বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ


বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ  ঢাকার রায়ের বাজার ইটখোলায় নির্মিত। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমাপ্তিলগ্নে পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাদের সহযোগীদের সহায়তায় দেশের যে-সকল শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবী এবং অন্যান্যদের হত্যা করেছিল তাঁদের শ্রদ্ধার নিদর্শন স্বরূপ এটি নির্মাণ করা হয়। যে স্থানটিতে এ হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছিল সেখানেই এ স্মৃতিসৌধটি নির্মিত হয়। নিহত বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ছিলেন শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, সাংবাদিক, লেখক, চলচ্চিত্র পরিচালক ও অন্যান্য পেশাজীবী।

বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ, রায়েরবাজার, ঢাকা

১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ সরকার এ নৃশংস হত্যাকান্ড সংঘটিত হওয়ার স্থানে স্মৃতিসৌধটি নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। বাংলাদেশ সরকারের গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেকটস্ যৌথভাবে স্মৃতিসৌধের নকশা প্রণয়নের জন্য জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতা আহবান করে। ২২টি নকশার মধ্যে স্থপতি ফরিদউদ্দীন আহমেদ ও স্থপতি জামি-আল-শফি প্রণীত নকশাটি নির্বাচিত হয়। গণপূর্ত বিভাগ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব লাভ করে। এ কাজ ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৯ পর্যন্ত তিন বছর সময়ে সম্পন্ন হয়।

সমগ্র স্থানটি ৩.৫১ একর আয়তনবিশিষ্ট। এটি ১৫.২৪ মিটার বর্গাকার একটি গ্রিড দ্বারা বিভক্ত হয়েছে। মূল বেদিটি রাস্তা থেকে ২.৪৪ মিটার উঁচু। স্মৃতিসৌধের প্রধান অংশটি ১৭.৬৮ মি উঁচু, ০.৯১ মি পুরু ও ১১৫.৮২ মি দীর্ঘ একটি ইটের তৈরি বাঁকানো দেয়াল। এটি রায়ের বাজারের আদি ইটখোলার প্রতীক, যেখানে বুদ্ধিজীবীদের মৃতদেহগুলি পড়েছিল। দেয়ালটির দুদিক ভাঙা। এ ভগ্ন দেয়াল ঘটনার দুঃখ ও শোকের গভীরতা নির্দেশ করছে। দেয়ালের দক্ষিণ-পশ্চিম পার্শ্বে একটি ৬.১০ মিটার বর্গায়তনের জানালা আছে। এ জানালা দিয়ে পেছনের আকাশ দেখা যায়। জানালাটি দেয়ালের বিশালতাকে কমিয়ে আনে।

বাঁকা দেয়ালের সম্মুখভাগে একটি স্থির জলাধার আছে। জলাধারের ভেতর থেকে কালো গ্র্যানাইট পাথরের একটি স্তম্ভ উঠে এসেছে। এটি শোকের প্রতীক। স্মৃতিসৌধের প্রধান প্রবেশপথ চত্বরের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে। এপথে প্রবেশ করলে দর্শনার্থী একটি বটগাছের মুখোমুখি হন। এই বটগাছ নিকটবর্তী শরীর-শিক্ষা কলেজ প্রাঙ্গণস্থ আদি বটগাছের প্রতীকরূপ। আদি বটগাছের নিচে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের ধরে এনে প্রথমে শারীরিকভাবে নির্যাতন করে পরে ইটখোলায় নিয়ে হত্যা করা হতো। চিরসবুজ বটগাছটি ছাড়া অন্য যেসব গাছ সৌধের চত্বরে লাগানো হয়েছে, সেগুলির পাতা নির্দিষ্ট সময়ে ঝরে যায়। এ গাছগুলি ডিসেম্বরে মাসে পত্রহীন অবস্থায় থাকে। এ দৃশ্য বার্ষিক অনুষ্ঠানের সময় শোকানুভূতিকে আরও আবেগময় করে তোলে।

সৌধচত্বরে একটি ছোট জাদুঘর, অফিস কক্ষসহ একটি পাঠাগার এবং একটি কবরস্থান নির্মাণের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আছে। [শহীদুল আমিন]