বদর আউলিয়া


বদর আউলিয়া  (১৪ শতক)  একজন দরবেশ। তিনি অপর এগারোজন দরবেশের সঙ্গে চট্টগ্রাম এসেছিলেন বলে কথিত আছে। এ দরবেশগণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে সমাহিত আছেন। বারোজন দরবেশের মধ্যে বদর আউলিয়াকেই প্রধান হিসেবে সম্মান দেখানো হয়। বদর আউলিয়া চট্টগ্রামে ইসলাম প্রচার করেন। এ কারণে লোকপ্রিয়ভাবে চট্টগ্রাম ‘বারো আউলিয়ার দেশ’ (বারো দরবেশের দেশ) বলে পরিচিতি লাভ করে। ঐতিহ্য অনুসারে, চট্টগ্রাম জেলার মানব বসতির সাথে বদর আউলিয়ার নাম জড়িত। চট্টগ্রামের অধিবাসীরা তাঁকে তাদের অভিভাবক হিসেবে গভীর শ্রদ্ধা করে।

বৌদ্ধ, হিন্দু ও চৈনিকগণ বদর আউলিয়াকে পরমেশ্বর অথবা আত্মার অধস্তন হিসেবে ভক্তি করে। অন্যদিকে মুসলিমগণ তাঁকে আউলিয়া বা দরবেশ হিসেবে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে। পূর্ব বাংলার মাঝিরা অন্য পাঁচজন দরবেশের (যারা পাঁচ পীর নামে পরিচিত) সাথে বদর আউলিয়ার নাম উচ্চারণ করে থাকে। সমুদ্রউপকূল ধরে দক্ষিণে সুদূর মালয় উপদ্বীপ ছাড়িয়েও সমুদ্রগামীদের কাছে তিনি নিত্যদিনের রক্ষক হিসেবে বিবেচিত। আরাকানের মধ্যযুগীয় বৌদ্ধ রাজাগণ তাঁর সমাধির জন্য কয়েকটি গ্রাম ওয়াকফ করে দেন এবং তারা তীর্থযাত্রী হিসেবে এ পবিত্র মাজারে আসতেন ও মাজারে দান করতেন। মায়ানমারের টেনাসেরিমের জনগণ তাঁকে মাদরা বলে ডাকত। আকিয়াবের অধিবাসীদের কাছে তিনি বুদ্ধ আউলিয়া বা বুদ্ধ সাহেব হিসেবে পরিচিত। চট্টগ্রামের অধিবাসীরা তাঁকে বিভিন্ন নামে ডাকে যেমন, বদর আলম, বদর আউলিয়া, বদর পীর বা পীর বদর ও বদর শাহ। মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে তাঁর নাম ‘শাহ বদর আলম’ হিসেবে পাওয়া যায়।

চট্টগ্রামের পুরাতন দুর্গ এলাকা অন্দরকিলার অন্তর্গত বর্তমানের বখশীর হাটের নিকটবর্তী বদরপট্টি বা বদরপটি নামে পরিচিত স্থানে বদর আউলিয়ার মাযার অবস্থিত। প্রাচীরবেষ্টিত মাযার কমপ্লেক্সটির পূর্ব দিকে রয়েছে একটি প্রবেশপথ, সমাধিসৌধ ও একটি পাকা কুয়া। চতুর্ভুজাকার সমাধিসৌধটি অত্যন্ত পুরু ও শক্ত প্রাচীর দিয়ে নির্মিত হয়েছে। উপরে ছাদটি সামান্য ঢালু এবং একটি বড় গম্বুজ দ্বারা আচ্ছাদিত। মাজারের পশ্চিম ফাসাদে বেলেপাথরের একটি শিলালিপি রয়েছে। শিলালিপিতে অনুভূমিকভাবে নাসখ রীতিতে পাঁচ লাইনে আরবি লিপি উৎকীর্ণ।

মাযারের পূর্বদিক থেকে প্রবেশের জন্য একটি সূচ্যগ্র খিলানপথ রয়েছে। খিলানপথটি গম্বুজ আচ্ছাদিত বিশাল একটি অভিক্ষিপ্ত অবকাঠামোর কুলুঙ্গির কেন্দ্রে স্থাপিত। গম্বুজের প্রাধান্যকে অক্ষুণ্ণ রেখেই এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে চারটি ছোট মিনার ছাদের উপর থেকে উত্থিত হয়েছে। মিনারগুলি ছোট গম্বুজ দ্বারা আচ্ছাদিত। স্থানীয় প্রবীণ অধিবাসিগণ বলেন যে, সমাধি কমপ্লেক্সের পশ্চিম দিকে আরও একটি প্রবেশপথ ছিল। ১৯৬০ সালে বারান্দা সংযোজনের কারণে এটি ধ্বংস করা হয়। মাযারের উত্তরপূর্ব কোণে একটি পরিত্যক্ত পাকা কুয়া আছে। অতীতে এটির পানি ওজুর জন্য ব্যবহূত হতো। জনশ্রুতি আছে যে, এ পবিত্র কুয়ার পানি দিয়ে গোসল করলে অসুস্থ ব্যক্তি ভাল হয়ে যেতো।  [শামসুল হোসাইন]