বৌদ্ধধর্ম


Mukbil (আলোচনা | অবদান) কর্তৃক ১০:২৩, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ পর্যন্ত সংস্করণে

(পরিবর্তন) ←পুর্বের সংস্করণ | সর্বশেষ সংস্করণ (পরিবর্তন) | পরবর্তী সংস্করণ→ (পরিবর্তন)

বৌদ্ধধর্ম বিশ্বের প্রাচীনতম ধর্মসমূহের অন্যতম। সিদ্ধার্থ গৌতম এর প্রবর্তক। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে তাঁর শিক্ষা ও উপদেশকে কেন্দ্র করে এ ধর্মের উদ্ভব ঘটে। সিদ্ধার্থের জন্ম ৫৬৩ খ্রিস্টপূর্ব। তাঁর পিতা শুদ্ধোদন ছিলেন বর্তমান নেপালের সীমান্তবর্তী রাজ্য কপিলাবস্ত্তর রাজা। মাত্র উনত্রিশ বছর বয়সে সিদ্ধার্থ জীবনে দুঃখের কারণ এবং তা থেকে মুক্তির উপায় অনুসন্ধানের জন্য সব রকম রাজকীয় মহিমা ও সুখভোগ পরিত্যাগপূর্বক কঠোর সাধনায় আত্মনিয়োগ করেন। অবশেষে পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে গয়ার নিরঞ্জনা নদীর তীরে একটি বৃক্ষের নিচে বসে তিনি সেই বোধি বা বিশেষ জ্ঞান (সম্মা সম্বোধি) অর্জন করেন। এ ঘটনার পর থেকেই লোকে তাঁকে সম্মানসূচক ‘বুদ্ধ’ নামে আখ্যায়িত করে এবং উক্ত বৃক্ষটি পরিচিত হয় ‘বোধিবৃক্ষ’ নামে। তিনি শাক্যমুনি (শাক্যবংশীয় ঋষি), তথাগত (সম্বুদ্ধ) এবং  বোধিসত্ত্ব (বুদ্ধত্বলাভে আগ্রহী) নামেও আখ্যাত হন।

বুদ্ধমূর্তি, ধর্মরাজিক বৌদ্ধবিহার,কমলাপুর, ঢাকা

বুদ্ধ কোনো ঈশ্বর ছিলেন না বা কোনো নবী বা ঈশ্বরের অবতারও ছিলেন না। রাজকুমার হওয়া সত্ত্বেও তিনি ছিলেন একজন সাধারণ মানুষ এবং নিজের চেষ্টায় তিনি জীবনের চরম সত্যকে জেনেছিলেন। বুদ্ধ মানব জাতির কোনো ত্রাণকর্তা ছিলেন না। তিনি বরং তাঁর অনুগামীদের স্বনির্ভর হতে এবং নিজেদের মুক্তির জন্য অধ্যবসায়ের সঙ্গে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করতেন। তাঁর বক্তব্যই ছিল নিজেকে চেষ্টা করতে হবে।

বুদ্ধের ধর্ম (ধম্ম) বা শিক্ষা শুধু পরমেশ্বরে অবিশ্বাসই নয়, বরং সৃষ্টিতত্ত্ব, আত্মার অমরত্ব, শেষ বিচার ইত্যাদি বিষয়ের প্রতিও আস্থাহীনতা। এসব ছাড়াও বুদ্ধের মতবাদ এখনও বিশ্বের অন্যতম প্রধান ধর্ম হিসেবে বিবেচিত হয়, কারণ এটি একটি উচ্চমার্গীয় আধ্যাত্মিক শৃঙ্খলা ও মহৎ জীবনব্যবস্থা, যা সূক্ষ্ম নীতিবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত। বিশ্বাসকে বুদ্ধ তাঁর ধর্ম গ্রহণের ভিত্তি হিসেবে পরিপূর্ণরূপে বর্জন করেছেন। তাই বৌদ্ধধর্ম হচ্ছে একান্তই যুক্তিনির্ভর (বিভজ্জবাদ)। বুদ্ধ বলেছেন: ‘আমার কথা তোমরা গ্রহণ করবে কেবল যুক্তি দিয়ে বিচার করে, কেবল আমার প্রতি তোমাদের শ্রদ্ধার কারণেই নয়।’ তিনি বলেছেন: ‘আস এবং দেখ (এহিপস্সিকো)’ এবং এভাবেই তিনি তাঁর মতবাদের যৌক্তিকতা তুলে ধরেছেন।

বুদ্ধের চিন্তা-ভাবনা মানুষের দুঃখকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে। তিনি মানব জীবনের এই সর্বাপেক্ষা বাস্তব ও মৌলিক বিষয়ে যে সত্য আবিষ্কার ও প্রচার করেছেন তা সাধারণত ‘চতুরার্য সত্য’ নামে পরিচিত। সেগুলি হলো: দুঃখ (দুক্খ), দুঃখের উৎপত্তি (দুক্খ-সমুদয়), দুঃখের নিরোধ (দুক্খ-নিরোধ) এবং দুঃখ নিরোধের উপায় (দুক্খ-নিরোধ-গমনি-পতিপাদ)। তবে বৌদ্ধধর্ম নৈরাশ্যবাদী নয়, কারণ তা জীবনের প্রতি মানুষকে নিরুৎসাহিত করে না। বুদ্ধ দুঃখের বিশ্বজনীনতা সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন, তাই নির্বাণ লাভের মাধ্যমে মানুষের এই বৈশ্বিক দুঃখ নিরোধের উপদেশ দিয়েছিলেন। নির্বাণ হচ্ছে চিরন্তন সুখ যা দুঃখের কারণ কামনাকে রোধ করে। এই নির্বাণ অবস্থা লাভ হয় চতুর্থ আর্যসত্য উপলব্ধির মাধ্যমে যা অষ্টাঙ্গিক মার্গ নামে পরিচিত। অষ্টাঙ্গিক মার্গ হচ্ছে: সম্যক দৃষ্টিভঙ্গি (সম্মা দিট্ঠি), সম্যক সংকল্প (সম্মা সংকপ্প), সম্যক বচন (সম্মা বাচা), সম্যক কর্ম (সম্মা কম্ম), সম্যক জীবন (সম্মা অজিব), সম্যক প্রচেষ্টা (সম্মা বয়ম), সম্যক মনন (সম্মা সতি) ও সম্যক সমাধি (সম্মা সমাধি)। এই অষ্টমার্গ আবার তিনটি ভাগে বিভক্ত: প্রথম দুটিকে বলা হয় প্রজ্ঞা, পরের তিনটি  শীল এবং শেষের তিনটি সমাধি। নির্বাণ লাভের জন্য এগুলির সমন্বিতচর্চা একান্ত আবশ্যক।

বুদ্ধকে দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে একজন প্রকৃতিবাদী বলে মনে করা হয়। এর কারণ, তাঁর শিক্ষা বা চিন্তাধারা শুধু যে ঈশ্বরবাদী অতিজাগতিক ধারণামুক্ত তা নয়, তিনি যে দুঃখময় জগতের কথা বলেন তা আমাদের অতি পরিচিত নিত্যদিনের এই জগৎ। তাঁর মতে জীবনের পরমার্থ এবং সর্ব প্রকার দুঃখ থেকে মুক্তির উপায় যে নির্বাণ তা এই জগতেই লাভ করা যায়, অলৌকিক কোনো জগতে নয়। বুদ্ধ ঈশ্বরকে সত্য বলে ধরে নিয়ে দুঃখের কারণ ও উৎপত্তি ব্যাখ্যা করেননি, বরং তিনি ব্যাখ্যা করেছেন তাঁর বিখ্যাত নির্ভরশীল উৎপত্তি তত্ত্ব (পতিচ্চসমুৎপাদ) নামক মতবাদের দ্বারা। এ মতানুসারে বিশ্বের সব কিছু পরস্পর সম্পর্কিত, সাপেক্ষ এবং কিছু একটা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

