বসন্ত


বসন্ত  Variola ও Varicella নামক ভাইরাসঘটিত সংক্রামক ছোঁয়াচে রোগ। দু’ধরনের বসন্তের মধ্যে একটি হলো গুটিবসন্ত যা ভ্যারিওলা ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হতো এবং এটি অত্যন্ত মারাত্মক এক ব্যাধি ছিল। গুটিবসন্তের সংক্রমণ বাংলাদেশ তথা সারা বিশ্ব থেকে নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে যদিও এর স্থায়ী দাগ (pockmark) বহুলোকের মুখমন্ডলে এখনও দেখতে পাওয়া যায়। অন্যদিকে ভ্যারিসেলা ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত জলবসন্ত তুলনামূলকভাবে কম মারাত্মক এবং এটি এখনও বিদ্যমান রয়েছে।

গুটিবসন্ত (Smallpox)  মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগ। দেহে প্রথমে এক ধরনের গুটি বের হয় যা পরবর্তী সময়ে তিল বা দাগ (macules), কুড়ি (papules), ফোস্কা (vesicles), পুঁজবটিকা (pustules) এবং খোসা বা আবরণ (crusts) ইত্যাদি পর্যায়ের মাধ্যমে দেহে লক্ষণ প্রকাশ করে। সারা শরীরের ত্বকে এবং চোখে মারাত্মক ক্ষতের আবির্ভাব এই রোগের প্রধান উপসর্গ যা কখনও কখনও অন্ধত্বের কারণ ঘটায়। গুটিবসন্তের মহামারি এই অঞ্চলে বিশেষ বিশেষ মৌসুমে দেখা যেত। এক সময়ে বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। ভ্যারিওলা ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত গুটিবসন্ত মানবদেহ আক্রান্তকারী একটি সনাতন রোগ। অণুজীববাহিত সংক্রামক রোগের টিকা আবিষ্কারের ক্ষেত্রে এই রোগের বিশাল অবদান রয়েছে যেহেতু ১৭৯৬ সালে গুটিবসন্তের বিরুদ্ধে এডওয়ার্ড জেনার সর্বপ্রথম টিকা আবিষ্কার করেন এবং তখন থেকেই সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে টিকা পদ্ধতির ব্যবহার শুরু হয়।

পারস্যের চিকিৎসক আল-রাজি ৯০০ খ্রিস্টাব্দে প্রথম গুটিবসন্তের বর্ণনা দেন এবং হাম (Measles) থেকে এর পার্থক্য উল্লেখ করেন। এর পূর্বে অবশ্য ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে বিশপ মেরিয়াস এ রোগকে ‘ভেরিওলা’ (Variola) নামে উল্লেখ করেছিলেন। ইংল্যান্ডের গিলবার্ট ১২০০ খ্রিস্টাব্দে গুটিবসন্তকে একটি ছোঁয়াচে রোগ হিসেবে শনাক্ত করেন। পরবর্তীতে ১৬৭৫ খ্রিস্টাব্দে থমাস সাইডেনহ্যাম এ রোগের আরও বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করেন। উইলিয়ম হেবারডেন ১৭৬৭ সালে গুটিবসন্ত ও জলবসন্তের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করেন।

সতেরো শতকের প্রথমভাগে গুটিবসন্ত গোটা ইউরোপে বিস্তৃত ছিল এবং ১৬৬৬-১৬৭৫ সময়কালে এটি ইংল্যান্ডে মহামারী আকারে দেখা দিয়েছিল বলে জানা যায়। তবে গোটা নিউ ইংল্যান্ডেই সতেরো শতকে এ রোগের প্রাদুর্ভাব ছড়ানো ছিটানোভাবে অব্যাহত ছিল। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত গুটিবসন্ত অন্যতম প্রাণসংহারক রোগ হিসেবে পৃথিবীর সবগুলি মহাদেশেই বিস্তৃত ছিল।

