বন্দ্যোপাধ্যায়, উমেশচন্দ্র


বন্দ্যোপাধ্যায়, উমেশচন্দ্র (১৮৪৪-১৯০৬)  আইনজীবী, রাজনীতিক। জন্ম কলকাতার দক্ষিণ শহরতলী খিদিরপুরে ১৮৪৪ সালে। তাঁর পিতা উকিল হলেও উমেশচন্দ্রকে লেখাপড়ার জন্যে ইংল্যান্ডে পাঠানোর মতো ভালো আর্থিক অবস্থা তাঁর ছিল না; এমনকি পাঠানোর ইচ্ছাও ছিল না, কারণ সেকালে কালাপানি পার হওয়ার বিরুদ্ধে সমাজের কঠোর মনোভাব ছিল। উমেশচন্দ্র তাঁর পিতার বন্ধু ককরেল স্মিথের সাহায্য নিয়ে ১৮৬৪ সালে রুস্তমজী জামশেদজী জিজিবাই বৃত্তি পেয়ে ইংল্যান্ডে আইন অধ্যয়ন করতে যান। পরিবার এবং পরিচিতদের রোষ এড়ানোর জন্যে তাঁকে বাড়ি থেকে পালিয়ে যেতে হয়েছিল এবং লন্ডনে পৌঁছে পিতাকে তিনি তাঁর অবস্থানের কথা জানান। ১৮৬৭ সালের জুন মাসে তিনি ব্যারিস্টার হন এবং তার প্রায় দেড় বছর পরে কলকাতায় ফিরে ১৮৬৮ সালের নভেম্বর মাসে কলকাতা হাইকোর্টে আইন-ব্যবসা আরম্ভ করেন।

লন্ডনে থাকার সময়েই তিনি তাঁর নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা প্রদর্শন করেন। দাদাভাই নওরোজির সহায়তার সেখানে তিনি ভারতীয়দের জন্যে একটি সমিতি গঠন করেন।  পরে ১৮৭৬ সালে ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন স্থাপনে তিনি তাঁর বন্ধু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে সাহায্য করেন। এটি ছিল ভারতবর্ষের প্রথম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান।  ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস (১৮৮৫) প্রতিষ্ঠায়ও তিনি সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। তিনি এর প্রথম এবং অষ্টম সভাপতি মনোনীত হন। তিনি বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক কাউন্সিলেরও সদস্য ছিলেন ১৮৯৩ থেকে ১৮৯৫ সাল পর্যন্ত। রাজনীতিতে দারুণ উৎসাহী ছিলেন বলে ১৮৯৮ সালে তিনি লিবারেল দলের প্রার্থী হিসেবে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের হাউস অব কমন্সের নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করেন।

উমেশচন্দ্র ছিলেন উদারনৈতিক বিলেতপ্রেমী এবং স্ত্রীশিক্ষার উৎসাহী সমর্থক। সেজন্যে তিনি বিলেত থেকে ফিরেই তাঁর নিরক্ষর স্ত্রী হেমাঙ্গিনীকে ইংরেজি শিক্ষা দেওয়া জন্যে চেষ্টা করেন এবং তাঁর পোশাকের আমূল সংস্কার করে তাঁকে আধুনিকা করে তোলেন। তাতেও সন্তুষ্ট হতে না-পারায়, পুরোপুরি ইউরোপীয় করে গড়ে তোলার উদ্দেশে তিন সন্তান সহ তাঁকে তিনি বিলেতে পাঠান ১৮৭৪ সালের প্রথম দিকে। ১৮৮৮ সালে উমেশচন্দ্র লন্ডনের দক্ষিণ শহরতলীতে একটি বাড়ি কেনার পর হেমাঙ্গিনী তাঁর সন্তানদের নিয়ে স্থায়ীভাবে লন্ডনে বাস করতে থাকেন। এই বাড়িটি কার্যত প্রবাসী ভারতীয়দের রাজনীতির আখড়ায় পরিণত হয়। উমেশচন্দ্রের পুত্র এবং কন্যারা অক্সফোর্ড ও কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন।

উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে আনুষ্ঠানিক ধর্মে বিশ্বাস হারিয়ে ফেললেও তিনি তাঁর স্ত্রীকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষা নিতে আপত্তি করেননি। তিনি তাঁর পরিবারকে নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন যে, তাঁর মৃত্যুর পরে যেন কোনো ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করা না হয়।

কর্মজীবন থেকে অবসর নেওয়ার পর উমেশচন্দ্র ১৯০২ সাল থেকে স্থায়ীভাবে লন্ডনে বাস করেন এবং ১৯০৬ সালে মারা যান।  [গোলাম মুরশিদ]