এই তত্ত্বভিত্তিক বুদ্ধনির্দেশিত অন্য তিনটি মতবাদ হলো: অনিত্যতাবাদ (অনিত্ত), অনাত্মবাদ (অত্মান) এবং কর্মবাদ (কর্ম)। বৌদ্ধধর্মমতে সব কিছুই অবিরাম চলমান, সব কিছুই পরিবর্তনশীল এবং ধ্বংসযোগ্য। অতএব আত্মা বলতে স্থায়ী কিছু নেই। কর্মবাদ হচ্ছে বিশ্বের কার্যকারণ তত্ত্ব, যার মূল কথা কর্মানুযায়ী ফললাভ। সুতরাং দুঃখ মানুষের নিজেদের তৈরি এবং কেউ চাইলে স্বীয় প্রচেষ্টা ও কর্মের দ্বারা তা নির্মূল করতে পারে।

বুদ্ধের মতবাদ  পালি ভাষায় রচিত তিনটি বৃহৎ গ্রন্থে সংরক্ষিত হয়েছে, যা  ত্রিপিটক নামে পরিচিত। ‘ত্রিপিটক’ শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘তিনটি ঝুড়ি’। এগুলি হচ্ছে: বিনয়পিটক এতে ভিক্ষুজীবনের নিয়ম-কানুন বর্ণিত হয়েছে, সুত্তপিটক এতে বুদ্ধের উপদেশ, কথোপকথন, অভিভাষণ ইত্যাদি এবং চতুরার্য সত্যের আকারে তাঁর মতবাদ সংরক্ষিত হয়েছে এবং অভিধম্মপিটক এতে সুত্তপিটকের শিক্ষণীয় বিষয়ের দার্শনিক ব্যাখ্যা স্থান পেয়েছে। ত্রিপিটক হচ্ছে থেরবাদী বা হীনযানীদের পবিত্র গ্রন্থ, আর মহাযানীদের পবিত্র গ্রন্থগুলির মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন হচ্ছে মহাযানসূত্র বা বৈপুল্যসূত্র। বলা হয়ে থাকে যে, মহাযান সূত্র বুদ্ধ স্বয়ং প্রচার করেছেন। সম্ভবত এটিই সর্বাপেক্ষা প্রাচীন, গুরুত্বপূর্ণ এবং বৌদ্ধধর্মের মৌলিক ধর্মগ্রন্থ। এতে রয়েছে জ্ঞানের (প্রজ্ঞা) পূর্ণতা সংক্রান্ত বুদ্ধের উপদেশমূলক প্রজ্ঞাপারমিতাসূত্রসমূহ।

বুদ্ধের পরিনির্বাণ লাভের পর তাঁর উপদেশসমূহের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে অনুসারীদের মধ্যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। রাজগৃহে অনুষ্ঠিত প্রায় পাঁচশ নেতৃস্থানীয় ভিক্ষুর প্রথম সঙ্গীতিতে সে বিতর্কের অবসান হলেও বুদ্ধের মৃত্যুর প্রায় একশ বছর পরে বৈশালীতে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় সঙ্গীতিতে নতুন করে বিতর্ক দেখা দেয়, যার ফলে বৌদ্ধ সংঘে বিভাজনের সৃষ্টি হয়। সংঘের প্রবীণ সদস্যরা বুদ্ধের রক্ষণশীল আদি মতবাদ সংরক্ষণ ও সমর্থন করেন বলে তাঁদের বলা হয় থেরবাদী, আর অপেক্ষাকৃত নবীনরা প্রগতিশীল ভিন্ন মত পোষণ করায় তাঁরা পরিচিত হন মহাসাংঘিক নামে। বৌদ্ধসংঘের এ দুটি বিভাগ থেকে পরবর্তীকালে আঠারোটি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটে বলে জানা যায়। সেগুলির মধ্যে হীনযান ও মহাযানই প্রধান। মহাযানীদের মতে তাদের ধর্ম স্বয়ং বুদ্ধ কর্তৃক নির্দেশিত এবং তা সর্ব মানবের জন্য; পক্ষান্তরে হীনযানীদের মতে বোধিলাভ সকলের জন্য নয়। হীনযান ও মহাযানকে কখনও কখনও বৌদ্ধধর্মের যথাক্রমে দক্ষিণা গোষ্ঠী ও উত্তরী গোষ্ঠীও বলা হয়। এর কারণ হীনযান বৌদ্ধধর্ম বিস্তার লাভ করে শ্রীলঙ্কা, বার্মা, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও লাওসে এবং  মহাযান বৌদ্ধধর্ম বিস্তার লাভ করে ভারতের উত্তরে তিববত, চিন, জাপান, কোরিয়া ও মঙ্গোলিয়ায়। ভারতের দক্ষিণে ভিয়েতনাম, জাভা ও সুমাত্রায়ও এ ধর্ম অনুসৃত হয়। পূর্ব ভারতে মহাযান বৌদ্ধধর্ম তান্ত্রিক রূপ লাভ করে এবং দ্বাদশ শতক পর্যন্ত তা বাংলায় প্রসার লাভ করে। মহাযান বৌদ্ধধর্ম থেকে কালক্রমে বৌদ্ধধর্মের আরও কয়েকটি নতুন রূপের উদ্ভব ঘটে, যেগুলির মধ্যে সর্বাধিক পরিচিত তিববত, নেপাল, সিকিম ও ভুটানের তিববতী বৌদ্ধধর্ম এবং জাপানের জেন বৌদ্ধধর্ম।

বাংলাদেশে বৌদ্ধধর্ম ভারতীয় বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসে  বঙ্গ বা বাংলাদেশ দুটি কারণে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। প্রথমত, বঙ্গদেশ ছিল ক্ষয়িষ্ণু ভারতীয় বৌদ্ধধর্মের শেষ আশ্রয়স্থল, যেখানে দ্বাদশ শতক পর্যন্ত তা একটি সামাজিক-সাংস্কৃতিক শক্তি হিসেবে টিকে ছিল, যদিও ওই সময়ে উপমহাদেশের আর কোথাও এর অস্তিত্ব ছিল না। দ্বিতীয়ত, বলা হয়ে থাকে যে, বঙ্গদেশ ছিল তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম নামে বৌদ্ধধর্মের এক অধঃপতিত রূপের আবাসস্থল। তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম হচ্ছে বাংলায় বৌদ্ধধর্মের শেষ পরিণতি। বিশুদ্ধ বৌদ্ধধর্মের এই তান্ত্রিকতায় রূপান্তরের পশ্চাতে কতিপয় সুনির্দিষ্ট কারণ ছিল এবং বাংলাদেশে বৌদ্ধধর্মের এই রহস্যময় ও গূঢ় চর্চার ধারা একান্তই বাংলাদেশের।

