বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন


বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন  প্রধানত বিভিন্ন সরকারি চাকুরি ও পদে নিয়োগ দানের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত একটি সাংবিধানিক সংস্থা। সংস্থাটি সরকারি কর্মচারীদের পদোন্নতি, পদায়ন, বদলি, শৃঙ্খলা ও আপীলের মতো বিষয়ের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার সঙ্গেও জড়িত। ব্রিটিশ শাসনের ঐতিহ্যবাহী অধিকাংশ দেশে ‘সিভিল’ বা ‘পাবলিক’ সার্ভিস কমিশন গঠনের মূল উদ্দেশ্য হলো সরকারি চাকুরিতে নিয়োগ প্রদান এবং চাকুরি সংক্রান্ত অন্যান্য বিষয়ে সকল সিদ্ধান্ত যাতে মেধা ও সমদর্শিতার নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হয় তা নিশ্চিতকরণ। বাংলাদেশে এই সংস্থা বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন বা বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন নামে অভিহিত।

ভারত উপমহাদেশে ১৯২৬ সালে প্রথম পাবলিক সার্ভিস কমিশন নামে একটি কমিশন গঠিত হয় এবং এটি ব্রিটিশ ভারতে কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন চাকুরিতে নিয়োগ দানের কার্যক্রম পরিচালনা  করত। ১৯১৯ সালের ভারত শাসন আইন এবং পরবর্তী ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন অনুযায়ী বিভিন্ন প্রদেশে দায়িত্বশীল সরকার গঠিত হওয়ার পর ১৯৩৭ সালে বেঙ্গল পাবলিক সার্ভিস কমিশনসহ প্রদেশ পর্যায়েও অনুরূপ কমিশন গঠিত হয়। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর ব্রিটিশ ভারতের পাবলিক সার্ভিস কমিশনের আদলে পাকিস্তানের কেন্দ্র ও প্রদেশ উভয় পর্যায়েই অনুরূপ পাবলিক সার্ভিস কমিশন গঠিত হয়। এভাবেই ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে পূর্ববঙ্গে (পরে পূর্ব পাকিস্তান) পাবলিক সার্ভিস কমিশনের প্রতিষ্ঠা।

বাংলাদেশের স্বাধীনতালাভের পর ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির ৩৪ নং আদেশবলে ১৯৭২ সালের মে মাসে প্রাথমিক পর্যায়ে পাবলিক সার্ভিস কমিশন (প্রথম) ও পাবলিক সার্ভিস কমিশন (দ্বিতীয়) নামে দুটি আলাদা কমিশন গঠিত হয়। কিন্তু ১৯৭২ সালের নভেম্বর মাসে গৃহীত সংবিধানে পাবলিক সার্ভিস কমিশন সংক্রান্ত ধারাসমূহ কার্যকর করার লক্ষ্যে সরকার নতুন একটি রাষ্ট্রপতি-আদেশ (রাষ্ট্রপতির আদেশ নং ২৫, ১৯৭৩) জারি করে যা কার্যত ১৯৭২ সালের মে মাস থেকে পাবলিক সার্ভিস কমিশন দুটির আনুষ্ঠানিক নিয়মিতকরণ সম্পন্ন করে। অবশ্য সরকার ১৯৭৭ সালের নভেম্বর মাসে দুটি কমিশনের স্থলে একটি কমিশন স্থাপন করার লক্ষ্যে আরেকটি অধ্যাদেশ জারি করে এবং ১৯৭৭ সালের ২২ ডিসেম্বর এই কমিশনের নামকরণ হয় বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন।

