বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদ


বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদ ব্রিটিশ রাজের অবসানের লক্ষ্যে বিশ শতকের প্রথম তিন দশক ব্যাপী প্রধানত হিন্দু ভদ্রলোক কর্তৃক পরিচালিত সহিংস রাজনৈতিক কর্মকান্ড। সম্মুখ সমরে বৃটিশ রাজের বিরুদ্ধে লড়াই করে স্বাধীনতা অর্জন অসম্ভব বিবেচনা করে মুক্তি সংগ্রামের ফলপ্রসূ কৌশল নিয়ে  ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এর মধ্যমপন্থী ও চরমপন্থীদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। যার ফলে কংগ্রেসের উগ্র সেকশন জাতীয় মুক্তির জন্য সন্ত্রাশবাদের কৌশল বেছে নেয়। আধুনিক terrorism বা সন্ত্রাসবাদ শব্দটির প্রথম ব্যবহার দেখা যায় ফরাসী বিপ্লবের এক পর্যায়ে, যখন রাষ্ট্র পক্ষ Reign of Terror অভিধাটি ব্যবহার করে। উনিশ শতকের শেষ অব্দি আইরিশদের সহ অনেক মুক্তিকামী জাতি কৌশল হিসেবে  terrorism বা সন্ত্রাসবাদ-এর আশ্রয় গ্রহন করে। ওই ভাবাদর্শে প্রভাবিত হয়েই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়স্বামী বিবেকানন্দঅরবিন্দ ঘোষ যুব সম্প্রদায়কে মুক্তির বাণী প্রচার করেন। তাঁদের দর্শন ও চিন্তাধারার মধ্যেই বিপ্লবী ধারণাসমূহ এবং বিপ্লবীদের পরিজ্ঞাত ও তাঁদের দ্বারা ব্যবহূত শব্দাবলি গ্রন্থিত ছিল। তাঁদের চিন্তাধারা এ যুবাদের বল প্রয়োগের মাধ্যমে ভারত থেকে উপনিবেশিক শাসকদের তাড়িয়ে দিতে সুদূর অতীত থেকে শক্তি আহরণ করতে প্রণোদিত করে। অংশগ্রহণকারী যুবাগণ শক্তির পূজা ও এর সহযোগী ধর্মরাজ্য সংস্থাপনের পূজায় উৎসর্গীকৃত ছিল। তারা দৈত্যদের অর্থাৎ বিদেশী শাসকদের বধ করতে এবং সনাতন ব্রাহ্মণ্য পবিত্রতার ওপর ভিত্তি করে হিন্দু সভ্যতার উপযোগী রাজ্যসৃষ্টির শপথ গ্রহণ করে।

সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীরা প্রধান দুটি দলে সংগঠিত ছিল - কলকাতায়  যুগান্তর ও ঢাকায়  অনুশীলন সমিতি। তাদের কার্যাবলি অত্যন্ত গোপনে পরিচালিত হতো। তাদের কার্যকলাপের গোপনীয়তা বজায় রাখতে বিশেষ সঙ্কেতলিপি অবলম্বন করা হতো। যাদেরকে নতুন বিপ্লবী হিসেবে দীক্ষা দেওয়া হতো তারা শপথগ্রহণ করে এই ব্রতে আবদ্ধ হতো যে, তারা এমনকি তাদের মাতাপিতাসহ অন্য কারও নিকট তাদের কৌশল ও কর্ম-পরিকল্পনা ফাঁস করবে না। এর ফলস্বরূপ অনেক মাতাপিতাও কখনও জানতেন না যে, স্কুলে অথবা কলেজে অধ্যয়নরত তাদের সন্তানেরা প্রকৃতপক্ষে বিপ্লবী কোন দলের সদস্য কি না।

বিপ্লবী সন্ত্রাসের দুটি স্বতন্ত্র পর্ব ছিল। ১৯০৫ থেকে ১৯১৮ সাল ব্যাপী প্রথম পর্বে সক্রিয় অংশগ্রহণকারিগণ গীতায় বর্ণিত কল্পিত ধর্মরাজ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠায় অধিক আগ্রহ দেখিয়েছে। এ সময়ব্যাপী কমপক্ষে ২১০টির মতো সহিংস ঘটনা সংঘটিত হয়, যাতে ৭০ জন পুলিশ ও অভীষ্ট ব্যক্তি এবং ২৪ জন বিপ্লবী নিহত হয়। ওই একই সময়ব্যাপী ভারতীয় দন্ডবিধি এবং অস্ত্র ও বিস্ফোরক পদার্থ আইনের আওতায় ২০৫ ব্যক্তিকে অপরাধী বলে সাব্যস্ত করে সাজা দেওয়া হয়। দন্ডিত অপরাধীদের এক বৃহৎ অংশকে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের দন্ডকার্যে ব্যবহূত উপনিবেশ বঙ্গোপসাগরের আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে নির্বাসন দেওয়া হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন পরিস্থিতিতে বিপ্লবীদের বিষয়টি সরকারকে বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন করে তোলে। তাদের কার্যাবলির বিস্তার রোধ করার প্রচেষ্টা হিসেবে ১৯১৫ থেকে ১৯১৮ সালের মধ্যবর্তী সময়ে ১২৬২ ব্যক্তিকে হাজতে আটক করা হয়। তাদের অধিকাংশই ছিল হয় অনুশীলন অথবা যুগান্তর বাহিনীর।

