বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট


বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট  বন ও বনজ সামগ্রীর ওপর গবেষণা পরিচালনার জন্য চট্টগ্রামের ষোলশহরে অবস্থিত একটি জাতীয় গবষেণা ইনস্টিটিউট। এটি মার্কিন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন এজেন্সির (USAID) কারিগরি সহায়তায় ১৯৫৫ সালে পূর্ব পাকিস্তান বন গবেষণা পরীক্ষাগার (EPFRL) হিসেবে স্থাপিত হয়। শুরুতে উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানের বনজ সামগ্রীর সদ্ব্যবহার, কিন্তু পরবর্তীকালে বনভূমিতে বৃক্ষের ঘনত্ব দ্রুত হ্রাস পাওয়ায় বন ব্যবস্থাপনা গবেষণা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়ে। ফলে ১৯৬৮ সালে খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন প্রকল্প এই দুই প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় বন ব্যবস্থাপনা শাখা গঠিত হয় এবং পূর্ব পাকিস্তান বন গবেষণাগারটি অতঃপর পূর্ণাঙ্গ বন গবেষণা সংস্থা হয়ে ওঠে এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট এই নতুন নামে পুনর্গঠিত হয়।

এই সংস্থার প্রধান উদ্দেশ্য: দারিদ্র্য বিমোচনকল্পে প্রযুক্তিগত উপকরণাদি সরবরাহের মাধ্যমে পার্বত্য, সমতল, পল্লী ও উপকূলীয় বনের উৎপাদন সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নয়ন; সর্বোত্তম ও পরিপোষক ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য পতিত ও প্রান্তিক জমিতে বনায়ন ও কৃষিবনায়নে গবেষণা সুবিধা প্রদান; প্রযুক্তিগত উপকরণ যোগানোর মাধ্যমে বনজ দ্রব্যাদির যুক্তিযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিতকরণ; জাতীয় ও পল্লী বনাঞ্চলে জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত ভারসাম্য সংরক্ষণে সহায়তা প্রদান।

পরিচালক এই প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী প্রধান। বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট দুটি শাখার (বন ব্যবস্থাপনা শাখা ও বনজ সামগ্রী শাখা) অধীন ১৭টি গবেষণা বিভাগের মাধ্যমে বনজ দ্রব্যের ব্যবহারিক ও অভিযোজ্যতা (adaptive) গবেষণা পরিচালনা করে। বন ব্যবস্থাপনা শাখায় আছে: বনবিদ্যা গবেষণা, বন বংশাণুবিদ্যা, ম্যানগ্রোভ বনবিদ্যা, বৃক্ষচাষ পরীক্ষণ ইউনিট, বন-অর্থনীতি, বীজতলা, বনসম্পদের তালিকা প্রণয়ন, মৃত্তিকাবিজ্ঞান, বনরক্ষণ ও গৌণ বনজ দ্রব্যাদি। বৃক্ষপরিবেশগত (dendroecological) অবস্থার ভিত্তিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে এই সংস্থার ২১টি গবেষণা স্টেশন রয়েছে। বনজ সামগ্রী শাখার অন্তর্ভুক্ত গবেষণা বিভাগে আছে কাঠের কাজ ও কাষ্ঠ প্রকৌশল, টেকসইকরণ (seasoning) ও কাষ্ঠ পদার্থবিদ্যা, কাঠ সংরক্ষণ, মন্ড ও কাগজ, ভিনিয়ার ও মিশ্র কাষ্ঠদ্রব্য ও বনরসায়ন। প্রধান গবেষণা কর্মকর্তা শাখাপ্রধান এবং বিভাগীয় কর্মকর্তা বিভাগের প্রধান। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সচিবের নেতৃত্বে ১১ সদস্যবিশিষ্ট একটি উপদেষ্টা বোর্ড গবেষণা ও অন্যান্য বিষয়ে নীতিনির্ধারক নির্দেশাবলি প্রদান করে।

