বর্মণ, রেবতীমোহন


বর্মণ, রেবতীমোহন (১৯০৩-১৯৫২)  মার্কসীয় তাত্ত্বিক ও ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা। তিনি ১৯০৩ সালে কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার শিমুলকান্দি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা হরমোহন বর্মণ ছিলেন রায়বাহাদুর খেতাবপ্রাপ্ত একজন আইনজীবী। মা রুক্সিণী দেবী। ১৯২২ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করার পর তিনি সেন্টপলস কলেজ থেকে ১৯২৬ সালে বিএ পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে স্বর্ণপদক লাভ এবং ১৯২৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে প্রথম স্থান অধিকার করে এমএ পাস করেন ও জগত্তারিণী স্বর্ণপদকে ভূষিত হন।

রেবতীমোহন বর্মণ

১৯২৩-১৯২৪ সালে রেবতীমোহন বর্মণ বেঙ্গল-ভলান্টিয়ারের কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া গ্রুপের নেতৃত্ব দেন এবং শ্রীসংঘে যুক্ত থেকে কাজ করেন কলকাতা, বাঁকুড়া এবং বীরভূমে। ১৯২৭-১৯২৮ সালে ছাত্র-যুব আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি কিশোর-কিশোরীদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাওয়া স্বর্ণপদক বিক্রি করে দিয়ে সেই টাকায় নিজের সম্পাদনায় বেণু নামে একটি মাসিক সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করেন। বেণুর প্রথম সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথের একটি গান প্রকাশিত হয়। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস বিপ্রদাস-ও প্রকাশিত হয় বেণু পত্রিকায়।

১৯৩০ সালের আগস্ট মাসে কলকাতায় পুলিশ কমিশনার চার্লস টেগার্টের ওপর বিপ্লবীদের আক্রমণের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে রেবতীমোহনকে পুলিশ গ্রেফতার করে। বিনা বিচারে আটককালে তাঁকে বিভিন্ন জেলখানায় স্থানান্তর করা হয়। জেলে বসে তিনি মার্কসবাদ-লেনিনবাদী দর্শন ও আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হন। দেউলী জেলে অবস্থানকালে অন্যান্য বিপ্লবীদের নিয়ে রেবতীমোহন বর্মণ প্রকাশ করেন The Communist ও সংহতি। জেলখানায় তিনি পাঠচক্রের মাধ্যমে বন্দিদের মার্কসবাদ-লেনিনবাদের উপর দীক্ষা দিতেন। দীর্ঘ আট বছর কারা-শাস্তির পর রাজপুতনার দেউলী জেল থেকে তিনি ১৯৩৮ সালের ২১ জুলাই মুক্তি পান। এরপর তিনি কমিউনিস্ট পার্টিতে সম্পৃক্ত হন এবং সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পার্টির দায়িত্ব নিয়ে শ্রমিক ও কৃষকদের সংগঠিত করার কাজে আত্মনিয়োগ করেন।

১৯৩৮ সালে স্যার, এফ, ফ্লাউডের নেতৃত্বে গঠিত Land Revenue Commission-এর কাছে ১৯৩৯ সালের ২২ মার্চ বঙ্গীয় কিষাণ সভার পক্ষে মৌখিক সাক্ষ্য দিয়েছিলেন রেবতীমোহন বর্মণ। কমিশন বরাবরে পেশকৃত বাষট্টি পৃষ্ঠার স্মারকলিপিটি প্রণয়ণেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

মার্কসবাদের প্রচার উদ্দেশে লেখালেখি এবং প্রকাশনার উদ্দেশ্যে ১৯৩৯ সালে তিনি কমরেড মুজাফফর আহমদ এবং অন্যান্যদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে কলকাতায় প্রতিষ্ঠা করেন সোসালিস্ট প্রকাশনী সংস্থা ‘ন্যাশনাল বুক এজেন্সি’। একই সময়ে বন্ধুদের সহায়তায় তিনি ঢাকায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘গণ-সাহিত্যচক্র’। ১৯২৯ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গ্রন্থ তরুণ রুশ। এছাড়াও তাঁর রচিত  সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি (১৯৩৮), মার্কস প্রবেশিকা (১৯৩৮), কৃষক ও জমিদার (১৯৩৮), সাম্রাজ্যবাদের সঙ্কট (১৯৩৮), হেগেল ও মার্কস (১৯৩৮), ভারতের কৃষকের সংগ্রাম ও আন্দোলন (১৯৩৮), লেনিন ও বলশেভিক পার্টি (১৯৩৯), অর্থনীতির গোড়ার কথা (১৯৪৫), সমাজ ও সভ্যতার ক্রমবিকাশ (১৯৫২) প্রভৃতি গ্রন্থ উল্লেখযোগ্য।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে তিনি অসুস্থ হয়ে নিজ গ্রাম শিমুলকান্দিতে ফিরে যান। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের ফলে সৃষ্ট সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় মর্মাহত হয়ে তিনি ১৯৫১ সালে জন্মভূমি ছেড়ে আগরতলায় আশ্রয় নেন। সেখানেই ১৯৫২ সালের ৬ মে তাঁর মৃত্যু হয়।  [শফিকুল ইসলাম]