ভলিবল


ভলিবল  হল ঘরে বা খোলা মাঠে দুটি দলের মধ্যে সমতল স্থানে পরিচালিত নেটের উপর দিয়ে বল পারাপারের খেলা। ভলিবল খেলার মাঠ আয়তাকার, দৈর্ঘ্যে ১৮ মিটার ও প্রস্থে ৯ মিটার। সেন্টার লাইন বরাবর খাড়া জাল থাকে এবং জালের ঊর্ধ্বপ্রান্ত ৮ ফুট উচ্চে থাকে। জালটির দৈর্ঘ্য ৯.৫০ মিটার ও প্রস্থ ১ মিটার। চামড়ার বলের পরিধি ৬৫ থেকে ৬৭ সেন্টিমিটার এবং ওজন ২৬০ থেকে ২৮০ গ্রাম।

প্রত্যেক দলে ৯ জন খেলোয়াড় থাকে। শুধু হাত ব্যবহার করে বল পারাপার করতে হয়। তবে নেটের একপাশে সর্বোচ্চ তিনজন খেলোয়াড় র‌্যালি করে বল নেটের অন্য প্রান্তে পাঠাতে পারে। যে দল সার্ভিস করে সেই দল যদি বলটির র‌্যালির সমাপ্তি নিজেদের পক্ষে রাখতে পারে অর্থাৎ নিজেদের কোর্টে বলকে মাটি ছুঁতে না দেয় বা নেট পার করে প্রতিপক্ষের কোর্টের বাইরে না ফেলে তবে একটি পয়েন্ট লাভ করবে। আর র‌্যালির সমাপ্তি যদি বিপক্ষ দলের পক্ষে যায় তাহলে সার্ভিসের দিক পরিবর্তন হয়।

বিশ্বে জনপ্রিয় খেলাগুলির মধ্যে ভলিবল একটি। বর্তমানে পৃথিবীতে ২০০ মিলিয়ন সক্রিয় ভলিবল খেলোয়াড় রয়েছে, ৫০০ মিলিয়ন লোক এ খেলাটিকে বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং ২১৫টি দেশ আন্তর্জাতিক ভলিবল সংস্থা এফআইভিবি-র এফিলিয়েটেড সদস্য, যা যে কোন খেলার আন্তর্জাতিক সদস্য সংখ্যার চেয়ে বেশি।

১৯৯৫ সালে ভলিবলের শতবর্ষ পূর্ণ হয়েছে। এ খেলাটি ১৮৯৫ সালে আবিষ্কার করেন আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরের অধিবাসী উইলিয়াম জি. মর্গান। তিনি এ খেলার নাম দেন মিনটোনেট। ১৮৯৭ সালে ভলিবল খেলার আইন-কানুন প্রথম পুস্তিকাকারে প্রকাশিত হয়। ১৯৪৭ সালে ফ্রান্সে আন্তর্জাতিক ভলিবল ফেডারেশন গঠিত হয়। এই সংস্থার যাত্রা শুরু হয়েছিল ১১টি দেশের এফিলিয়েশনের মাধ্যমে। ফ্রান্সের মি. এল লুৎবাড ছিলেন নবগঠিত এই সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ১৯৬৪ সালে টোকিও অলিম্পিকে ভলিবল প্রতিযোগিতার ইভেন্টে অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৪৯ সালে সিনিয়র বিশ্ব ভলিবল চ্যাম্পিয়নশিপ, ১৯৫২ সালে জুনিয়র বিশ্ব ভলিবল চ্যাম্পিয়নশিপ, ১৯৬৫ সালে পুরুষ ভলিবল বিশ্বকাপ, ১৯৭৩ সালে মহিলা বিশ্বকাপ ভলিবল, ১৯৭৭ সালে বিশ্ব জুনিয়র চ্যাম্পিয়নশিপ চালু হয়।

