে প্রচুর উদ্ভিদের অবশিষ্টাংশ বিদ্যমান আছে। ট্র্যাপ শিলাসমূহ প্রধানত হর্নব্লেন্ড ব্যাসল্ট, ধূসর সুবজাভ ব্যাসল্ট ও এ্যানডেসাইট এবং এগুলো অধিকাংশই এ্যামিগডালয়ডল (amygdaloidal), যার রন্ধ্রগুলো ক্যালসাইট, ক্যালসিডিনি ও এ্যানালসাইট দ্বারা পূর্ণ। ব্যাসল্টসমূহ গাঢ় রঙের এবং খুবই মিহি ম্যাট্রিক্সে পূর্ণ। সর্বোচ্চ ব্যাসল্ট প্রবাহটি সবচেয়ে পুরু, প্রায় ৭৬ মিটার। তবে অন্য প্রবাহগুলো আরও কম পুরু। বাংলাদেশে পশ্চিমাঞ্চলীয় বগুড়া, জামালগঞ্জ, শিবগঞ্জ ও সিংড়া অঞ্চলের ভূগর্ভে রাজমহল ট্র্যাপ শিলার সন্ধান পাওয়া গেছে। এগুলোর পুরুত্ব ৬৮ মিটার থেকে ৫৪৬ মিটার। সিংড়ায় (২৪°২৯´ উত্তর, ৮৯°১৯´ পূর্ব) একটি আন্তঃট্র্যাপীয় স্তরের সঙ্গে দুটি ট্র্যাপ স্তর রয়েছে।

রাজমহল সোপান টাইপ সেকশনে এবং বাংলাদেশের উভয় ক্ষেত্রে পাহাড়পুর স্তরসমষ্টির উপর অসংগতভাবে শায়িত (বরাকার সোপান) এবং শিবগঞ্জ ট্র্যাপওয়াশ দ্বারা (Mahadek Trap Wash) অসংগতভাবে অধিশায়িত। রাজমহল পাহাড়ের আন্তঃট্র্যাপীয় স্তরসমূহ বিশেষ করে নিপানিয়ার কাছে চার্ট (chert) স্তরসমূহে উদ্ভিদ জীবাশ্ম পাওয়া গিয়েছে। জীবাশ্মগুলো থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, টাইপ সেকশনে রাজমহল সোপান জুরাসিক যুগীয়। বাংলাদেশের সিংড়ায় আন্তঃট্র্যাপীয় স্তরে কোন উদ্ভিজ্জ অথবা প্রাণীজ জীবাশ্ম পাওয়া না যাওয়ায় বাংলাদেশে রাজমহল সোপানের কোন নির্ভরযোগ্য বয়সকাল নিরূপণ সম্ভব হয় নি। তবে এটিকে জুরাসিক-প্রবীণ ক্রিটেসিয়াস বলে মনে করা যেতে পারে।

বোলপুর স্তরসমষ্টি (Bolpur Formation)  ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বোলপুর নামক স্থানের (২৩°৩৭´ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৭°৪৫´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ) নামানুসারে ভূগর্ভস্থিত এই স্তরসমষ্টির নামকরণ করা হয়েছে। ১৬০ মিটার পুরুত্ববিশিষ্ট এই স্তরসমষ্টি সমুদ্রপৃষ্ঠের ১,০৩২ মিটার থেকে ১,১৯৩ মিটার নিচে অবস্থিত। রাজমহল শিলাসোপানের উপর এই স্তরসমষ্টি অসংগতভাবে অধিশায়িত এবং এর উপরে নবীন ক্রিটেসিয়াস (১৪ কোটি ৪০ লক্ষ থেকে ৬ কোটি ৬০ লক্ষ বছর পূর্বে) ঘাটাল স্তরসমষ্টি অথবা জালাঙ্গী স্তরসমষ্টি সংগতভাবে অধিশায়িত রয়েছে। বোলপুর স্তরসমষ্টি লোহিত বর্ণের কর্দম, কর্দমপাথর ও সবুজাভ বেলেপাথর (Trapwash) এবং কোন কোন স্থানে শ্বেতবর্ণের বেলেপাথর দ্বারা গঠিত। এই স্তরসমষ্টিতে কোন ফোরামিনিফেরা পাওয়া যায়নি, তবে এর ঊর্ধ্বে শায়িত জালাঙ্গি স্তরসমষ্টির সঙ্গে পরিবর্তনশীল মন্ডলে (transitional zone) কখনও কখনও চারা (Chara)-এর জীবাশ্ম অবশেষ (gyrogonites) এবং লবণাক্ত-স্বাদুজল (brackish) ও উপহ্রদীয় (lagoonal) অস্ট্রাকোডা পাওয়া যায়। বোলপুর স্তরসমষ্টির স্থানে স্থানে আদিম দ্বিবীজপত্রী উদ্ভিদের পরাগরেণু (pollen) বিদ্যমান থাকতে দেখা যায়। এই স্তরসমষ্টি প্রধানত স্বাদুপানির সঞ্চয়ন, তবে এর ঊর্ধ্বাংশের কোন কোন স্থানে মোহনাজ সঞ্চয়নও সংশ্লিষ্ট রয়েছে। এতে বিদ্যমান বীজরেণু (spore) ও পরাগরেণু বোলপুর স্তরসমষ্টির গঠনকাল ক্রিটেসিয়াস যুগের বলে নির্দেশ করছে। বোলপুর স্তরসমষ্টির শিলালক্ষণ, স্তরতাত্ত্বিক অবস্থান ও বয়সের কথা বিবেচনা করে এটিকে খুব সহজেই উত্তরবঙ্গের সোপান অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ ক্রিটেসিয়াস শিবগঞ্জ ট্রাপওয়াস এবং আসামের ক্রিটেসিয়াস মহাদেব স্তরসমষ্টির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত করা যায়।

