বনশিল্প


বনশিল্প  ব্রিটিশ শাসনামলে বনশিল্পের অস্তিত্ব ছিল খুবই নগণ্য। ১৯৫০-এর দশকে ব্যক্তিমালিকানায় এক্ষেত্রে সামান্য অগ্রগতি সাধিত হয়। ষাটের দশকে পাকিস্তান সরকার বনশিল্প উন্নয়ন সংস্থা (এফআইডিসি) স্থাপন করে, যার লক্ষ্য ছিল দূর বনাঞ্চল থেকে কাঠ আহরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং আধুনিক বনশিল্পের বিকাশ ও উন্নয়ন সাধন। কাঠের বড় বড় গুড়ি বহনের কাজে ঐতিহ্যবাহী হাতির ব্যবহারের সাথে যান্ত্রিক পদ্ধতির প্রচলন শুরু হয়। শিরীষ, বাবলা পাইন, ইউক্যালিপটাস ইত্যাদি দ্রুত বর্ধিষ্ণু গাছ থেকে গুড়ি ও কাঠ সংগ্রহের পরীক্ষা-নিরীক্ষাও চলতে থাকে। এফআইডিসি কক্সবাজারের সন্নিকটে রামুতে চারশত একর জমি জুড়ে এবং চট্টগ্রামের রাউজানে সমপরিমাণ জমিতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে রাবার বাগান স্থাপন করেছে। সিলেট এবং টাঙ্গাইলে আরও কিছুসংখ্যক ছোট আকারের রাবার বাগান স্থাপন করা হয়েছে। কাগজ ও বোর্ড শিল্পের উন্নয়ন এবং মিলে ব্যবহারের জন্য কাঠ ও বাঁশ আহরণ এফআইডিসি-র দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। ১৯৭২ সালে কাগজ ও বোর্ড শিল্প কর্পোরেশন স্থাপন করা হয়, যা পরবর্তীকালে ১৯৭৬ সালে রসায়ন শিল্প উন্নয়ন সংস্থার সাথে একীভূত হয়। ১৯৮০ ও ১৯৯০ সালের মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি খাতে ধীরে ধীরে অনেক নতুন শিল্প গড়ে ওঠে এবং দেশের আর্থিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটা ভিত্তি রচনা করে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বনশিল্প হচ্ছে কাঠ আহরণ। পার্বত্য চট্টগ্রামের সংরক্ষিত বন এলাকায় (কাসালং, কাপ্তাই এবং রাইনকিয়ং) ঢাকা ও ময়মনসিংহের বন এলাকায়, সিলেট ও শ্রীমঙ্গলের বন এলাকায় এবং সুন্দরবন এলাকায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কাঠ মজুত রয়েছে। বনশিল্প সংস্থার মাধ্যমে সরকার কাঠভিত্তিক বিভিন্ন প্রকল্প পরিচালনা করছে, এদের মধ্যে একটি হচ্ছে কাঠ আহরণ করার এবং অন্য তেরোটির মধ্যে রয়েছে করাত কল, কাঠ প্রক্রিয়াজাতকরণ, কেবিনেট, দরজা-জানালা তৈরিসহ অন্যান্য সামগ্রী তৈরি করা। বনশিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ দানের জন্য কাপ্তাইয়ে একটি মাত্র প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে। প্রশিক্ষণের সুযোগ-সুবিধা কেবল বনাঞ্চলে কাঠ আহরণ, যন্ত্রপাতির সংরক্ষণ ও করাত কলের মেরামত কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

