বাবা আদম শহীদ


বাবা আদম শহীদ  সyুফ-সাধক। মুন্সিগঞ্জ জেলার রামপালের অদূরে বিক্রমপুরের একটি প্রাচীন মসজিদের আঙ্গিনায় তিনি সমাহিত। মসজিদে সংযুক্ত একটি আরবি শিলালিপিতে সুলতান জালালুদ্দীন ফতেহ শাহের (১৪৮১-১৪৮৭) কর্মচারি মালিক কাফুরকে এর নির্মাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। শিলালিপিতে বাবা আদম শহীদের বিষয়ে কোনো উল্লেখ নেই, কিংবা অপরাপর কোনো উৎসেও এ সুফি-সাধক সম্পর্কে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না।

স্থানীয় প্রচলিত কাহিনী মতে বাবা আদম শহীদ একজন ফকির বা সাধু পুরুষ রূপে মক্কায় বাস করছিলেন। সে সময়ে রামপালের নিকটবর্তী কানা-চং গ্রামের জনৈক মুসলমান স্থানীয় শাসক বল্লাল সেনের অত্যাচারের বিরুদ্ধে তাঁর হস্তক্ষেপ কামনা করেন। তাঁর পুত্রের জন্ম অনুষ্ঠান পালনের জন্য তিনি একটি গরু কোরবানী করেছিলেন। এ জন্য স্থানীয় হিন্দু রাজা তাকে নির্যাতন করেন। ফলে তিনি দেশ থেকে পালিয়ে মক্কায় চলে যান। সেখানে তিনি তার দুর্ভাগ্যের কাহিনী বাবা আদম শহীদের কাছে বর্ণনা করেন। স্বধর্মীর বেদনায় ব্যথিত হয়ে সyুফসাধক ছয় থেকে সাত হাজার অনুসারী নিয়ে তাকে সাহায্য করতে আসেন। রাজা মুসলমান অনুপ্রবেশকারীদের বহিষ্কারে সংকল্পবদ্ধ হন এবং তার সেনাবাহিনী নিয়ে অগ্রসর হন। সেনাবাহিনী মুসলমানদের সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে ব্যর্থ হওয়ায় রাজা নিজে যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হন। অবশেষে সুফিসাধক নিহত হন। কিন্তু অদৃষ্টের নির্মম পরিহাস যে, স্বয়ং রাজা এবং তার পরিবারবর্গ অগ্নিকুন্ডে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণ বিসর্জন দেন।

এ লোককাহিনীতে সত্যতা যাই থাকুক না কেন, এ কাহিনীই হচ্ছে বাবা আদম শহীদের ইতিহাস পুনর্গঠনের একমাত্র উৎস। তেরো শতকে বখতিয়ার খলজীর নেতৃত্বে তুর্কিদের বঙ্গ বিজয়ের অনেক আগেই আরব বণিকদের মাধ্যমে বাংলার সঙ্গে মুসলমানদের যোগাযোগ স্থাপিত হয়। কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে আরবদের যোগাযোগের ফলে রামপালের মতো প্রত্যন্ত স্থানে মুসলমান বসতি স্থাপিত হওয়া সন্দেহজনক। সম্ভবত মসজিদ নির্মাণের পূর্বেই এতদঞ্চলে এই সুফি সাধকের আগমন ঘটেছিল। সুফি সাধকের কবরকে কেন্দ্র করে যখন মুসলিম বসতি গড়ে ওঠে তখনই সম্ভবত মসজিদটি নির্মাণ করা হয়।

আনন্দ ভট্টের বল্লালচরিত নামক গ্রন্থে বল্লাল সেনের সঙ্গে বাবা আদমের যুদ্ধের কাহিনী পাওয়া যায়। এ গ্রন্থে বল্লালের শত্রুর নামকরণ করা হয়েছে ’বায়াদুম্ব’, যা স্পষ্টতই বাবা আদমের অপভ্রংশ। বাবা আদম এবং তাঁর অনুসারীদের ‘ম্লেচ্ছ’ বলে অভিহিত করা হয়েছে (এ সময়ে মুসলমানদের বুঝাতে হিন্দু লেখকগণ প্রায়শ ম্লেচ্ছ শব্দটি ব্যবহার করতেন)। বলা হয় যে, বাবা আদম পাঁচ হাজার সৈন্যের এক বাহিনী পরিচালনা করেন। রাজা এবং তার পরিবারের ভাগ্য কিংবদন্তিতে উল্লিখিত রূপেই বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু আনন্দ ভট্টের সময়কাল নির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। কাহিনীটি মূলগ্রন্থের একটি পরিশিষ্ট বিধায় কোনো কোনো আধুনিক পন্ডিত এর বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছেন।

এ ধারণায় কিছুটা সত্যতা রয়েছে যে, তখন সেখানে বল্লাল সেন নামে একজন প্রভাবশালী জমিদার ছিলেন। তিনি চোদ্দ শতকের শেষের দিকে বিক্রমপুরে প্রতিপত্তি লাভ করেন। তিনি ছিলেন বৈদ্য সম্প্রদায়ভুক্ত এবং বারো শতকে খ্যাতি অর্জনকারী বল্লালসেন (বাংলার সেন বংশের) থেকে ভিন্ন ব্যক্তি। বৈদ্য সম্প্রদায়ের এ বল্লালসেনের অনুরোধেই আনন্দ ভট্ট তার বল্লালচরিত গ্রন্থ রচনা করেন। এ দ্বিতীয় বল্লাল সেনের সময়ে বাংলায় হিন্দু রাজশক্তি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়েছিল।

একসময় পন্ডিতদের ধারণা ছিল যে, বাবা আদম শহীদ ছিলেন তুর্কি বিজয়ের পূর্বে বাংলায় আগত সুফিদের একজন। কিন্তু তুর্কি বিজয়ের পূর্বে কোনো সুফি বাংলায় এসেছিলেন এমন ধারণার সপক্ষে কোনো সঠিক প্রমাণ নেই। বাবা আদমের সময় চৌদ্দ শতকের শেষ দিকে নির্ধারণ করা যেতে পারে।  [আবদুল করিম]

গ্রন্থপঞ্জি  Journal of the Asiatic Society of Bengal, LVII, Calcutta, 1889; Muhammad Enamul Haq, A History of Sufism in Bengal, Dhaka, 1975; A Karim, Social History of the Muslims in Bengal, 2nd edition, Chittagong, 1985.