বাংলাদেশে এই রোগটি কয়েক শতাব্দী ধরে বিরাজ করেছে। গুটিবসন্ত এবং গুটিবসন্তের ভাইরাস জীবাণু বহনকারী দেহে টিকাদান প্রক্রিয়া ভেষজ চিকিৎসক ও কবিরাজদের মাধ্যমে বিশেষভাবে চর্চা করা হতো। গুটিবসন্তের চিকিৎসায় কিছু নির্দিষ্ট প্রতিষেধক ব্যবহার করা হতো যার উল্লেখ পাওয়া যায় নোয়াখালীর এক ম্যাজিস্ট্রেটের ১৮৭৪-১৮৭৫ সালের বার্ষিক রিপোর্টে। গুটিবসন্তের তিনটি প্রতিষেধক ব্যবহার করা হয়। যেমন: ১. গলা এবং ঘাড়ে আকন্দ গাছের রস ও সরিষা মালিশ করা; পিঁয়াজ, কলা এবং ভিজানো চাল পথ্য দেওয়া; গরম পানির সেঁক এবং গোসল করানো; ২. কুমিরের মাংস, মধু এবং রাতে সংগৃহীত মাটির মিশ্রণ; ৩. বিষকাটালীর রস ও বড় পদ্ম ফুলের রস একত্রে মিশ্রিত করে গলা, নাক এবং কানে ঢেলে দেয়া। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে গুটিবসন্ত রোগের ইতিহাসে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হলো ১৯৫৭-১৯৫৯ সালে সংঘটিত ব্যাপক মহামারি। এই তিন বছরে ১,১৫,০০০-এরও অধিক লোক এই রোগে আক্রান্ত হয় এবং প্রায় ৮৬,০০০ রোগী মৃত্যুবরণ করে বলে তথ্য পাওয়া যায় (সারণি দ্রষ্টব্য)।

বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে) ১৯৬১ সালে গুটিবসন্ত নির্মূল কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৬১ সালের জুলাই থেকে ১৯৬৩ সালের জুন পর্যন্ত দুই বছরের মধ্যে জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপকভাবে টিকা প্রদানের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এই কার্যক্রম শুরু হয়। অতিমাত্রায় সংবেদনশীল রোগীদের ক্ষেত্রে নিয়মিত রীতিবদ্ধ টিকাদান কর্মসূচিসহ একটি সুসংগঠিত ব্যাপক টিকাদান কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়।

সারণি  ১৯৫০ থেকে ১৯৭৭ সালে গুটিবসন্তে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা।

বছর আক্রান্ত মৃত বছর আক্রান্ত মৃত
১৯৫০ ২১২৭৩ ৯৪৪৫ ১৯৬৪ ৬৯ ৪২
১৯৫১ ৩৮৮৭১ ৩০৩৪১ ১৯৬৫ ৩১৬ ১৪২
১৯৫২ ১০৪৯০ ৮০৫৩ ১৯৬৬ ৩২০৭ ১৪৯১
১৯৫৩ ১১০২ ৭৮৮ ১৯৬৭ ৬৬৪৮ ৩৪৫৫
১৯৫৪ ৪৪৫ ১৮৮ ১৯৬৮ ৯০৩৯ ৪০২৪
১৯৫৫ ১৯২৬ ৯৭৯ ১৯৬৯ ১৯২৫ ৫৯৭
১৯৫৬ ৪৯৬২ ৩১৭০ ১৯৭০ ১৪৭৩ ৫০২
১৯৫৭ ২৪৯২০ ১৮১৪৯ ১৯৭১ তথ্য পাওয়াযায়নি তথ্য পাওয়াযায়নি
১৯৫৮ ৭৯০৬০ ৫৮৮৯১ ১৯৭২ ১০৭৫৪ ৩২৬২
১৯৫৯ ১৫০৪৮ ৯৫০৮ ১৯৭৩ ৩২৭১১ ৯৩৫৪
১৯৬০ ১৯০৫ ১২৭১ ১৯৭৪ ১৬৪৮৫ ২৭৮০
১৯৬১ ৬৬০ ৪৬৯ ১৯৭৫ ১৩৭৯৮ ২৪৯২
১৯৬২ ৬১০ ৩৭৯ ১৯৭৬
১৯৬৩ ৩৭৩৫ ২৮৪৭ ১৯৭৭