প্রধান প্রধান বনশিল্পের মধ্যে রয়েছে করাত কল, কাগজ ও মন্ড তৈরি, প্লাইউড/ভিনিয়ার, দিয়াশলাই এবং প্যানেল বোর্ড তৈরি। বনশিল্পে গুরুত্বের দিকে দ্বিতীয় পর্যায়ে রয়েছে আসবাবপত্র তৈরি এবং কাঠ সিজনিং ও প্রক্রিয়াজাতকরণ।বনশিল্পের আওতায় কাঠনির্ভর নয় এমন কিছু ছোট ছোট কল-কারখানা আছে যেগুলিতে বাঁশ ও বেতের উপর ভিত্তি করে হস্তশিল্প, প্রাকৃতিক ভেষজ তৈরি ও সরবরাহ, লাক্ষা থেকে তৈরি বার্নিশ, ওক গাছ থেকে সংগৃহীত রং তৈরি ও কাঠ শুকানোর কারখানা অন্তর্ভুক্ত।

বর্তমানে প্রায় ৬০ লক্ষ কিউবিক মিটার কাঠ চেরার ক্ষমতাসম্পন্ন করাত কল স্থাপিত হয়েছে, যদিও প্রকৃত উৎপাদন ২৭ লক্ষ কিউবিক মিটার। মোট কাগজ ও মন্ড তৈরির ক্ষমতা হচ্ছে ১৫ কোটি টন আর শিল্প-কারখানাগুলি তার মোট উৎপাদন ক্ষমতার শতকরা ৮৩ ভাগ উৎপাদন করছে। হাডবোর্ড, পার্টিক্যালবোর্ড এবং প্লাইউডের সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা হচ্ছে ৮০ লক্ষ বর্গমিটার, তবে উৎপাদন হচ্ছে এর শতকরা ৭০ ভাগ। করাত কল বাংলাদেশে এখন অন্যতম প্রসারণশীল শিল্প। বর্তমানে দেশে প্রায় ৫ হাজার করাত কল রয়েছে এবং এসব কারখানায় ৩৫ হাজার শ্রমিক নিয়োজিত আছে। এইসব কারখানা মূলত ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, সিলেট এবং রাজশাহীতে অবস্থিত। এ সকল কারখানায় সবধরনের কাঠেরই ব্যবহার রয়েছে।

মূল্য সংযোজনের বিবেচনায় কাগজ ও মন্ড তৈরির শিল্প অর্থনৈতিক গুরুত্বের দিক থেকে কাঠশিল্পে দ্বিতীয় স্থানের অধিকারী। এসব কারখানা খুলনা (খালিশপুর), চট্টগ্রাম (চন্দ্রঘোনা) সিলেট (ছাতক) এবং সম্প্রতি ঢাকার বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে। এগুলির প্রধান কাঁচামাল হচ্ছে বাঁশ, শিরীষ ও গেওয়া জাতীয় নরম কাঠ। এর পরেই রয়েছে প্লাইউড এবং ভিনিয়ার (সস্তা কাঠের আস্তরণ) তৈরি করার শিল্পের স্থান। এসব কারখানা চট্টগ্রামে অবস্থিত এবং প্রধানত চায়ের বাক্স তৈরির কাজে নিয়োজিত। যেসব গাছ থেকে এইসব শিল্পের কাঁচামাল বা কাঠ আহরিত হয় তার মধ্যে রয়েছে সিভিট, শিমুল, চান্দুল, আম এবং কালাহুজা।

দিয়াশলাই তৈরি হচ্ছে অন্যতম প্রাচীন এবং সবচেয়ে বেশি সম্প্রসারিত কাঠশিল্প। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, ঢাকা এবং খুলনায় মোট পাঁচটি বৃহৎ শিল্প ইউনিট রয়েছে, যেখানে বাজারের শতকরা ৯৫ ভাগ দিয়াশলাই উৎপাদিত হয়। বাকি ৫% উৎপাদিত হয় ১৮টি মধ্যম এবং দুশ ছোট কারখানায়। এসব ছোট কারখানা ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, কুমিল্লা, বগুড়া এবং সিলেটে অবস্থিত। সম্প্রতি পেট্রোলিয়াম লাইটারের ক্রমবর্ধমান প্রচলনের ফলে দিয়াশলাইয়ের চাহিদা হ্রাস পেয়েছে। এসব কারখানায় ব্যবহূত নরম কাঠের মধ্যে রয়েছে শিমুল, সিভিট, গেওয়া, কদম, পিটালি, কড়ই, পশুর এবং ছাতিম। মোট কাঁচামালের চাহিদা হচ্ছে প্রায় ৯০ হাজার ঘনমিটার।

