বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র


বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (বিপিএটিসি)  বাংলাদেশ সরকারের প্রধান প্রশাসনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। রাজধানী শহর ঢাকা থেকে ২৮ কিলোমিটার উত্তরে সাভারে অবস্থিত। এর প্রাথমিক দায়িত্ব জনসেবায় নিয়োজিত বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ প্রদান। সংস্থাপন মন্ত্রণালয় এর নিয়ন্ত্রক।

১৯৮৪ সালের ২৬ নং অর্ডিন্যান্সের আওতায় লোকপ্রশাসন ও ব্যবস্থাপনার জন্য প্রতিষ্ঠানটি একটি সমন্বিত জাতীয় স্বায়ত্তশাসিত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। সরকারের একজন সচিব এর প্রধান কর্মকর্তা। তাঁর পদবী রেক্টর। রেক্টরের অধীনে পাঁচটি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম-সচিব পর্যায়ে রয়েছে পাঁচজন পরিচালক। বিভাগগুলো হলো: ব্যবস্থাপনা ও লোকপ্রশাসন, কর্মসূচি প্রণয়ন ও পর্যবেক্ষণ, উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক বিষয়াদি, গবেষণা ও নির্দেশনা এবং প্রকল্প প্রণয়ন। একজন মন্ত্রীর সভাপতিত্বে ১২-সদস্য বিশিষ্ট বোর্ড অব গভর্নরস প্রতিষ্ঠানটির সাধারণ নীতিমালা নির্ধারণ করে।

জাতীয় পর্যায়ে লোকপ্রশাসনের ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নের জন্য সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয়  জ্ঞান ও কলাকৌশল শিক্ষাদানের মাধ্যমে তাঁদের উন্নয়ন সাধন করা এ প্রতিষ্ঠানের বিশেষ উদ্দেশ্য। সে লক্ষ্যে  প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে নবনিযুক্ত ক্যাডারদের মৌলিক প্রশিক্ষণ, মধ্যম স্তরের ও সিনিয়র সরকারি কর্মকর্তাদের চাকুরিকালীন প্রশিক্ষণ এবং পাবলিক করপোরেশন, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দানের জন্য কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এর কার্যক্রমের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো লোকপ্রশাসন, ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন বিষয়ে গবেষণা পরিচালনা, প্রশাসন ও উন্নয়ন বিষয়ক সমস্যা সমাধানে সরকারকে পরামর্শ দান, প্রশাসন ও উন্নয়ন বিষয়ক বই, সাময়িকী ও প্রতিবেদন প্রকাশ, গ্রন্থাগার ও পাঠকক্ষ প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা এবং অর্ডিন্যান্সে বর্ণিত অন্যান্য বিষয় বাস্তবায়ন করা। সরকার লোকপ্রশাসন বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও গবেষণা সম্পর্কিত অন্যান্য কাজ সম্পাদনের জন্যও বিপিএটিসি-কে নির্দেশ দিতে পারে।

ক্যাডার ও নন-ক্যাডারভুক্ত সকল সরকারি কর্মকর্তা  বিপিএটিসি-র প্রশিক্ষণের আওতাধীন। এদের মধ্যে রয়েছে উর্ধ্বতন নীতিনির্ধারক থেকে নবনিযুক্ত বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা। সম্প্রতি এনজিও কর্মকর্তারাও বিপিএটিসি-র কর্মসূচিতে যোগদানে উৎসাহ দেখাচ্ছেন। প্রতিবছর প্রশিক্ষণ কোর্স, কর্মশালা ও সেমিনার অনুষ্ঠানের জন্য বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রণীত হয়। প্রশিক্ষণার্থীদের চাহিদা ও দ্রুত পরিবর্তিত পরিস্থিতি এবং পরিবেশের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে পরিকল্পনার রদবদল করা হয়। বিপিএটিসি-র প্রশিক্ষণ কর্মসূচি সার্বিকভাবে দুই শ্রেণিতে বিভক্ত: একটি মৌলিক কোর্স, অন্যটি স্বল্পমেয়াদি বিশেষ কোর্স। মৌলিক কোর্সের মেয়াদ ১০-১৬ সপ্তাহ আর স্বল্পমেয়াদি কোর্স ১-৪ সপ্তাহ মেয়াদের। মৌলিক কোর্সের বিষয় তত্ত্বগত ও পেশাসংক্রান্ত, আর স্বল্পমেয়াদি কোর্স হলো বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন। মৌলিক কোর্স কাঠামোর আওতায় বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্স, প্রশাসন ও উন্নয়ন বিষয়ক উচ্চতর প্রশিক্ষণ কোর্স  ও সিনিয়র স্টাফ কোর্স পরিচালিত হয়।

