বিজ্ঞাপন


বিজ্ঞাপন  বিভিন্ন প্রচার মাধ্যম ব্যবহার করে পণ্য ও সেবা কিংবা নতুন ধারণা সম্পর্কে ভোক্তা বা ব্যবহারকারী সকলকে জানানোর একটি ব্যবস্থা। এটি শুধু জানানোতেই সীমাবদ্ধ থাকে না, সম্ভাব্য ক্রেতা বা ব্যবহারকারীদের কাছে এসবকে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করে, সেগুলি ক্রয়ে উদ্বুদ্ধ, এমনকি কখনও কখনও প্ররোচিতও করে। আর এই কাজটি করে থাকে বিক্রেতা তথা উৎপাদনকারী নিজে, তার প্রতিনিধি কিংবা বিপণনে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি। যে মাধ্যমেই বিজ্ঞাপন প্রচারিত হোক, এর জন্য বিজ্ঞাপনদাতাকে ব্যয় বহন করতে হয়। বিজ্ঞাপনের ধরন নির্বাচন, তার জন্য কথা বা ছবি সাজানো এবং তার উপস্থাপনা, প্রকাশনা, প্রচারণা ইত্যাদি অতীতে ব্যক্তিগতভাবে বা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের নিজ স্থাপনা ও জনবলের সাহায্যে সম্পাদিত হলেও এখন এসব একটি সুসংগঠিত পেশার কাজ এবং এসবের জন্য আছে ছোটবড় বিভিন্ন বিশেষায়িত বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠান।

বাংলাদেশে বিজ্ঞাপনের অস্তিত্ব প্রাচীন হলেও অল্পদিন আগেও এর প্রসার ছিল সীমিত। স্বাধীনতার পূর্বে বিজ্ঞাপন শিল্প বলতে তেমন কিছু ছিল না। শিল্প কারখানার ব্যাপক বিকাশ না ঘটায় বিজ্ঞাপনের প্রয়োজনীয়তাও তেমন প্রকট ছিল না। ১৯৬৭ সালে ঢাকায় বিটপী, ইস্ট এশিয়াটিক ও ইন্টারস্প্যান নামে তিনটি বিজ্ঞাপনী ফার্ম প্রতিষ্ঠা লাভ করে। লিভার ব্রাদার্স এবং সমস্থানীয় খুবই সীমিতসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের পণ্য বিপণনের বিজ্ঞাপনই ছিল এদের প্রধান ব্যবসা। এ পরিপ্রেক্ষিতে বলা হয়, বাংলাদেশে বিজ্ঞাপন শিল্পের বিকাশ বলতে যা-কিছু তার সবই ঘটে ১৯৭১-এর দেশ স্বাধীন হবার পরবর্তী সময়কালে। বর্তমানে বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেয় এমন নিবন্ধিত বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৫০ এবং অনুমান করা হয় যে সংগঠিত ও অসংগঠিত উভয় খাত মিলে দেশে মোট বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠান আছে প্রায় ৫০০। তবে প্রচারিত বিজ্ঞাপনের ৭০% ভাগই যায় বড় বড় বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এবং বাজারে আধিপত্যের ক্রম-অনুযায়ী সাজালে হাতে গোণা এসব বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আছে অ্যাডকম, এশিয়াটিক, বিটপী, ইউনিট্রেন্ড, গ্রে, ইন্টারস্পিড, পপুলার, ম্যাডোনা এবং মাত্রা। ১৩% ভাগ বিজ্ঞাপনের প্রচার হয় অন্যান্য বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আর বিজ্ঞাপনের বাকি অংশ (১৭%) প্রচার করে উৎপাদনকারী/বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান নিজে, তাদের নিজস্ব বিপণন শাখার সাহায্যে।