ভারতীয় বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসে দেখা যায় এর প্রতি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সম্রাট ও রাজার সমর্থন ও সহানুভূতি ছিল এবং বাংলাদেশে বৌদ্ধধর্মের বিকাশের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। বুদ্ধের জীবদ্দশায় এবং তাঁর মৃত্যুর পরেও তাঁর ধর্মের প্রচার এবং ধর্ম ও সভ্যতা হিসেবে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এর সমৃদ্ধি ঘটেছে মূলত কতিপয় মহানুভব ব্যক্তির পৃষ্ঠপোষকতায়। তাঁরা হলেন মগধের বিম্বিসার ও অজাতশত্রু, কোশলের প্রসেনজিৎ, মৌর্যরাজ অশোক, কুষাণরাজ কনিষ্ক প্রমুখ। এ ধারা বাংলায় প্রচলিত ছিল পাল ও চন্দ্র রাজাদের মধ্য দিয়ে বারো শতক পর্যন্ত। যদিও অন্যান্য রাজবংশের রাজাদের অনেকেই বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করেননি, এমনকি কেউ কেউ এর বিকাশে বাঁধাও দিয়েছেন, তথাপি বাংলায় পরবর্তী আরও প্রায় আটশ বছর ধরে বৌদ্ধর্মের উন্নয়ন ধারা অব্যাহত ছিল।

ঐতিহাসিক সূত্র থেকে জানা যায় যে, বৌদ্ধধর্ম বাংলায় প্রবেশ করে সম্রাট অশোকের রাজত্বকালে খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে। কিন্তু তারও আগে বৌদ্ধধর্ম বাংলায় এসেছে কিনা তা বিচার্য বিষয়। বিনয়পিটক অনুসারে আর্যাবর্তের পূর্ব সীমা পুন্ড্রবর্ধন (উত্তর বঙ্গ) পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। বিনয়পিটক সংকলিত হয়েছিল অশোকেরও আগে। সুতরাং বলা যায়, বৌদ্ধধর্ম সম্ভবত বাংলার কিছু কিছু অঞ্চলে, এমনকি বর্তমান বাংলাদেশেও, অশোকের আগেই প্রবেশ করেছিল।

সিদ্ধার্থ বোধি লাভের পর প্রথমে সারনাথ এবং পরে মগধ, কোশল, বৈশালী, মধ্যদেশ প্রভৃতি স্থানে তাঁর ধর্ম প্রচার করেন। বিনয়পিটক অনুসারে মধ্যদেশের পূর্বপ্রান্তে ছিল কজঙ্গলা নগর এবং তার বাইরে মহাসালা। কিন্তু দিব্যাবদান  অনুসারে এর পূর্বসীমা বিস্তৃত ছিল  পুন্ড্রবর্ধন পর্যন্ত। ধর্ম প্রচারের সময় গৌতম বুদ্ধ মগধরাজ বিম্বিসারের সহায়তা পেয়েছিলেন। বিম্বিসার বৌদ্ধ ভিক্ষুদের বসবাসের জন্য বেণুবন বিহার নির্মাণ করিয়ে দিয়েছিলেন এবং আজীবন তিনি ধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রে বুদ্ধের একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। বাংলা যেহেতু মগধ সীমান্তের পাশেই ছিল সেহেতু এরূপ অনুমান ভিত্তিহীন নয় যে, বুদ্ধ বাংলার কোথাও কোথাও পদচিহ্ন রেখেছিলেন।  হিউয়েন-সাং উল্লেখ করেছেন যে, বুদ্ধ বাংলা ও বিহারের বহু জায়গা ভ্রমণ করেছেন এবং সম্রাট অশোক সেই স্মৃতি ধরে রাখার জন্য সেসব স্থানে স্তূপ নির্মাণ করিয়েছেন।

অশোকের রাজত্ব এবং মৌর্যপরবর্তী যুগ শিলালিপি ও অন্যান্য উৎস থেকে এটা স্পষ্ট যে, অশোকের সময়ে বৌদ্ধধর্ম বাংলায় দৃঢ়ভাবেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বগুড়া জেলার মহাস্থানে ব্রাহ্মী অক্ষরে লেখা একটি অভিলেখ পাওয়া গেছে, যাতে ‘পুডনগল’ (পুন্ড্রনগর) কথাটি লেখা আছে। সেখান থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ-৩য় শতকের কিছু মৌর্য মুদ্রা ও অস্ত্র-শস্ত্রও পাওয়া গেছে। এসব থেকে প্রমাণিত হয় যে, এই গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ তখন মৌর্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। চৈনিক পরিব্রাজক ইৎ-সিং পশ্চিমবঙ্গের তাম্রলিপ্তি (তমলুক) ও কর্ণসুবর্ণের (বর্তমান বর্ধমান ও মুর্শিদাবাদ) নিকট এবং পুন্ড্রবর্ধন (উত্তর বঙ্গ) ও সমতটে (বাংলাদেশ) আশোকের স্তূপ দেখেছিলেন বলে বলা হয়। আশোকের সময়ে ভাগীরথী-হুগলি নদীর পশ্চিম পাড়ে তাম্রলিপ্তি বন্দর নৌযোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। মহাবংশ থেকে জানা যায় যে, অশোকের রাজধানী পাটলিপুত্র থেকে একটি বৌদ্ধধর্মীয় গোষ্ঠী এই বন্দর থেকেই শ্রীলঙ্কায় সংঘ স্থাপনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিল।

মৌর্য রাজবংশের পতনের ফলে বৌদ্ধধর্ম রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা হারায়। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে পুষ্যমিত্র তাঁর প্রভু বৃহদ্রথকে হত্যা করে মগধের সিংহাসন অধিকার করেন এবং শূঙ্গবংশের প্রতিষ্ঠা করেন। শূঙ্গবংশের অভ্যুদয়ে বৌদ্ধধর্ম প্রথমবারের মতো বাধাগ্রস্ত হয়। এক সময়ের সমৃদ্ধশালী এই ধর্ম শুধু রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি; এর পশ্চাতে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল এবং তা হলো বৌদ্ধধর্ম ও সংঘের প্রতি শূঙ্গরাজাদের বিরূপ মনোভাব।

তবে কতিপয় ভারতীয় পন্ডিতের অভিমত এই যে, শূঙ্গরাজারা বৌদ্ধধর্মের প্রতি অসহিষ্ণু ছিলেন না এবং সে কারণে তাঁদের সময়ে বৌদ্ধধর্মের প্রসারও ঘটেছিল। তাম্রলিপ্তিতে প্রাপ্ত একটি টেরাকোটা ফলক থেকে অনুমিত হয় যে, শূঙ্গরাজত্বে বাংলায় বৌদ্ধধর্মের অস্তিত্ব ছিল। উক্ত ফলকটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশুতোষ জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।

খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে কুষাণরাজদের সময় বৌদ্ধধর্ম আবার নতুন শক্তি লাভ করে। রাজা কনিষ্ক বৌদ্ধধর্মকে রাষ্ট্রীয় ধর্মে উন্নীত করেন এবং অশোকের মতো স্তূপ, চৈত্য ও বিহার নির্মাণ করেন। তিনি বিদেশে ধর্মপ্রচারকদেরও প্রেরণ করেন। এ সময়ের প্রাপ্ত বিভিন্ন বুদ্ধমূর্তি, তাম্র ও স্বর্ণমুদ্রা এবং প্রত্নলিপি থেকেও কনিষ্কের আমলে বৌদ্ধধর্মের সমৃদ্ধি অর্জনের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়।

