বন্দ্যোপাধ্যায়, ব্রজেন্দ্রনাথ


বন্দ্যোপাধ্যায়, ব্রজেন্দ্রনাথ (১৮৯১-১৯৫২)  পন্ডিত, গবেষক, সম্পাদক। ১৮৯১ সালের ২১ সেপ্টেম্বর হুগলি জেলার বালী গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় তন্ত্রশাস্ত্রে পন্ডিত ছিলেন। ব্রজেন্দ্রনাথ শৈশবে পিতৃহারা হন এবং নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় মায়ের মৃত্যু হলে ১৯০৮ সালে কলকাতায় এসে একটি সওদাগরি অফিসে মুদ্রাক্ষরিকের চাকরি গ্রহণ করেন। পরে এ চাকরি ত্যাগ করে জেমস অ্যান্ড কোম্পানিতে যোগদান করেন।

নলিনীরঞ্জন পন্ডিত ও অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণের সান্নিধ্যে এসে ব্রজেন্দ্রনাথ সাহিত্যচর্চায় উৎসাহী হয়ে ওঠেন। বিদ্যাভূষণের তত্ত্বাবধানে তিনি নবাবী আমলের ইতিহাস অবলম্বন করে লেখেন বাঙ্গলার বেগম (১৩১৯)। এটি তাঁর প্রথম গ্রন্থ। তবে তিনি যদুনাথ সরকারের সান্নিধ্য লাভ করে ইতিহাস অনুশীলনের বৈজ্ঞানিক ধারার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান। এ সময়ে তিনি মোগল যুগকে বিষয় করে কয়েকটি বই রচনা করেন, যেমন Begams of Bengal (১৯১৫), নূরজহান (১৩২৩), বেগম সমরু (১৩২৪), মোগল যুগে স্ত্রীশিক্ষা (১৩২৬), মোগল-বিদুষী (১৩২৬), জহান-আরা (১৩২৭), দিল্লীশ্বর (১৩৩০) প্রভৃতি।

ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের তিনটি গ্রন্থ- Rajah Rammohun Roy’s Mission to England (১৮২৬), Dawn of New India (১৯২৭) ও বিদ্যাসাগর প্রসঙ্গ (১৩৩৮) বাঙালি বিদ্বৎসমাজকে নাড়া দেয়। বিশেষত, রামমোহন ও বিদ্যাসাগর সম্পর্কে তিনি অনেক নতুন তথ্য পরিবেশন করেন। গবেষণাকর্মে তাঁর পারদর্শিতা অর্জন এবং পন্ডিতমহলে সে গবেষণাকর্মের নির্ভরযোগ্যতা লাভ, তাঁকে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌছে দেয়। তিনি ১৯২৯ সালে প্রবাসী ও Modern Review পত্রিকার সহকারী সম্পাদক নিযুক্ত হন। বাংলা ১৩৩৭ সনে বঙ্গীয় সাহিত্য-পরিষদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কে গড়ে ওঠে। ১৩৩৯ সনে তিনি পরিষদের কার্য-নির্বাহক-সমিতির সভ্য হন এবং ১৩৪১ সনে পরিষদের ‘আজীবন সদস্য’ পদ লাভ করেন।  পরে গ্রন্থাধ্যক্ষ (১৩৪০-৪১, ১৩৫২-৫৫), সহকারী সম্পাদক (১৩৪১-৪২), পরিষদ পত্রিকার সম্পাদক (১৩৪৫-৪৬) পরিষদের সম্পাদক (১৩৪৭-৫১, ১৩৫৬-৫৯) প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিযুক্ত হন।

ইতোমধ্যে শোভাবাজার-রাজবাড়ির গ্রন্থাগার থেকে তিনি বাংলা সংবাদপত্র সমাচার দর্পণ-এর পুরো ফাইল ও অন্যান্য সাময়িক পত্রিকার বিপুল ভান্ডার আবিষ্কার করেন। উনিশ শতকের সাহিত্য, সমাজ, সংস্কৃতি ও ইতিহাস জানার ক্ষেত্রে এসব সাময়িক পত্রিকার গুরুত্ব অপরিসীম বিধায় এসব সাময়িক পত্রিকার ভিত্তিতে তিনি রচনা করেন সংবাদপত্রে সেকালের কথা (৩ খন্ড, ১৩৩৯, ১৩৪০, ১৩৪২), বঙ্গীয় নাট্যশালার ইতিহাস (১৩৪২), বাংলা সাময়িক পত্র (১৩৪৬), বাংলা সাময়িক সাহিত্য: ১৮১৮-৬৭ (১৩৫১), সাময়িকপত্র সম্পাদনে বঙ্গনারী (১৩৫৭) প্রভৃতি গ্রন্থ।