বাংলাদেশে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমগুলিকে সীমানা অনির্ধারিত এবং সীমানা নির্ধারিত এই দুই শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। প্রথমোক্ত শ্রেণিতে পড়ে পত্র-পত্রিকা, সাময়িকী, বেতার ও টেলিভিশনের মাধ্যমে দেয়া বিজ্ঞাপন এবং দ্বিতীয় শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে সেইসব বিজ্ঞাপন যেগুলি কোম্পানি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিজস্ব ব্যবস্থাপনা বা বিপণন শাখার মাধ্যমে বিলবোর্ডে ছবি বা লেখা এবং আলোকসজ্জিত প্রচারমূলক শব্দমালা বা প্রতিচ্ছবি, যাত্রা ও পথনাটক ইত্যাদি কিংবা গাড়ির বডিতে বা বেলুনের গায়ে অাঁকা ছবি ইত্যাদি দ্বারা প্রচারের ব্যবস্থা করে। ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশে বিজ্ঞাপন ব্যবসায়ের মোট পরিমাণ ছিল প্রায় ২০০ কোটি টাকা। বিজ্ঞাপন খরচের হার কত হবে তা নির্ভর করে বিজ্ঞাপন মাধ্যমের ধরন এবং তাতে ব্যবহূত জায়গা বা সময়ের পরিমাণের ওপর। পিক সময়ে (সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত) বাংলাদেশ টেলিভিশনে ৩০ সেকেন্ডের একটি বিজ্ঞাপন প্রচারের চার্জ হচ্ছে ৯,৪৫০ টাকা। তবে এই সময়ের মধ্যে শুধু একটি নির্ধারিত সময়েই প্রচার করাতে চাইলে ৫০% বেশি চার্জ দিতে হয়। সংবাদ প্রচারের ঠিক আগে বা অব্যবহিত পরে প্রচারের ক্ষেত্রে চার্জের পরিমাণ ৭০% বাড়ে এবং তা ১০০% হয় যদি বিজ্ঞাপন প্রদর্শিত হয় সংবাদ বা ছায়াছবি প্রচারের মাঝখানের বিরতিতে। সন্ধ্যা ৭টার আগে বিজ্ঞাপন প্রচারের চার্জ নিয়মিত চার্জের প্রায় অর্ধেক। কোন প্রতিষ্ঠান টেলিভিশনের কোন অনুষ্ঠান প্রযোজনার মাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচারের সুযোগ পেতে পারে। সেক্ষেত্রে সন্ধ্যা ৭টার আগে প্রচারের একটি অনুষ্ঠানে সর্বমোট ১৮০ সেকেন্ড বিজ্ঞাপন প্রচারের অধিকার পেতে এমন অনুষ্ঠানের ৬০ মিনিটের একটি এপিসোড প্রযোজনায় ফি দিতে হয় আশি হাজার টাকা আর একই রকম শর্তে পিক সময়ে প্রচারের জন্য ফি দিতে হয় এক লক্ষ টাকা। বাংলাদেশ টেলিভিশন বই এবং বিজ্ঞাপনবিহীন সাময়িকীর বিজ্ঞাপন প্রচারের ক্ষেত্রে নির্ধারিত চার্জের ওপর ২৫% ছাড় দেয়। তবে এই ছাড়-সুবিধা ভর্তি বা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের জন্য ছাপা গাইড বই-এর জন্য প্রযোজ্য নয়। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানও এই ছাড়-সুবিধা পায় না। দেশের বাইরে প্রস্ত্তত পণ্যসামগ্রীর বিজ্ঞাপন প্রচারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ টেলিভিশন নিয়মিত হারের ওপর ৬০% অতিরিক্ত চার্জ আদায় করে। বাংলাদেশ বেতারের বিজ্ঞাপন হার টেলিভিশনের তুলনায় অনেক কম। বেতারে ১৫ সেকেন্ডের একটি বিজ্ঞাপন ১ থেকে ৫১ বার পর্যন্ত প্রচারের ক্ষেত্রে চার্জ হচ্ছে প্রতিবার প্রচারের জন্য ৬০০ টাকা। বাংলাদেশ বেতার একটি ক্রিকেট ম্যাচ প্রচারের স্বত্ব বিক্রয় করে ৪৫,০০০ টাকায় এবং ফুটবল ম্যাচের জন্য নেয় ৩,০০০ টাকা। দেশে প্রচারিত পত্রিকাসমূহ বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য যে চার্জ নেয় তার হার ভিতরের পৃষ্ঠাসমূহের জন্য কলাম ইঞ্চিপ্রতি ৪০০ থেকে ৮০০ টাকা এবং প্রথম ও শেষ পৃষ্ঠার জন্য এর থেকে প্রায় তিন গুণ। বাংলাদেশে অদ্যাবধি বিজ্ঞাপন শিল্পের যে প্রবৃদ্ধি ঘটেছে তার সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির একটি সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমানে প্রায় সকল ধরনের বিজ্ঞাপন প্রতিষ্ঠানই প্রচুর প্রতিযোগিতার সম্মুখীন। বিজ্ঞাপন প্রতিষ্ঠানগুলি যাদের কার্যাদেশ নিয়ে ব্যবসা চালায় সেগুলির মধ্যে আছে বেসরকারি খাতের দেশীয় কোম্পানি, বহুজাতিক কোম্পানি এবং বিভিন্ন এনজিও। তবে বিজ্ঞাপন ব্যবসার ৬০% ভাগই আসে বহুজাতিক কোম্পানি থেকে আর ২৫% ভাগের উৎস হচ্ছে দেশীয় বেসরকারি কোম্পানি। বাজারে যেসব পণ্য যতবেশি প্রতিযোগিতার সম্মুখীন, সেগুলির জন্য বিজ্ঞাপনও ততবেশি প্রয়োজন। আর বিজ্ঞাপন বাজেটের বেশির ভাগই যায় ভোগ্যপণ্যাদির প্রচারে। সাধারণত স্থানীয় বাজারে যেসব খাতের পণ্য ও সেবার চাহিদা বেশি সেগুলিই বিজ্ঞাপনে বেশি ব্যয় করে থাকে। রপ্তানিমুখী শিল্পসমূহও বিজ্ঞাপনে অভ্যস্ত হতে শুরু করেছে এবং তাদের এ কাজের সূচনা হয়েছে মূলত প্রচারমূলক পুস্তিকার মাধ্যমে। সরকার বিজ্ঞাপন ব্যবসায়ের আইনগত দিক নিয়ন্ত্রণের জন্য সকল ধরনের বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনদাতা ও বিজ্ঞাপন প্রচার সংস্থার মধ্যে চুক্তি সম্পাদনের বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে। এই চুক্তির সাধারণ শর্তাবলি মুদ্রণ, প্রকাশনা  ও গণযোগাযোগ সংক্রান্ত আইন-কানুনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। তথ্য মন্ত্রণালয়ই মূলত প্রধান নিয়ন্ত্রক এবং কোন নির্দিষ্ট মাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচারের ক্ষেত্রে শর্তাবলিতে পরিবর্তন আনতে হলে এই মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রয়োজন। আবার ওষুধপত্র বা ধূমপান সামগ্রীর বিজ্ঞাপনের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি লাগে। এছাড়া সরকার বিজ্ঞাপনী সংস্থাসমূহ এবং প্রচার মাধ্যমের জন্য একটি সদাচরণ নীতিমালা প্রণয়ন করেছে, যা আইনের মর্যাদা না পেলেও সাধারণভাবে মেনে চলা বাঞ্ছনীয়। এই নীতিমালায় মদ, সিগারেট, শিশুদের জন্য শিল্পজাত খাদ্য, মহিলা ও পুরুষদের অন্তর্বাস এবং বড়ি ব্যতীত অন্যান্য জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর বিজ্ঞাপন প্রচার থেকে বিরত থাকতে বলা হয়। একই সঙ্গে তা প্রচার মাধ্যমসমূহকে সামাজিক নিয়মাচার ও নৈতিক মূল্যবোধ রক্ষা করে চলতে বলে, ধর্ম, ব্যক্তি বা সংস্থার প্রতি প্রত্যক্ষ আক্রমণ থেকে বিরত থাকতে বলে, রুচিবিবর্জিত সকল বিষয় পরিহার করতে বলে এবং কোন ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যাতে বিজ্ঞাপনে ব্যবহূত না হয় সেদিকে সতর্ক থাকতে বলে।  [সৈয়দ ফরহাত আনোয়ার]