আইনগত ভিত্তির পরিবর্তে বরং সাংবিধানিক ভিত্তিই বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশের সংবিধানের পাঁচটি অনুচ্ছেদ সংবলিত একটি অধ্যায়ে (৯ম ভাগের ২য়) কমিশনের গঠনপ্রণালী ও কার্যাবলি নির্দেশিত হয়েছে। কমিশনের চেয়ারম্যান এবং সদস্যগণ রাষ্ট্রপতি কর্তৃক (কার্যত প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে) পাঁচ বছর মেয়াদে অথবা তাদের বয়স বাষট্টি বছর পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত সময়ের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত হন। নিয়োগযোগ্য সর্বোচ্চ বা সর্বনিম্ন সদস্যের সংখ্যা সংবিধানে নির্দিষ্ট করা হয় নি। তবে ১৯৭৭ সালে জারিকৃত রাষ্ট্রপতির এক অধ্যাদেশে চেয়ারম্যানসহ এ সংখ্যা সর্বোচ্চ পনেরো (ন্যূনতম ছয়) নির্ধারণ করা হয়েছে। সদস্য হিসেবে নিয়োগ লাভের জন্য বিশেষ যোগ্যতার প্রয়োজন হয় না। তবে কমিশনের মোট সদস্যের অন্তত অর্ধেক থাকবেন ন্যূনতম বিশ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সরকারি কর্মকর্তা। সাধারণত সরকারি বিভাগ থেকে নিযুক্ত চেয়ারম্যান ও সদস্যরা সকলেই শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে নির্বাচিত হন এবং অন্যান্যদের অধিকাংশই থাকেন প্রবীণ শিক্ষাবিদ। সরকারি চাকুরি থেকে অবসর গ্রহণের পর একজন কর্মকর্তা পুনরায় কোনো সরকারি চাকুরিতে (পাবলিক সার্ভিস কমিশন সহ) নিয়োগ লাভের যোগ্য বিবেচিত হন না। কিন্তু ব্যতিক্রম ঘটে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যানের ক্ষেত্রে, যিনি চাকুরি থেকে অবসর গ্রহণ সত্ত্বেও চেয়ারম্যান হিসেবে অতিরিক্ত এক মেয়াদের জন্য এবং একইভাবে কমিশনের একজন সদস্যও অবসর গ্রহণের পর কমিশনের সদস্য বা চেয়ারম্যান হিসেবে অতিরিক্ত এক মেয়াদের জন্য পুনরায় নিয়োগ পেতে পারেন।

কমিশনের যেকোন সদস্যকেই তার পদ থেকে অপসারণ করা যায়, তবে কেবল সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারপতিকে অপসারণ করার অভিন্ন কারণ ও পদ্ধতি অনুসরণক্রমেই তা করা যায়। পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান/সদস্যদের পদমর্যাদা মোটামুটি সরকারের নির্বাহী বিভাগের কর্মকর্তাদের পদানুক্রমেই নির্ধারিত হয়ে থাকে। বর্তমান পদমানক্রম অনুযায়ী চেয়ারম্যানের অবস্থান সরকারের একজন পূর্ণ সচিবের পদমর্যাদার সমান, যদিও চেয়ারম্যান ১৭নং পদমর্যাদার স্তরের সকল কর্মকর্তার ঊর্ধ্বে সমাসীন। অন্যদিকে কমিশনের সদস্যদের অবস্থান সরকারের একজন অতিরিক্ত সচিবের (অর্থাৎ ২১নং স্তরের) সমমর্যাদার।