তুরা স্তরসমষ্টি (Tura Formation) গারো পাহাড়ে প্রকটিত প্যালিওসিন/প্রবীণ ইয়োসিন যুগের বেলেপাথরসমৃদ্ধ ভূতাত্ত্বিক স্তরক্রম। আসামের তুরা শহরের (২৫°৩১´ উত্তর অক্ষাংশ, ৯৯°১৫´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ) অনুকরণে ভূতত্ত্ববিদ সি.এস ফক্স এই স্তরসমষ্টির নামকরণ করেন। শিবগঞ্জ স্তরসমষ্টির ঊর্ধ্বে এই স্তরসমষ্টি অসংগতভাবে শায়িত এবং সিলেট চুনাপাথরের নিম্নে সংগতভাবে অবস্থিত। এই স্তরসমষ্টিটি সিলেট জেলার টাকেরঘাট নামক স্থানে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বিদ্যমান। বগুড়া এবং রাজশাহী জেলার ভূগর্ভেও এই ভূতাত্ত্বিক এককের উপস্থিতি রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। তুরা স্তরসমষ্টির শিলাগঠন অপ্রধান (subordinate) কর্দমশিলা ও ক্যালকেরিয়াস কর্দম (marl) এবং কখনও কখনও অঙ্গারময় কর্দমশিলাসহ প্রধানত বেলেপাথর দ্বারা গঠিত। বেলেপাথরের বর্ণ হাল্কা ধূসর, সাদা, ফ্যাকাশে সাদা এবং হাল্কা বাদামি হয়ে থাকে। এই স্তরসমষ্টি সূক্ষ্ম থেকে মোটা দানাবিশিষ্ট এবং কোন কোন স্থানে নুড়িময় (pebbly)। আড়াআড়ি স্তরায়নও (cross bedding) লক্ষ্য করা যায়। বেলেপাথরের মধ্যে পাতলা স্তর হিসেবে কর্দম শিলা উপস্থিত থাকে এবং এর বর্ণ ধূসর থেকে ধূসরাভ বাদামি হয়ে থাকে। মার্ল-এর স্তর ধূসরাভ বাদামি বর্ণের এবং জীবাশ্মসমৃদ্ধ। অঙ্গারময় শিলার স্তর স্থানীয়ভাবে কয়লা খনিতে সৃষ্টি হয়ে থাকে। গারো পাহাড়ে এই স্তরসমষ্টি প্রায় ১৫২ মিটার পুরু। বগুড়া গ্রস্ত উপত্যকায় অবস্থিত সিংড়া-৯, কুচমা-১১ এবং বগুড়া-১১ -এর পুরুত্ব যথাক্রমে ৩৬০ মিটার, ২৭০ মিটার এবং ১৬৯ মিটার রেকর্ড করা হয়েছে। সিলেটের লালঘাটে অবস্থিত ডি.এইচ-৫ -এ তুরা বেলেপাথরের পুরুত্ব পাওয়া গিয়েছে ২৩৭.৮০ মিটার। তবে বাংলাদেশের উত্তরাংশে ই.ডি.এইচ-৩ -এ তুরা বেলেপাথরের সর্বোচ্চ পুরুত্ব নির্ণয় করা হয়েছে ১০৫ মিটার। আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানি স্ট্যান্ডার্ড ভ্যাকুয়াম অয়েল কুচমা এবং বগুড়া কূপের ধারাক্রম বর্ণনায় সুপ্রতিষ্ঠিত চেরা স্তরসমষ্টিকে ব্যবহার করেছে।

