ভাওয়াল এস্টেট


ভাওয়াল এস্টেট পরিধি এবং আয়ের দিক থেকে ঢাকার নওয়াব এস্টেট এর পরেই পূর্ব বাংলায় দ্বিতীয় বৃহত্তম জমিদারি। ভাওয়াল জমিদার বংশের পূর্বপুরুষগণ মুন্সিগঞ্জের অন্তর্গত বজ্রযোগিনী গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন বলে জানা যায়। এই বংশের জনৈক বলরাম সতেরো শতকের শেষার্ধে ভাওয়াল পরগণার জমিদার দৌলত গাজীর দীউয়ান হিসেবে কাজ করতেন। বলরাম এবং তার পুত্র শ্রীকৃষ্ণ তৎকালীন বাংলার দীউয়ান মুর্শিদকুলী খানের অত্যন্ত প্রিয়ভাজন হয়ে ওঠেন এবং কৌশলে গাজীদের বঞ্চিত করে জমিদারি হস্তগত করেন।

রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে মুর্শিদকুলী খান অনেক মুসলমান জমিদারকে বিতাড়িত করে তদ্স্থলে হিন্দু জমিদার নিযুক্ত করেন। ভাওয়ালের গাজীগণ মুর্শিদকুলী খানের এই নীতির কারণে জমিদারি স্বত্ব হারান। ১৭০৪ সালে শ্রীকৃষ্ণকে ভাওয়ালের জমিদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। তখন থেকে এই পরিবারটি ১৯৫১ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত না হওয়া পর্যন্ত ক্রমাগতভাবে এই জমিদারির অধিকারী ছিলেন।

শিকারীর বেশে রমেন্দ্রনারায়ণ রায়চৌধুরী

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত এর পরবর্তী সময়ে ভাওয়াল পরিবার আশেপাশের বহু ছোটখাট জমিদারি বা জমি ক্রয় করে একটি বিরাট জমিদারির মালিক হয়। ১৮৫১ সালে জেমস ওয়াইজ এর জমিদারি ভাওয়াল এস্টেট কিনে নেয়। এই ক্রয়ের মাধ্যমে পরিবারটি সম্পূর্ণ ভাওয়াল পরগণার মালিক হয়ে যায়। সরকারি রাজস্ব নথিপত্র থেকে জানা যায় যে, ভাওয়ালের জমিদার ৪,৪৬,০০০ টাকা দিয়ে ওয়াইজের জমিদারি ক্রয় করেন। ১৮৭৮ সালে ভাওয়াল জমিদার কালীনারায়ণ রায়চৌধুরী ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে বংশানুক্রমিক ‘রাজা’ উপাধি লাভ করেন। কালীনারায়ণের পুত্র রাজা রাজেন্দ্রনারায়ণ রায়চৌধুরী এই জমিদারির আরও বিস্তৃতি ঘটান। এই সময়ই ভাওয়াল জমিদারি ঢাকা, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর ও বাকেরগঞ্জ জেলায় বিস্তৃত হয় এবং পূর্ব বাংলার দ্বিতীয় বৃহত্তম জমিদারিতে পরিণত হয়। উল্লেখ্য যে, আপাতদৃষ্টিতে যদিও ঢাকার নওয়াব পরিবার ছিল ঢাকা শহরের সর্ববৃহৎ জমিদার, কিন্তু ঢাকা শহরের অংশবিশেষ ও আশপাশের প্রায় সকল জমির মালিক ছিলেন ভাওয়াল রাজা। অবশ্য এটা ঠিক যে, ঢাকার নওয়াব পরিবার বিস্তৃত অঞ্চলে তাদের জমিদারির সম্প্রসারণ ঘটিয়েছিল এবং তাদের এস্টেটের সদর দফতর ছিল ঢাকায়। ১৯১৭ সালে ভূমিজরিপ ও বন্দোবস্ত রেকর্ড থেকে জানা যায় যে, ভাওয়াল পরিবারটি বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ২২৭৪টি মৌজায় ৪,৫৯,১৬৩ একর জমির মালিক ছিলেন। ১৯০৪ সালে জমিদারিটি সরকারকে ৮৩,০৫২ টাকা রাজস্ব হিসেবে প্রদান করে এবং সকল খায়-খরচা বাদ দিয়ে মোট আয় করে ৪,৬২,০৯৬ টাকা। দেশের বেশির ভাগ জমিদার বিভিন্ন শহরে অনুপস্থিত জমিদার (Absentee Land Lord) হিসেবে বাস করলেও ভাওয়ালের রাজা তাঁর জমিদারির কেন্দ্রস্থল জয়দেবপুর গ্রামেই বাস করতেন।

ভাওয়াল এস্টেটের জমিদারি ব্যবস্থাপনাও ছিল বিশেষভাবে দক্ষ। রাজা নিজেই জমিদারি পরিচালনা করতেন। সাধারণত বেশির ভাগ বড় জমিদার তাদের জমিদারি ব্যবস্থাপনার জন্য তাদের নায়েব-গোমস্তাদের ওপর নির্ভর করতেন। কিন্তু ভাওয়াল রাজা এই ব্যবস্থাপনা নিজের হাতে রাখেন  এবং প্রতিদিন এবং নির্ধারিত সময়ে কাচারিতে বসতেন। গোটা জমিদারিটি কয়েকটি সার্কেলে বিভক্ত ছিল। ব্যবস্থাপনার জন্য প্রতিটি সার্কেল ন্যস্ত ছিল একজন মফস্বল নায়েবের ওপর। নায়েবকে সাহায্য করত তহসিলদার, মুহুরি, জমাদার, পিয়ন, ঝাড়ুদার এবং কুলি ইত্যাদি কর্মচারী।

