ব্রজলাল কলেজ


ব্রজলাল কলেজ  খুলনা জেলা শহর থেকে ৫ মাইল পশ্চিমে ভৈরব নদীর তীরে ঐতিহ্যবাহী ব্যবসাকেন্দ্র দৌলতপুরে অবস্থিত। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯০২ সালের জুলাই মাসে। প্রথমে এর নাম ছিল হিন্দু একাডেমী। ১৮১৬ সালে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হিন্দু কলেজের আদলে এই একাডেমী প্রতিষ্ঠা করেন শিক্ষানুরাগী বাবু ব্রজলাল চক্রবর্তী। হিন্দু কলেজের মতোই দৌলতপুরের হিন্দু একাডেমীর দুটি শাখা ছিল: চতুষ্পাঠী ও কলেজ বা একাডেমী। চতুষ্পাঠীর ছাত্রদের থাকা খাওয়া ও পড়ার খরচ কর্তৃপক্ষ বহন করত। তারা প্রথম দিকে ছিল আবাসিক। আর একাডেমী পরিচালনার ভার ন্যস্ত ছিল ৫ জনের একটি বোর্ড অব ট্রাস্টিজ-এর ওপর। এর প্রধান ছিলেন বাবু ব্রজলাল চক্রবর্তী। রাজা প্রমথভূষণ দেবরায়, পন্ডিত আশুতোষ স্মৃতিরত্ন এবং আরও অনেক খ্যাতনামা ব্যক্তি এই কমিটির সদস্য ছিলেন।

এই শিক্ষায়তনে ক্লাস শুরু হয় ১৯০২ সালের ২৭ জুলাই। প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষ একইসঙ্গে চালু হয়। পাকা ভিত ও পাকা মেঝে, বেড়া ও টিনের তৈরি দুটি ঘর নিয়ে প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু। এই প্রতিষ্ঠানে ১৯০৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি নারায়ণশিলা (দেবতার প্রতীক) স্থাপন করা হয়। এখানে এখন মন্দির ও মসজিদ আছে। একাডেমীর জমির পরিমাণ প্রথমে ছিল ২ একর। পরবর্তীকালে হাজী মুহম্মদ মোহসীনএর সৈয়দপুর এস্টেট থেকে ৪০ একর জমি পাওয়া যায়। এস্টেট প্রতিষ্ঠানটিকে কিছু অর্থসাহায্যও দিত। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯০৭ সালে এটিকে অনুমোদন দেয়।

১৯১০-১১ সালে এখানে মুসলমান ছাত্রদের জন্য ছাত্রাবাস নির্মিত হয়। তখন মুসলমান ছাত্রদের ফারসি ও আরবি পড়তে হয়েছে মূল ভবনের আঙিনার বাইরে অবস্থিত মুসলিম ছাত্রাবাসে। অনেক পরে শিক্ষামন্ত্রী এ.কে ফজলুল হক এই প্রতিষ্ঠানে মুসলিম শিক্ষক নিয়োগের নির্দেশ দেন। প্রথম খন্ডকালীন মুসলিম শিক্ষক নিযুক্ত হন জনাব মুসাদ্দার আলী। ১৯৪৪ সালের ৮ আগস্ট বাবু ব্রজলাল চক্রবর্তী মারা যান। ১৯৪৬ সালে তাঁর নামানুসারে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম হয় ব্রজলাল হিন্দু একাডেমী। পরবর্তীকালে একাডেমীর পরিবর্তে নামকরণ করা হয় ব্রজলাল কলেজ বা সংক্ষেপে বি এল কলেজ। কলেজটি প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং আরও পরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়। ১৯৬৭ সালের ১ জুলাই তারিখে এই কলেজকে সরকারিকরণ করা হয়। ১৯৭৩ সালে কলেজটি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ বলে ঘোষিত হয়। এরপর এখানে বাংলা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, বাণিজ্য, পদার্থবিদ্যা ও রসায়ন বিষয়ে স্নাতকোত্তর কোর্স চালু হয়। বর্তমানে প্রায় সকল শাখাতেই অনার্স ও এম.এ কোর্স চালু রয়েছে।

এই কলেজের কৃতী শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন সুন্দরবনের ইতিহাস গ্রন্থের লেখক এ.এফ.এম আবদুল জলিল, ছান্দসিক প্রবোধচন্দ্র সেন, গণিতজ্ঞ চারুচন্দ্র বসু, বাংলা সাহিত্যের নতুন ইতিহাস লেখক নাজিরুল ইসলাম, বাউল গবেষক ড. এ.এস.এম আনোয়ারুল করিম, ঐতিহাসিক সতীশচন্দ্র মিত্র প্রমুখ।

এই কলেজের কৃতী ছাত্রদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন কবি গোলাম মোস্তফা, পন্ডিত ও লেখক ড. দেবীপদ ভট্টাচার্য, গল্পকার হাসান আজিজুল হক, বিশিষ্ট পার্লামেন্টারিয়ান সৈয়দ নওশের আলী, লেখক স.ম বাবর আলী, কম্যুনিস্ট রাজনৈতিক নেতা রতন সেন, গল্পকার কুন্তল চক্রবর্তী, ধর্মগ্রন্থ লেখক অদ্বৈতানন্দ মহারাজ, নাট্যকার কাজী আবদুল খালেক প্রমুখ।  [আমজাদ হোসেন]