বিপিএটিসি-র প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের সদর দপ্তরে চারটি আঞ্চলিক লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র পরিচালিত হয়। এ কেন্দ্রগুলোর দায়িত্ব প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তাসহ সহায়ক কর্মকর্তাদের জন্য প্রশিক্ষণ কোর্সের ব্যবস্থা করা, মাঝেমধ্যে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জন্য আঞ্চলিক কেন্দ্রসমূহে প্রশিক্ষণ কোর্স, সেমিনার ও কর্মশালার ব্যবস্থা করা, প্রতিবছর আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলোর জন্য বার্ষিক প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহে তা প্রেরণ করা।

বিপিএটিসি-র প্রশিক্ষণ কোর্সের মধ্যে রয়েছে জাতীয় ও আর্ন্তজাতিক পর্যায়ের সেমিনার ও কর্মশালা। সিনিয়র স্টাফ কোর্স ও উচ্চতর কোর্সে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেক প্রশিক্ষণার্থীকে নির্দিষ্ট বিষয়ে সেমিনার পেপার তৈরি করতে হয়। একইভাবে, বুনিয়াদি কোর্সে অংশগ্রহণকারীদেরও প্রশিক্ষণ গ্রহণের সময় সেমিনার পেপার তৈরির জন্য উৎসাহিত করা হয়। বিপিএটিসি-র অনুষদ সদস্য ও প্রশিক্ষকদের সর্বদা লোকপ্রশাসন, ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নমূলক অর্থনীতি বিষয়ে গবেষণা ও জরিপ (কেস স্টাডি) পরিচালনার জন্য অনুপ্রাণিত করা হয়। এসব কর্মকান্ড পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ও আনুষঙ্গিক সাহায্য-সহযোগিতা প্রদান করা হয়। প্রতিবছর অনুষদ সদস্যরা ৮-১০টি গবেষণাকর্ম পরিচালনা করে থাকেন। এসব গবেষণা ও জরিপের ফলাফলের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পাঠক্রম, শিক্ষা উপকরণ, শিক্ষণ বিষয়াদি ও প্রশিক্ষণ পদ্ধতি তৈরি করা হয়।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিপিএটিসি-র অনুষদ সদস্যদের বিভিন্ন দেশে প্রশিক্ষণ প্রতিনিধিরূপে প্রেরণ করা হচ্ছে। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান, ডেনমার্ক, সুইডেন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও পাকিস্তান। বিদেশে প্রশিক্ষণের অন্তর্ভুক্ত বিষয়াবলি হচ্ছে জনপ্রশাসন, ব্যবসায় প্রশাসন, উন্নয়ন অর্থনীতি, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পল্লী উন্নয়ন, ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমস, জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সিস্টেম (জি.আই.এস) এবং নীতিমালা বিশ্লেষণ ইত্যাদি। এছাড়াও বিপিএটিসি escap, undp, unicef, ids, IIPP, wfp, ilo এবং apdc সহ বিভিন্ন আর্ন্তজাতিক সংস্থার সহযোগিতায় প্রশিক্ষণ কোর্স, কর্মশালা, সেমিনার ও গবেষণা কর্মসূচির আয়োজন করে। বিশ শতকের নববইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত slida (শ্রীলঙ্কা), intan (মালয়েশিয়া), lan (ইন্দোনেশিয়া), pasc (পাকিস্তান), nasc (নেপাল), iipa (ভারত)-এর সহযোগিতায় সিনিয়র স্টাফ কোর্স ও উচ্চতর কোর্সের প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য বিদেশে শিক্ষা সফরের আয়োজন করা হয়।  [সৈয়দ নকীব মুসলিম]