চেরা স্তরসমষ্টি (Cherra Formation)  উত্তরাঞ্চলীয় অন্তরীপ সোপানের, বিশেষ করে খাসিয়া ও জৈন্তিয়া পাহাড়ে টারশিয়ারী যুগের প্রধানত বালুময় স্তর। গারো পাহাড়ে বিদ্যমান অনুরূপ অবক্ষেপ তুরা স্তরসমষ্টি নামে পরিচিত। পরাগস্তরীয় বিশ্লেষণে দেখা গেছে শিলং মালভূমির দক্ষিণাঞ্চলীয় ঢাল বরাবর চেরা ও তুরা স্তরসমষ্টি এবং আপার আসামের টিওক স্তরসমষ্টির (Teok formation) বয়স মিকির স্তরসমষ্টির সমান। বাংলাদেশে তুরা স্তরসমষ্টি পর্যায়ক্রমিক সাদা, গোলাপি ও বাদামি মিহি থেকে মোটা দানাবিশিষ্ট ব্যাপকভাবে আড়াআড়ি স্তরায়িত বেলেপাথর, হাল্কা, ধূসর, ছাই ধূসর কর্দম শিলা, কাদাপাথর ও অঙ্গারময় বস্ত্তদ্বারা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ।

সোপানের প্রান্তিক অংশে টারশিয়ারী ভিত্তি স্তরক্রম গঠনকারী চেরা ও তুরা স্তরসমষ্টির বয়স নির্ণয় নিয়ে দীর্ঘদিন বিতর্ক ছিল। শিলাগত সাদৃশ্য ছাড়াও অনুপুষ্পক (microfloral) সমাহারের পারম্পর্য (correlation) দুটির মধ্যে একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক প্রদর্শন করে। পরাগীয় উপাত্তে দেখা যায় তুরা স্তরসমষ্টিকে ৪টি সেনোজোনে বিভক্ত করা যায়, যেখানে চেরা স্তরসমষ্টিকে ৩টি সেনোজোনে চিহ্নিত করা গেছে, যদিও শিলা স্তরক্রমে অনুপুষ্পক সমাহারের উপাদানে বিভিন্নতা খুবই অল্প। প্রকাশিত অনেক নিবন্ধে দুটি স্তরসমষ্টিকেই প্যালিওসিন অবক্ষেপ বিবেচনা করা হয়েছে। অবশ্য কোন কোন লেখকের মতে পরীক্ষিত স্তরক্রমের পরাগস্তরতাত্ত্বিক গবেষণা থেকে অনুমান করা যেতে পারে যে, চেরা স্তরসমষ্টি প্রবীণ ইয়োসিন যুগের। পরবর্তীতে অন্যান্য গবেষকরাও অনুরূপ যুক্তি মেনে নেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যান্ডার্ড ভ্যাকুয়াম অয়েল কোম্পানি কুচমা ও বগুড়া কূপসমূহের স্তরক্রম বর্ণনায় সুপরিচিত নাম চেরা স্তরসমষ্টি গ্রহণ করেছে। পরবর্তীতে এই শিলা একককে কুচমা বেলেপাথর নামে অভিহিত করা হয়।

কোপিলি স্তরসমষ্টি (Kopili formation)  ভারতের আসামস্থ কোপিলি নদীর নামানুসারে পি. ইভান্স (P Evans) জৈন্তিয়া সিরিজের নবীন এককের নামকরণ করেন কোপিলি স্টেজ। বাংলাদেশে সিলেট জেলার ডাউকি নদীর তীরেই শুধু এই স্তরসমষ্টির পুরুত্ব ৩৬০ থেকে ৪৬০ মিটারের মধ্যে। বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলীয় অন্তরীপ সোপান অঞ্চলের গাইবান্ধায় ৮৮ মিটার ও সিংড়ায় ৪০ মিটার অন্তর্ভূ-পৃষ্ঠে কোপিলি স্টেজের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। এই স্তরসমষ্টির গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি আপার আসামে, যা ৭০০ মিটার বলে জানা গেছে। এই স্তরসমষ্টি ইয়োসিন চুনাপাথরের উপরে এবং ওলিগোসিন লাইসং স্তরসমষ্টির নিচে অবস্থিত।