প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায় ১৯৬১ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত প্রায় ৭ কোটি ৫০ লক্ষ লোককে টিকা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া এই কর্মসূচির ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য আরও প্রায় ৬ কোটি ৮০ লক্ষ লোককে ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৬ সালের মধ্যে টিকা দান করা হয়েছে। ১৯৭০ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত ১৪৭৩ ব্যক্তির সংক্রমণের তথ্য পাওয়া যায় এবং এর মধ্যে ৫০২ জন মৃত্যুবরণ করে। এই সংক্রমণ এবং মৃত্যু সংখ্যার শতকরা ৯৬ ভাগ ময়মনসিংহ, সিলেট, বগুড়া ও টাঙ্গাইল জেলায় সংঘটিত হয়। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় টিকাদান এবং পর্যবেক্ষণ কর্মসূচি চালু ছিল, কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই কর্মসূচি বাধাপ্রাপ্ত হয়। ১৯৭২ সালের প্রথম চার মাসের সবকটি সংক্রমণের ঘটনা ভারত থেকে আগত লোকজনের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে বলে চিহ্নিত করা গিয়েছে। ১৯৭১ সালে যুদ্ধের সময় লক্ষ লক্ষ মানুষ দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। এদের অধিকাংশই ঘনবসতিপূর্ণ আশ্রয় শিবিরে অবস্থান করছিল। কলকাতার নিকটে সল্ট লেক ক্যাম্প নামে পরিচিত সর্ববৃহৎ ক্যাম্পে আনুমানিক দুই থেকে তিন লক্ষ শরণার্থী আশ্রয় গ্রহণ করে। খাদ্য সরবরাহ, আশ্রয়, স্বাস্থ্যবিধান সুবিধাদি এবং মারাত্মক ডায়রিয়াজনিত রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে সরকার অগ্রাধিকার দেয়। এই অবস্থায় সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব অত্যন্ত স্বাভাবিক ছিল। ১৯৭১ সালের শেষের দিকে আশ্রয় শিবিরে গুটিবসন্তের প্রাদুর্ভাব ঘটে, কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে রোগটিকে শনাক্ত করা যায় নি।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শরণার্থীদের সঙ্গে গুটিবসন্তের জীবাণু ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। সক্রিয় গুটিবসন্তের সংক্রমণ, সুপ্ত অবস্থায় দেহে বিরাজিত সংক্রমণ এবং টিকা গ্রহণ করে নি এমন ব্যক্তিদের সকলেই দেশে প্রত্যাবর্তনকালে যানবাহনে অবস্থানের ফলে এই রোগের সংবহন সহজতর হয়। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে রংপুর, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, ফরিদপুর, বরিশাল এবং পটুয়াখালী এই আটটি জেলা গুটিবসন্ত রোগের প্রাদুর্ভাবের শিকার হয়। পিরোজপুর জেলার নেসারাবাদ (স্বরূপকাঠি) উপজেলার এক-ষষ্ঠাংশ গ্রামে পরিচালিত জরিপ থেকে দেখা যায় যে, ফেব্রুয়ারি এবং মার্চ মাসে এই উপজেলায় দুই হাজারেরও অধিক মানুষ গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়। সবকটি সংক্রমণের ঘটনা চিহ্নিতকরণের পর দেখা যায় যে, এই রোগের আবির্ভাবের প্রধান উৎস হলো শরণার্থী শিবির, বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনকালে জনবহুল যানবাহন এবং অস্থায়ী শিবির। এই সময়ে গুটিবসন্ত নির্মূলকরণ কর্মসূচি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-এর বিশ্বব্যাপী প্রকল্পের অধীনে চালু করা হয়। এই কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে পর্যবেক্ষণ, গুটিবসন্ত প্রাদুর্ভাব চিহ্নিতকরণ ও দমন, সংক্রমণের রোগী পৃথকীকরণ এবং টিকাদান। অনুরূপ কর্মসূচি বাংলাদেশেও গ্রহণ করা হয়।

স্বাধীনতা উত্তরকালে বিশেষভাবে সংক্রমিত এলাকাসমূহে নির্মূলকরণ কর্মসূচি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পুনর্গঠন করা হয়। ১৯৭৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাষ্ট্রপতির এক আদেশে গুটিবসন্তকে একটি জাতীয় সমস্যা হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয় এবং গুটিবসন্ত নির্মূলকরণ কর্মসূচিকে সকল প্রকার কার্যকরী সহায়তাসহ চালু রাখার নির্দেশ প্রদান করা হয়। এই কর্মসূচিকে সফল করার জন্য আন্তর্জাতিক সাহায্য কামনা করা হয়। সংক্রমণের ব্যাপক বিস্তার রোধ করার জন্য নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করা হয়। এই উদ্ভাবিত পদ্ধতিতে রয়েছে: সংক্রমণ শরীরে দেখা দেওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে নতুন সংক্রমণ ঘটনার শতকরা আশি ভাগ চিহ্নিত করা ও দমন করা যাতে চিহ্নিত হওয়ার ১৫ দিন অথবা তারও বেশি সময়ের মধ্যে কোন নতুন সংক্রমণের ঘটনা না ঘটে এবং শতকরা ৯০ ভাগ সংক্রমণের ঘটনার উৎস চিহ্নিত করা যায়। এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পরিকল্পনা কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়। সংক্রমণের উৎস আবিষ্কারে সাফল্য এবং সরকারের পূর্ণ আন্তরিকতা সত্ত্বেও এপ্রিল মাস পর্যন্ত সংক্রমণের প্রাদুর্ভাব বাড়তে থাকে। প্রতিটি নতুন সংক্রমণ গভীরভাবে পরীক্ষা করা হয় এবং চিহ্নিতকরণ ও দমনের সমস্যা খুঁজে বের করা হয়। মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে নতুন সমাধানের উপায় এবং নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবনের ব্যবস্থা করা হয়।

