ব্র্যাক

ব্র্যাক (বাংলাদেশ রুরাল অ্যাডভান্সমেন্ট কমিটি) একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন। জাতীয় পর্যায়ে সারাদেশ জুড়ে উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড পরিচালনার পাশাপাশি সংগঠনটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তার কর্মসূচির বিস্তার ঘটিয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১১ কোটি লোককে ব্র্যাক তার উন্নয়ন কার্যক্রমের আওতায় নিয়ে এসেছে। ১৯৭২ সালে ফজলে হাসান আবেদ সিলেট জেলার শাল্লা এলাকায় ব্র্যাক প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের পর ভারত থেকে প্রত্যাগত উদ্বাস্তুদের ত্রাণ ও পুনর্বাসনে সহায়তামূলক কর্মকান্ডের মাধ্যমে এর সূচনা হয়। পরবর্তী সময়ে ব্র্যাক বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং দরিদ্র জনগণের ক্ষমতায়নের মতো দীর্ঘমেয়াদি বিষয়ে মনোনিবেশ করে। বর্তমানে ব্র্যাক  ক্ষুদ্রঋণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, মানবাধিকার, নারী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন প্রভৃতি কার্যক্রমের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের জীবনমান পরিবর্তনের লক্ষ্যে তাদের কর্মসূচি পরিচালনা করছে।

বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার ৫১৯টি উপজেলায় ৬৯,৪২১টি গ্রামে ব্র্যাক তার কার্যক্রম পরিচালিত করছে। ২০০৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্র্যাকের নিয়মিত কর্মীর সংখ্যা ছিল ৪৬,৯১৪ জন। তা ছাড়া এর শিক্ষা কর্মসূচিতে খন্ডকালীন চাকুরির ভিত্তিতে ৬৫,৩৫৯ জন শিক্ষক নিয়োজিত রয়েছেন। ব্র্যাক তার উন্নয়ন কার্যক্রমের আওতায় ২০০৯ সাল পর্যন্ত ৮.৪৬ মিলিয়ন দরিদ্র ব্যক্তিকে সংগঠিত করেছে। এই ব্যক্তিদের নিয়ে গঠন করা হয়েছে গ্রামসংগঠন। প্রতিটি গ্রামসংগঠনের সদস্যসংখ্যা ৩৫-৪০ জন। এদের অধিকাংশই মহিলা। ২০০৯ সাল পর্যন্ত ব্র্যাকের গ্রামসংগঠনের সংখ্যা দাঁড়ায় ২,৯৪,৮৪৮।

গ্রামসংগঠনগুলি দরিদ্রদের নিজেদের উন্নতির পথে প্রধান প্রতিবন্ধকতাসমূহ আলোচনার জন্য খুবই কার্যকর ফোরাম। এই সংগঠনগুলিই আবার দরিদ্রদের আর্থিক সেবা প্রদানের প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যম। ব্র্যাকের ঋণ কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৭৪ সালে এবং ২০০৯ সাল পর্যন্ত ব্র্যাক তার গ্রামসংগঠনের সদস্যদের উপার্জনমূলক কর্মতৎপরতা বৃদ্ধির জন্য ৬,৯৮২.০৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিতরণ করেছে। অপরদিকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ব্র্যাকের গ্রামসংগঠনের সদস্যদের সঞ্চয়কৃত অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৬৮.৫৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ব্র্যাক তার সদস্যদের জীবিকা নির্বাহ ও উপার্জনমূলক কর্মকান্ড বৃদ্ধি এবং ভোগ্যপণ্যের বাজারের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ সম্প্রসারণের উপরও গুরুত্ব দেয়। ব্র্যাক তার সদস্যদের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করে এবং তাদের নিজস্ব গ্রাম ও এলাকায় বৈষম্য দূরীকরণের উপযোগী করে তার সামাজিক উন্নয়ন কার্যক্রমের পরিকল্পনা প্রণয়ন করে।

