ভদ্রলোক


ভদ্রলোক ঔপনিবেশিক শাসনের অভিঘাতে সামাজিক বিবর্তন ধারায় নবোত্থিত ইংরেজি শিক্ষিত অভিজাত শ্রেণি। প্রাক্-আধুনিক যুগে সংস্কৃত ভাষায় ভদ্র শব্দটি একাধিক অর্থে ব্যবহূত হত, যথা বাসুতভিটা ও ভূসম্পত্তির মালিক ইত্যাদি। নবাবী যুগে কেউ যখন তার বাস্ত্তভিটা জমিদারের নিকট থেকে নিষ্কর সুবিধা লাভ করতো তখন তার ওই বসতবাটি সমাজে পরিচিতি পেত ভদ্রাসন বলে। ভদ্রাসনের অধিকারী হলেন ভদ্র এবং তা থেকেই ভদ্রলোক পরিভাষার উদ্ভব। আবার ‘ভদ্রলোক’ শব্দটি বিশেষ ব্যক্তির সুরুচি ও সদাচরণও বোঝাত। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে ভদ্রলোক একটি সামাজিক শ্রেণি হিসেবে বিকাশ লাভ করতে শুরু করে। এদের বৈশিষ্ট্য হলো বিদেশিদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করে অর্জিত অর্থবলে ভূ-সম্পত্তি লাভ এবং ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করে সরকারি চাকুরি লাভ। উনিশ শতকের মধ্যভাগে এসে ভদ্রলোক একটি সামাজিক শ্রেণিতে পরিণত হয়। ভদ্রলোকের বৈশিষ্ট্য দাঁড়ায় ইংরেজি শিক্ষা, শহরে আবাস এবং সরকারি চাকুরি।

প্রাতিষ্ঠানিক অর্থে ‘ভদ্রলোক’ শব্দটির সঙ্গে আমাদের প্রথম পরিচয় ঘটে ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৭৮৭-১৮৪৮) লেখায়। তিনি ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র কাঠামোয় স্থাপিত নতুন দেশীয় কেরানি, ক্ষুদ্র আমলা, কর্মকর্তা-কর্মচারী, নব্য ব্যবসায়ী ও নব্য জমিদার, ঠিকাদার প্রভৃতি শ্রেণিকে ব্যঙ্গ করে সামষ্ঠিকভাবে ভদ্রলোক বলে আখ্যায়িত করেন। তাঁর ব্যঙ্গ রচনা কলিকাতা কমলালয় (১৮২৩), নববাবুবিলাস (১৮২৫), নববিবিবিলাস (১৮৩১) প্রভৃতি গ্রন্থের বিষয় হচ্ছে নব্য ভদ্রলোক। তাঁর বর্ণনায় ‘ভদ্রলোক’ ইউরোপীয়দের সাহচর্যে এসে রাতারাতি প্রচুর ধন-সম্পদের অধিকারী হন। শ্বেতাঙ্গ প্রভুর প্রভাবে এই নব্য ভদ্রলোক শ্রেণি তাদের পিতৃপুরুষদের ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি বেশ অনীহ, এজন্য তারা সনাতন বনেদি সমাজের নিকট হাস্যাস্পদ ও সম্মানহীন।

তবে নব্য ভদ্রলোকদের সামাজিক মর্যাদা উনিশ শতকের দ্বিতীয় দশক থেকে বৃদ্ধি পেতে থাকে। ইংরেজি শিক্ষা, বিত্ত, দানদক্ষিণায় উদার ও সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান বিধায় সনাতন সমাজ তাদের সামাজিক স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়, যদিও ভদ্রলোক পুরানো সম্ভ্রান্তদের নিকট তখনো অপাংক্তেয়। তবে সাধারণভাবে পুরানো সম্ভান্ত শ্রেণির ক্রম আর্থিক দুর্বলতার জন্য ভদ্রলোক শ্রেণির নিকট তারা আর কোনো চ্যালেঞ্জ নয়। বলা যায়, উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে ভদ্রলোক শ্রেণির সামাজিক আধিপত্য শুরু। ঐ শতকের মধ্যভাগ থেকে নব্য ভদ্রলোক শ্রেণিকে সামাজিকভাবে সমীহের চোখে না দেখার কোনো উপায় ছিল না। কারণ, সেসময় তাঁরা শুধু সম্পদশালীই ছিলেন না, সুশিক্ষিত এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রভাবশালীও ছিলেন।

