বন্দ্যোপাধ্যায়, রঙ্গলাল


বন্দ্যোপাধ্যায়, রঙ্গলাল (১৮২৭-১৮৮৭)  কবি, সাংবাদিক। পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার বাকুলিয়ায় তাঁর জন্ম। শৈশবে পিতৃহীন রঙ্গলাল স্থানীয় পাঠশালা এবং মিশনারি স্কুলে শিক্ষাশেষে হুগলী মহসীন কলেজে অধ্যয়ন করেন। তিনি বাংলা, ইংরেজি, সংস্কৃত ও উড়িয়া ভাষা ও সাহিত্যে ব্যুৎপন্ন ছিলেন। ছাত্রাবস্থায় ঈশ্বরগুপ্তের  সংবাদ প্রভাকর তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়। তিনি নিজে  কলকাতা থেকে মাসিক রস সাগর (১৮৫২) (পরিবর্তিত নাম সংবাদ সাগর) ও সাপ্তাহিক বার্তাবহ (১৮৫৬) সম্পাদনা করেন। এডুকেশন গেজেট পত্রিকা (১৮৫৫) প্রকাশিত হলে তিনি তার সহসম্পাদক নিযুক্ত হন। এতে তাঁর গদ্যপদ্য উভয় প্রকার রচনা প্রকাশিত হতো। কলকাতা  প্রেসিডেন্সি কলেজএ তিনি কিছুদিন বাংলা সাহিত্যে অধ্যাপনা করেন (১৮৬০)। পরে আয়কর এসেসর ও ডেপুটি কালেক্টর পদে নিযুক্ত হয়ে তিনি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পদে উন্নীত হন। চাকরিসূত্রে তিনি যখন উড়িষ্যার কটকে ছিলেন তখন সেখান থেকে উৎকল দর্পণ নামে উড়িয়া ভাষায় একটি সংবাদপত্র প্রকাশ করেন। এতে উড়িষ্যার পুরাতত্ত্ব ও উড়িয়া ভাষা সম্পর্কে তিনি অনেক গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ লেখেন।

রঙ্গলালের প্রথম ও প্রধান সাহিত্যকীর্তি পদ্মিনী উপাখ্যান ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। এটি ইংরেজি কাব্যাদর্শের অনুসরণে টডের Annals and Antiquities of Rajasthan-এর কাহিনী অবলম্বনে রচিত ঐতিহাসিক রোমান্সধর্মী কাব্য। ‘স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে, কে বাঁচিতে চায়/ দাসত্বশৃঙ্খল বল কে পরিবে পায় হে, কে পরিবে পায়।’ পদ্মিনী উপাখ্যানে তাঁর এই উক্তি পরবর্তীকালে স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপ্লবীদের বীজমন্ত্র হিসেবে কাজ করেছে। তাঁর রচিত অন্যান্য কাব্য হচ্ছে: কর্মদেবী (১৮৬২), শূরসুন্দরী (১৮৬৮) ও কাঞ্চী কাবেরী (১৮৭৯)। তিনি কালিদাসের ঋতুসংহার ও কুমারসম্ভব-এর পদ্যানুবাদ (১৮৭২) করেন। তাঁর নীতিকুসুমাঞ্জলি (১৮৭২) সংস্কৃত নীতি ও তত্ত্বমূলক কবিতার অপর পদ্যানুবাদ। তিনি ভেক-মুষিকের যুদ্ধ নামে হোমারের কাব্যেরও অনুবাদ করেন। তাঁর কলিকাতা কল্পলতা  গ্রন্থকে কলকাতা সম্পর্কে প্রথম ইতিহাসমূলক রচনা বলে মনে করা হয়। এতে কলকাতার ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে। তিনি মুকুন্দরামের কবিকঙ্কণ চন্ডী সম্পাদনা করে প্রকাশ করেন (১৮৮২)। সুতরাং বাংলা সাহিত্যের নানা ক্ষেত্রে বিচরণ করেন এবং বাংলা সাহিত্যচর্চায় পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেন। ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দের ১৩ মে তাঁর মৃত্যু হয়।   [সুশান্ত সরকার]