বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন


বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন পূর্ব পাকিস্তান কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের পরিবর্তিত নাম। ১৯৬০ সালে খাদ্য ও কৃষি কমিশন প্রণীত সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৬১ সালে এক অধ্যাদেশ মোতাবেক পূর্ব পাকিস্তান কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর এর নাম হয় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন। কৃষিখাতে সরকারের কার্যক্রম অন্যান্য কৃষি সংস্থা থেকে স্বাতন্ত্র্যমন্ডিত করার জন্য ১৯৭৫ সালে এর নতুন নামকরণ করা হয় Bangladesh Agricultural Inputs Supply and Services Corporation (BAISSC)। তবে এর সকল ব্যবহারিক উদ্দেশ্য অপরিবর্তিত রাখা হয়। ১৯৭৬ সালে একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে পুনরায় BAISSC-এর নামকরণ করা হয় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন। এটি বর্তমানে কৃষি মন্ত্রণালয়ের একটি অধীন আধা-স্বায়ত্তশাসিত কর্পোরেট সংস্থা। এর কেন্দ্রীয় দপ্তর ঢাকায় অবস্থিত এবং সারাদেশে এর কর্মকান্ড বিস্তৃত। এর মূল লক্ষ্য দেশে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি।

চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে ‘বোর্ড অব ডিরেক্টরস’ (মোট ৬ জন)-এর ওপর কর্পোরেশনের সাধারণ দিকনির্দেশনা, প্রশাসন ও যাবতীয় বিষয়ের দায়িত্ব ন্যস্ত। কর্পোরেশনের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ৬টি বিভাগ রয়েছে: প্রশাসন, সেচ, বীজ, সরবরাহ, পরিকল্পনা ও অর্থ। প্রশাসন বিভাগ চেয়ারম্যানের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং অন্য প্রত্যেকটি বিভাগের প্রধান হিসেবে আছেন সংশ্লিষ্ট সদস্য পরিচালক।

১৯৬১ সালে অধ্যাদেশের আওতায় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের উপর তিন ধরনের কর্তব্য ন্যস্ত করা হয়। বাধ্যতামূলক বা প্রাথমিক কর্তব্য হচ্ছে: কৃষকদের মধ্যে বণ্টনের জন্য গোটা বাংলাদেশে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে অত্যাবশ্যকীয় কৃষি উপকরণ যেমন বীজ, সার, উদ্ভিদ-সংরক্ষণ যন্ত্রপাতি, কীটনাশক, কৃষি-যন্ত্রপাতি প্রভৃতি সংগ্রহ, পরিবহণ, গুদামজাতকরণ ও সরবরাহের যথাযোগ্য ব্যবস্থা গ্রহণ; সমবায় সমিতি গঠনে উৎসাহ যোগানো, যাতে পর্যায়ভিত্তিক কর্মসূচি অনুযায়ী এর সরবরাহ কার্যক্রমগুলির জন্য হস্তান্তর করা যায়; অন্যান্য যেসব ক্ষেত্রে কর্পোরেশন আগ্রহী সেসব ক্ষেত্রে সমবায় সমিতি গঠনে উৎসাহ যোগানো; বীজ উৎপাদন ও পশুপ্রজনন খামার এবং ফলের নার্সারির দায়িত্ব গ্রহণ ও ব্যবস্থাপনা এবং উন্নতমানের কৃষি যন্ত্রপাতি ও সাজ-সরঞ্জাম তৈরিতে সহায়তা ও উৎসাহ প্রদান।

বাধ্যতামূলক দায়িত্বগুলির পাশাপাশি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের অতিরিক্ত উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম হচ্ছে: ঋণ হিসেবে কৃষি উপকরণ প্রদান; কৃষি পণ্য প্রসেসিং, কীটনাশক, ছত্রাকনাশক বা প্রয়োজনীয় জীববস্ত্ত (biomass) উদ্ভাবন বা উৎপাদন, গবাদি পশু ও হাঁসমুরগির খাদ্য উৎপাদনের জন্য শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠায় সাহায্য, সহযোগিতা ও উৎসাহ যোগানো; লিফট-পাম্প ও নলকূপ সরবরাহ, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনামূলক কার্যক্রম পরিচালনা এবং মেরামতের জন্য ছোটখাটো কারখানা স্থাপন; এবং সেচ ও অন্যান্য কাজে পানি সরবরাহের জন্য লিফট-পাম্প ও নলকূপ সরবরাহ, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ।

প্রকৌশল, কৃষি, অর্থনীতি, ব্যবস্থাপনা প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয়ের পেশাদাররা বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনে একত্রে কাজ করছেন। অনুমোদিত মোট পদসংখ্যা ২৫,৪৫১। কিন্তু স্বাভাবিক অবসর গ্রহণ, স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ ও অন্যান্য কারণে ১৯৯৮ সালের জানুয়ারিতে কর্মরত লোকসংখ্যা হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ১০,৭৮১ জন।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের সরবরাহকৃত যন্ত্রপাতির সাহায্যে মোট চাষ এলাকার ৭০% জমিতে সেচকার্য চলছে। এ প্রতিষ্ঠান সারের সরবরাহ ৫০ হাজার মে টন থেকে ২২ লক্ষ মে টনে বৃদ্ধি করেছে। বীজখাতে বীজ উৎপাদন খামার এবং চুক্তিবদ্ধ চাষীদের মাধ্যমে উন্নতমানের বীজ উৎপাদন এবং বীজ সংগ্রহ, প্রসেসিং ও বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু সেচ, সার ও বীজ খাতের অনেক কার্যক্রম বেসরকারিকরণের ফলে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের ভূমিকা সম্প্রতি কিছুটা সংকুচিত হয়েছে।  [মো. জাহিদুল ইসলাম]