উনিশ শতকের শেষদিক থেকে ভূম্যধিকারী শ্রেণিও নিজেদের ভদ্রলোক পরিচিতি দিতে অনীহ থাকে নি। ফলে তখন থেকে ভদ্রলোক শ্রেণির পরিধি বৃদ্ধি পেতে থাকে। বিশ শতকের দ্বিতীয় দশক পর্যন্ত সমাজে ভদ্রলোক শ্রেণি হিসেবে স্বীকৃত ছিল হিন্দু অভিজাত শ্রেণি। কেননা, বেশির ভাগ জমিদার এবং শিক্ষিত অভিজাত শ্রেণি ছিল হিন্দু। অভিজাত মুসলমান পরিবার নিজেদের আশরাফ হিসেবে পরিচয় দিত। পুরানো হিন্দু অভিজাত শ্রেণি নব্য ভদ্রলোকদের স্বীকৃতি দিয়ে নিজেরাও ভদ্রলোকে পরিণত হলেও মুসলমান আশরাফ শ্রেণি ভদ্রলোক অভিধায় ছিল অনীহ। মুসলমান আশরাফগণ ‘ভদ্রলোক’ শব্দটির পক্ষপাতী ছিলেন না। কারণ আশরাফ শ্রেণি বংশমর্যাদা নিয়ে ছিল গর্বিত। অধিকাংশ আশরাফদের দাবী ছিল এই যে, তাঁরা মহানবী হযরত মুহম্মদ (স.)-এর পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত।

সিপাহী বিদ্রোহের পর থেকে ধর্মনিরপেক্ষ, শিক্ষিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিশেষ ভূমিকার জন্য বাঙালি সমাজকাঠামোয় ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। পরিবর্তিত সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসে কেবল হিন্দু বাবুরা ভদ্রলোক হিসেবে পরিচিত হতেন। তারা ছিলেন শিক্ষিত, সম্পদশালী, দানশীল এবং শেতাঙ্গ শাসকগোষ্ঠীর প্রশাসনিক কাজে জড়িত। উনিশ শতকের শেষে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ভদ্রলোক শ্রেণির সদস্যদের দ্বারাই সংঘটিত হয়। বিশ শতকের দ্বিতীয় দশক পর্যন্ত বাঙালি ভদ্রলোক বাংলার প্রশাসন, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেন এবং সে সুবাদে তারা অর্জন করেন সামাজিক স্বীকৃতি। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র কাঠামোয় ভদ্রলোক শ্রেণি সবচেয়ে প্রভাবশালী অংশ হিসেবে আবির্ভুত হয়। বিশ শতকের প্রথম দুই দশকের রাজনীতি ছিল ভদ্রলোক শ্রেণির দখলে। জাতিয়তাবাদী আন্দোলন, বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলন (১৯০৫), বিপ্লবী আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন প্রভৃতি ঘটনায় ভদ্রলোক শ্রেণির ভূমিকা ছিল প্রায় একচেটিয়া।

ভদ্রলোক শ্রেণির সামাজিক ও রাজনৈতিক আধিপত্যে বড় আঘাত আসে ১৯১৯ সালের মন্টেগও-চেমসফোর্ড সংস্কার আইন ও ১৯৩২ সালের ম্যাকডোনাল্ড রোয়েদাদের মাধ্যমে। এই সব শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থার আওতায় মুসলমানদের জন্য সংখ্যানুপাতে আইন পরিষদের জন্য রিজার্ভ সিট বরাদ্দ করা হয়। অমনিভাবে নিম্নবর্গের হিন্দুদেরও সংখ্যানুপাতিক রিজার্ভ সিট দেয়া হয়। ভদ্রলোক হিন্দুদের জন্য খোলা থাকে সাধারণ সিট অর্থাৎ আনুপাতিক হারে সিট বরাদ্দের পর বাকি সিট। এ ব্যবস্থায় রাজনৈতিক ক্ষমতা আগের মতো ভদ্রলোক শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা ছিল অসম্ভব এবং বস্ত্তত তাই হয়। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগ ও সিডিউল কাস্ট শ্রেণির প্রতিনিধিরা সরকার গঠন করে এবং মুসলিম লীগ ও সিডিউল কাস্ট-এর কোয়ালিশন সরকার গঠন প্রক্রিয়া ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত চলে। এসব রাজনীতিক পটপরিবর্তন ভদ্রলোক শ্রেণিদের ঐতিহ্যগত আধিপত্যকে খর্ব করে এবং জাতীয়তাবাদ ও সাম্প্রদায়িক সম্পর্কে গভীরভাবে প্রভাব ফেলে। ১৯৩৭ সাল থেকে রাজনৈতিক পুনর্গঠন ভদ্রলোক পরিচিতিকে নির্মূল করে দেয়। মুসলিম জাতীয়তাবাদ ও নমশুদ্র রাজনীতি উভয় মিলে ভদ্রলোক রাজনীতির পতন ঘটায়। কিন্তু অচিরেই কংগ্রেস দল উদ্ভুত পরিস্থিতিকে সামাল দেয় এবং নমশূদ্রদের রাজনীতি উঁচু মহলে স্থান দিয়ে মুসলিম জাতীয়তাবাদকে ঠেকাবার চেষ্টা করে। কিন্তু মুসলিম জাতীয়তাবাদকে পাকিস্তান লাভের সংকল্প থেকে ফেরানো যায়নি। ফলে, বাংলা বিভাগের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয় পাকিস্তান। [সিরাজুল ইসলাম]