বজরা শাহী মসজিদ


বজরা শাহী মসজিদ নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ থানাধীন বজরা নামক গ্রামের একটি বড় পুকুরের উত্তরপাড়ে অবস্থিত। এ পুকুরে একটি বাঁধানো ঘাট আছে। প্রধান প্রবেশপথের উপর স্থাপিত একটি শিলালিপির বর্ণনা অনুযায়ী মুগল সম্রাট মুহম্মদ শাহের আমলে জনৈক আমানউল্লাহ কর্তৃক ১৭৪১-৪২ সালে মসজিদটি নির্মিত হয়।

বেষ্টনী দেওয়ালের প্রবেশপথের উপরাংশে এবং মসজিদের ভেতরের দেওয়ালে লাগানো বাংলা ও ফারসি ভাষায় লিখিত শিলালিপির তথ্যানুযায়ী বাংলা ১৩১৮ (১৯১১ ইং) থেকে ১৩৩৫ (১৯২৮ ইং) সনের মধ্যে বজরার জমিদার খান বাহাদুর আলী আহমদ এবং খান বাহাদুর মুজির উদ্দীন আহমদ কর্তৃক এ মসজিদ সম্পূর্ণরূপে সংস্কার করা হয়েছে। মসজিদের দক্ষিণ দেয়ালে সংস্থাপিত একটি বাংলা শিলালিপিতে উল্লেখ আছে যে,  ঢাকার বেনজীর উস্তাগর মসজিদের সংস্কার কাজ সম্পাদন করেন। চীনামাটির পাত্রের টুকরার সাহায্যে করা অলংকরণও ওই সময়েই করা। মসজিদটি বর্তমানে বেশ ভাল অবস্থায় সংরক্ষিত আছে।

বজরা শাহী মসজিদ

একটি উঁচু মঞ্চের পশ্চিম দিকের অর্ধেকটা জুড়ে নির্মিত মসজিদটি পূর্বদিকের মধ্যভাগে একটি চিত্তাকর্ষক তোরণসহ বহির্দেওয়াল দ্বারা ঘেরা। ইটের তৈরি মসজিদটি পরিকল্পনায় আয়তাকার (১৬ মি. × ৭.৩২ মি.)। এর বাইরের চার কোণায় রয়েছে অষ্টভুজাকৃতির বুরুজ এবং এর দেওয়ালের পুরুত্ব ছিল ১.২২ মি.। ইমারতটির পূর্বদিকে তিনটি খিলানপথ আছে এবং উত্তর ও দক্ষিণ দিকের প্রত্যেক দেওয়ালে রয়েছে একটি করে খিলানপথ। সবগুলি প্রবেশপথই বাইরের দিকে অভিক্ষিপ্ত এবং এর উভয় পার্শ্বে আছে সরু মিনার। কিন্তু পূর্বদিকের মাঝের প্রবেশ পথের অভিক্ষেপ ও আকৃতি তুলনামূলকভাবে বড়। অর্ধগম্বুজাকৃতির ভল্টের নিচে উন্মুক্ত পূর্বদিকের তিনটি খিলানপথের বাইরের দিকে বহুখাঁজ নকশা আছে। পূর্বদিকের তিনটি প্রবেশপথের বরাবরে কিবলা দেয়ালের অভ্যন্তরে তিনটি অর্ধঅষ্টভুজাকৃতির মিহরাব আছে। এগুলির মধ্যে মাঝেরটি অপেক্ষাকৃত বড়। সবগুলি মিহরাবই দেওয়ালের পেছন দিকে আয়তাকার অভিক্ষেপের মধ্যে স্থাপিত। অভিক্ষেপের উভয় পার্শ্বে রয়েছে ছোট বুরুজ। প্রবেশপথ ও চার অষ্টভুজাকৃতির কোণার মিনারসহ মিহরাব অভিক্ষেপের প্রান্তস্থিত ছোট বুরুজগুলি অনুভূমিক বপ্র ছাড়িয়ে উঠে গেছে এবং এর শীর্ষসমূহে আছে নিরেট ছত্রী ও কলস চূড়াসহ ছোট গম্বুজ।

মসজিদের অভ্যন্তরীণ কক্ষটি দুটি সুন্দর বহুখাঁজবিশিষ্ট আড়াআড়ি খিলান দ্বারা তিনটি ‘বে’-তে বিভক্ত। মাঝের ‘বে’-টি বর্গাকার এবং পার্শ্ববর্তী দুটি আয়তাকার। ছাদের উপর অষ্টকোণাকার পিপার উপর স্থাপিত তিনটি কন্দাকৃতির গম্বুজ আছে। এগুলির শীর্ষ পদ্ম ও কলস চূড়া দ্বারা সুশোভিত। মাঝের গম্বুজটি অন্যদুটির চেয়ে বড়। এটির ভার বহন করছে উপরস্থ কোণাগুলির উপর স্থাপিত ক্ষুদ্র অর্ধগম্বুজাকৃতির স্কুইঞ্চ। পূর্বদিকের অর্ধগম্বুজাকৃতির খিলানছাদ, দেয়াল ও কোণের ত্রিকোণাকৃতির পেন্ডেন্টিভসমূহ বহন করছে পাশের ক্ষুদ্রাকৃতি গম্বুজগুলির ভার।

আনুভূমিক প্যারাপেট ও অষ্টকোণাকৃতির পিপাগুলির বহির্মুখে কয়েকটি সারিবদ্ধ মারলোন নকশা দেখা যায়। বৈচিত্র্যপূর্ণ নানা ধরনের খোপ খিলান নকশা দ্বারা মসজিদের বাহির ও ভেতরের দেওয়ালগুলি চমৎকারভাবে অলঙ্কৃত। প্রধান মিহরাবটিতে রয়েছে জাঁকালো স্টাকো অলঙ্করণ। আদিতে ইমারতটি পলেস্তরায় আবৃত ছিল, কিন্তু বর্তমানে এর প্রতিটি অংশ বিভিন্ন রংয়ের চীনা মাটির পাত্রের টুকরা দ্বারা অতিসূক্ষ্মভাবে অলঙ্কৃত করা হয়েছে।  [এম.এ বারি]