ভট্টাচার্য, বিজন


বিজন ভট্টাচার্য

ভট্টাচার্য, বিজন (১৯০৬-১৯৭৮)  নাট্যকার, অভিনেতা।  ফরিদপুর জেলার খানখানাপুরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ক্ষীরোদবিহারী ভট্টাচার্য ছিলেন একজন স্কুলশিক্ষক। পিতার কর্মসূত্রে বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাস করার সুবাদে তিনি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হন; ফলে তাদের সংগ্রামী জীবন ও আঞ্চলিক কথ্য ভাষার ছাপ তাঁর রচিত নাটকে পরিলক্ষিত হয়।

বিজন ভট্টাচার্য অসহযোগ আন্দোলনে (১৯২০-২২) যোগ দিয়ে কারাবরণ করেন। পরে কলকাতার আশুতোষ কলেজ ও রিপন কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি জাতীয় আন্দোলনে (১৯৩১-৩২) যোগ দেন এবং মহিষবাথানে লবণ সত্যাগ্রহ আন্দোলনে সম্পৃক্ত হন। ফলে লেখাপড়ায় (বিএ) ছেদ পড়ে এবং ১৯৩৪-৩৫ সালের ছাত্র আন্দোলনের কর্মী হিসেবে তিনি বিভিন্ন কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করেন।

বিজন ভট্টাচার্য কিছুদিন (১৯৩১-১৯৩২) আনন্দবাজার পত্রিকায় চাকরি করেন এবং ১৯৩৮-৩৯ সালে তিনি আলোচনা, ফিচার ও স্কেচ লেখার কাজ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রথমদিকে তিনি মাতুল সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদারের অরণি পত্রিকার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হন এবং বিভিন্ন বিষয়ে লেখালেখি করতে থাকেন। ১৯৪২ সালে সক্রিয় কর্মী হিসেবে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। এছাড়া তিনি  ভারত ছাড় আন্দোলন, জনযুদ্ধ-নীতি প্রচার, ফ্যাসিবাদ বিরোধী লেখক ও শিল্পিসঙ্ঘ স্থাপন এবং  প্রগতি লেখক সঙ্ঘ এবং ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘ গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখেন।

নবনাট্য আন্দোলনের অন্যতম সৈনিক বিজন ভট্টাচার্য গণজীবনের সংগ্রাম ও দুঃখ-দুর্দশা, শোষণ-বঞ্চনা, প্রগতিশীল চিন্তা ও সমাজবোধ নিয়ে নাটক রচনা করে এবং এ ক্ষেত্রে তিনি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও বিপুল খ্যাতি অর্জন করেন। তবে তাঁর শেষজীবনে রচিত নাটকে মার্কসীয় দর্শন, হিন্দু ধর্ম ও দর্শন সংমিশ্রিত হয়েছে। তিনিই প্রথম বাংলা রঙ্গমঞ্চকে  পুরাণ ও ইতিহাসের রোম্যান্টিক প্রভাব থেকে মুক্ত করেন। তাঁর প্রথম নাটক আগুন (১৯৪৩) নাট্যভারতীতে অভিনীত হয়। পরে তিনি রচনা করেন জবানবন্দী (১৯৪৩); এটি কৃষকজীবনের আলেখ্য। তাঁর প্রতিভার সার্থকতম নিদর্শন হলো নবান্ন (১৯৪৪) নাটক; বন্যা, দুর্ভিক্ষ ও মহামারীর পটভূমিকায় রচিত এই নাটকে দুঃস্থ-নিপীড়িত কৃষকজীবন প্রতিফলিত হয়েছে। গণনাট্য সংঘের প্রযোজনায় নবান্ন নাটকে তিনি নিজে অভিনয় করেন এবং অন্য অভিনেতা-অভিনেত্রীরা ছিলেন তৃপ্তি মিত্র,  শম্ভু মিত্র, গঙ্গাপদ বসু, শোভা সেন, গোপাল হালদার প্রমুখ।

১৯৪৬ সালের দাঙ্গার পটভূমিকায় তিনি রচনা করেন জীয়নকন্যা নাটক। এছাড়া তাঁর আরও দুটি নাটক হলো মরাচাঁদ ও কলঙ্ক। মরাচাঁদ চবিবশ পরগনার এক অন্ধ গায়কের জীবনকাহিনী, আর কলঙ্ক বাঁকুড়ার  সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর জীবনালেখ্য। তাঁর গোত্রান্তর (১৯৬০) নাটকের বিষয়বস্ত্ত ছিন্নমূল পূর্ববঙ্গবাসীর ভাগ্যবিপর্যয়। পরে তিনি লেখেন মুনাফাখোর মিল-মালিক ও শোষিত শ্রমিকদের নিয়ে অবরোধ (১৯৪৭)। ১৯৬৬-তে লেখেন দেবীগর্জন ও বেদেদের জীবন নিয়ে গর্ভবতী জননী। এছাড়া তাঁর উল্লেখযোগ্য দুটি গল্প হচ্ছে তেভাগা আন্দোলনের পটভূমিতে রচিত ‘জনপদ’ এবং দেশবিভাগের প্রেক্ষাপটে রচিত ‘রাণী পালঙ্ক’।

বিজন ভট্টাচার্য স্বপ্রতিষ্ঠিত ক্যালকাটা থিয়েটার গ্রুপে (১৯৫০) ইস্তফা দিয়ে ১৯৭০ সালে ‘কবচকুন্ডল’ নাট্যপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন এবং শেষাবধি এর সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন। তিনি চলচ্চিত্রেও দক্ষতার সঙ্গে অভিনয় করেন। তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলি হলো: বাড়ি থেকে পালিয়ে, মেঘে ঢাকা তারা, সুবর্ণরেখা, পদাতিক, যুক্তি তক্কো গপ্পো ইত্যাদি। এছাড়া তিনি নাগিন, সাড়ে চুয়াত্তর, বসু পরিবার, তৃষ্ণা, ডাক্তারবাবু প্রভৃতি ছবির স্ক্রিপ্ট তৈরি করেন।

১৯৪৮-৫০ সময়ে বিজন ভট্টাচার্য বোম্বাই চলচ্চিত্রে অভিনয় ও ফিল্মস্ক্রিপ্ট লেখার কাজও করেন। গায়ন ও সুরযোজনায়ও তিনি পারদর্শী ছিলেন। বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবীর সঙ্গে তিনি পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন, যদিও তাঁদের দাম্পত্য জীবন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। নাট্যজগতে বিশেষ অবদানের মূল্যায়নস্বরূপ কেন্দ্রীয় সঙ্গীত নাটক আকাদেমি, পশ্চিমবঙ্গ সঙ্গীত নাটক আকাদেমি এবং  কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে পুরস্কৃত করে। ১৯৭৮ সালের ১৯ জানুয়ারি কলকাতায় তাঁর মৃত্যু হয়। [ওয়াহিদা মল্লিক]