বিষাদ-সিন্ধু


বিষাদ-সিন্ধু কারবালার যুদ্ধক্ষেত্রকে উপাত্ত করে রচিত মীর মশাররফ হোসেনের ঐতিহাসিক উপন্যাস। এটি যথাক্রমে ১৮৮৫, ১৮৮৭ ও ১৮৯১ সালে তিন ভাগে প্রকাশিত হয়; পরবর্তীতে সেগুলি একখন্ডে মুদ্রিত হয়।

বিষাদ-সিন্ধুর প্রধান চরিত্রগুলো নামের দিক থেকে ঐতিহাসিক, কিন্তু ঘটনা বর্ণনায় ও চরিত্র সৃষ্টিতে কাল্পনিক। এই গ্রন্থে কিছু উপকাহিনী আছে, যেগুলো যথার্থ ঐতিহাসিক নয়। গ্রন্থের মুখবন্ধে লেখক মীর মশাররফ হোসেন লিখেছেন- ‘পারস্য ও আরব্য গ্রন্থ হইতে মূল ঘটনার সারাংশ লইয়া বিষাদ-সিন্ধু বিরচিত হইল।’ লক্ষণীয় বিষয়, মীর মশাররফ হোসেন বিষাদ-সিন্ধু গ্রন্থে বর্ণিত ঘটনাসমূহ কোন কোন আরবি এবং ফারসি গ্রন্থ হতে সংগ্রহ করেছেন তার নাম উল্লেখ করেননি। এ কারণে ‘সমালোচকবৃন্দ’ লেখকের ‘বক্তব্য অনুমোদনে দ্বিধান্বিত’। মুনীর চৌধুরী লেখকের দাবী সম্পর্কে যৌক্তিক সংশয় পোষণ করেছেন। তিনি দোভাষী পুঁথির সঙ্গে বিষাদ-সিন্ধুর বেশ সাদৃশ্য আবিষ্কার করে নিশ্চিন্ত হয়েছেন যে মশাররফের অবলম্বন ছিল কারবালাবিষয়ক জনপ্রিয় বাংলা পুঁথিই। গোলাম সাকলায়েনের অভিমতও অভিন্ন। আনিসুজ্জামান ও মুস্তাফা নূরউল ইসলামও মনে করেন দোভাষী পুঁথিই মশাররফের কাহিনীর প্রধান প্রেরণা ও মূল উৎস। কাজী আবদুল মান্নান অনুমান করেছেন, ‘গ্রন্থটির প্রতি ধর্মপ্রাণ মুসলমান সমাজের শ্রদ্ধা এবং আকর্ষণ সৃষ্টির জন্যই মশাররফ কাহিনী-উৎসের প্রশ্নে আরবি-ফারসি গ্রন্থেও প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেন।

মীর মশাররফ হোসেনের বিষাদ-সিন্ধুর মূল বিষয়বস্ত্ত হচ্ছে- হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র ইমাম হোসেনের মৃত্যুর জন্য দায়ী ঘটনাসমূহ। অবশ্য ইমাম হোসেনের মৃত্যুর ফলে যে সকল ঘটনা ঘটেছিল তারও বর্ণনা রয়েছে এ গ্রন্থে। বিষাদ-সিন্ধু উপন্যাসের প্রধান চরিত্রগুলির সন্ধান ইতিহাসে পাওয়া যায়, কিন্তু কোনো কোনো অপ্রধান চরিত্রের উল্লেখ বা সন্ধান ঐতিহাসিক কোনো গ্রন্থে পাওয়া যায় না। কিন্তু গবেষকের সিদ্ধান্ত- ‘যেহেতু ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করেই এই গ্রন্থ রচিত হয়েছে, সুতরাং এটিকে ঐতিহাসিক উপন্যাস বলা যায়।’ এতে একই সঙ্গে উপন্যাসের চরিত্রচিত্রণ, মানবজীবনের দুঃখ-যন্ত্রণা, হিংসা-বিদ্বেষ ইত্যাদি যেমন চিত্রিত হয়েছে তেমনি ইতিহাসের পটভূমিকায় সিংহাসন নিয়ে দ্বন্দ্ব, সংগ্রাম, রক্তপাত, হত্যাকান্ড ইত্যাদি বর্ণিত হয়েছে। সারকথা বিষাদ-সিন্ধুতে বর্ণিত ইতিহাসের চরিত্র ও ইতিহাসের লক্ষণকে প্রত্যক্ষ করে গবেষক একে ঐতিহাসিক উপন্যাসের মর্যাদা দিতে দ্বিধা করেননি। তবে এতে এমন কিছু ঘটনার উল্লেখ আছে যেগুলো ইতিহাসের আলোকে বিচার করা চলে না। এমনকি বাস্তব জীবনেও সেগুলির অস্তিত্ব সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করা চলে, যেমন-কিছু অতিপ্রাকৃত ঘটনা, এগুলির কোনোটির উৎপত্তি ধর্মীয় বিশ্বাসে, আবার কোনটির উৎপত্তি ঐন্দ্রজালিক শক্তিতে ও আস্থায়।