গুপ্তযুগ গুপ্ত সম্রাটরা ছিলেন ব্রাহ্মণ্যধর্মের একনিষ্ঠ অনুসারী (পরম ভাগবত)। তাঁরা এ ধর্মকে পুনরুজ্জীবিত করে তোলেন। পাশাপাশি তাঁরা বৌদ্ধধর্ম এবং অন্যান্য ধর্মের প্রতিও উল্লেখযোগ্য সহিষ্ণুতা ও সহানুভূতি প্রদর্শন করেন। তাঁদের উদার ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি ব্রাহ্মণ্যধর্মের পাশাপাশি বৌদ্ধধর্মের প্রসারেও সহায়তা করে। শৈব ও বৈষ্ণব এ দুটি শক্তিশালী মতবাদের কাছে বৌদ্ধধর্ম একটি প্রতিযোগী মতবাদ হিসেবে দেখা না দিয়ে বরং হিন্দুধর্মের আরও কাছাকাছি এসেছিল। আধ্যাত্মিক নাস্তিক্যবাদ পরিহার করে বৌদ্ধধর্ম ভক্তি আন্দোলনের এতই কাছাকাছি চলে এসেছিল যে, ষষ্ঠ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বুদ্ধদেব বিষ্ণুর একজন  অবতার হিসেবে গৃহীত হন।

চৈনিক সূত্রমতে প্রথম গুপ্ত শাসক মহারাজা গুপ্ত বা শ্রীগুপ্ত একটি বৌদ্ধ বিহার নির্মাণ করে ২৪টি গ্রামসহ তা চীনা ভিক্ষুদের দান করেন। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতক পর্যন্ত সেটি একটি পবিত্র স্থান হিসেবে বিদ্যমান ছিল বলে মনে করা হয়। সমুদ্রগুপ্ত বিষ্ণুর একনিষ্ঠ পূজারী হওয়া সত্ত্বেও বৌদ্ধধর্মের একজন মহান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাঁরই সময়ে ভারত ও শ্রীলঙ্কার মধ্যে সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তিনি তাঁর শিক্ষক বিখ্যাত বৌদ্ধপন্ডিত বসুবন্ধুকে মন্ত্রী নিয়োগ করেন এবং শ্রীলঙ্কার রাজা মেঘবন্নের অনুমতি সাপেক্ষে শ্রীলঙ্কার তীর্থযাত্রীদের জন্য বোধগয়ায় একটি বৌদ্ধ বিহার নির্মাণ করেন। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত তাঁর পিতা সমুদ্রগুপ্তের মতোই বৈষ্ণবধর্মের একজন একনিষ্ঠ সমর্থক ছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি তাঁর সাম্রাজ্যে অন্যান্য ধর্মের চর্চার ক্ষেত্রেও সম্পূর্ণ স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা বিধান করেছিলেন। তাঁর শাসনামলে বৌদ্ধধর্ম জনজীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

ফা-হিয়েন তাঁর বঙ্গদেশ ভ্রমণকালে গঙ্গানদী পার হয়ে পূর্বাঞ্চল ভ্রমণ করেন বলে বলা হয়। সে সময় তিনি বিভিন্ন স্থানে অনেক বৌদ্ধ স্তূপ ও ভিক্ষুদের দেখতে পেয়েছিলেন। বলা হয়ে থাকে যে, তিনি তাম্রলিপ্তিতে দুবছর অবস্থান করেন এবং বাইশটি বৌদ্ধ বিহার পরিদর্শন করেন, যেখানে বৌদ্ধ বিনয়ানুসারী ভিক্ষুরা বসবাস করতেন।

গুপ্তযুগে বৌদ্ধধর্মের সমৃদ্ধ অবস্থা সম্পর্কে ফা-হিয়েনের এই বর্ণনাকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করার মতো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনও রয়েছে। কুমিল্লার গুনাইগড়ে মহারাজা বিনয়গুপ্তের একটি অভিলেখ পাওয়া গেছে। ১৮৮ গুপ্ত সনে (৫০৬/৭ খ্রি) লিখিত এ অভিলেখে মহাযান বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অবৈবর্তিক সংঘকে কিছু জমি দান করার বর্ণনা আছে। সম্রাটের অনুগত জনৈক রুদ্রদত্তের অনুরোধে ত্রিপুরার বিজয় শিবির থেকে এ জমি দান করা হয়েছিল। আচার্য শান্তিদেব প্রতিষ্ঠিত এই অবৈবর্তিক সংঘটি আশ্রম বিহার নামে একটি বিহারে অবস্থিত ছিল এবং সেটি ছিল অবলোকিতেশ্বরের নামে উৎসর্গীকৃত। অভিলেখটিতে আরও কয়েকটি বিহারের উল্লেখ আছে, যার একটি হলো রাজবিহার। রাজশাহী জেলার বিহরৈলে দাঁড়ানো অবস্থায় একটি বুদ্ধমূর্তি পাওয়া গেছে। সোনায় মোড়া একটি মঞ্জুশ্রী মূর্তি পাওয়া গেছে বগুড়ার মহাস্থানগড়ের বলই ধপ ঢিবিতে। এগুলি থেকেও গুপ্তরাজাদের সময়ে বাংলায় বৌদ্ধধর্মের সমৃদ্ধির প্রমাণ পাওয়া যায়।

গুপ্তযুগে হীনযান ও মহাযান উভয় ধারাই পাশাপাশি প্রসার লাভ করেছিল। বিভিন্ন স্থানে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কার্যের ফলে প্রাপ্ত গুপ্তযুগীয় বৌদ্ধ অভিলেখ, সিলমোহর, মূর্তি এবং পুথিসমূহ থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, তখন সর্বাস্তিবাদ, সম্মতিয় বা বৎসিপুত্রিয় এবং স্থবিরবাদী হীনযানী ধারার প্রসার অব্যাহত ছিল। কিন্তু এ ধারা ক্রমাগত তার প্রভাব হারাচ্ছিল এবং সেই সুযোগে মহাযানী ধারা অধিকতর শক্তিশালী হচ্ছিল। মহাযানী ধারা তার অত্যাধুনিক পরার্থবাদী নীতি, পূজার্চনার সুযোগ এবং ভিক্ষু ও সাধারণ জনগণের জন্য বোধিসত্ত্ব লাভের উন্মুক্ত পথের কারণে সাধারণ মানুষের ভাবনাকে প্রভাবিত করতে থাকে এবং এর ফলে তা একটি শক্তিশালী ধর্মীয় আন্দোলনে পরিণত হয়। আর এ ধারাটি জনপ্রিয় হওয়ার কারণে মঞ্জুশ্রী ও অবলোকিতেশ্বর বোধিসত্ত্ব এবং দেবী প্রজ্ঞাপারমিতা গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেন।  আদি বুদ্ধ এবং অমিতাভ বুদ্ধও বিশেষ মর্যাদা লাভ করেন। বুদ্ধমূর্তির পূজার সঙ্গে বোধিসত্ত্ব মূর্তির পূজাও একটি সাধারণ আচরণীয় বিষয় হয়ে ওঠে। হীনযানীরা যেমন তাঁদের বিনয় ও অভিধর্ম গ্রন্থকে শ্রদ্ধা করে, তেমনি মহাযানীরা প্রজ্ঞায় শ্রদ্ধাশীল ছিল বলে কথিত হয়। মহাযানীরা ধর্মীয় উদ্দেশ্যে সম্মোহন বিদ্যারও চর্চা করত বলে বলা হয়।