উনিশ শতকের বহু দুর্লভ গ্রন্থহকে তিনি এগারো খন্ডে দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থমালা (১৩৪৩-১৩৪৬) শিরোনামে সম্পাদনা করেন। তাঁর চেষ্টায় পরিষদের গ্রন্থপ্রকাশ বিভাগের কার্যসূচি নতুনভাবে পরিকল্পিত হলে বাংলা সাহিত্যের সাধকদের রচনাবলী পুনঃপ্রচারের ব্যবস্থা হয়। মৃত্যুঞ্জয়-গ্রন্থাবলী (১৩৪৬) সম্পাদনা করে তিনি এর নতুন ধারার সূচনা করেন। পরে সজনীকান্ত দাসসহ সম্পাদনা করেন বিদ্যাসাগর-গ্রন্থাবলী (৩ খন্ড, ১৩৪৪-১৩৪৬), বঙ্কিম-রচনাবলী (৯ খন্ড, ১৩৪৫-১৩৪৮), মধুসূদন-গ্রন্থাবলী (২ খন্ড, ১৩৪৭-১৩৪৮), ভারতচন্দ্র-গ্রন্থাবলী (২ খন্ড, ১৩৪৯-১৩৫০), দীনবন্ধু-গ্রন্থাবলী (২ খন্ড, ১৩৫০-১৩৫১), রামমোহন-গ্রন্থাবলী (২ খন্ড, ১৩৫১-১৩৫২), দ্বিজেন্দ্রলাল-গ্রন্থাবলী (১৩৫৩), রামেন্দ্র-রচনাবলী (৫ খন্ড, ১৩৫৬-১৩৫৭), বলেন্দ্র-গ্রন্থাবলী (১৩৫৯) প্রভৃতি। ফলে বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষদের স্থায়ী আয়ের পথ প্রশস্ত হয়। প্রবর্তিত হয় পরিষদের কর্মীদের জন্য প্রভিডেন্ট ফান্ড ও পূজা বোনাস ব্যবস্থা।

ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অপর শ্রেষ্ঠ কীর্তি ‘সাহিত্য-সাধক-চরিতমালা’ নিয়মিতভাবে বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ কর্তৃক প্রকাশিত হয়। এ সিরিজের জীবনী গ্রন্থের মধ্যে তিনি নিজেই লেখেন পঁচানববইটি। এগুলি বাঙালি সাহিত্য-সেবীদের জীবন-আলোচনায় এবং বাংলা ভাষায় জীবনী সাহিত্যের মূল্যবান দলিল হিসেবে গণ্য।

বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষদের পরিচালনায় ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। অপরদিকে তাঁর রচিত, সম্পাদিত ও সঙ্কলিত বাংলা ও ইংরেজি গ্রন্থগুলি গবেষণাকর্ম হিসেবে মূল্যবান। তাঁর রচিত প্রবন্ধ ও গ্রন্থগুলি নবাবিষ্কৃত ও প্রামাণিক তথ্যের প্রাচুর্য, আবেগহীন ও অত্যুক্তিবর্জিত সরল ভাষা, নিরপেক্ষ সত্যানুসন্ধান প্রভৃতি গুণের জন্য উল্লেখযোগ্য। তিনি তাঁর গবেষণাকর্মের মাধমে উনিশ শতকের বাঙালি সাহিত্য-সাধক, বাংলা সাহিত্য, সমাজ ও সাময়িকপত্রের দিকে নতুন করে আলো ফেলে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ফলে উনিশ শতকের সমাজ-ইতিহাসের জ্ঞানক্ষেত্র প্রশস্ত হয়ে ওঠে।

তিনি বিভিন্ন সময়ে তাঁর গবেষণাকর্মের জন্য পুরস্কৃত হয়েছেন। ১৯২৮ সালে Calcutta Historical Society তাঁকে Honorary Member মনোনীত করেন; ১৯৩৭ সালে বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ ‘রামপ্রাণ স্বর্ণপদক’ ও ১৯৫১-৫২ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ‘রবীন্দ্রস্মৃতি পুরস্কার’ দিয়ে তাঁকে সম্মানিত করেন। তিনি ১৩৫৩ সালে বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ থেকে লাভ করেন ‘অক্ষয়কুমার বড়াল রৌপ্যপদক’। তাঁর মৃত্যু, ১৯৫২ সালের ৩ অক্টোবর।  [মুহম্মদ সাইফুল ইসলাম]