চুনযুক্ত বেলেপাথরের (calcareous sandstone) সঙ্গে গাঢ় ধূসর কর্দমশিলা দিয়ে এই স্তরসমষ্টি গঠিত। ডাউকি নদীতে এই কর্দমশিলা ব্যাপকভাবে বিদ্যমান থাকলেও গাইবান্ধা অঞ্চলে কর্দম ও বালুর অনুপাত প্রায় ১:১। স্তরসমষ্টিটি জীবাশ্মসমৃদ্ধ। গুরুত্বপূর্ণ জীবাশ্মসমূহ হচ্ছে Quinqueloculina bouena, Q. carinata, Q. seminulum, Q. zealandica, Q. praelongirostrata, Pyrgo bulloides, Triloculina gibba, Lagena globosa, L. hexagons, L. hispidula, Discorbis globiformis, Chiloguembelina parallela, Nonion ovatum, Globigerina, Cibicides mimulus, Pullenia quinqueloba, Pararotalia audouini, P. armata, Nummulites pengaroensis, Pellatispora inflata, P. irregulaaris, P. glabra, Guembelitria oveyi, Discocyclina, Hantkenina, Globorotalia এবং Cancris। পরাগতত্ত্বগত উপাত্ত Zonocostities ramonae, Dicolpopollenites kalewensis, Ephedra ইত্যাদির উপস্থিতির ইঙ্গিতবাহী। কোপিলি স্তরসমষ্টি অগভীর সামুদ্রিক থেকে অর্ধ লবণাক্ত পরিবেশে মজুত ছিল। এই জল ছিল অর্ধ লবণাক্ত থেকে লবণাক্ত এবং তাপমাত্রা ছিল ১০০ থেকে ৩০০ সেন্টিগ্রেডের মধ্যে। এই স্তরসমষ্টি নবীন ইয়োসিন যুগের বলে প্রমাণিত হয়েছে।

বর্ধমান স্তরসমষ্টি (Burdwan Formation)  ওলিগোসিন ও মায়োসিন সময়কার অবক্ষেপ নিয়ে গঠিত। এটি ধাপে ধাপে মায়োসিন পান্ডুয়া স্তরসমষ্টি ও ওলিগোসিন মেমারী স্তরসমষ্টির সঙ্গে মিলে যায়। স্তরক্রমের নিচের দিকে বর্ধমান স্তরসমষ্টি স্বাদুজল পরিবেশে অবক্ষেপ নির্দেশ করে, যা প্রধান ওলিগোসিন সময়ের সমুদ্রের পশ্চাদ্গতির (regression) সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু স্তরক্রমের উপরের দিকে বর্ধমান স্তরসমষ্টি সামুদ্রিক অথবা মোহনাজ পরিবেশে অবক্ষেপ নির্দেশ করে। বর্ধমান স্তরসমষ্টি মূলত মিহি ও মোটা দানাযুক্ত বেলেপাথর দিয়ে গঠিত, যার মধ্যে অন্তঃস্তরায়িত অবস্থায় আছে কর্দমশিলা এবং বিশেষ করে স্তরক্রমের নিচের দিকে লিগনাইটিক কর্দমশিলা। বর্ধমান-১ কূপে লিগনাইটিক কর্দমশিলার পুরুত্ব প্রায় ১৬৩ মিটার। এই কূপটিকে এই স্তরসমষ্টির টাইপ সেকশন হিসেবে ধরা হয়। এই স্তরসমষ্টির প্রবীণ স্তরসমূহ ও নবীন স্তরসমূহের মধ্যকার সীমানা হলো পরিবর্তনমূলক। এই স্তরসমষ্টিটি কোন কোন কূপে যেমন, বর্ধমান-১, গালসি-১, বোলপুর-১, দেবগ্রাম-১ এবং জালনাজ-১-এ সংগতভাবে উপরে শায়িত নিওজিন পান্ডুয়া স্তরসমষ্টির সঙ্গে ধাপে ধাপে মিশে গেছে। আবার কোন কোন কূপে যেমন, মেমারী-১ এবং ঘাটাল-১ এ বর্ধমান স্তরসমষ্টি মেমারী স্তরসমষ্টি (ওলিগোসিন) দ্বারা অধিশায়িত। পরাগ স্তরতত্ত্ব গবেষণায় বর্ধমান স্তরসমষ্টিকে বঙ্গীয় পরাগ স্তরতাত্ত্বিক ওলিগোসিন জোন-iv এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে এই এককের উপরিস্থিত অংশটি প্রবীণ মায়োসিন হিসেবে চিহ্নিত।

বরাইল শিলাদল (Barail Group)  অনেকগুলি স্তরসমষ্টির সমন্বয়ে গঠিত ওলিগোসিন শিলাস্তরতাত্ত্বিক একক। আসামের বরাইল শৃঙ্গের আলোকে পি. ইভান্স এই শিলা এককটির নামকরণ করেন বরাইল সোপান। পরবর্তীতে বি. বিশ্বাস এটিকে সংশোধন করে নামকরণ করেন বরাইল শিলাদল। এটি ওলিগোসিন সময়ের ভূ-অবতলভঙ্গের (geosyncline) বিভিন্ন গঠন পর্যায় নির্দেশ করে। বরাইল সুরমা উপত্যকা, কাকরের উত্তরাঞ্চল এবং আসামের খাসিয়া ও জৈন্তিয়া পাহাড়ে প্রকটিত। এটি বেলেপাথর এবং স্থানে স্থানে কর্দমশিলা এবং অঙ্গারময় শিলা দ্বারা গঠিত। এই শিলাদলের তিনটি স্তরসমষ্টি রয়েছে। প্রবীণ থেকে নবীনতম স্তরসমষ্টিগুলি যথাক্রমে লেইসং স্তরসমষ্টি, জেনাম স্তরসমষ্টি ও রেনজি স্তরসমষ্টি। বাংলাদেশে সিলেটের জৈন্তাপুরের পূর্বে এবং ডাউকি নদীর পশ্চিমে রেনজি স্তরসমষ্টি প্রকটিত। সিলেটের আটগ্রামে খননকাজ চলাকালে কূপনম্বর আটগ্রাম- ix তে ৪,৭৪০ মিটার থেকে ৪,৯৮০ মিটার গভীরতায় জেনাম স্তরসমষ্টির শিলা পাওয়া গেছে। একইভাবে আটগ্রাম- ix কূপে রেনজি স্তরসমষ্টির শিলা ৪,০১৫ মিটার থেকে ৪,৭৪০ মিটার গভীরতায় পাওয়া গেছে। বরাইল শিলাদল জেনাম সিরিজের উপরে অংসগতভাবে সম্পর্কিত। আপার আসামে এই এককটিতে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক কয়লা ও তেলক্ষেত্র পাওয়া গিয়েছে।

সুরমা শিলাদল (Surma Group)  বরাইল শিলাদলের উপর অসংগতভাবে এবং টিপাম শিলাদলের নিচে সংগতভাবে শায়িত। এই শিলাদল ভূবন স্তরসমষ্টি এবং বোকাবিল স্তরসমষ্টি - এই দুই ভূতাত্ত্বিক উপ-এককে বিভক্ত। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাংশে অবস্থিত সিলেটে বোকাবিল স্তরসমষ্টি এবং টিপাম স্তরসমষ্টির মধ্যে স্থানীয় অসংগতি বিদ্যমান। বর্তমানে সুরমা শিলাদল বাংলাদেশ এবং ভারত - উভয় দেশেই একটি শিলা একক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

বোকাবিল স্তরসমষ্টি' (Bokabil Formation) সুরমা সিরিজের নবীন একক। পি. ইভান্স এই ভূতাত্ত্বিক এককটিকে ভারতের আসাম রাজ্যে অবস্থিত কাছাড় জেলার উত্তরাংশে হাইলাকান্দি (২৪°২৬´ উত্তর অক্ষাংশ, ৯২°৩২´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ) উপত্যকার নামানুসারে বোকাবিল শিলাসোপান হিসেবে নামকরণ করেছে। বোকাবিল এককটিকে শনাক্ত করার ক্ষেত্রে শিলালক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে এবং এ কারণে বাংলাদেশ এবং ভারত- উভয় দেশেই বোকাবিল শিলাসোপানকে বোকাবিল স্তরসমষ্টি তথা একটি শিলা একক হিসেবে নির্দেশ করা হয়ে থাকে। আসামে বোকাবিল স্তরসমষ্টি ৯০০ থেকে ১৫০০ মিটার পুরু বালুময় কর্দমশিলার সঙ্গে পালাক্রমে পলিপাথর ও লৌহজ বেলেপাথর বিদ্যমান আছে।

বোকাবিল স্তরসমষ্টি

বৃহত্তর সিলেট, চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের পর্বতসারিতে বোকাবিল স্তরসমষ্টি প্রকটিত। সাধারণত এই স্তরসমষ্টির ঊর্ধ্ব ও নিম্নভাগে কর্দমশিলা ও পলিপাথরের প্রাধান্য থাকে, তবে মধ্যভাগে বেলেপাথরের প্রাধান্য অধিক। নিম্নে শায়িত প্রধানত বালুময় প্রবীণ ভুবন স্তরসমষ্টি এবং ঊর্ধ্বে শায়িত টিপাম বেলেপাথর স্তরসমষ্টির মধ্যবর্তী স্থানে বোকাবিল স্তরসমষ্টি অবস্থিত। এই স্তরসমষ্টি ভারি মণিক ধারণ করে এবং জোইসাইট (zoisite), এপিডোট (epidote), স্টেরোলাইট (staurolite), কায়ানাইট (kyanite) এবং হর্নব্লেন্ডের (hornblende) উপস্থিতি দ্বারা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত।

