বেজি


বেজি

বেজি (Mongoose)  Carnivora বর্গের Herpestidae গোত্রের ছোট, মাংসাশী, স্থলচর স্তন্যপায়ী প্রাণী। আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া, দূরপ্রাচ্য ও মধ্যপ্রাচ্যে এবং একটি প্রজাতি দক্ষিণ স্পেন অবধি বিস্তৃত। বেজি মরুভূমি, তৃণভূমি ও বনসহ নানা পরিবেশে বসবাসে অভ্যস্ত। চটপটে ও কৌশলী এই স্তন্যপায়ীদের শরীর ও মুখ লম্বা, পা খাটো, কান ছোট ও গোলাকার আর ঝোপালো লম্বা লেজ। লোম অমসৃণ ও কুঁচকানো। লেজসহ দেহদৈর্ঘ্য ৫০-১০০ সেমি, লেজ শরীরের সমান লম্বা। গন্ধগোকুলের মতো এদের গন্ধগ্রন্থি নেই, পায়ু অঞ্চলে একটি বড় গন্ধথলে আছে। নিজ এলাকা শনাক্তিতে এরা গন্ধ ব্যবহার করে। অধিকাংশ প্রজাতিই নিঃসঙ্গ। এরা মোটেই সর্পবিষসহিষ্ণু নয়। চটপটে, কৌশলী ও শরীরের নিবিড় লোমের জন্যই সর্পদংশন এড়াতে পারে। বড় বেজি (Herpestes edwardsi) গোখরাসহ নানা জাতের সাপ শিকারে দক্ষ। এরা সাপকে ছোবল মারতে প্ররোচিত করে এবং কৌশলে দংশন এড়াতে থাকে। অতঃপর সাপ ক্লান্ত হয়ে পড়লে বেজি সাপের মাথা কামড়ে ধরে ও ভেঙে ফেলে। ছোবল এড়ানো শিখতে গিয়ে অল্পবয়সী বেজিরা অনেক সময় সর্পদংশনে মারা যায়। সাপের বিষ পেটে গেলেও বেজির কোন ক্ষতি হয় না। কারণ এরা সাপের মাথাসহ বিষগ্রন্থি খেতে পারে। বড় বেজি সহজেই পোষ মানে এবং ইঁদুর মারার জন্য লোকে পোষে। ইঁদুর দমনের জন্য ওয়েস্ট ইন্ডিজে বেজি আমদানি করা হলে এরা ইঁদুরসহ অন্যান্য ছোট আকারের স্থানীয় স্থলচর প্রাণীদের প্রায় নিঃশেষ করে ফেলে। এজন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, এমনকি চিড়িয়াখানার জন্যও বেজি আমদানি নিষিদ্ধ। প্রাচীন মিশরীয়রা স্থানীয় ধূসর বেজি (Herpestes ichneumon) পুষত এবং এদের পবিত্র প্রাণী ভাবত। আফ্রিকার জলাশয়ে বেজি (Atilax paludinosus) জলাভূমির কিনারে থাকে এবং পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে শিকার ধরে। বাংলাদেশে ৩ প্রজাতির বেজি আছে, তন্মধ্যে ২টি বিপদগ্রস্ত ও ১টি বিপদমুক্ত। নিচে বাংলাদেশের বেজির বিবরণ দেওয়া হলো।

বড় বেজি (Common Mongoose, Herpestes edwardsi)  হলুদাভ-ধূসর, লোমে পরপর হালকা ও গাঢ় কালো চক্রাকার দাগ, লেজের আগা সাদা বা হলুদ-লাল। শীতকালে লোমের রং গাঢ় হয়। মাথাসহ দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৫ সেমি, লেজ সমান লম্বা, ওজন ১.৪ কেজি। পাথরের বা ঝোপের নিচে, উইয়ের ঢিবিতে বা নিজের খোঁড়া গর্তে থাকে। শিকার করে একা, কখনও দুটিতে, দৈবাৎ সপরিবারে। এরা ছোটখাটো স্তন্যপায়ী, সরীসৃপ, উভচর ও সব ধরনের কীটপতঙ্গ ধরে থাকে। বেজিরা দৈবাৎ পাখির ডিম, মৃত জীব খেয়ে থাকে; কখনও ফলমূল এবং শহর ও গ্রামে হাঁস-মুরগিও ধরে খায়। বছরে যে-কোন সময় একবার প্রসব করে, বাচ্চা ৩টি পর্যন্ত হয়।

গর্ভকাল প্রায় ৬০ দিন। সারা দেশে খোলা মাঠ, ঝোপঝাড়ে ও ক্ষেতখামারে অসংখ্য বেজি ছড়িয়ে আছে। বর্তমানে প্রজাতিটি বিপদগ্রস্ত। আবাসভূমি ধ্বংস ও ক্ষতিকর প্রাণী হিসেবে নিধনই বিপন্নতার কারণ। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, মায়ানমার, ইরাক এবং তুরস্কেও বেজি আছে।

কাঁকড়াভুক বেজি (Crab-eating Mongoose, Herpestes urva)  বড়সড়, কালচে-ধূসর রঙের, মুখের কোণ থেকে একটি সাদা ডোরা গলার পাশ দিয়ে ঘাড় অবধি ছড়ানো। লোম লম্বা, অমসৃণ ও কিছুটা কুঁচকানো। লম্বা লোমের আগা হালকা রঙের। ভেতরের পশমি লোমের গোড়া গাঢ় বাদামি, আগা বাদামি-হলুদ। মাথাসহ দৈর্ঘ্য ৪০-৫০ সেমি, লেজ ২৫-৩০ সেমি, লেজের আগা লোমহীন। ওজন ১.৮-২.৩ কেজি। চমৎকার সাঁতারু ও  ডুবুরি। এরা ব্যাঙ, মাছ ও কাঁকড়া খায়। আত্মরক্ষার জন্য একটি দুর্গন্ধযুক্ত তরল ছড়ায়। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকার জলাশয়ের কাছে বাস করে। প্রজাতিটি বিপন্ন। আবাস ধ্বংসই বিপন্নের প্রধান কারণ। এটি ভারত (উত্তর-পূর্ব অঞ্চল), নেপাল, মায়ানমার, চীন (দক্ষিণ) ও মালয়েশিয়ায়ও (উত্তর) আছে।

নকুল বেজি (Indian Mongoose, Herpestes javanicus)  ছোটখাটো বেজি, লেজও খাটো (দেহের চেয়ে), সবুজ-ধূসর রঙের, সোনালি আভার কোমল লোম। ঝোপঝাড় ও চাষজমিতে নিজের খোঁড়া গর্তে এদের বাস। সতর্ক দিবাচর এই প্রাণীটি ঝোপঝাড়ের আশেপাশে থাকে। দিনের পর দিন একই পথে চলাচলের দরুন বাসস্থানের আশপাশে পথচিহ্ন দেখে এদের উপস্থিতি শনাক্ত করা যায়। ইঁদুর, সাপ, কাঁকড়াবিছা, চেলা, বোলতা ও সব ধরনের পোকামাকড় খায়। বছরে যে-কোন সময় একবার প্রসব করে, বাচ্চা ২-৩টি। নবজাতকেরা সম্পূর্ণ লোমহীন, দেখতে কালো ইঁদুরের মতো। জন্মের ১৫-১৭ দিন পর চোখ ফোটে। ভারত, মায়ানমার, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরাক এবং তুরস্কেও পাওয়া যায়।  [মোঃ আনোয়ারুল ইসলাম]