বাহারি উদ্ভিদ


Mukbil (আলোচনা | অবদান) কর্তৃক ১১:০৭, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ পর্যন্ত সংস্করণে

(পরিবর্তন) ←পুর্বের সংস্করণ | সর্বশেষ সংস্করণ (পরিবর্তন) | পরবর্তী সংস্করণ→ (পরিবর্তন)

বাহারি উদ্ভিদ (Ornamental plants) শুধুই সৌন্দর্যের জন্য জন্মানো গাছগালা, তবে কোন কোন প্রজাতির ব্যবহারিক উপযোগিতাও থাকে, যদিও এক্ষেত্রে তা বিচার্য নয়। এতে ফার্ন, নগ্নবীজী ও গুপ্তবীজীর মতো উচ্চস্তরের উদ্ভিদসমূহ রয়েছে। বাগান, গৃহকোণ ও রাস্তার পাশে সাধারণভাবে জন্মানো অধিকাংশই গুপ্তবীজী, অবশ্য অল্পসংখ্যক নগ্নবীজী উদ্ভিদ আর ফার্নও রয়েছে। নিচে বাংলাদেশের বাহারি উদ্ভিদের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা উল্লেখ করা হলো।

বাগান ও বসতবাড়ির আঙিনায় জন্মানো উল্লেখযোগ্য বাহারি উদ্ভিদসমূহ হচ্ছে-  শাপলা, বাংলাদেশের জাতীয় ফুল (Water lily, Nymphaea pubescens); পাতাবাহার (Croton variegatum); কলিয়াস (Coleus blumei); অ্যাকালাইফা (Acalypha wilkesiana); জেব্রিনা (Zebrina pendula); পার্পুল হার্ট (Setcreasea purparea); মনোস্টেরা (Monstera deliciosa); ক্যালাডিয়াম (Caladium hortulanum); ক্যাবেজ পাম (Cordyline terminalis); মুর্বা (Sansevieria trifascita); মেইডেন হেয়ার ফার্ন (Adiantum capillus); ব্লিডিং হার্ট (Clerodendrum thomosonae); রঙ্গন (Ixora coccinea); পেন্টাস (Pentas lanceolat); রক্তজবা (Hibiscus rosa-sinensis); স্পাইডার প্লান্ট (Chlorophytum comosum ‘variegatum’); ঘৃতকুমারী (Aloe vera); লালপাতা (Euphorbia pulcherrima); হিমসাগর (Kalachoe pinnnata); ড্রাসিনা (Dracena marginata); পিস-লিলি (Spathiphyllum wallisii); মানি প্লান্ট (Rhahidophora aurea); হার্ট-লিফ (Scindapsus aureus); ক্রিস্টাল অ্যানথুরিয়াম (Anthurium cystallinum); ফ্লামিংগো লিলি (Anthurium andreanum); সন্ধ্যামণি/কৃষ্ণকলি (Mirabilis jalapa); ক্রসান্ড্রা (Crossandra undulaefolia); শ্রিমপ প্ল্যান্ট (Beloperone guttata); সিলভার কিং (Aglaonema commutatum); গুজামিয়া (Guzamania lingulata); বার্ড অব প্যারাডাইস (Strelitzia neginae); হ্যাংগিং লবস্টার ক্লো (Heliconia rostrata); গন্ধরাজ (Gardenia jasminoides); অ্যালমুনিয়াম প্লান্ট (Pilea cadierei); অ্যালোকেসিয়া (Alocasia lowii); পিলিওনিয়া (Pellionia pulchra); বার্ডস নেস্ট ফার্ন (Asplenium nidus); স্পাইডার লিলি (Hymenocalis narcissiflora); বাগানবিলাস (Bouganvillea glabra, B. speetabilis); মাধবীলতা (Quisqualis indica); য়ুক্কা (Yucca gloriosa); রাস্না (Vanda tessellata); রিফোঁস্টাইলিস (Rhynchostylis retusa)।

পথবৃক্ষ হিসেবে জন্মানো উল্লেখযোগ্য বাহারি উদ্ভিদসমূহ হচ্ছে- কলকে (Thevetia peruviana); গোলসাগু/চাউর (Caryota urens); রয়েল পাম (Roystonia regia); বিলাতি ঝাউ (Casuarina equisetifolia); বট (Ficus religiosa); স্বর্ণচাঁপা (Michelia champaca); পলাশ (Butea monosperma); সোঁদাল/বান্দরলাঠি (Cassia fistula); কৃষ্ণচূড়া (Delonix regia); অশোক (Saraca asoca); রক্তকাঞ্চন (Bauhinia purpurea); রেইনট্রি  (Samanea saman); শিরীষ (Albizia lebbek); নিম (Melia azadirachta); শিমুল (Bombax ceiba); কাঠবাদাম (Terminalia catappa); কদম (Anthocephalus chinensis); ছাতিম (Alstonia scholaris); নাগেশ্বর (Masua nagassarium); দেবদারু (Polyalthia longifolia); ইউক্যালিপ্টাস (Eucalyptus citriodora); হিজল (Barringtonia acutangula)। [জিয়া উদ্দিন আহমেদ]