গারো পাহাড়ের দুটি স্থানে বোকাবিল স্তরসমষ্টি থেকে এ যাবৎ ১০০টিরও অধিক প্রজাতির জীবাশ্ম শনাক্ত করা হয়েছে। এদের অধিকাংশই প্যালিসিপোডা (Pelecypoda) এবং গ্যাসট্রোপোডা (Gastropoda) প্রজাতিভুক্ত। নিম্নের কয়েক প্রজাতির ফোরামিনিফেরার উপস্থিতিও বোকাবিল স্তরসমষ্টিতে লক্ষ্য করা গিয়েছে। এগুলো হচ্ছে: Chiloguembelina globigera, Globigerina bulloides, G. falconensis, G. cf bradyi এবং G. quinqueloba। সীতাকুন্ড পাহাড়ে বোকাবিল কর্দমশিলায় Ostrea digitalina, O. gryphoides এবং অসংখ্য Bolanus, Arca, Pecten Trochus, Oliva এবং প্রবালের খোলক পাওয়া গিয়েছে। ধারণা করা হয় যে, এই স্তরসমষ্টি অগভীর সামুদ্রিক থেকে বদ্বীপীয় এবং মোহনাজাত পরিবেশে অবক্ষেপিত হয়েছে। বোকাবিল স্তরসমষ্টিতে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক প্রাকৃতিক গ্যাস মজুত রয়েছে।

টিপাম শিলাদল (Tipam Group)  কয়েকটি স্তরসমষ্টি নিয়ে বঙ্গীয় অববাহিকার এই প্লায়োসিন শিলাস্তরীয় এককটি গঠিত। ভারতের আসাম রাজ্যে অবস্থিত টিপাম পাহাড়ের (২৭°১৬´ উত্তর অক্ষাংশ, ৯৫°৩০´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ) নামানুসারে এফ. আর ম্যালে (Mallet) এই শিলাদলের নামকরণ করেন। আসামের ডিহিং নদী এলাকা (২৭°১৫´ উত্তর অক্ষাংশ, ৯৫°২৫´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ) এর টাইপ এলাকা। আপার আসাম এবং সুরমা উপত্যকা থেকে আরাকান উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় এই শিলাদল প্রকটিত। তবে ডিহিং অববাহিকার মূল টিপাম শিলাদলের সঙ্গে বঙ্গীয় অববাহিকার টিপাম শিলাদল কোনভাবেই সম্পর্কযুক্ত নয়। এই শিলাদল দুটি স্তরসমষ্টিতে বিভক্ত: টিপাম বেলেপাথর স্তরসমষ্টি এবং গিরুজান কর্দম স্তরসমষ্টি। বোকাবিল স্তরসমষ্টির উপর শায়িত টিপাম বেলেপাথর স্তরসমষ্টি মোটা দানাদার বেলেপাথর দ্বারা গঠিত। বঙ্গীয় অববাহিকার প্রান্তিক অংশ এবং পশ্চিমের সোপান এলাকাসমূহে এই দুই শিলা এককের মধ্যকার সম্পর্ক অসংগত, পক্ষান্তরে, অববাহিকার গভীরতর অংশে সংগত। টিপাম বেলেপাথর স্তরসমষ্টির সঙ্গে উপরিভাগের গিরুজান কর্দম স্তরসমষ্টির সর্ম্পকও সংগত। তবে গিরুজান কর্দম স্তরসমষ্টির অনুপস্থিতির ক্ষেত্রে ডুপিটিলা স্তরসমষ্টি অসংগতভাবে টিপাম বেলেপাথর স্তরসমষ্টির উপর অধিশায়িত থাকে।