বাংলাদেশে উৎপাদিত কাঠের যৌগিক পণ্যগুলিকে দুভাগে ভাগ করা যায় হার্ডবোর্ড এবং পার্টিক্যাল বোর্ড। তবে এই উভয় প্রকারের বোর্ড তৈরিতেই জ্বালানি কাঠ এবং কাঠশিল্পের উপজাতকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। দেশে অন্তত ৬৭টি শিল্পসংস্থা রয়েছে যারা উৎপাদন কাজে ১৯ মিলিমিটার পুরু কাঠ ব্যবহার করছে এবং এগুলির প্রস্ত্ততকারী হচ্ছে সাতটি প্রাথমিক উৎপাদনকারী শিল্পসংস্থা যাদের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ৫৫ লক্ষ বর্গমিটার। এসব কারখানাগুলি মূলত চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, খুলনায় অবস্থিত। খুলনা হার্ডবোর্ড শিল্পে কাঁচামাল হিসেবে শুধু সুন্দরী কাঠ ব্যবহার করা হয়।করাত কলের পাশাপাশি আরেকটি সম্প্রসারণশীল ক্ষুদ্রশিল্প বা কুটির শিল্প হচ্ছে আসবাবপত্র তৈরি। সারাদেশে এ ধরনের ছোটবড় প্রায় ৪০ হাজার আসবাবপত্র তৈরির স্থাপনা রয়েছে, যেগুলিতে প্রায় এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার শ্রমিক কাজ করছে। এসব স্থাপনার শতকরা ৩০ ভাগ ৬টি বিভাগীয় শহরে অবস্থিত।

করাত কলের কাঠ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সিজনিং শিল্প দেশের মোট চাহিদার ০.৩% পূরণে সক্ষম। তিনটি কারখানার মোট প্রক্রিয়াকরণ ক্ষমতা হচ্ছে ২০ হাজার ঘনমিটার। আসবাবপত্র তৈরিতে মূলত গর্জন, সেগুন, জাম, চাপালিশ, তেলসুর, চম্পা, রেইনট্রি (পাত্রিকড়ই) কড়ই, কাঁঠাল, জারুল, গামার এবং কেওড়া কাঠ ব্যবহূত হয়।

বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশনের সিলেট, টাঙ্গাইলের মধুপুরে প্রায় ১৮টি রোবার বাগান রয়েছে। চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে ব্যক্তিমালিকানায় কিছু কিছু রাবার বাগান গড়ে উঠেছে এবং সেখানে রাবার কারখানাগুলি শুধু রাবার শিট তৈরি করে যাচ্ছে। দেশে মোট ৫,০০০ মেট্রিক টন রাবার উৎপাদিত হচ্ছে বিগত বছরগুলিতে যার পরিমাণ ছিল ২,০০০ মে. টন।

এছাড়াও দেশের আনাচেকানাচে বহু স্থাপনা রয়েছে, যারা কাঠের আসবাবপত্র তৈরি করছে। এগুলি সবই ব্যক্তিমালিকানাধীন ক্ষুদ্র এবং কুটির শিল্প এদের উৎপাদিত সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে রিকশার বডি, খেলনা, খেলার সামগ্রী, কৃষি উপকরণ, ব্রাশ, বিভিন্ন যন্ত্রের বাট, গরুর গাড়ির চাকা, বাদ্যযন্ত্র, গৃহস্থালির সাজসরঞ্জাম, পাটকলে ব্যবহূত ববিন, নৌকা তৈরি এবং কাগজের বোর্ড তৈরি। এ ধরনের স্থাপনার সংখ্যা প্রায় দশ লক্ষ এবং এর মধ্যে ২ লক্ষ ২০ হাজার বাঁশ ও বেতের সামগ্রী তৈরিতে নিয়োজিত।  [মোস্তফা কামাল পাশা]