ভূগর্ভস্থ পানি


ভূগর্ভস্থ পানি (Groundwater)  ভূ-পৃষ্ঠের নিচে সঞ্চিত পানি সম্পদ যা প্রধানত ভূ-পৃষ্ঠের সঞ্চয়িত পানি নিয়ে গঠিত। এই পানি মৃত্তিকা ও তার রন্ধ্রে সঞ্চিত হয়। ভূগর্ভস্থ পানির উপরের স্তরকে বলে ভূ-জলপৃষ্ঠ (water table)। পৃথিবীর স্বাদুজল সম্পদের প্রায় ৩০% আসে ভূগর্ভস্থ পানি থেকে। তবে আহরণযোগ্য সাধু পানির প্রায় ৯৭% আসে ভূগর্ভস্থ পানি থেকে। নদী জলাশয়ে এই পানির পরিমাণ এক শতাংশেরও কম। বাদবাকি ৬৯% হিমবাহ আকারে সঞ্চিত হয়ে আছে। ভূতাত্ত্বিকভাবে পানিচক্রের একটি অন্যতম উপাদান ভূগর্ভস্থ পানি যা ভূগর্ভস্থ জলস্তর (aquifer) নামে পরিচিত শিলাস্তরে সঞ্চিত থাকে। বৃষ্টির পানি ও ভূ-পৃষ্ঠ জলরাশি ভূ-পৃষ্ঠে অনুপ্রবেশ করে যখন ভূ-জলপৃষ্ঠে পৌঁছায়, তখন ভূঅভ্যন্তরে এই পানিরাশির এক দীর্ঘ ও মন্থর যাত্রা শুরু হয় যার গতি দিনে মাত্র কয়েক মিলিমিটার থেকে কয়েক মিটার পর্যন্ত হতে পারে। ভূ-জলপৃষ্ঠের উপরের তলভাগকে অপরিপৃক্ত অঞ্চল (unsaturated zone) ও নিচের তলভাগকে পরিপৃক্ত অঞ্চল (saturated zone) বলা হয়। অপরিপৃক্ত অঞ্চলের মৃত্তিকা ও শিলা পানির প্রধান প্রধান অপদ্রব্য পরিশোধন করে। পরিপৃক্ত অঞ্চলের শিলা ও মৃত্তিকা তাকে আরও বেশি পরিমাণে পরিশ্রুত ও বিশুদ্ধ করে তোলে। এই প্রক্রিয়ায় পানি জীবাণু ও দূষণমুক্ত হয়। ভূগর্ভস্থ পানি সাধারণত একদিকে যেমন বিশুদ্ধতার দিক থেকে খুবই উত্তম মানের, অন্যদিকে রাসায়নিকভাবে পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন। ভূগর্ভস্থ জলস্তরে খুব কম প্রবাহসহ বিপুল পরিমাণ পানি সঞ্চিত করে এবং কূপ, নলকূপ খনন করে বা ঝর্নার মাধ্যমে সহজেই তা আহরণযোগ্য। ভূগর্ভস্থ জলস্তরের গুরুত্ব নির্ভর করে স্তরসমূহের ভূতাত্ত্বিক প্রকৃতির ওপর। যেমন: পাললিক স্তরসমষ্টি উত্তম ভূগর্ভস্থ জলস্তরের প্রতিভূ আর কঠিন শিলার পানি সঞ্চয় ক্ষমতা অত্যন্ত কম।

বাংলাদেশে কম গভীরতায় ভূগর্ভস্থ পানি পাওয়া যায়। প্লাবনভূমি অঞ্চলে সাম্প্রতিক নদীবাহিত অবক্ষেপের মাঝে ভূগর্ভস্থ জলস্তর গঠিত হয়েছে। উচ্চতর সোপানসমূহে যেমন, বরেন্দ্র ও মধুপুর গড় অঞ্চলে প্লাইসটোসিন যুগের ডুপিটিলা বালু ভূগর্ভস্থ জলস্তর হিসেবে কাজ করে। পাহাড়ি অঞ্চলে প্লায়োসিন টিপাম বালু জলস্তরের জন্য উপযুক্ত। বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্রই ভূ-জলপৃষ্ঠ, ভূ-পৃষ্ঠের খুব কাছে অবস্থান করে এবং বার্ষিক আগমন ও নির্গমন ধারায়  উঠানামা করে। সাম্প্রতিককালে সেচের জন্য ব্যাপক হারে উত্তোলনের কারণে বার্ষিক ওঠানামার পরিমান ক্রমান্বয়ে বেড়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে ভূগর্ভস্থ জলস্তরে পুনঃসঞ্চারণ প্রধানত বৃষ্টি ও বন্যার পানির অনুভূমিক অনুস্রবনের মাধ্যমে ঘটে থাকে। নদী ও অন্যান্য প্রাকৃতিক জলাশয়গুলো কাছাকাছি ভূগর্ভস্থ জলস্তরসমূহে স্থানীয়ভাবে পানি সরবরাহ করে। জল নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের নলকূপের সাহায্যে ভূগর্ভস্থ পানি তুলে নেওয়া। নিম্নতর অবক্রমের (lower gradient) দিকে প্রবাহের মাধ্যমেও কিছু পানি নিষ্ক্রান্ত হয়। বর্ষা মৌসুমে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ভূ-পৃষ্ঠের খুব কাছে উঠে আসে। আবার এপ্রিল-মে মাসে তা সবচেয়ে গভীরে নেমে যায়। ঢাকা শহর ও বরেন্দ্র এলাকা ছাড়া বাংলাদেশের অধিকাংশ অঞ্চলেই এই প্রবণতা একরকম। পানি সম্পদের অসম বণ্টনের কারণে বাংলাদেশে শুকনা মৌসুমে পানির চাহিদা প্রধানত ভূগর্ভস্থ পানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়।