সংবিধানে নির্দিষ্ট করে বলা আছে যে, পাবলিক সার্ভিস কমিশন সরকারি চাকুরিতে নিয়োগদানের জন্য প্রার্থী বাছাই সংক্রান্ত সকল পরীক্ষা ও যাচাইকার্য পরিচালনা করবে, সংশ্লিষ্ট যেসব বিষয়ে কমিশনের মতামত চাওয়া হবে সেসব বিষয়ে কমিশন রাষ্ট্রপতিকে (অর্থাৎ সরকারকে) প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করবে এবং সংবিধি নির্ধারিত অন্যান্য দায়িত্ব পালন করবে। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা হিসেবে রাষ্ট্রপতিকে যেসব বিষয়ে কমিশনের মতামত গ্রহণ করতে হয় সেগুলি হলো নিয়োগ পদ্ধতি, নিয়োগ ও পদোন্নতির নীতিমালা, বদলির নীতিমালা, চাকুরির শর্তাদি ও শৃঙ্খলা। তবে, আপাতদৃষ্টিতে যতটা মনে হয় কার্যত কমিশনের দায়িত্ব ততটা ব্যাপক নয়, কেননা কমিশনের সঙ্গে পরামর্শের পর রাষ্ট্রপতি আদেশবলে সংবিধান কর্তৃক নির্দিষ্ট কমিশনের যেকোন বিষয় থেকে কমিশনের এখতিয়ার খারিজ করতে পারেন। অধিকন্তু কোনো কোনো বিষয়ে রাষ্ট্রপতি কমিশনের সঙ্গে পরামর্শ করতে বাধ্য থাকলেও সেসব বিষয়ে কমিশনের সবগুলি মতামত বা পরামর্শ যে তাকে গ্রহণ করতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। অদ্যাবধি জারিকৃত রাষ্ট্রপতির বিভিন্ন আদেশবলে বেশ কিছু ধরনের গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ দানের বিষয় কমিশনের আওতা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ১৯৭৯ সালের বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পরামর্শ) প্রবিধান হলো এ জাতীয় আদেশেরই একটি।

পাবলিক সার্ভিস কমিশন সাধারণত নিম্নোক্ত কার্যক্রম সম্পাদন করে: ১. সরকারি চাকুরিতে সরাসরি নিয়োগ দানের জন্য লোক বাছাই করার উদ্দেশ্যে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা এবং/অথবা সাক্ষাৎকার গ্রহণ; ২. প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এবং সিভিল সার্ভিসের বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগ প্রত্যাশী প্রার্থীদের জন্য মনস্তাত্ত্বিক ও মেধাযাচাই পরীক্ষার ব্যবস্থা; ৩. সরকারি কর্মকর্তাদের এক চাকুরি থেকে অন্য চাকুরিতে পদোন্নতি (যথা ২য় শ্রেণি থেকে ১ম শ্রেণিতে) দানের উদ্দেশ্যে পরীক্ষা এবং/অথবা সাক্ষাৎকার গ্রহণ; ৪. সরকারি চাকুরিতে অস্থায়ী ভিত্তিতে কর্মরত ব্যক্তিদের মধ্য থেকে স্থায়ী চাকুরিতে নিয়োগদানের জন্য প্রার্থী নির্বাচন; ৫. বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অধীনস্থ অ্যাড হক ভিত্তিক নিয়োগ অনুমোদন; ৬. নিয়োগ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় বিধি, নিয়োগ দানের ক্ষেত্রে অনুসরণীয় নীতিমালা, সরকারি চাকুরিতে পদোন্নতি ও বদলি সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন এবং সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যেকার পারস্পরিক জ্যেষ্ঠতা নিরূপণের ক্ষেত্রে পরামর্শ প্রদান; ৭. বিভাগীয় ও পেশাগত বিভিন্ন পরীক্ষার নিয়মাবলি ও পাঠ্যসূচি পরীক্ষা ও অনুমোদন এবং সরকারি কর্মচারীদের জন্য সেসব পরীক্ষার আয়োজন; ৮. সরকারি কর্মচারীদের চাকুরির শর্তাদি প্রভাবিত করে এমন সব বিষয়ে পরামর্শ দান; এবং ৯. সরকারি কর্মচারীদের বিভিন্ন শৃঙ্খলা ও আপীল বিষয়ে পরামর্শ দান। অধিকন্তু, কমিশন সরকারি চাকুরিপ্রার্থীদের ব্যাপারে কর্মী-বিষয়ক গবেষণার কিছু কাজও করে, যেমন প্রার্থীদের সম্পর্কে নানা তথ্য সংগ্রহ ও পরিসংখ্যানগতভাবে তাদের প্রবণতাগুলি (শিক্ষাগত, আর্থ-সামাজিক, আঞ্চলিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রেক্ষাপট সহ) বিশ্লেষণ।