ব্র্যাক দরিদ্র জনগণের স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা পূরণে ব্যাপকভিত্তিক চিকিৎসা, পুষ্টি এবং জনসংখ্যা কার্যক্রম পরিচালনা করে। ব্র্যাকের স্বাস্থ্যসেবার সুবিধাভোগী লোকের সংখ্যা প্রায় ১০০ মিলিয়ন। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যসেবিকারা গ্রামের দরিদ্র জনগণের স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করেন। তাঁরা গ্রামবাসীদের প্রাথমিক চিকিৎসা ও বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধবিষয়ক প্রশিক্ষণও দিয়ে থাকেন। ব্র্যাকের সদস্যদের এবং গ্রাম্য জনগোষ্ঠীর প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার জন্য ব্র্যাক বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর মধ্যে রয়েছে বয়ঃসন্ধিকালে পারিবারিক জীবনসম্পর্কিত শিক্ষা, গর্ভনিরোধ ব্যবস্থা, এসটিডি/আরটিআই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, এইচআইভি/এইডস সম্বন্ধে জ্ঞান, স্বাস্থ্য উন্নয়নে বিশেষ সেবা এবং গর্ভবতী মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসচেতনতা। এ ছাড়া যক্ষ্মা ও ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে ব্র্যাক কর্মসূচি পরিচালনা করছে। তদুপরি ওয়াটার, স্যানিটেশন অ্যান্ড হাইজিন (ওয়াশ) কর্মসূচির মাধ্যমে পানীয় জল, পয়ঃনিষ্কাশন ও স্বাস্থ্যবিধি পালনে জনগোষ্ঠীকে সচেতন করে তোলার জন্য ব্র্যাক ব্যাপক ভিত্তিতে কাজ করে যাচ্ছে। পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা, পরিবেশ দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন রোধেও বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে।

৩৮,২৫০টি এককক্ষবিশিষ্ট বিদ্যালয়ের মাধ্যমে পরিচালিত ব্র্যাকের উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম ১.১২ মিলিয়ন শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষা প্রদান করছে। এই শিশুদের ৬৫ শতাংশ মেয়ে। এ ছাড়া ব্র্যাক ২৬,৩৫০টি প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা করছে। অন্যদিকে সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়সমূহের শিক্ষা ও পরিচালনার মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি ও শিক্ষকদের জন্য ব্র্যাক নিয়মিতভাবে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। শিক্ষা কর্মসূচির আওতায় সারাদেশে ২ হাজারেরও অধিক গণকেন্দ্র পাঠাগার, প্রায় ৬শ ভ্রাম্যমাণ পাঠাগার এবং প্রায় ৯ হাজার কিশোরী উন্নয়নকেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে। এসব কেন্দ্রের সদস্যসংখ্যা ২,৩৩,০১৮। কিশোরী উন্নয়ন কেন্দ্রগুলি কিশোরীদের জন্য জীবিকা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্রঋণ ও সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি পরিচালনা করছে। এ ছাড়া ব্র্যাক দেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধীদের জন্যও শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

ব্র্যাকের অন্যান্য কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে মানবাধিকার ও আইন সহায়তা কর্মসূচি, সামাজিক উন্নয়ন কর্মসূচি, অ্যাডভোকেসি এবং জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভারসিটি কর্মসূচি। এগুলির মাধ্যমে ব্র্যাক মানবাধিকার রক্ষা, লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠা এবং সামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখছে। ব্র্যাকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি হচ্ছে অতিদরিদ্র কর্মসূচি। গ্রামীণ দরিদ্র বিশেষত নারীপ্রধান অতিদরিদ্র পরিবারের আর্থসামাজিক অগ্রগতি মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন করাই এই কর্মসূচির লক্ষ্য।

উন্নয়নক্ষেত্রে উত্তম ব্যবস্থাপনা এবং দক্ষতা গড়ে তোলার জন্য রয়েছে প্রশিক্ষণ বিভাগ। এ বিভাগের আওতায় ২০টি আবাসিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং ২টি উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। অন্যদিকে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পগুলির নানা দিক বিশ্লেষণ করে কর্মসূচির মান উন্নয়নে দিক নির্দেশনা দানের জন্য কাজ করছে গবেষণা ও মূল্যায়ন বিভাগ। এ ছাড়া ব্র্যাকের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সহায়তা দানের জন্য রয়েছে মানবসম্পদ বিভাগ, কমিউনিকেশনস বিভাগ, অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগ, পরিবীক্ষণ বিভাগ, অর্থ বিভাগ, যানবাহন বিভাগ, নির্মাণ বিভাগ এবং ক্রয় ও সরবরাহ বিভাগ। ব্র্যাকের মূল কর্মসূচিগুলি যাতে স্বচ্ছন্দে পরিচালিত হয় সেজন্য এসব বিভাগ কার্যকর সহায়তা প্রদান করে।