এছাড়াও নায়েবের অধীনে থাকত একদল লাঠিয়াল, যাদেরকে প্রয়োজনে অবাধ্য রায়তদেরকে অনুগত করার কাজে ব্যবহার করা হতো। প্রতিটি গ্রামে একজন করে জমিদারি মন্ডল নামে একজন গ্রাম প্রধান থাকত, যার মাধ্যমে সেই গ্রামের খাজনা আদায় করা হতো। জমির খাজনা বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যে মাঝে মাঝে প্রতিটি গ্রাম জরিপ করা হতো। বাংলার অন্যান্য জমিদারের মতো ভাওয়াল রাজা কিন্তু সাধারণভাবে কোন মধ্যস্বত্বভোগী (Intermediate Tenures) সৃষ্টি করেন নি। জমিদারির প্রধান কাচারি জয়দেবপুরেই অবস্থিত ছিল। এই কাচারিতে রাজার জন্য ’সিংহাসন’ নামে একটি গদি বা বিশেষ আসন ছিল। জমিদারির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে দীউয়ান বলা হতো, যার অধীনে ছিল একজন উপ-দীউয়ান, কয়েকজন নায়েব-গোমস্তা। জমিদারির বিভিন্ন এলাকার জন্য দীউয়ান খানায় আলাদা আলাদা দফতর ছিল এবং প্রতিটি দফতরের জন্য বিভিন্ন ধরনের বেশ কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারী ছিল।

ভাওয়াল এস্টেটের সর্বশেষ ক্ষমতাবান জমিদার ছিলেন রাজা রাজেন্দ্রনারায়ণ রায়চৌধুরী। প্রখ্যাত সাহিত্যিক কালীপ্রসন্ন ঘোষ ছিলেন তাঁর দীউয়ান। রাজেন্দ্রনারায়ণ রায়চৌধুরীর ছিল তিন পুত্রসন্তান। তাঁরা হলেন রণেন্দ্রনারায়ণ রায়চৌধুরী, রমেন্দ্রনারায়ণ রায়চৌধুরী এবং রবীন্দ্রনারায়ণ রায়চৌধুরী। তিনপুত্র সন্তান নাবালক অবস্থায় ১৯০১ সালে রাজেন্দ্রনারায়ণের মৃত্যু হয়। সে কারণে জমিদারিটি একবার ১৯০১ সালে এবং আর একবার ১৯০৪ সালে কোর্ট অব ওয়ার্ডসের অধীনে চলে যায়। রাজেন্দ্রনারায়ণের তিন পুত্র সন্তান একজন ইউরোপীয় গৃহ-শিক্ষক অধীনে লেখাপড়া শিখতেন। ঐ গৃহ শিক্ষকের বক্তব্য অনুযায়ী, তিন পুত্রই লেখাপড়া ও নৈতিক শিক্ষার প্রতি অত্যন্ত অমনোযোগী ছিলেন। ১৯০৯ সালে দ্বিতীয় পুত্র রমেন্দ্রনারায়ণ চিকিৎসার জন্য দার্জিলিং যান। সেখানে তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয় এবং যথারীতি দাহ করা হয় বলেও দাবী করা হয়। অপর দুই পুত্রেরও খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মৃত্যু হয় এবং পরিবারটি পুত্র সন্তানবিহীন অবস্থায় নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে দ্বিতীয় পুত্র সন্তানটি নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন এবং তিনি বহুদিন যাবৎ সন্ন্যাসী হিসেবে জীবন যাপন করেন। পরিশেষে ১৯২০ সালের শেষের দিকে তিনি প্রায় ১২ বছর পর নাটকীয়ভাবে ঢাকায় এসে উপস্থিত হন এবং তার জমিদারি দাবি করেন।

এভাবেই ১৯৩৫ সালে শুরু হয় বিখ্যাত ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলা, যা সমগ্র বাংলায়, এমনকি বাংলার বাইরেও প্রায় এক যুগ ধরে খবরের কাগজে সংবাদ এবং নানা ধরনের গল্প গুজবের প্রধান উপাদান হয়ে থাকে। এমনকি ঘটনাটি সারা ভারতবর্ষে বিভিন্ন ভাষায় সাহিত্য, নাটক এবং সিনেমারও বিষয়বস্ত্ত হয়। ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলার পরে জমিদারির উত্তরাধিকারের বিষয়টি শেষ পর্যন্ত জটিল হয়ে পড়ে এবং ফলে এর ব্যবস্থাপনা ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বাতিল না হওয়া পর্যন্ত কোর্ট অব ওয়ার্ডসের অধীনেই থেকে যায়। যেহেতু উত্তরাধিকারী নিয়ে বহু জটিলতা ছিল এবং জমিদারি সংক্রান্ত বহু মামলাও অমীমাংসিত ছিল, সে কারণে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত ঘোষণার পরেও এর বিষয়-সম্পত্তি বা দায়-দায়িত্ব যথাযথভাবে বণ্টন করা সম্ভব হয় নি। ফলে পাকিস্তান আমলেও জমিদারিটি কোর্ট অব ওয়ার্ডসের অধীনেই থাকে। বর্তমানে ভাওয়াল এস্টেটের কর্মকান্ড গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ভূমি সংস্কার বোর্ড পরিচালনা করে।  [সিরাজুল ইসলাম]