হিউয়েন-সাং সপ্তম শতকে ভারতবর্ষ ভ্রমণ করেন এবং সে সময় তিনি বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় সকল প্রধান স্থান পরিদর্শন করেন। তাঁর বর্ণনা অনুসারে রাজমহলের নিকটবর্তী কজঙ্গলায় ছয়-সাতটি বৌদ্ধ বিহার ছিল, যেখানে তিনশরও বেশি ভিক্ষু বাস করতেন। তিনি আরও বলেছেন যে, দেশের উত্তরাঞ্চলে পাথর ও ইটের তৈরি একটি সুউচ্চ মিনার তিনি দেখেছেন। এটি একটি প্রশস্ত উঁচু ভিত্তির উপর নির্মিত। এতে শৈল্পিক অলঙ্করণ এবং বুদ্ধ ও দেব-দেবীর মূর্তি খোদাই করা ছিল। পুন্ড্রবর্ধনে তিনি বিশটি বৌদ্ধ বিহার দেখেছিলেন, যেখানে তিন হাজারেরও বেশি ভিক্ষু হীনযান ও মহাযান উভয় ধর্মের চর্চা করতেন। বিখ্যাত পো-শি-পো বিহার পুন্ড্রবর্ধনের রাজধানীর নিকটই অবস্থিত ছিল। এতে প্রশস্ত হলঘর এবং উঁচু উঁচু তলাবিশিষ্ট কক্ষ ছিল এবং এখানে সাতশরও বেশি ভিক্ষু থাকতেন। এর কাছাকাছি অবলোকিতেশ্বরের মূর্তিসহ একটি মন্দিরেরও উল্লেখ আছে। মন্দিরটি তখন দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আকর্ষণ করত।

ফা-হিয়েনের বিবরণ থেকে জানা যায় যে, তিনি পঞ্চম শতকে যখন ভারত ভ্রমণ করেন তখন বৌদ্ধধর্ম চর্চার দুটি প্রাচীন কেন্দ্র কপিলাবস্ত্ত ও সরস্বতীকে পরিত্যক্ত এবং ধ্বংসোন্মুখ অবস্থায় দেখেছেন। অপরদিকে পাটলিপুত্র, মথুরা, বোধগয়া, সারনাথ এবং নালন্দা কেন্দ্রগুলিকে দেখেছেন বিকাশমান অবস্থায়। কুমারগুপ্ত মহেন্দ্রাদিত্য প্রতিষ্ঠিত নালন্দা মহাবিহার গুপ্তযুগে বিশেষ স্বাতন্ত্র্য অর্জন করে। কালক্রমে এটি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপ লাভ করে এবং এশিয়ার মধ্যে বৌদ্ধধর্ম চর্চার বৃহত্তম কেন্দ্রে পরিণত হয়। নালন্দা মগধে অবস্থিত হলেও বাংলার বৌদ্ধগণ প্রথম থেকেই এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। হিউয়েন-সাং-এর ভারত ভ্রমণের পূর্বে এ বিহারের অধ্যক্ষ ছিলেন আচার্য ধর্মপাল। তারপর তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন তাঁরই শিষ্য আচার্য  শীলভদ্র, যিনি ছিলেন সমতটের জনৈক ব্রাহ্মণ রাজার বংশধর। শীলভদ্রের তত্ত্বাবধানেই হিউয়েন-সাং পাঁচ বছর বৌদ্ধদর্শন এবং  বেদ ও  সাংখ্য শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। বাংলার শুধু পন্ডিতরাই নন গুপ্ত, পাল প্রভৃতি রাজাও নালন্দার এই বিশ্ববিদ্যাপীঠের উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছেন।

গুপ্তোত্তর যুগ গুপ্ত রাজাদের পর শশাঙ্ক (৬ষ্ঠ শতক) ক্ষমতায় এসে বৌদ্ধধর্মের প্রতি বৈরিতা পোষণ করেন এবং ব্রাহ্মণ্যধর্মের উন্নয়নে সমধিক যত্নবান হন। তাঁর আমলে বৌদ্ধধর্মের অনেক ক্ষতি সাধিত হয়। এরপর হর্ষবর্ধনের সময়ে (৬০৬-৬৪৭) বৌদ্ধধর্মের পুনরুত্থান ঘটে। তিনি বৌদ্ধধর্মের প্রসারে নতুন গতি দান করেন।  শিব ও সূর্যদেবতার পূজারী হওয়া সত্ত্বেও বৌদ্ধধর্মের প্রতি তাঁর ছিল গভীর শ্রদ্ধাভক্তি। তাঁর অগ্রজ রাজ্যবর্ধন এবং ভগ্নী রাজ্যশ্রীও ছিলেন অনুরূপ। হর্ষবর্ধন প্রথমে হীনযান মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন; পরে মহাযান মতবাদে গভীর আস্থা স্থাপন করেন। বৌদ্ধধর্মের প্রতি তাঁর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য অবদান হলো গঙ্গার তীরে অসংখ্য স্তূপ নির্মাণ, বৌদ্ধ তীর্থস্থানসমূহে বিহার নির্মাণ এবং পশুহত্যা নিষিদ্ধ করা। তিনি নিয়মিতভাবে বৌদ্ধ পন্ডিতদের সম্মেলন আহবান করতেন ধর্মীয় বিষয়ে আলোচনা করার জন্য। এ উপলক্ষে তিনি তাঁদের পুরস্কৃতও করতেন। তিনি তাঁর রাজস্ব আয়ের এক বিরাট অংশ বৌদ্ধদের জন্য ব্যয় করতেন। হর্ষবর্ধন নালন্দার সঙ্গে বিশেষভাবে জড়িত ছিলেন এবং তার উন্নয়নে আন্তরিকতার সঙ্গে সাহায্যের হাত সম্প্রসারিত করেছিলেন।

হর্ষবর্ধনের পর খড়গ হচ্ছে প্রথম বৌদ্ধ রাজবংশ যারা সপ্তম-অষ্টম শতকে স্বাধীন বাংলাদেশ শাসন করেন। ঢাকার ত্রিশ মাইল উত্তর-পূর্বে আশরাফপুর এবং কুমিল্লার চৌদ্দ মাইল দক্ষিণে দেউলবাড়িতে প্রাপ্ত দুটি তাম্রলিপি থেকে এ রাজবংশ সম্পর্কে অনেক তথ্য জানা যায়। এদুটি থেকে খড়েগাদ্যমা, জাতখড়গ ও দেবখড়গ নামে তিনজন রাজা এবং দেবখড়গর স্ত্রী প্রভাবতী ও পুত্র রাজরাজ বা রাজরাজভটের নাম জানা যায়। ই-ৎসিং-এর বিবরণ অনুযায়ী সপ্তম শতকের শেষার্ধে পঞ্চাশ-ষাটজন চীনা বৌদ্ধ ভিক্ষু ভারত ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল ভ্রমণ করেন। তাঁদের মধ্যে একজন শেং-চি আসেন সমতটে। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী রাজভট ছিলেন ত্রিরত্নের (বুদ্ধ, ধম্ম ও সংঘ) একজন একনিষ্ঠ উপাসক। তিনি প্রতিদিন ভিক্ষুদের আশীর্বাদ নিয়ে রাজকার্য শুরু করতেন। সমতটে তখন ত্রিশটির মতো বিহার ছিল, যেখানে চারশ ভিক্ষু তীর্থ ভ্রমণের সময় অবস্থান করতে পারতেন। এসব থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, সপ্তম শতকে খড়গ রাজাদের সময় বাংলায় বৌদ্ধধর্ম প্রসারলাভ করেছিল।