টিপাম বেলেপাথর স্তরসমষ্টি প্রধানত ধূসর-বাদামি থেকে বিবর্ণ ধূসর, মোটা দানাযুক্ত, আড়াআড়িভাবে শায়িত বেলেপাথর দ্বারা গঠিত। ধূসর কর্দম শিলা, কংগ্লোমারেট ক্ষিতিজসমূহ (conglomerate horizons), নুড়িপাথর, কাষ্ঠখন্ড এবং শিলায়িত বৃক্ষগুঁড়ি এই স্তরসমষ্টিতে নিবিষ্ট (intercalated) থাকে। পার্বত্য চট্টগ্রামের দক্ষিণতম অংশ থেকে ভারতের মিজোরাম রাজ্যের পশ্চিম অংশ এবং ত্রিপুরা থেকে সুরমা অববাহিকা পর্যন্ত বিস্তৃত সম্মুখ বলিত বলয়ের (frontal folded belt) সর্বত্র প্রকটিত টিপাম বেলেপাথর স্তরসমষ্টির সঞ্চয়ন সংঘটিত হয়েছে। এই স্তরসমষ্টি নিয়মিতভাবে সম্মুখ বলিত বলয় এলাকার ঊর্ধ্বভঙ্গীয় প্রবণতাসমূহের (anticlinal trends) পার্শ্বদেশে বিদ্যমান থাকে এবং খাড়া পাড়ের (cliffs) সৃষ্টি করে। গ্রামিনী (gramineae) গোত্রের পরাগরেণু (gymnospermous pollen) এবং মনোপোরেট পরাগরেণু (monoporate pollen) জীবাশ্মের প্রাধান্য দ্বারা টিপাম স্তরসমষ্টি বৈশিষ্ট্যমন্ডিত।

আসামের ডিগবয় নামক স্থানে (২৭°২৩´ উত্তর অক্ষাংশ, ৯৫°৩৮´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ) প্রবাহিত একটি ক্ষুদ্র স্রোতস্বিনীর নামানুসারে পি. ইভান্স গিরুজান কর্দম সোপানের নামকরণ করেন। নিম্নশায়িত টিপাম বেলেপাথর স্তরসমষ্টি থেকে সংগতভাবে এবং পর্যায়ক্রমিকভাবে এই স্তরসমষ্টি গঠিত হয়েছে। বালুময় ডুপি টিলা স্তরসমষ্টি অসংগতভাবে এই স্তরসমষ্টির উপর অধিশায়িত রয়েছে। প্রধানত কর্বুরিত কর্দম ও অধীনস্ত কর্বুরিত বেলেময় কর্দম, বেলেপাথর ও অধীনস্ত লৌহময় বেলেপাথর দ্বারা গিরুজান কর্দম স্তরসমষ্টি গঠিত। জীবাশ্ম কাঠ এবং লিগনাইটও এই শিলা এককে বিদ্যমান। প্রধানত বলিত বলয়ের অধঃভাজ প্রবণতার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ বৃহৎ উপত্যকাসমূহে এই স্তরসমষ্টি সঞ্চিত হয়েছে। আসামে গিরুজান কর্দম স্তরসমষ্টির পুরুত্ব ৯১৫ মিটার থেকে ১,৮২৯ মিটার, সীতাকুন্ড ঊর্ধ্বভঙ্গে ১৬৮ মিটার, কক্সবাজারের সন্নিকটে ১০৭ মিটার, হারারগঞ্জ এলাকায় ৩৬৬ মিটার, শারি নদী এলাকায় ৭৬২ মিটার এবং লুবা খাল এলাকায় ১,০৭৭ মিটার। গিরুজান কর্দম স্তরসমষ্টি হ্রদীয় প্লাবনভূমি (lacustrine floodplain) এবং তীর অতিক্রমকারী (overbank) সঞ্চয়ন প্রদর্শন করে। এই পলি সঞ্চয়ন অর্ধবায়ব (subaerial) পরিবেশে সংঘটিত হয়েছে।