বাহারি উদ্ভিদের ক্ষতিকর প্রাণী (Pests of ornamental plants) সাজ-সজ্জার জন্য জন্মানো গাছগাছালি আক্রমণকারী কীটপতঙ্গ, পোকামাকড় ও নিমাটোডের মতো বিভিন্ন জীব। বাংলাদেশে মৌসুমি বর্ষজীবী বা বহুবর্ষজীবী বীরুৎ, গুল্ম ও বৃক্ষজাতীয় বেশ কিছু বাহারি উদ্ভিদ জন্মে। অতীতে এদেশে কেবল নান্দনিক গুরুত্বের জন্য বাহারি উদ্ভিদের সমাদর ছিল। সম্প্রতি অনেক বাহারি উদ্ভিদ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব অর্জন করেছে। বহু কীটপতঙ্গ ও পোকামাকড় বাহারি উদ্ভিদের কন্দ, মূল, কান্ড, পাতা, ডালপালা, কুঁড়ি, ফুল, ফল ও বীজে আক্রমণের মাধ্যমে ব্যাপক ক্ষতি করে। বাহারি উদ্ভিদের বহুমুখী গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও এসব উদ্ভিদের গুণমানের উন্নয়নে বাংলাদেশের ধারাবাহিক গবেষণার কোন উদ্যোগ নেওয়া হয় নি। ফলে বাহারি উদ্ভিদের ক্ষতিকর কীটপতঙ্গের তালিকা বা এ ধরনের কোন মৌলিক তথ্য পাওয়া যায় না। তা সত্ত্বেও প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশের কিছু বাহারি উদ্ভিদের ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ ও পোকামাকড়ের একটি বিবরণ উপস্থাপিত হলো।

বাংলাদেশে বর্ষজীবী ও বহুবর্ষজীবী বাহারি ওষধি, লতা ও গুল্মজাতীয় উদ্ভিদের মধ্যে সাধারণত অ্যালামান্ডা,  বিগোনিয়া, কাঞ্চন, বাগানবিলাস, ক্যাকটাস, কার্নেশন, ঢেরি গাঁদা, পাতাবাহার, গন্ধরাজ, রঙ্গন, জুঁই, লিলি, ইত্যাদি অধিক জন্মাতে দেখা যায়। এগুলির মধ্যে নিচে আলোচিত মাত্র কয়েকটি উদ্ভিদ প্রজাতির ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ ও পোকামাকড় সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়।

বাংলাদেশে বারোটির অধিক কীটপতঙ্গ গোলাপ গাছ আক্রমণ করে। জাবপোকার দুটি প্রজাতি (Macrosiphum euphorbiae, M. rosae), রোজ থ্রিপস (Thrips fuscipennis) ও লাল মাকড়সা (Tetranychus urticae) পাতা, ফুলের কুঁড়ি ও পাপড়ির রস চুষে খায় এবং ফুলকে বিকৃত করে। লেবুর সাদামাছি (Aleurocanthus spiniferus) ও এক ধরনের অাঁশপোকা (Icerya purchasi) গোলাপের পাতার রস চুষে খেয়ে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত করে। কতকগুলি Chaffer beetle (Adorectus bicolor, A. bicundatus, A. lasiopygus, Oxycetonia versicolor) পাতা ও ফুল খায়। Pandemis heparanaArchips oporana পোকার লার্ভা পাতা মোড়ায় এবং ভিতরে পাতা খায়। সম্প্রতি এক ধরনের সাদামাছি (Aleurodicus dispersus) কতকগুলি বাহারি উদ্ভিদ, বিশেষ করে মাধবী লতার (Quisqualis indica) একটি মারাত্মক ক্ষতিকর বালাই হিসেবে দেখা দিয়েছে। অপ্রাপ্ত ও প্রাপ্তবয়স্ক পতঙ্গ উভয় অবস্থাতেই এ ধরনের মাছি পাতার রস খেয়ে বিন্দু বিন্দু মধু জমায় যা ভুসো ছত্রাক জন্মাতে সাহায্য করে। এতে উদ্ভিদের সালোক সংশ্লেষণ প্রক্রিয়া বাধাপ্রাপ্ত হয়। আক্রান্ত পাতা ঝরে পড়ে এবং উদ্ভিদের বৃদ্ধি থেমে যায়। কতকগুলি মিলিবাগ প্রজাতি বাগানে বা গৃহকোণে (টবে) জন্মানো  বহুবর্ষজীবী বাহারি গুল্ম, বিশেষ করে পাতাবাহার (Codioeum species), রঙ্গন (Ixora species), গন্ধরাজ (Gardenia jasminoides), জবা (Hibiscus rosa-chinensis) ইত্যাদিকে আক্রমণ করে এবং গাছের পাতা বিনষ্ট করে।