প্রসারমাণ বাজারের সঙ্গে গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র উৎপাদনকারীদের যোগসূত্র স্থাপনের লক্ষ্যে ব্র্যাক বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। লুপ্তপ্রায় কারুশিল্পের পুনরুদ্ধার এবং কারুশিল্পীদের উৎপাদিত পণ্য বিপণনের মাধ্যমে তাদেরকে স্বনির্ভর ও সচ্ছল করে তোলার লক্ষ্যে ব্র্যাক কর্তৃক পরিচালিত আড়ং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

১৯৯৮ সালে ব্র্যাক ডেইরি ফার্ম চালু করে। গাভিপালনে ঋণ প্রদান করে ব্র্যাক সেই খামারিদের উৎপাদিত দুধ সংগ্রহ করে মানসম্পন্ন দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করে। দেশের ২৮টি জেলার ৮০ হাজার গাভিপালনকারীর কাছ থেকে প্রতিদিন গড়ে ১ লাখ লিটার দুধ সংগ্রহ করা হয়। সংগৃহীত দুধ দেশব্যাপী স্থাপিত ১০০ চিলিং সেন্টারে সংরক্ষণ করা হয়। এ ছাড়া ব্র্যাকের সদস্যদের চাহিদার প্রতি লক্ষ রেখে গ্রামাঞ্চলে ৯টি পোলট্রি ফার্ম এবং পোলট্রি ফার্মের খাদ্য সরবরাহের জন্য ২টি ফিডমিল স্থাপন করা হয়েছে।

ব্র্যাকের কর্মসূচি সহায়ক অন্যান্য বাণিজ্যিক উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে ব্র্যাক প্রিন্টার্স, ব্র্যাক প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং, ১টি হিমাগার, ৬টি বীজাগার, ১০টি চিংড়ি ও মৎস্য হ্যাচারি এবং ১টি বুল অ্যান্ড বাক স্টেশন (হিমায়িত সিমেন উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিতরণ) এবং ৬০ জেলার ১৮৫৯টি ইউনিয়নে গো-প্রজনন (গরু ও ছাগল) কেন্দ্র। এ ছাড়া শস্যের বৈচিত্রায়ন এবং নতুন চাষপদ্ধতি উদ্ভাবনকল্পে ব্র্যাকের রয়েছে ১টি নিজস্ব টিস্যু কালচার গবেষণাগার এবং ৪টি বীজ গবেষণা ও উৎপাদন কেন্দ্র। ব্র্যাকের বাণিজ্যিক উদ্যোগগুলি কৌশলগতভাবে মূল উন্নয়ন কর্মধারার সঙ্গে যুক্ত। এসব বাণিজ্যিক উদ্যোগ থেকে অর্জিত লভ্যাংশ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশিক্ষণসহ নানা কার্যক্রমে ব্যয়িত হয়।

২০০১ সালে স্থাপন করা হয় ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি। শিক্ষা উন্নয়ন এবং গভর্নেন্স স্টাডিজ নামে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির রয়েছে দুটি আলাদা ইনস্টিটিউট।

২০০২ সালে আফগানিস্তানে কার্যক্রম শুরু করার মাধ্যমে ব্র্যাক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার কর্মসূচিকে সম্প্রসারিত করে। ঐ সময় থেকে এশিয়া এবং আফ্রিকার আটটি দেশে ব্র্যাক দারিদ্র্য দূরীকরণের লক্ষ্যে তার উদ্ভাবনী শক্তি এবং বহুমুখী বিস্তৃত কর্মসূচির অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশে দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং জীবনমান উন্নয়নের উদ্যোগে নবতর শক্তি ও গতির সঞ্চার করেছে। বর্তমানে ব্র্যাক আফগানিস্তান, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, লাইবেরিয়া, তানজানিয়া, উগান্ডা, দক্ষিণ সুদান, সিয়েরা লিওনে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংগঠন হিসেবে দেশে ও বিদেশে এর উজ্জ্বল ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে। ২০১০ সালে ব্র্যাক তার প্রাতিষ্ঠানিক প্রতীক হিসেবে নতুন লোগো প্রবর্তন করেছে এবং বর্তমানে বিশ্বব্যাপী একটি ব্র্যান্ড হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার লক্ষ্যে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠাকালে ব্র্যাকের বার্ষিক বাজেট ছিল ৩ মিলিয়ন টাকা যার পুরোটাই ছিল বিদেশি সাহায্যনির্ভর। ২০০৯ সালে ব্র্যাকের বার্ষিক বাজেট দাঁড়ায় ৬৯৩.৫৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং এর মধ্যে বিদেশি সাহায্যের অংশ মাত্র ২০ শতাংশ। [শামসুল হুদা]