সংবিধান সুস্পষ্ট ভাষায় নির্দেশ করেছে যে, প্রতি বছর ১ মার্চের মধ্যে পাবলিক সার্ভিস কমিশন বিগত বছরে নিষ্পন্ন কাজের উপর একটি বার্ষিক প্রতিবেদন তৈরি করে রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করবে। সেসঙ্গে যুক্ত একটি স্মারকলিপিতে থাকবে ১. কোন কোন বিষয়ে সরকার কমিশনের পরামর্শ গ্রহণ করে নি এবং গ্রহণ না করার পক্ষে সরকার কি কি কারণ বা যুক্তি দেখিয়েছে; এবং ২. কোন কোন বিষয়ে সরকার কর্তৃক কমিশনের পরামর্শ নেওয়া উচিত ছিল, কিন্তু নেয় নি এবং কেন নেয় নি  সে সম্পর্কে সরকারের বক্তব্য ও যুক্তি। প্রতিবেদনটি পেশ করার বছরেই ৩১ মার্চের পর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে স্মারকলিপিসহ এটি উপস্থাপনের জন্য রাষ্ট্রপতি নির্দেশ প্রদান করবেন। কমিশনের সঙ্গে পরামর্শযোগ্য বিষয় যাতে উপেক্ষিত না হয় এবং কমিশনের পরামর্শ যথানিয়মে গৃহীত হয় তা নিশ্চিত করার জন্যই এ ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে। একই সঙ্গে যেসব বিষয় সরকার যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ মনে করে সেসব বিষয়ে নিজস্ব সিদ্ধান্ত অনুসরণের স্বাধীনতা তার রয়েছে, তবে নিজ সিদ্ধান্ত গ্রহণের যৌক্তিকতাগুলি সংসদের সামনে তুলে ধরার প্রস্ত্ততিও সরকারের থাকবে।

বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের কর্মকান্ড পরিচালনায় সহায়তা দানের জন্য কমিশনের একটি  সচিবালয় রয়েছে। কাঠামোগত অবস্থানের দিক থেকে এটি সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের একটি অংশ এবং মন্ত্রণালয়ের একটি বিভাগের সমমর্যাদাসম্পন্ন। রাজধানী শহরে (ঢাকায়) অবস্থিত পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদর দপ্তরের যাবতীয় কর্মকান্ড মোট ১০টি সার্ভিস শাখার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়ে থাকে, যেমন সংস্থাপন শাখা, হিসাব শাখা, পরীক্ষা শাখা, নিয়োগ শাখা, মনস্তত্ত্ব শাখা, গবেষণা শাখা ও গ্রন্থাগার শাখা ইত্যাদি। এছাড়া পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মোট ৬টি আঞ্চলিক অফিসের মধ্যে ৫টি রাজধানীর বাইরের বিভাগীয় সদরে এবং ঢাকা বিভাগের জন্য নির্দিষ্ট অবশিষ্টটি রাজধানীতে কমিশনের কেন্দ্রীয় সচিবালয় ভবনে অবস্থিত। আঞ্চলিক অফিসগুলি কার্যত যোগাযোগ রক্ষাকারী অফিসের ভূমিকাই পালন করে থাকে। কমিশন সচিবালয়ে নিয়োজিত সচিব হলেন এর মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা। তিনি সরকারের একজন অতিরিক্ত সচিব এবং কমিশন সচিবালয়ে প্রেষণে নিয়োগকৃত। সচিবের সহযোগী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন ১ জন যুগ্মসচিব, ১ জন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, ১ জন প্রধান মনোবিজ্ঞানি, ২ জন উপসচিব ও ৭ জন পরিচালক।  [সৈয়দ গিয়াসউদ্দিন আহমদ]