পালযুগ পালযুগ বাংলায় বৌদ্ধধর্মের স্বর্ণযুগ হিসেবে চিহ্নিত। পালরা ছিলেন বৌদ্ধধর্মের একনিষ্ঠ অনুসারী। তবে তাঁরা অন্যান্য ধর্মের প্রতিও সমান  শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তাঁরা রাষ্ট্রীয় দলিলপত্রের শুরুতে বুদ্ধের নাম লিপিবদ্ধ করতেন। তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলায় চারশ বছর ধরে বৌদ্ধধর্ম বিকাশশীল ছিল, যদিও এ সময়ে ভারতের অন্যান্য অঞ্চল থেকে তা প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। পাল আমলে বৌদ্ধধর্ম একটি প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছিল এবং উত্তরে তিববত ও দক্ষিণে মালয় উপদ্বীপ পর্যন্ত তার প্রভাব বিস্তার করেছিল।

বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক ও আভিলৈখিক দৃষ্টান্ত থেকে বৌদ্ধধর্মের উন্নয়নের জন্য পাল রাজাদের পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষণার কথা জানা যায়। এ বিষয়ে অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে। তিববতী ঐতিহ্য অনুসারে রাজা গোপাল নালন্দায় একটি বিহার এবং অনেকগুলি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছিলেন। তারানাথের বর্ণনা অনুসারে গোপালের রাজত্বে অনেক বিশিষ্ট বৌদ্ধ পন্ডিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন দানশীল, বিশেষমিত্র, সুর এবং প্রজ্ঞাবর্মা। ওদন্তপুরী বিহার ছিল বিরল স্থাপত্যশৈলীর জীবন্ত নমুনা। তিববতের স্যাম-ইয়ে বিহার এই মহাবিহারের আদলে নির্মিত বলে কথিত হয়।

ধর্মপাল তাঁর পিতা গোপালের অনুসরণে বৌদ্ধধর্মের উন্নয়নে উদার সমর্থন জুগিয়েছিলেন। মগধের বিক্রমশীলা বিহার তাঁরই নির্মিত। নালন্দার পরে এই বিহারটিই অল্পকালের মধ্যে একটি আন্তর্জাতিক বিদ্যাপীঠে পরিণত হয়। সমগ্র পাল আমলে তিববতের সঙ্গে এর যোগাযোগ ছিল এবং তিববতী পন্ডিতরা এখানে অবস্থান করতেন। বিক্রমশীলায় এক সময় তিন হাজার পন্ডিত বসবাস করতেন। তাঁদের অনেকেই সংস্কৃতে অসংখ্য গ্রন্থ রচনা করেছেন এবং সেগুলি তিববতী ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এখানে যুক্তিবিদ্যা, অধিবিদ্যা,  ব্যাকরণতন্ত্র, ধর্মশাস্ত্র ইত্যাদি বিষয় পড়ানো হতো এবং এসব বিষয়ে ১১৪জন শিক্ষক ছিলেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই যে, দেশের সর্বাধিপতি এখানকার ছাত্রদের ডিগ্রি প্রদান করতেন।

ধর্মপাল দিনাজপুরের পাহাড়পুরে সোমপুর বিহারও নির্মাণ করিয়েছিলেন। এটি বৌদ্ধধর্মের প্রতি পালদের পৃষ্ঠপোষকতার এক উজ্জ্বল নিদর্শন। বিহারটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক বিহারের আদর্শস্বরূপ ছিল। ধর্মপাল এছাড়াও প্রায় পঞ্চাশটির মতো ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছিলেন, যেখানে বৌদ্ধদর্শন, বিশেষত  প্রজ্ঞাপারমিতা শিক্ষা দেওয়া হতো। ধর্মপাল ছিলেন বৌদ্ধপন্ডিত হরিভদ্রের পৃষ্ঠপোষক। পিতার মতো তাঁর রাজত্বেও পূর্ণবর্ধন, প্রভাকর, কল্যাণগুপ্ত, সাগরমেঘ, বুদ্ধজ্ঞপদ প্রমুখ বৌদ্ধপন্ডিত বর্তমান ছিলেন।

রাজা দেবপালের সময় পাল সাম্রাজ্য খ্যাতির চরম শিখরে আরোহণ করে এবং বাংলা একটি শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হয়। তিনি জাভা, সুমাত্রা ও মলয় দ্বীপের রাজা বলপুত্রদেব কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত একটি বিহারের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পাঁচটি গ্রাম দান করেছিলেন। তিনি কেবল সোমপুর প্রতিষ্ঠানটিই সম্পূর্ণ করেননি, মগধের বিক্রমশীলা বিহারের উন্নতি সাধনেও আন্তরিক ছিলেন। পালবংশের নবম রাজা প্রথম মহীপালকে বলা হয় দ্বিতীয় পাল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি বৌদ্ধ স্থাপনাসমূহের অতীত গৌরব ফিরিয়ে আনেন, নালন্দার বৌদ্ধ স্থাপত্যসমূহ সংস্কার করেন এবং বোধগয়ায় নতুন নতুন বিহার নির্মাণ করেন। পাল আমলে নির্মিত আরো কয়েকটি বিখ্যাত বিহার হলো জগদ্দল, ত্রৈকুটক, পন্ডিত, দেবীকোট, পট্টিকেরক, সন্নগড়, ফুল্লহরি এবং বিক্রমপুরী।

চন্দ্রবংশের রাজত্বকালে হরিকেলে (পূর্ব-দক্ষিণ বঙ্গ) বৌদ্ধধর্ম উল্লেখযোগ্য প্রসার লাভ করে। কুমিল্লা থেকে চার মাইল পশ্চিমে ময়নামতি পাহাড়ে প্রাপ্ত চন্দ্র রাজাদের সময়ের বিশাল বুদ্ধস্তূপ এবং শালবন বিহার থেকে বৌদ্ধধর্মের এই উন্নতির প্রমাণ পাওয়া যায়। তিববতি প্রমাণ অনুসারে চন্দ্রযুগেই তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের বিকাশ ঘটেছিল। বিক্রমপুরের বিখ্যাত বৌদ্ধ পন্ডিত অতীশ দীপঙ্কর চন্দ্রবংশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন বলে অনুমান করা হয়।

পাল সাম্রাজ্য শুধু মৃতপ্রায় বৌদ্ধধর্মের দুর্গস্বরূপই ছিল না, তখন এখানে তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মেরও উত্থান ঘটেছিল। Charles Eliot এবং অন্যান্যরা মহাযান বৌদ্ধধর্মের এই নবরূপকে ‘আধুনিক’, ‘অধঃপতিত’, ‘ক্ষয়িষ্ণু’ এবং ‘বিকৃত’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। এই অভিযোগগুলি সত্য বলে ধরে নেওয়া হয় এই জন্য যে, বৌদ্ধধর্ম বাংলায় প্রবেশ করার পরে ধীরে ধীরে তান্ত্রিক মতবাদ ও যৌনযোগাদি রীতিনীতি দ্বারা প্রভাবিত হতে থাকে। ফলে বৌদ্ধধর্ম তার প্রাথমিক অবস্থার পবিত্রতা হারায় এবং পরিণামে এমন এক রূপ লাভ করে যা গুহ্যার্থক বা তন্ত্র-মন্ত্রাত্মক বৌদ্ধধর্ম নামে পরিচিত হয়। মধ্যযুগীয় বাংলায় বৌদ্ধধর্মের এই নবরূপকেই বলা হয় তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম। এর আবার কয়েকটি ভাগ ছিল, যেমন: মন্ত্রযান, বজ্রযান, কালচক্রযান এবং সহজযান।

