বসু, বিধুভূষণ


বসু, বিধুভূষণ (১৮৭৪-১৯৭২)  সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সমাজকর্মী। স্বদেশী যুগে তাঁর অগ্নিবর্ষী লেখনী স্বদেশপ্রেমে উজ্জীবিত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। ১৮৭৪ সালের ২৭ মে বাগেরহাট জেলার কাঁঠাল গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল খুলনা জেলার বিষ্ণুপুরে; পরবর্তীকালে তিনি কলকাতার স্থায়ী বাসিন্দা হন।

বিধুভূষণ শৈশবে পিতৃমাতৃহারা হয়ে বাগেরহাটের এক আত্মীয়ের আশ্রয়ে লালিত-পালিত হন। বিষ্ণুপুর ও মূলঘর স্কুলে শিক্ষালাভ করার পর দৃষ্টিক্ষীণতার কারণে তিনি আর উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পারেননি। বাগেরহাটের জাতীয় বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন; পরে বিষ্ণুপুর স্কুল ও কলকাতার শিবপুর স্কুলে শিক্ষকতা করেন। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে বিখ্যাত দুজন হলেন ভাষাবিদ  সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এবং বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ  সুশীল কুমার দে

সখা ও সাথী পত্রিকায় লেখা প্রকাশের মাধ্যমে বিধুভূষণের সাহিত্যচর্চা শুরু হয়। দেশাত্মবোধে উজ্জীবিত বিধুভূষণ স্বাধীনতা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গল্প, কবিতা ও  উপন্যাস রচনার মাধ্যমে সাহিত্যাঙ্গনে বিচরণ করেন। তাঁর প্রথম উপন্যাস লক্ষ্মী মেয়ে (১৮৯৭) পারিবারিক ও সামাজিক সমস্যা নিয়ে রচিত। এ ধারার অপর উপন্যাস লক্ষ্মী মা (১৮৯৮), লক্ষ্মী বৌ (১৮৯৮) ও সতী লক্ষ্মী (১৮৯৯, হিন্দি ও গুজরাটি ভাষায় অনূদিত)। তাঁর অন্যান্য উপন্যাস: চারুচন্দ্র (১৯০০), অমৃতে গরল, সুভদ্রা (১৯১২), পাপিষ্ঠা (১৯১৪), গোধন, কামিনী-কাঞ্চন (১৯২৫), দীপালীর বাজী (১৯২৬), প্রখরা (১৯২৮), কুলের কালি (১৯২৮), নষ্টোদ্ধার, বিষের বাতাস (১৯২৮), জ্যাঠাই মা (১৯২৮), পৌত্রান্ত (১৯৫৮) পরিণাম (১৯৬১) প্রভৃতি। অমৃতে গরল উপন্যাসটির জন্য তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করে।

স্বদেশী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত থেকে বিধুভূষণ জাতীয় জাগরণমূলক একাধিক নাটক রচনা করেন।  মুকুন্দদাস অভিনীত দাদা (১৯২২) তাঁর এরূপ একটি নাটক; অনুরূপ আরও তিনটি নাটক মীরকাশিম (১৯০৫), রক্তযজ্ঞ (১৯১০) ও সোনার ফসল (১৯১০) তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হয়। তাঁর অন্যান্য নাটক হলো: ব্রহ্মচারিণী (১৯২৫), ভগিনী বিদ্রোহ, বিমাতা, বাপের ভিটা, সুদর্শন, দুইবিঘা জমি, কালাপাহাড় প্রভৃতি।

বিধুভূষণ ১৮৯৯ থেকে ১৯০২ সাল পর্যন্ত মাসিক সঞ্জীবনী পত্রিকা সম্পাদনা করেন। এছাড়া ১৯০৮ সালে বাগেরহাট থেকে প্রকাশিত পল্লীচিত্র পত্রিকাটিও তিনি সম্পাদনা করেন। এ পত্রিকায় ১৯০৯ সালে ‘শিকার’ নামক তাঁর একটি উপন্যাস প্রকাশিত হলে রাজদ্রোহের অভিযোগে তিনি চার বছর কারাভোগ করেন। তাঁর গল্পগ্রন্থ বনমালা (১৯১৪) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে উৎসর্গীকৃত।

১৯৩০ সালে  আইন অমান্য আন্দোলন কালে বিধুভূষণ পুনরায় কারারুদ্ধ হন। স্বদেশী আন্দোলনের বিরুদ্ধবাদী এমএলএ পদপ্রার্থী এক জমিদারকে ব্যঙ্গ করে ভোটরঙ্গ কাব্য লিখে তিনি মানহানির মামলায় অভিযুক্ত হন। এসব থেকে অনুমিত হয় যে, তিনি কতটা প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর ছিলেন।

বিধুভূষণ রচিত দুটি গুরুত্বপূর্ণ চরিতগ্রন্থ হলো মহাত্মা গান্ধীর জীবন চরিত (১৯১১) ও দেশবন্ধু চরিত্রমহিমা (১৯২৫)। স্মৃতিকথা (১৯৫৯) নামে তাঁর একটি আত্মজীবনীও আছে। তিনি শতাধিক গানও রচনা করেছেন, যেগুলি গীতিহার (১৯১৭) নামক গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে।

বিধুভূষণ বেশ কিছু সামাজিক কাজ করেছেন। নিজ গ্রামে তিনি একটি উচ্চ বিদ্যালয়, একটি বালিকা বিদ্যালয়, একটি ডাকঘর ও একটি জলাশয় প্রতিষ্ঠা করেন। শেষ জীবনে তিনি সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে যান। ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি তাঁর মৃত্যু হয়। [সুশান্ত সরকার]