ভজন


ভজন  এক ধরনের আধ্যাত্মিক ভক্তিগীতি। সঙ্গীতের মাধ্যমে দেবদেবী এবং ঈশ্বর বা সৃষ্টিকর্তার উপাসনার মধ্য দিয়ে এ গানের সৃষ্টি। ভজন ভক্তিরস প্রধান গান এবং অধ্যাত্মবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এর উৎপত্তি ঠিক কোন সময়ে তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। প্রথম পর্যায়ে হিন্দুদের যে কোনো ভক্তিগীতিই ভজন নামে পরিচিত ছিল। কিন্তু ভারতীয় সঙ্গীতের স্বর্ণযুগ হিসেবে খ্যাত ষোড়শ শতকে ভজন ব্যাপক প্রসার লাভ করায় তা আর কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের গন্ডিতে আবদ্ধ থাকেনি। তখন বিভিন্ন ধর্ম-সম্প্রদায়ের প্রার্থনাসঙ্গীত হিসেবে বহু ভজন রচিত হয়েছে এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সুফি, সাধক, সন্ত, কবি ও গায়ক-গায়িকা ভজন গানের জন্য বিখ্যাত হয়েছেন।

ভজনের মূল প্রতিপাদ্য ঈশ্বরের প্রতি আত্মসমর্পণ এবং মানুষে মানুষে বিভেদহীনতা প্রচার করা। হিন্দিতে রচিত মীরার ভজন ঈশ্বরে আত্মসমর্পণের উৎকৃষ্ট নিদর্শন। আর দাদু, কবীর, রজ্জব প্রমুখ সাধকের গানে মানবতার জয়গান এবং বৈষ্ণব ও সুফি চিন্তাপ্রসূত ভক্তিবাদের ব্যাপক প্রচার করা হয়েছে। এসকল গানের উদার মর্মবাণী সমাজের লোকজনের মধ্য থেকে ধর্মীয় কুসংস্কার এবং ভেদজ্ঞান দূরীভূত করতে অনেকটা সাহায্য করেছে। কবীরের একটি গানে বলা হয়েছে যে, ঈশ্বরকে মসজিদ বা মন্দিরে পাওয়া যাবে না, যাবে মানুষের অন্তরে। দাদু তাঁর একটি ভজনে বলেছেন, হিন্দু-মুসলিম এ জাতিভেদ প্রথা অযৌক্তিক। বাংলার লালন শাহ, হাসন রাজা প্রমুখও এরূপ ধারণা পোষণ করতেন। তাঁদের ভজনেও আধ্যাত্মিক ভাবধারার পাশাপাশি নানারকম বিভেদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ প্রকাশ পেয়েছে। মধ্যযুগের ভজন গানে যাঁরা বিখ্যাত হয়ে আছেন তাঁদের মধ্যে মীরাবাঈ, তুলসীদাস, কবীর,  নানক, ব্রহ্মানন্দ এবং সুরদাসের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

ভজন গানে বিভিন্ন রাগ-রাগিণীর ব্যবহার হলেও রাগসঙ্গীতের মতো এতে রাগের নিয়মকানুন কঠোরভাবে মানা হয় না। তালের ক্ষেত্রেও খুব কঠিন তাল ব্যবহার করা হয় না, কারণ তাতে ভক্তিরসের ব্যাঘাত ঘটার সম্ভাবনা থাকে। পদ রচনার দিক থেকে ভজন গান ধ্রুপদীয় প্রবন্ধের অনুসারী।

ভজন সাধারণভাবে হিন্দি ভাষায় রচিত হলেও বাংলা এবং ভারতীয় অনেক প্রাদেশিক ভাষায়ও রচিত ও গীত হয়েছে, যা বর্তমানেও সমধিক জনপ্রিয়। বাংলা ভজনগানের ক্ষেত্রে রামমোহন রায়, রামপ্রসাদ সেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অতুলপ্রসাদ সেন, ডি.এল রায়, রজনীকান্ত সেন, কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁরা রাগপ্রধান গানের ঢঙে অনেক ভজন রচনা করেছেন। মীরাবাঈয়ের কৃষ্ণভক্তিমূলক ভজনের মতো রামপ্রসাদের শ্যামাসঙ্গীতও ভক্তিগীতি হিসেবে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া আধ্যাত্মিক ও সুফি মতবাদের অনেক বাংলাগানও ভজনগান হিসেবে প্রচলিত আছে।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং ভক্তিবাদের আলোকে ষোড়শ শতকে ভজনগানের যে গুরুত্ব ছিল, তা আজও কিছুমাত্র কমেনি; বরং মহাত্মা গান্ধীর বিখ্যাত ভজন ‘ঈশ্বর, আল্লাহ তেরা নাম, সবকো সুমতি দে ভগবান’-এর মতো অন্যান্য ভজন গান এখনও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।  [কৃষ্ণপদ মন্ডল]