ডুপি টিলা স্তরসমষ্টি (Dupi Tila Formation)  মানচিত্রায়ন সম্ভব বঙ্গীয় অববাহিকার এমন একটি প্লায়োসিন-প্লাইসটোসিন শিলাস্তর। সিলেট জেলার শারি নদী অববাহিকা এলাকায় (২৫°০৬´ উত্তর অক্ষাংশ; ৯২°০৮´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ) ডুপিটিলা পাহাড়শ্রেণীর নামানুসারে পি.ইভান্স এই স্তরসমষ্টির নামকরণ করেন। চট্টগ্রাম বিভাগে এবং বাংলাদেশ ও ভারতের আসাম রাজ্যে অবস্থিত জৈন্তা পর্বতশ্রেণীর দক্ষিণ প্রান্তে এই স্তরসমষ্টি প্রকটিত। উত্তরবঙ্গে বেশকিছু ভূতাত্ত্বিক খননকূপে এই স্তরসমষ্টির উপস্থিতি লক্ষ্য করা গিয়েছে। টিপাম শিলাদলের উপর এই স্তরসমষ্টি অসংগতভাবে অধিশায়িত এবং ডুপি টিলা স্তরসমষ্টির ঊর্ধ্বে হয় ডিহিং স্তরসমষ্টি অথবা নবীন পলল সঞ্চয়ন বিদ্যমান থাকে। আটগ্রামে এই শিলাএকক বোকা বিল স্তরসমষ্টির উপর অধিশায়িত। সিলেটে ডুপি টিলা স্তরসমষ্টি দুটি সুস্পষ্ট এককে গঠিত। প্রবীণতর অংশটি প্রধানত সংহত (massive) বেলেপাথর এবং অপ্রধান অন্তঃস্তরায়িত কর্দমপাথর দ্বারা গঠিত। বেলেপাথরের বর্ণ হলুদ থেকে হলুদাভ বাদামি, মধ্যম থেকে মোটা দানাদার, আড়াআড়ি স্তরায়িত এবং স্থানে স্থানে নুড়িময়। নবীনতর অংশটি কর্দমশিলা এবং পলিপাথর ও অপ্রধান বেলেপাথর দ্বারা গঠিত। চট্টগ্রাম অঞ্চলের ডুপি টিলা স্তরসমষ্টি হলুদাভ-বাদামি থেকে বাদামি, মিহি থেকে মধ্যম দানাবিশিষ্ট নুড়িময় এবং অধীনস্থ কর্দমপাথর ও পলিপাথর সমৃদ্ধ আড়াআড়ি স্তরায়িত বেলেপাথর দ্বারা গঠিত। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের অন্তর্ভূ-পৃষ্ঠে ডুপি টিলা স্তরসমষ্টি নুড়িময় স্তর, মোটা থেকে মিহি দানাদার বেলেপাথর এবং ধূসর বর্ণের কর্দমশিলা দ্বারা গঠিত। রাঙ্গামাটির নিকটবর্তী কাপ্তাই হ্রদে বিদ্যমান ডুপি টিলা স্তরসমষ্টির বেলেপাথরে সুস্পষ্ট পত্রছাপ (leaf impressions) লক্ষ্য করা গিয়েছে। স্তরসমষ্টির সঞ্চয়নকালে সাধারণভাবে ভাঁজ ও চ্যুতি সংঘটিত হয়েছে এবং দ্রুত অবনমিত এলাকাসমূহে অত্যন্ত পুরু স্তরক্রমসমূহ অবক্ষেপিত হয়েছে। সিলেটের শারি নদী এলাকায় এই শিলা এককের পুরুত্ব প্রায় ১,৭২২ মিটার, গোয়াইন ও কুশিয়ারা খাদসমূহে পুরুত্ব যথাক্রমে ৪,৪১৯ মিটার ও ৩,৬৬৯ মিটার এবং উত্তরবঙ্গের অন্তর্ভূ-পৃষ্ঠে পুরুত্ব ২০ থেকে ২৭৬ মিটার। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার এলাকায় অবস্থিত ডুপি টিলা স্তরসমষ্টির স্থানে স্থানে চীনামাটির সঞ্চয়ন লক্ষ্য করা যায়, যদিও ময়মনসিংহ জেলায় অবস্থিত স্তরসমষ্টিতে চীনামাটির স্তর পাওয়া গিয়েছে।

ডিহিং স্তরসমষ্টি (Dihing Formation)  প্লাইসটোসিন যুগীয় জরিপযোগ্য এই শিলা বঙ্গীয় অববাহিকায় বিক্ষিপ্তভাবে বর্তমান এবং এর শুধুমাত্র স্থানীয় গুরুত্ব রয়েছে। ভারতের আসামে জয়পুরের কাছে ডিহিং নদী (১৭°১৬´ উত্তর, ৯০°২৪´ পূর্ব) থেকে এফ. আর ম্যালেট এই নামকরণ করেন। বাংলাদেশে এই স্তরসমষ্টির উপস্থিতি খুবই অনিয়মিত। কক্সবাজার জেলার রামু অঞ্চলে এর পুরুত্ব শুধুমাত্র ২৪ মিটার। তবে আসামের টাইপ সেকশনে ৩০৫ মিটার থেকে মানাবুম প্রতিবেশে ১,৫২৫ মিটার। স্তরসমষ্টিটি হলুদ ও ধূসর, মধ্যম দানাদার, মাঝেমাঝেই নুড়িময় বেলেপাথর এবং কর্বুরিত কর্দমের অন্তঃস্তরসহ কর্দমময় বেলেপাথরে গঠিত। এই শিলারাশি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই খুব কম দৃঢ়। এককটি ডুপি টিলা স্তরসমষ্টি ও পললের মধ্যে অসংগতভাবে শায়িত। কোন কোন এলাকায় ডিহিং স্তরসমষ্টির ভিত্তিস্তরে (base) চীনামাটি পাওয়া গিয়েছে। [মুজিবর রহমান খান, সিফাতুল কাদের চৌধুরী, মোঃ নিহাল উদ্দিন এবং এ.কে.এম খোরশেদ আলম]