বাংলাদেশে জন্মানো মৌসুমি গাছপালার মধ্যে সাধারণত এস্টার, মোরগফুল, দোপাটি, চন্দ্রমল্লিকা, কসমস, ডালিয়া, ডায়েন্থাস, ডেইজি, হলিহক, গাঁদা, ফ্লকস, পিটুনিয়া, পপি, রজনীগন্ধা ইত্যাদি অধিক দেখা যায়। এদের মধ্যে নিম্নোক্ত কয়েকটি উদ্ভিদের ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ ও পোকামাকড় সম্পর্কে তথ্য জানা গেছে।

জাবপোকা (Myzus persicae, M. euphobiae) স্ন্যাপড্রাগনকে (Antirrhinum species) আক্রমণ করে। অপূর্ণদেহ কীট ও প্রাপ্তবয়স্ক উভয় পর্যায়ের পতঙ্গ উদ্ভিদের কান্ড থেকে রস চুষে খায় এবং কান্ডবিকৃতি ঘটায়, ফলে উদ্ভিদের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। Tarnished plant bug (Lygus ragulipennis) ও জাবপোকা (M. euphobiae) অ্যাস্টর (Callistephus chinensis) আক্রমণ করে। অপূর্ণাঙ্গ ও প্রাপ্তবয়স্ক কীটপতঙ্গ উভয়েই পাতা, ডাল ও ফুলের কুঁড়ির রস খায়; ডগা দুমড়িয়ে ফেলে, ফুল বিকৃত ও উদ্ভিদের বৃদ্ধি প্রতিহত করে। ঢেঁড়স জাবপোকা (Aphis fabae) ডালিয়ার (Dahlia imperialis) কচিডগা ও পাতার রস চুষে নেয়। কতিপয় শুঁয়াপোকা Phlogophora meticulosa, Progonia partonalisNymphula responsalis ফুলে আক্রমণ করে। আলুর জাবপোকা (Myzus persicae) কার্নেশনের (Dianthus caryophyllus) ডগায় আক্রমণ করে। প্রাপ্তবয়স্ক উইভিল Otiorrhynchus sulcatus ক্যামেলিয়ার কচি ডাল ও কুঁড়ি, এবং O. singularis আজেলিয়ার ডগা ও পাতাকে আক্রমণ করে। এক ধরনের সাদামাছি (Aleydes azalae) আজেলিয়া গাছের পাতার রস চুষে খায় এবং বিন্দু বিন্দু মধু জমা করে, যার ফলে ভুসো ছত্রাকের আক্রমণ দেখা দেয়। চন্দ্রমল্লিকা জাবপোকা (Macrosiphoniella sanborni) গাছের পাতা ও ফুলের রস চুষে খায়। অপরদিকে Earwig (Forficula species) চন্দ্রমল্লিকা ফুলের পাপড়ি খেয়ে থাকে। ডেলফিনিয়াম মথের (Polychrisia moneta) লার্ভা ডেলফিনিয়াম গাছের পাতা, কুঁড়ি ও ফুল খেয়ে থাকে। গ্ল্যাডিওলাসের তিনটি ক্ষতিকর পতঙ্গের মধ্যে জাবপোকা (M. euphorbiae) ও Gladiolus thrips (Thrips simplex) উদ্ভিদের রস চুষে নেয় এবং P. meticulosa পতঙ্গের শুঁয়াপোকা ফুলের পাপড়ি খায়। লিলির (Crimum species) দুটি ক্ষতিকর পতঙ্গের মধ্যে লিলির জাবপোকা (Dysaphis tulipae) কন্দের রস চুষে খায় এবং লিলি-বিটল (Lilioceris species) পাতা খায়। Phlox-এর দুটি বালাইয়ের একটি হলো জাবপোকা (Myzus persicae) যা পাতার রস চুষে খায় এবং অন্যটি এ ধরনের নিমাটোড (Ditylenchus dipsaci) যা পাতা ও কান্ড খায়। জিনিয়া ফুলের দুটি বালাইয়ের একটি Tarnished plant bug (L . regulipennis) যা গাছের পাতা, ডাল ও ফুলের কুঁড়ির রস খায়, অন্যটি পাতার নিমাটোড (Aphelenchoids ritzema-bosi) যা পাতা খেয়ে দাগের সৃষ্টি করে।  [এম ইব্রাহিম আলী]

আরও দেখুন অর্কিড; পরাশ্রয়ী; ফার্ন; বনফুলবনফুল; বাগানের ফুল