বাংলাদেশে প্রায় ৯৭% গ্রামের মানুষ খাবার পানির জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভর করে। শহর অঞ্চলেও পানির সরবরাহ প্রধানত ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভর করে। ঢাকা নগরে মোট জল সরবরাহের ৮৭ শতাংশের বেশি আসে ভূগর্ভস্থ পানি থেকে, বাকিটা ভূপৃষ্ঠস্থ জলশোধনের মাধ্যমে আসে। ভূগর্ভস্থ পানি সেচকাজেও ব্যাপকভাবে ব্যবহূত হয়। ১৯৯৫ সালের হিসাব অনুযায়ী মোট সেচের ৭২% পানি উত্তোলিত হয় ভূগর্ভ থেকে। মহাপরিকল্পনা সংস্থার (MPO) ১৯৮৯ সালের জরিপ থেকে জানা যায় বাংলাদেশে ভূগর্ভস্থ পানির মজুত ২,৫৭৫ কোটি ঘনমিটার যার মধ্যে ১৬৮.৬ কোটি ঘনমিটার উত্তোলনযোগ্য নয়। বাকি মজুতের ৯০ কোটি ঘনমিটার গৃহস্থালি ও শিল্প উৎপাদনে এবং সর্বোচ্চ ১,২ ৮১ কোটি ঘনমিটার কৃষির জন্য ব্যবহূত হতে পারে।

বাংলাদেশে ভূগর্ভস্থ পানি উন্নয়নে কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। সবচেয়ে বড় বাধা হলো ভূগর্ভস্থ পানিতে ব্যাপক আর্সেনিক দূষণ। আসেনিক দূষণ আবিষ্কৃত হওয়ার আগে গ্রামের ৯৭% মানুষ পানের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল ছিল। বর্তমানে এই পরিমাণ কমে ৮০% এ দাঁড়িয়েছে। আর্সেনিক ছাড়াও লোহার উচ্চহার, উপকূলীয় অঞ্চলে উচ্চ লবণাক্ততা, ম্যাঙ্গানিজের অত্যধিক তীব্রতা ইত্যাদি পানির গুণ নষ্ট করছে। মলমূত্রের কলিফর্মও একটা বড় সমস্যা, বিশেষ করে অগভীর ভূগর্ভস্থ পানির জন্য। সেচের জন্য ব্যাপক উত্তোলনের দরুন শুকনা মৌসুমে ভূ-জল পৃষ্ঠ নিচে নেমে যাওয়াও একটি বিশেষ সমস্যা। ভূ-জল পৃষ্ঠ ৬ মিটারের নিচে নেমে গেলে সাধারণভাবে প্রচলিত হস্তচালিত নলকূপে পানি ওঠে না। তখন ভিন্নতর প্রযুক্তির আশ্রয় নিতে হয়। ভূ-জল পৃষ্ঠের অব্যাহত অবনমন কূপ খননের খরচও বাড়িয়ে তোলে। ভূ-জল পৃষ্ঠ নেমে যাওয়ার আরেকটি ক্ষতিকর দিক হচ্ছে ভূমি দেবে যাওয়া। ঢাকা শহরে এ অবস্থার আশংকা রয়েছে।অবশ্য পূর্বাভাস সত্ত্বেও, ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে বাংলাদেশে ভূমি অবনমনের কোন লক্ষণ এখনও দেখা যায়নি। কলকারখানা ও পৌর বর্জ্য যত্রতত্র ফেলার কারণেও ঢাকার মতো বড় বড় শহরে ভূগর্ভস্থ পানির মান ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। বিশ্ব উষ্ঞয়ন ও বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির জন্য একটি ঝুঁকি। [কাজী মতিন উদ্দিন আহমেদ এবং মোঃ আলমগীর হোসেন]