কড়া প্রতিরোধক ব্যবস্থা গ্রহণ ও সতর্ক প্রহরার ফলে ১৯১৯ সাল নাগাদ বিপ্লবী কার্যাবলি সাময়িকভাবে নিবৃত্ত হয়। ১৯১৯ সালে মাত্র একটি সহিংস ঘটনা ঘটে এবং ১৯২০ ও ১৯২১ সালে একটিও সহিংস ঘটনা ঘটে নি। কিছুটা উদারপন্থী রাজনৈতিক অবস্থা বিরাজ করার মাধ্যমে সন্দেহমুক্ত এবং শাসনতান্ত্রিক সংস্কারের পক্ষে ভারতীয় জনমতকে নমনীয় করার ধারণা দ্বারা প্রত্যয়দীপ্ত হয়ে ভারত প্রতিরক্ষা আইনের আওতায় যে রাজনৈতিক অংশগ্রহণকারীদের হাজতে আটক করা হয়েছিল, তাদের সকলকে রাজকীয় ক্ষমার অধীনে সরকার মুক্তি দেয়। এ রাজক্ষমা আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে নির্বাসিত কট্রর বিপ্লবীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য ছিল।

হাজতে আটক অবস্থা থেকে মুক্তি পেয়ে বিপ্লবীদের অনেকেই সহিংসতার পথ পরিত্যাগ করে এবং কংগ্রেসের উদারপন্থী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে যোগদান করে। তাদের কিছুসংখ্যক নেতা কংগ্রেস দলে দায়িত্বশীল পদ লাভ করে। অনেকে সদ্য প্রতিষ্ঠিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করে। আবার অনেকে সুভাষচন্দ্র বসুর ন্যাশনাল ভলান্টিয়ার কোর-এ যোগ দেয়। কিন্তু বিপুল হারে সন্ত্রাসী পথ পরিত্যাগ করা সত্ত্বেও সবচেয়ে কট্টর বিপ্লবিগণ যুগান্তর দলের নতুন নেতৃত্বাধীনে পুনরায় সংগঠিত হতে শুরু করে। যুগান্তর ও অনুশীলন উপদল দুটি অনুশীলনের নরেন্দ্রমোহন সেন ও যুগান্তর দলের যদুগোপাল মুখার্জীর যৌথ নেতৃত্বাধীনে সংযুক্ত হয়।

অনুশীলন-যুগান্তর একত্রীকরণ প্রচেষ্টা অবশ্য বিপ্লবী আন্দোলনের পুরাতন উদ্দীপনা পুনরায় সক্রিয় করতে ব্যর্থ হয়। বয়োজ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দের সম্পাদিত কার্য ও কৌশল দ্বারা চরমভাবে নিরাশ হয়ে যুবা বিপ্লবিগণ নতুন করে আক্রমণাত্মক কার্যাবলি চালু করার মানসে সকল উপদল নিয়ে একটি ফেডারেশন গঠন করে। এ ফেডারেশনের নেতৃত্ব দেন বরিশাল অনুশীলনের নেতা নিরঞ্জন সেনগুপ্ত, ঢাকা অনুশীলনের সতীশচন্দ্র পাকড়াশি, দক্ষিণ কলকাতা অনুশীলনের যতীন দাস এবং চট্টগ্রাম যুগান্তর দলের সূর্যসেন ও গণেশ ঘোষ। এ নতুন মিত্রসঙ্ঘকে নব্য সহিংস দল  হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। এ দল ১৯২৯ সালে একই সময়ে সকল সরকারি প্রতিষ্ঠানে আঘাত হানার কার্যক্রম গ্রহণ করে।

১৯২৯ থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ ও ব্যক্তিবর্গের ওপর ধারাবাহিক আক্রমণ পরিচালিত হয়। এগুলির মধ্যে সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ছিল ১৯৩০ সালে সূর্যসেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগারে আকস্মিক আক্রমণ। ১৯৩২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলার গভর্নর স্যার স্ট্যানলি জ্যাকসনের ওপরও আক্রমণ হয়। ১৯৩৪ সালে গভর্নর স্যার জন অ্যান্ডারসনের ওপর আরেকটি সশস্ত্র আক্রমণ ঘটে এবং প্রকৃতপক্ষে সেটাই ছিল শেষ বড় রকমের দুঃসাহসিক বিপ্লবী অভিযান।

১৯৩৫ সালের জনপ্রতিধিত্বমূলক ভারত শাসন আইন কার্যকর করার ফলে অধিকতর সহনশীল জাতীয়তাবাদী রাজনীতি শুরু হয়। ব্রিটিশদের ভারত ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত এবং মুসলমানদের পৃথক হওয়ার আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ সন্ত্রাসবাদী বৈপ্লবিক রাজনীতিকে বলতে গেলে অচল করে দেয়। যুব সমাজ যে রাজনৈতিক পরিবেশে বিপ্লবী কর্মকান্ড গড়ে তোলেছিল তা সম্পূর্ণরূপে বদলে দেয় ১৯৩৫ পরবর্তী রাজনীতি। তদোপরি উম্মেষ ঘটে মুসলিম জাতীয়তাবাদী রাজনীতি। এভাবে ১৯৩৬ সালের মধ্যে বিপ্লবী সন্ত্রাসের পরিসমাপ্তি ঘটে।  [সিরাজুল ইসলাম]