এই প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন শ্রেণির ৭০ জন গবেষক এবং প্রায় ৬৫০ জন সহায়ক কর্মকর্তা ও কর্মচারী বর্তমানে কর্মরত। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান গবেষণা কর্মসূচি হলো: টেকসই উৎপাদনের জন্য বৃক্ষপ্রজাতি উন্নয়ন; ক্লোনজাত ও বীজজাত চারাগাছের বাগান ও বীজতলা স্থাপন; মাইক্রোবিস্তারণ কৌশল উন্নয়ন; নার্সারি, বনায়ন এবং পাহাড়, সমতল ও ম্যানগ্রোভ বনের বনবিদ্যাগত উন্নয়ন; বৃক্ষরোপণ, পল্লী বনায়ন ও কাঠনির্ভর শিল্প সম্পর্কে আর্থ-সামাজিক সমীক্ষা পরিচালনা; বন ও নার্সারির জন্য সমন্বিত ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ ব্যবস্থাপনা; পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা গবেষণা; শিল্প ও অন্যান্য কাজে কাঠের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, গুণগত উন্নতি সাধনের জন্য কাঠ সিজনিং, বনজ দ্রব্যের স্থায়িত্ব বৃদ্ধির জন্য সংরক্ষক দ্রব্যাদি ব্যবহার; শিল্পকর্মে বর্জ্যকাঠের ব্যবহার, মন্ড উৎপাদনের উন্নত পদ্ধতি উদ্ভাবন, মন্ড আমদানির বিকল্প হিসেবে দেশী কাঁচামাল থেকে মন্ডপ্রস্ত্তত; সম্প্রসারণ, প্রশিক্ষণ ও পরামর্শসেবা।

বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি এবং বন ব্যবস্থাপনা ও বনসম্পদ সদ্ব্যবহারের প্রয়োজনীয় তথ্যাদি উদ্ভাবন করেছে। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য: বাঁশ-চাষের সহজ কৌশল, পল্লীগৃহের নির্মাণসামগ্রীর আয়ুষ্কাল বৃদ্ধির কৌশল, বনবৃক্ষ প্রজাতির বংশবিস্তার ও বাঁশের টিস্যু-কালচার, সৌরশক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কাঠের সিজনিং এবং এজন্য রোদ কাজে লাগিয়ে কাঠ সিজনিংয়ের জন্য একটি সহজ, স্বল্পব্যয়ী ও কার্যকর সৌরভাঁটি উদ্ভাবন; রেলের স্লিপারের জন্য অপ্রচলিত কাঠ; নার্সারি ও আবাদের প্রধান ক্ষতিকারক কীটপতঙ্গ ও রোগবালাই শনাক্তকরণ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণ। কাঠের বর্জ্য কাজে লাগিয়ে নতুন ধরনের পণ্য, প্যানেল সামগ্রী ও পার্টিকেল বোর্ড তৈরির কৌশলও উদ্ভাবন করা হয়েছে।

এই ইনস্টিটিউট থেকে ইতোমধ্যে প্রায় ৭০০টি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত রয়েছে। ইনস্টিটিউটের সাময়িকী Bangladesh Journal of Forest Science বছরে দুবার প্রকাশিত হয়।

ইনস্টিটিউট নিয়মিত সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠান এবং বাঁশচাষ, নার্সারি কৌশল, কৃত্রিম বনের অধিক উৎপাদনশীলতা, স্থান নির্ধারণের জন্য জমির সম্ভাবনা মূল্যায়ন, কাঠশনাক্তি, কাঠ সংরক্ষণ, কাঠ সিজনিং, কাঠপ্রযুক্তি ইত্যাদি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ কোর্স পরিচালনা করে থাকে। বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট বনের উৎপাদন, ব্যবস্থাপনা ও ব্যবহার সম্পর্কে বিভিন্ন সংস্থাকে পরামর্শ ও কারিগরি সেবা দেয়।

চট্টগ্রাম শহরে প্রায় ৭৫ একর জমির উপর ইনস্টিটিউটের একটি প্রশাসনিক ভবন এবং দুইটি গবেষণাগার/অফিস ভবন রয়েছে। গবেষণাগারগুলিতে বনায়ন গবেষণা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামসহ যথেষ্ট সুযোগ-সুবিধা আছে। ফিল্ড স্টেশনগুলিতে প্রায় ৩,৫০০ একর জমিসহ গবেষণাগার, অফিস ও আবাসিক সুবিধা রয়েছে।

বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটে বনায়ন ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ওপর ১২ হাজারের বেশি বইপত্রের একটি আধুনিক গ্রন্থাগার আছে। তদুপরি ইনস্টিটিউটের রয়েছে অনধিক ১৬,০০০টি ঔষধি লতাগুল্ম এবং উদ্ভিদতত্ত্ব গবেষণার জন্য শতাধিক প্রজাতির দেশী ও বিদেশী বৃক্ষসমৃদ্ধ একটি বৃক্ষ উদ্যান।

[এম.এ সাত্তার]

আরও দেখুন বন ও বনবিজ্ঞান; বাংলাদেশ বন শিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশন।