বনবিবির জহুরনামা


বনবিবির জহুরনামা পীরমাহাত্ম্যবিষয়ক  পাঁচালি কাব্য। দোভাষী পুথিকার মহম্মদ খান এর রচয়িতা। বনবিবি সুন্দরবনের অধিষ্ঠাত্রী কাল্পনিক পীরানি। তিনি হিন্দুর বনদুর্গা বা বনদেবীর মুসলমানি রূপ। মধ্যযুগীয় লোকসমাজ রোগ-শোক ও হিংস্র জীবজন্তুর প্রকোপ থেকে বাঁচার জন্য এসব কাল্পনিক দৈবসত্তার পূজা করত, তাদের নিকট মানত করত এবং  শির্নী দিত। সেই ধারা এখনও বহমান।

বনবিবি সুন্দরবনের মউল্যা বা মধুসংগ্রহকারী শ্রমজীবীদের রক্ষাকর্ত্রী। গভীর বনে মধু ও মোম সংগ্রহ করতে যাওয়ার আগে তারা বনবিবির উদ্দেশে ক্ষীরাদি অন্নযোগে শির্নী দেয়। এতে বাঘ ও ভূতপ্রেতের ভয় থাকে না বলে তাদের বিশ্বাস, কারণ বনবিবি ওইসব অপশক্তির ওপর কর্তৃত্ব করেন।

আরবি ‘জহুরা’ বা হিন্দি ‘জহুর’ শব্দের অর্থ কৃতিত্ব, অলৌকিক শক্তি; আর ফারসি ‘নামাহ্’ শব্দের অর্থ পুস্তক, নথিপত্র। বনবিবির অলৌকিক কীর্তিকলাপের বিবরণ অর্থে কাব্যের উক্ত নামকরণ হয়েছে। কাব্যের প্রথমাংশে বনবিবির জন্মবৃত্তান্ত, মক্কা থেকে তার ভাটি দেশে আগমন এবং সেখানে তার প্রভাব বিস্তারের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। দ্বিতীয়াংশ ‘ধোনাই-দুখের পালা’য় বনবিবির পূজা প্রবর্তন এবং আঠারো-ভাটিতে তার আধিপত্য প্রতিষ্ঠার বর্ণনা রয়েছে। এটি একটি কাল্পনিক আখ্যান এবং মঙ্গলকাব্যের ঢঙে রচিত। আল্লাহ-রসুল, মক্কা, পীর-পীরানি যুক্ত করে আখ্যানকে ইসলামিকরণ করা হয়েছে। অরণ্যচারী মানুষের বিশ্বাস, ভক্তি ও জীবনধারা এতে বর্ণিত হয়েছে। কাব্যখানি এক সময় খুবই জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল।  [ওয়াকিল আহমদ]