অধ্যাপক Trevor Ling মনে করেন যে, বাংলায় অশোকের সময় থেকে পালযুগ পর্যন্ত তান্ত্রিক নয়, বরং হীনযান ও মহাযান এই উভয় মতবাদেরই চর্চা হতো। তিনি আদি এবং আদর্শ বৌদ্ধধর্মকে সংঘ, রাজা ও জনগণ এই ত্রিবিধ বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করেন এবং জোর দিয়ে বলেন যে, পালযুগের বৌদ্ধধর্মই ছিল বৌদ্ধধর্মের এই রূপের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। Trevor Ling এবং আরো অনেকে বিশ্বাস করেন যে, বাংলায় পাল শাসন সংস্কৃতি, ধর্ম, শিক্ষা, সাহিত্য, কলা এবং স্থাপত্যবিদ্যার এক উন্নয়নের যুগের সূচনা করে। Ling পাল রাজাদের অন্যান্য অবদানের মধ্যে বিশেষভাবে  বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতার কথা উল্লেখ করেন। বাংলা ভাষা তখন ছিল প্রাথমিক অবস্থায় এবং একটি নতুন ও জনপ্রিয় ভাষা। এ ভাষায়ই বৌদ্ধ কবিরা প্রথম কবিতা রচনা করেন, যা বর্তমানে  চর্যাপদ নামে খ্যাত। এটি একটি তান্ত্রিক গ্রন্থ এবং এর রচয়িতারা ছিলেন তেইশজন তান্ত্রিক বৌদ্ধ, যাঁরা সাধারণভাবে সিদ্ধ বা সিদ্ধাচার্য নামে খ্যাত।

তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম  এতে  মন্ত্র, যন্ত্র,  মন্ডল, মুদ্রা, ধারণি ইত্যাদির চর্চা করা হয়। এর সঙ্গে আরও থাকে মৈথুন, যোগ, দেবালয়, পূজা ও আচার-অনুষ্ঠান, জাদুবিদ্যা, সম্মোহন, প্রেতালাপ, জ্যোতিষ, প্রতীকীত্ব, ধাতুবিদ্যা, প্রকৃত অদ্বৈতের মধ্যে আপাত দ্বৈতের ধারণা, নারীসঙ্গীর সহযোগিতা এবং নারী-পুরুষের মিলনে মহাসুখ। তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের দুটি প্রাচীন গ্রন্থ হচ্ছে গুহ্যসমাজতন্ত্র এবং মঞ্জুশ্রীমূলকল্প। প্রথমটিতে যোগ ও অনুত্তরযোগ (তন্ত্রমতে ধ্যান) এবং দ্বিতীয়টিতে মন্ত্র, মুদ্রা, মন্ডল ইত্যাদি আলোচিত হয়েছে। মঞ্জুশ্রীমূলকল্পে আরও আছে তান্ত্রিক দেবালয়ে বিভিন্ন দেবদেবীর চিত্রাঙ্কনের নির্দেশ। অন্যান্য তান্ত্রিক গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো হেবজ্রতন্ত্র, সম্বরতন্ত্র, কালচক্রতন্ত্র, জ্ঞানসিদ্ধি, করন্ডব্যূহসূত্র, নীলকণ্ঠধারণি এবং মহাপ্রত্যঙ্গিরাধারণি।

বাংলায় বৌদ্ধধর্মের এই গুহ্য রূপ প্রসার লাভ করে পালযুগে এবং এর প্রবল প্রভাব বৌদ্ধধর্মের গতি ও ইতিহাসকে পরিবর্তিত করে দেয়। মধ্যযুগীয় বৌদ্ধধর্মীয় আন্দোলন প্রতিষ্ঠিত হয় সিদ্ধ নামক তান্ত্রিক আচার্যদের দ্বারা। এই আচার্যরা আধ্যাত্মিক ও অতিপ্রাকৃতিক শক্তিতে শক্তিমান ছিলেন বলে মনে করা হয়। বৌদ্ধ ঐতিহ্য অনুসারে এই সিদ্ধদের সংখ্যা চুরাশি। তাঁদের মধ্যে প্রধান কয়েকজন হলেন সরহপা, নাগার্জুন, তিলোপা, নারোপা, অদ্বয়বজ্র,  কাহ্নপা, সবরপা, লুইপা, ভুসুকুপা, কুক্কুরিপা, ডোম্বি এবং ইন্দ্রভূতি।

তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের প্রাথমিক রূপটি সাধারণত মন্ত্রযান নামে পরিচিত। ‘মন্ত্র’ শব্দ থেকেই এর এরূপ নাম হয়েছে। মন্ত্র হচ্ছে কতগুলি রহস্যময় শব্দসমষ্টি যা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে উচ্চারিত হতো এবং মনে করা হতো, এগুলির পুনঃপুন উচ্চারণে কাঙ্ক্ষিত ফল লাভ হবে, এমনকি মুক্তিও। এই ধর্মীয় রীতি এক সময় তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের অন্যান্য রূপ  বজ্রযানসহজযান এবং কালচক্রযানদ্বারা অবদমিত হয়। বজ্রযান ও সহজযান উভয়ই ভিন্ন ভিন্নভাবে তান্ত্রিকতারই চর্চা করে। তবে বজ্রযানে যেমন আনুষ্ঠানিকতার ওপর জোর দেওয়া হয়, সহজযানে তার কোনো স্থান নেই। বজ্রযান দেবদেবীর পূজার সময় মন্ত্র, মুদ্রা এবং মন্ডলের ওপর গুরুত্ব দেয়। তবে উভয় মতবাদের চর্চায়ই যোগ অপরিহার্য, যা কোনো গুরু বা শিক্ষকের সাহায্যে সম্পন্ন করতে হয়। গুরু তাঁর শিষ্যের জন্য সাধনার সঠিক পথের সন্ধান দেন এবং শিষ্যকে মহাসুখ লাভের পথে চালিত করেন।

অবক্ষয় ও পুনরুত্থান সিদ্ধদের হাতে তান্ত্রিক মরমিয়াবাদ হিসেবে বৌদ্ধধর্ম এমন এক অবস্থায় পৌঁছে যে তা শাক্তমতবাদের সঙ্গে সহজেই একীভূত হয়ে যায়। শাক্তমতবাদ এবং বৌদ্ধ মরমিয়াবাদের এই মিলনে শাক্তমতবাদের কয়েকটি নতুন ধারা এবং আরও কয়েকটি জনপ্রিয় ধর্মীয় মতবাদের উদ্ভব ঘটে এবং ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রভাবে বিলুপ্ত হওয়া সত্ত্বেও বৌদ্ধধর্ম এগুলির মধ্যেই বেঁচে থাকে বলে বিশ্বাস করা হয়। শাক্তমতবাদের এমন একটি ধারা হলো কৌল, যার নামকরণ করা হয়েছে ‘কুল’ শব্দানুসারে। ‘কুল’ শব্দের অর্থ ‘শক্তি’। এই ধারার অনুসারীদের বলা হয় কৌল, কুলপুত্র বা কুলীন। অন্য যে ধারাগুলি বৌদ্ধধর্মকে অন্তর্ভুক্ত করেছে বলে বিশ্বাস করা হয়, সেগুলির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো  নাথধর্ম, অবধূত,  সহজিয়া এবং  বাউল। নাথধর্মের গুরুদের বলা হয় ‘নাথ’। তাঁরা ‘যোগী’ নামেও পরিচিত, যেহেতু তাঁরা বুদ্ধ বা পতঞ্জলি ব্যবহূত  যোগ ভিন্ন অন্য এক প্রকারের যোগচর্চা করেন। তাঁরা মুক্তি লাভের উদ্দেশ্যে একটি বিন্দুতে মনস্থির করার পরিবর্তে আন্তর বায়ু সংহত করে ‘সিদ্ধি’ লাভের চেষ্টা করেন এবং এজন্য তাঁরা বায়ুকে উদরের নিম্ন থেকে ওপরের দিকে চালিত করেন। নাথদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন  মৎস্যেন্দ্রনাথ, গোরক্ষনাথ, মীননাথ এবং চৌরঙ্গনাথ। এঁদের মধ্যে মৎস্যেন্দ্রনাথ হচ্ছেন নাথধর্মের প্রতিষ্ঠাতা।