বিষাদ-সিন্ধুর সূচনা হচ্ছে- হজরত মুহম্মদ (সা.)-এর এক ভবিষ্যদ্বাণীতে এবং ভবিষ্যদ্বাণী সত্যে পরিণত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রন্থের উপসংহার হবে। এই ভবিষ্যদ্বাণী ছাড়াও এতে কিছু অতিপ্রাকৃত ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। যেমন-এজিদের চোখের সামনে থেকে হোসেনের খন্ডিত শির অদৃশ্য হওয়া, কারবালা প্রান্তরের বৃক্ষ থেকে রক্তক্ষরিত হওয়া, হোসেনের মৃতদেহের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় হোসেনের পিতামাতার মর্তে আগমন এবং দু্ই পাহাড়ের মধ্যবর্তীস্থানে হানিফার বন্দি হওয়া ইত্যাদি। কোনো উপন্যাসে কেবল বাস্তব জীবনের ঘটনা চিহ্নিত হলে তাকে সাধারণত উপন্যাস হিসেবে গণ্য করা হয় না। কিন্তু বিষাদ-সিন্ধুতে বাস্তব ঘটনা এবং অতিপ্রাকৃত বিষয়ের অবতারণা করা হলেও তা পাঠকদের অবিশ্বাস উদ্রেক করে না। বিষাদ-সিন্ধুর ঘটনাস্থান ও ঘটনাকাল সপ্তম শতাব্দীর আরবদেশ। এ উপন্যাস বিচারকালে কোনো কোনো গবেষক সেই বিশেষ যুগের ও মানুষের বিশ্বাসের কথাটি মনে রাখার পক্ষে মত দিয়ে বলেছেন- হজরত মুহম্মদ (সা.)-এর বংশধরেরা যদি দৈবশক্তিতে বিশ্বাসী হন, আশ্চর্য হবার কিছু নেই। কারণ তাঁরা বিশ্বাস করতেন- বিধাতার স্থিরীকৃত পথ থেকে কেউ বিচ্যুত হতে পারে না। বিষাদ-সিন্ধু পাঠকালে কখনো কখনো মনে হয় যেন ইমাম হাসান ও ইমাম হোসেন রক্তমাংসের কোনো মানুষ নয়, কেননা তারা সম্পূর্ণরূপে দৈবের ওপর নির্ভরশীল এবং তারা কেউ নিজেদের কৃতকর্মের ফলের জন্য নিজেদের দায়ী বলে মনে করে না। অপরদিকে এজিদ, জায়েদা, মায়মুনা এবং মরওয়ান-এরা পাষন্ড হলেও এদের অনেকটা রক্তমাংসের মানুষ মনে হয়। কারণ এরা মনে করে-তাদের বর্তমান ক্রিয়াকর্মের ফলেই ভবিষ্যৎ ঘটনাবলী প্রভাবান্বিত হবে। এজিদ হজরত মুহম্মদ (সা.)-এর বংশধরদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে অনবরত সংগ্রাম করতে থাকে, কিন্তু সর্বক্ষণই এজিদ আপন বাহুবল ও কলাকৌশলের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু ইমাম হাসান এবং ইমাম হোসেন মৃত্যুকে বরণ করে বিনা প্রতিবাদে, বিনা প্রতিরোধে। কেননা, তাঁরা বিশ্বাস করে- বিধাতার অভিপ্রায়ই তাই, ফলে তাঁকে মৃত্যুবরণ করতে হবে।

মীর মশাররফ হোসেন জন্মগ্রহণ করেন ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে এবং তিনি যে পরিবেশে বেড়ে উঠেন সেটি ছিল সে-যুগের পূর্ববর্তী সময়ের রীতি-নীতি ও বিশ্বাসদ্বারা লালিত। অধিকাংশ গবেষক বিষাদ-সিন্ধুকে মহাকাব্যের সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন- ‘এতে রয়েছে মহাকাব্যের বিশাল পটভূমি। এটি ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির সংঘর্ষের কাহিনী নয়- এ হচ্ছে প্রভুত্ব নিয়ে দুই নৃপতির মধ্যে সংঘর্ষ। এই সংঘর্ষের সঙ্গে জড়িত ছিল বহু লোকের জীবন, বহু লোকের ভাগ্য।’ এতে প্রায় শ’খানেক পাত্রপাত্রী আছে; এর মধ্যে রয়েছে অনেক কাহিনী শাখা-প্রশাখায় বিস্তৃত। হিংসা বিদ্বেষজর্জরিত মানুষের কামনা, বাসনা, প্রভুত্বের নিষ্ঠুরতা, রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, আর এসব ঘটেছিল একটি নারীকে কেন্দ্র করে। ঠিক এমন ঘটনা গ্রিক সাহিত্যের ইলিয়াড মহাকাব্যে ঘটেছিল।

বিষাদ-সিন্ধুর অধিকাংশ ঘটনাই জয়নাবকে কেন্দ্র করে। এজিদ ও ইমাম হাসান-হোসেনের সংঘর্ষের মূল কারণ জয়নাব। জয়নাব সতীসাধ্বী স্ত্রী। প্রথম স্বামী কর্তৃক পরিত্যক্ত হয়ে দ্বিতীয়বার পরিণীতা হন ইমাম হাসানের সঙ্গে। ভাগ্যের পরিহাসে ইমাম হাসানের মৃত্যুর পর সে এজিদের কারাগারে বন্দিনী হন। কারাগারে বন্দিনী থাকাকালে তার মনে হতো কারবালার রক্তপাতের জন্য সেই যেন দায়ী। এজিদকে স্বামীত্বে বরণ করে নিলেই তো আর এসব ঘটনা ঘটত না। সাহিত্য সৃষ্টির দিক থেকে মাইকেলের মেঘনাদবধ কাব্যের সীতা-চরিত্রের সঙ্গে জয়নাবের তুলনা করা চলে।

বিষাদ-সিন্ধু পাঠ্যপুস্তক হিসেবেই প্রথমে জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং গ্রামে গ্রামে পঠিত হতে থাকে। পরবর্তীতে বিষাদ-সিন্ধুর এই জনপ্রিয়তার সূত্র ধরে বাংলাদেশের জারিগানের আসরে প্রথমত প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠানের প্রশ্নোত্তর পর্বে আত্তীকৃত হয়, পরবর্তীতে জারিগানের গীত-নৃত্যমূলক পরিবেশনায় বিষাদ-সিন্ধুর পদ্যগীতে রূপান্তরিত হয়ে পরিবেশিত হতে থাকে। আধুনিক বাংলা ভাষার গদ্যরীতিতে রচিত মীর মশাররফ হোসেনের লিখিত সাহিত্য বিষাদ-সিন্ধুর পুরো পাঠটিই বাংলাদেশের নেত্রকোণা অঞ্চলে প্রচলিত জারিগানের আদলে আত্তীকৃত হয়েছে।

বিষাদ-সিন্ধু ও জারিগানের তুলনামূলক পাঠের ভেতর দিয়ে পাঠক-গবেষক স্পষ্টভাবে প্রত্যক্ষ করতে পারবেন, আধুনিক বাংলা ভাষার লিখিত সাহিত্য বিষাদ-সিন্ধু কীভাবে গ্রামের স্বল্পশিক্ষিত ‘বয়াতি’, ‘জারিয়াল’ বা ‘খেলোয়াড়’  কর্তৃক জারিগানের আসরে আত্তীকৃত হয়ে কতটা প্রাণবন্তভাবেই না গ্রামীণ আসরে পরিবেশিত হয়ে থাকে। উপস্থাপিত পাঠের ভেতর দিয়ে মূলত নৃত্য-গীত আশ্রিত জারিপালার আত্তীকৃত পাঠকে প্রত্যক্ষ করা যাবে। কিন্তু মনে রাখা দরকার যে, জারিগানের আসরে লিখিত সাহিত্য বিষাদ-সিন্ধু আত্তীকৃত হবার ইতিহাস হতে জানা যায় সাধারণত দুইভাবে আত্তীকৃত হয়ে বিষাদ-সিন্ধুর আখ্যান গ্রামীণ আসরে পরিবেশিত হয়ে আসছে। ক্ষেত্রসমীক্ষণে জারিগানের বয়াতিদের ভাষ্যমতে, জারিগানের আসরে বিষাদ-সিন্ধু প্রথমবারের মতো আত্তীকৃত হয়েছিল মূলত প্রতিযোগিতামূলক আসরে প্রশ্নোত্তরের একটি আকর্ষণীয় তথ্যনির্ভর উপাদান হিসেবে, দ্বিতীয়ত প্রতিযোগিতামূলক জারিগানের আসর হতেই পর্যায়ক্রমে বিষাদ-সিন্ধু গীত-নৃত্য আশ্রিত জারিপালায় প্রবেশ করে বয়াতিদের মুখে মুখে সৃজিত ছন্দের গাঁথুনিতে রূপান্তরিত হয়ে। দ্বিতীয় পর্যায়ে বিষাদ-সিন্ধুর গদ্যরীতি জারিগানের সৃজনশীল বয়াতিদের দ্বারা ছন্দবদ্ধ গীতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে মূলত ‘ক্ষুদ্র পয়ার’ বা ‘দীর্ঘ পয়ার’ ছন্দগীত প্রযুক্ত হলেও তাতে বৈচিত্র্য প্রদান করে পালার পয়ারের পূর্বে এবং মধ্যে মধ্যে গীত দোহারদের দিশা-দোহার বা ধূয়া এবং ডাক। দিশা-দোহার বা ধূয়াতে বিচিত্র ছন্দের প্রয়োগ লক্ষ করা যায়। মূলত দোহার-দিশাতেই বিচিত্র ছন্দ প্রয়োগ করা হয়, পালার পয়ারের প্রচলিত কাঠামোর ওপরে সাধারণত ত্রিপদী, চৌপদী ইত্যাদি ছন্দের আবরণ দিয়েই জারিগানে বৈচিত্র্য সৃজন করা হয়। জারিগানের আসরের নৃত্য-গীতের মধ্যে বৈচিত্র্য সৃজন করে দোহার-খোলোয়াড়দের মুখে উচ্চারিত আরেকটি উপাদান তা হলো ‘ডাক’।

বিষাদ-সিন্ধু কেন্দ্রিক নৃত্য-গীত আশ্রিত জারিগানের আসরে লিখিত সাহিত্য এ উপন্যাসে নির্ধারিত প্রবাহ হতে কখনো মূলপাঠ আবার কখনো মূলপাঠের কথার কাট-ছাট উপস্থাপন করে তার আগে ও পরে ছন্দগীত আকারে জারিপালা পরিবেশন করে থাকেন। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে কারবালাবিষয়ক কাব্য রচনায় কবি হায়াত মামুদ, ফকির গরীবুল্লাহ এবং সৈয়দ হামজা সর্বাপেক্ষা কৃতিত্বের পরিচয় দেন। মীর মশাররফ হোসেনের কাহিনীতে কবি হায়াত মামুদ ও ফকির গরীবুল্লাহ’র কাহিনীর সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। পূর্বসূরী ফকির গরীবুল্লাহ’র রচনা থেকে উপকরণ নিলেও বিষাদ-সিন্ধু গ্রন্থের কাহিনী-নির্বাচন, নির্মাণ ও চরিত্র সৃষ্টি মীর মশাররফের একান্ত নিজস্ব।  [সাইমন জাকারিয়া]