এফআইভিবি-এর সভাপতি মেক্সিকোর ড. একোস্টার কর্তৃক ভলিবলের উন্নতির জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলে প্রচলিত ‘বিচ’ ভলিবল সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। কয়েক বছরের মধ্যেই বিচ ভলিবল স্থান করে নিয়েছে বিশ্ব অলিম্পিকে। বিনোদনের জন্য প্রবর্তন করা হয়েছে ‘পার্ক ভলিবল’। অবসর বিনোদনে, পিকনিক বা ভ্রমণকালে স্বল্পপরিসরে খেলার জন্য এটির আয়োজন করা হয়। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে লিবারো খেলোয়াড়, রেলিপয়েন্ট সিস্টেম, প্রয়োজনে পা দিয়ে খেলা, সার্ভিসের বল নেট টাচ প্রভৃতির মধ্য দিয়ে ভলিবল খেলার সংস্কার ও পরিবর্তন সাধিত হয়।

বাংলাদেশে ভলিবল খেলার প্রচলন ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছে তার সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে পাকিস্তানের সূচনালগ্ন থেকেই এদেশের বহু জায়গায় ভলিবল খেলা হতো বলে জানা যায়। ১৯৬৭ সাল থেকে সরকারিভাবে ভলিবল খেলার আয়োজন শুরু হয় এবং ঐ বছর পূর্ব পাকিস্তানের ৪টি বিভাগে বিভাগীয় পর্যায়ে ভলিবল প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত জাতীয় পর্যায়ে আর কোন খেলা হয় নি।

১৯৭৩ সালে সরকারি উদ্যোগে জাতীয় ভলিবল ফেডারেশন গঠন করা হয়। ফেডারেশনের উদ্যোগে ১৯৭৩ সাল থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত ২৩টি জাতীয় ভলিবল প্রতিযোগিতা (পুরুষ) অনুষ্ঠিত হয় এবং ১৯৭৯ সাল থেকে ১৫টি জাতীয় মহিলা ভলিবল প্রতিযোগিতা হয়। ১৯৮০ সাল থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত ১৩টি জাতীয় যুব ভলিবল প্রতিযোগিতাও অনুষ্ঠিত হয়। অনেক বিদেশি টিম বাংলাদেশ সফর করে। আর বাংলাদেশ টিমও বিদেশের বেশকিছু প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। ১৯৭৮ সালে অষ্টম এশিয়ান গেমসে অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশ ১৫টি দেশের মধ্যে ১১তম হয়। ১৯৮৪ সালে সৌদি আরবের রিয়াদে এবং ১৯৮৬ সালের থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত এশিয়ান ইয়ূথ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশ অংশগ্রহণ করে। ১৯৮৯ সালের সিউল, ১৯৯৩ সালের কোরাট (থাইল্যান্ড) এবং ১৯৮০ সালের তুরস্ক এশিয়ান ভলিবল চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশ দল অংশগ্রহণ করে। ১৯৮৬ সালের ভারতের হায়দারাবাদ এবং মিয়ানমারের ইয়াংগুনে ইন্টারন্যাশনাল ভলিবল চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশ অংশগ্রহণ করে। বাংলাদেশ দল কলকাতা (১৯৮৭), ইসলামাবাদ (১৯৮৯), কলম্বো (১৯৯১), ঢাকা (১৯৯৩), চেন্নাই (১৯৯৫), কাঠমুন্ডু (১৯৯৯), ইসলামাবাদ (২০০৪) এবং কলম্বো (২০০৬) সাউথ এশিয়ান গেমসে অংশগ্রহণ করে। ১৯৯৯ সালে নেপালের কাঠমুন্ডুতে অনুষ্ঠিত ৮ম সাফ গেমসে অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশ ব্রোঞ্জ পদক লাভ করে। এছাড়া ২০০৭ সালের কলকাতা ইন্ডো-বাংলাদেশ বাংলা গেমস-এ বাংলাদেশ অংশগ্রহণ করে।

স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন ক্লাব, সংস্থা ও সার্ভিসেস ভলিবল খেলে থাকে। এগুলির মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ রাইফেলস, ব্রাদার্স ইউনিয়ন, অডিট ক্রীড়া সংসদ, আজাদ স্পোর্টিং ক্লাব, দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, আনসার ও ভিডিপি প্রভৃতি।  [গোফরান ফারুকী]