গুটিবসন্ত সংক্রমণে মৌসুমকালীন বিরতি এবং রোগ শনাক্তকরণ ও দমনের উন্নত পদ্ধতি আবিষ্কারের ফলে এই রোগের সংক্রমণের ঘটনা ১৯৭৫ সালের মে মাসে অত্যন্ত দ্রুত হ্রাস পেতে থাকে। বর্ষাকালের শেষের দিকে গুটিবসন্ত সংক্রমণের ধারাবাহিকতা অধিকাংশ জেলায় কমতে থাকে। ১৯৭৫ সালের ১৬ অক্টোবর গুটিবসন্ত সংক্রমণের ঘটনার শেষ তথ্য পাওয়া যায়। এর পরে ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশকে গুটিবসন্ত জীবাণুমুক্ত দেশ হিসেবে সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়, যদিও সেই সময়ে পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলিতে গুটিবসন্ত সংক্রমণের খবর পাওয়া যায়। কিন্তু পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলিতে গুটিবসন্ত নির্মূল কর্মসূচি অত্যন্ত দ্রুত সফল পরিসমাপ্তির দিকে অগ্রসর হয় এবং পরবর্তী দুই বছরে ১৯৭৯ সালে এই অঞ্চলকে গুটিবসন্তমুক্ত ঘোষণা দেওয়া হয়। এরূপে বিশ্বব্যাপী গুটিবসন্ত নির্মূল কার্যক্রম সফলতা লাভ করে।

একসময় গুটিবসন্ত মহামারী আকারে আবির্ভূত হতো আর এতে পুরুষ, নারী ও শিশুসহ গ্রামের হাজার হাজার মানুষ মারা যেত। শীতলা বিবি/দেবী গ্রামে/অঞ্চলে উঠে আসার সহিত এর সম্পৃক্ততা রয়েছে এধারণা থেকে এলাকায় শীতলা বিবি/দেবীর উঠে আসা প্রতিরোধে আর উঠে আসলে একে বের  করে দেয়ার নিমিত্তে বিভিন্ন আচরণ ও রীতির কুসংষ্কার তখন প্রচলিত ছিল।

জলবসন্ত (Chickenpox)  হারপেস ভাইরাস গ্রুপের সদস্য ভ্যারিসেলা ভাইরাস কর্তৃক সংক্রমিত রোগ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটিকে জটিল রোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। দেহে উপসর্গ প্রকাশ পাওয়ার পর সাধারণত দুই সপ্তাহ এটি স্থায়ী হয়ে থাকে। এই ভাইরাস সম্ভবত শ্বসনযন্ত্রের উপরের অংশের মিউকাস আবরণীর মাধ্যমে দেহে প্রবেশ করে। কোন প্রকার ঋতুভিত্তিক নিদর্শন ছাড়া এই রোগটি বাংলাদেশে বিক্ষিপ্তভাবে ঘটতে দেখা যায়। কিন্তু বসন্তকাল ও প্রাক গ্রীষ্মকালীন সময়ে বাতাসে ভাসমান প্রচুর ধুলাবালির কারণে এই রোগের সংক্রমণের ঘটনা অহরহ ঘটতে দেখা যায়। এই রোগের প্রাথমিক উপসর্গের মধ্যে রয়েছে গা ম্যাজ ম্যাজ ভাব এবং জ্বর। এর পরবর্তী পর্যায়ে প্রথমে মধ্য শরীরে এবং পরে মুখমন্ডল, বাহু এবং মুখগহবর ও গলবিলের মিউকাস আবরণীতে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। কিছুদিনের মধ্যে পর্যায়ক্রমে দেহে জলীয় রসপূর্ণ ফোস্কা দেখা দেয়। এভাবে দেহে রোগটির পূর্ণতা প্রকাশ পায় যাকে স্থানীয়ভাবে জলবসন্ত হিসেবে অভিহিত করা হয়। এই রোগটি আরোগ্যকালে ত্বকে স্থায়ী কোন ক্ষত সৃষ্টি করে না। জলবসন্ত রোগটি সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ যেমন চোখ ইত্যাদিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না। বাংলাদেশে জলবসন্তের প্রাদুর্ভাব তুলনামূলকভাবে মৃদু এবং এই রোগটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। অপেক্ষাকৃত কম জটিলতাপূর্ণ ক্ষেত্রে এই রোগের সংক্রমণে সাধারণত কোন প্রতিষেধক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয় না।  [এস.এম হুমায়ুন কবির এবং জিয়া উদ্দিন আহমেদ]

আরও দেখুন টিকাদান; ভাইরাসজনিত রোগ