বনকর


বনকর মুগল আমলে বন হতে আদায়কৃত খাজনা। মুগলরা বন সংরক্ষণ ও উন্নয়নের ব্যাপারে বিশেষভাবে সচেতন ছিলেন। কোন গাছ না পুঁতে গাছ কাটা ছিল নিষিদ্ধ। বন থেকে বনকর নামক খাজনা আদায় করে সরকার প্রচুর রাজস্ব লাভ করত। ভূ-জরিপবিদ রেনেলের মানচিত্রে মুগল শাসনাধীন বাংলার অরণ্যরেখা সুস্পষ্টভাবে লক্ষিত হয়। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ সময় পর্যন্ত তিনটি সুচিহ্নিত রেখা ছিল। প্রথমটি ছিল মধ্য ভারতীয় অরণ্যরেখা, যা বর্ধমান, বীরভূম, বিষ্ণুপুর ও মেদিনীপুরে এসে শেষ হয়। দ্বিতীয় অরণ্যরেখাটি ছিল উত্তর-পূর্ববঙ্গের দিকে সম্প্রসারিত হিমালয়ের পাদদেশীয় অরণ্য (মুরাং) যা শেষপর্যন্ত গারো ও জয়ন্তিয়া পাহাড়ের অরণ্যের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। এই অরণ্যশৃঙ্গের অন্তর্ভুক্ত ছিল তিস্তা-মহানন্দা অববাহিকার সুবিশাল বৈকুণ্ঠপুর অরণ্য এবং ময়মনসিংহের আতিয়া পরগনার মধ্য দিয়ে পাবনা থেকে সিলেটমুখী প্রসারিত মধুপুর অরণ্যরাজি। সবচেয়ে বৃহৎ ও দুর্ভেদ্য ছিল সুন্দরবন অরণ্যরাজি নামের উপকূলীয় অরণ্যরেখা। এটি পূর্বে চট্টগ্রাম উপকূল রেখা থেকে পশ্চিমে মেদিনীপুর উপকূল রেখা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। উপকূল রেখা হতে এ অরণ্যের অভ্যন্তরীণ বিস্তৃতি ছিল ২০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত। মুগল সরকার এসব অরণ্যের সর্বোত্তম ব্যবহার করতেন।

জ্বালানির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস ছিল অরণ্যের গাছপালা। গৃহনির্মাণ ও কৃষিকাজের উপকরণ এখান থেকেই নেওয়া হতো। সেচ কার্যের জন্য যন্ত্রপাতি, ধান ভানার ও তেল নিঙড়ানোর যন্ত্র, হস্তশিল্প, লাঙলের ফলা তৈরি, পুল ও সড়ক এবং নর্দমা নির্মাণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, তাঁত প্রভৃতির জন্য অরণ্য থেকে দ্রব্যাদি সংগৃহীত হতো। এই নদীমাতৃক দেশের সর্বোত্তম পরিবহণ ব্যবস্থা নৌকার জন্য প্রয়োজনীয় কাঠও আহরিত হয় অরণ্য থেকে। তাছাড়া অরণ্য থেকে পাওয়া যায় ফলমূল, তৃণলতা, শিকড়, তেল উৎপন্নকারী গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদার্থ, মশলা এবং বিভিন্ন ধরনের রঞ্জক পদার্থ। অরণ্যেই জন্মায় ভোগ কার্পাস নামের তুলা গাছ। বীরভূম ও সিলেটের অরণ্য হতে তসর সিল্ক, লাক্ষা ও গঁদ পাওয়া যায়। মোম এবং মধুও গুরুত্বপূর্ণ অরণ্য সম্পদ। এসব সম্পদের ওপর বিভিন্ন হারে যে খাজনা আরোপ করা হতো তারই সাধারণ নাম ছিল বনকর।  [সিরাজুল ইসলাম]