অবধূত সম্প্রদায়ও বৌদ্ধ যোগ চর্চা করত। তবে তারা যোগের শারীরতত্ত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ জ্ঞান লাভের ওপর গুরুত্ব দিত। শারীরতত্ত্বের মধ্যে রয়েছে অসংখ্য নাড়ি, যার প্রধান তিনটি হচ্ছে ললনা, রসনা এবং অবধূতি। অবধূত সম্প্রদায়কে মনে করা হয় প্রাচীন কোনো ধর্মীয় মতবাদের নব সংস্করণ। প্রাচীন বৌদ্ধগ্রন্থসমূহে এর উল্লেখ আছে, তবে ধার্মিক বৌদ্ধরা কখনই এর চর্চা করতেন না। অবধূত সম্প্রদায়ের নিয়ম ছিল ভিক্ষা করা, জনবসতি থেকে অনেক দূরে বাস করা, ছিন্ন বস্ত্র পরিধান করা ইত্যাদি। চৈতন্যের সহযোগী নিত্যানন্দকে বলা হতো এই সম্প্রদায়ের একজন বড় সমর্থক। সহজিয়া মতের প্রতিষ্ঠা হয়েছে মনে করা হয় অন্যতম সিদ্ধ সরহপার দ্বারা এবং এর অপর দুই প্রবক্তা ছিলেন কাহ্নপা ও লুইপা। সহজিয়ারা ছিল দেবদেবীর পূজা এবং অন্যান্য আচার-অনুষ্ঠানের বিরোধী; তারা বরং কামসেবার মতো সহজ পথে মুক্তি অর্জনের প্রতি গুরুত্ব দিত। তেরো শতকে প্রাপ্ত ময়নামতি লিপিকে সহজিয়া মতের প্রাচীনতম প্রমাণ বলে মনে করা হয়। চৌদ্দ শতকের বাঙালি কবি চন্ডীদাসের কাব্য এবং গানে সহজিয়া মতের প্রকাশ দেখা যায়। কালক্রমে সহজযান বৈষ্ণবধর্মের সঙ্গে একীভূত হয়ে যায় এবং তার অনেক পুরাতন বৈশিষ্ট্য পরিত্যক্ত হয়। বাউলরা সহজিয়াদের চেয়ে অধিক পরিমাণে স্বকীয় বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেছে বলে মনে করা হয়, যেহেতু তাদের ওপর বৈষ্ণবধর্মের প্রভাব পড়েনি।

পালদের পরে সেনরা ক্ষমতায় আসেন। তাঁরা ছিলেন শৈব বা বৈষ্ণবধর্মের গোঁড়া অনুসারী। বৌদ্ধধর্মের প্রতি তাঁদের সহানুভূতি ছিল না বললেই চলে। ফলে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা হারিয়ে বৌদ্ধধর্ম অচিরেই ক্ষীয়মাণ ও নানা ভাগে বিভক্ত হতে থাকে। বৌদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং যেগুলিও বা টিকে যায় সেগুলিও মুহম্মদ বখতিয়ার খলজির আক্রমণ থেকে রক্ষা পায়নি। মুসলিম আক্রমণকারীদের হাত থেকে যেসব বৌদ্ধ ভিক্ষু বেঁচে যান তাঁরা পালিয়ে নেপাল, তিববত এবং ভুটানে চলে যান। আর সাধারণ বৌদ্ধ জনগণ হয়  ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে, না হয় ব্রাহ্মণ্যধর্মের সঙ্গে মিশে যায়। এভাবে বৌদ্ধধর্ম এক রকম বিলুপ্ত হয়ে যায়; এর আর পৃথক কোনো অস্তিত্ব থাকে না। তবে কোথাও কোথাও  ধর্মঠাকুর পূজা,  জগন্নাথ পূজা ইত্যাদি বিকৃত আকারে এর অস্তিত্ব লক্ষ করা যায়।

তবে বৌদ্ধধর্মের এই অবক্ষয় সত্ত্বেও জন্মভূমি থেকে তার অস্তিত্ব একেবারেই মুছে যায়নি। আধুনিক ভারতে এর পুনরুত্থানের পূর্ব পর্যন্ত জনপ্রিয় কিছু পূজা-পার্বণের মধ্য দিয়ে তা টিকে থাকে। মাতৃভূমিতে তার পুনর্জাগরণের ফলে বৌদ্ধধর্মের ঐতিহ্যবাহী নিদর্শনসমূহ এখন গুরুত্বের সঙ্গে স্বীকৃতি পাচ্ছে। যেমন অশোকস্তম্ভ, ধর্মচক্র এবং সারনাথের সিংহনাদ এখন ভারতের জাতীয় জীবন ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হিসেবে বিবেচিত। ভারতে বৌদ্ধধর্মের পুনর্জাগরণের কৃতিত্ব বি.আর আম্বেদকরের, যিনি ভারতীয় সংবিধানের রূপকার হিসেবে খ্যাত। তিনি ১৯৫৬ সালে লাখ লাখ নিম্নবর্ণের অস্পৃশ্য লোকদের বৌদ্ধধর্মে ধর্মান্তরিত করিয়েছেন। তবে ভারতের মহারাষ্ট্র এবং অন্যান্য অঞ্চলে আম্বেদকরের নব বৌদ্ধধর্ম আন্দোলনের শতশত বছর পূর্বেই বাংলায় বৌদ্ধধর্মের পুনরুজ্জীবন শুরু হয়েছিল। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষুদ্র একটি বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী বাংলায় মুগল ও ব্রিটিশ আসার বহু পূর্বেই থেরবাদ বৌদ্ধধর্মের চর্চা করত। কালক্রমে তারা তাদের সংঘ পুনর্গঠিত করে এবং ১৮৮৭ সালে ‘চট্টগ্রাম বৌদ্ধ সমিতি’ গঠন করে। এটাই ভারতীয় উপমহাদেশে গঠিত প্রথম বৌদ্ধ সমিতি।  [নীরু কুমার চাকমা]

গ্রন্থপঞ্জি  GEORGE GRIMM, The Doctrine of the Buddha, Berlin, 1958; RC MAJUMDAR ed, The History of Bengal, Vol. I, University of Dacca, 1963; BN CHAUDHURY, Buddhist Centres in Ancient India, Calcutta, 1969; LM JOSHI, Studies in the Buddhistic Culture of India, Delhi, 1977; BT BHATTACHARYA, An Introduction to Buddhist Esoterism, Delhi, 1980; KL HAZRA, Buddhism in India as Described by the Chinese Pilgrims AD 399-689, New Delhi, 1983.

আরো দেখুন  ষড়দর্শন।