বঙ্গোপসাগর


বঙ্গোপসাগর (Bay of Bengal)  ভারত মহাসাগরের উত্তরের সম্প্রসারিত বাহু। ভৌগোলিকভাবে ৫° উত্তর ও ২২° দক্ষিণ অক্ষাংশ এবং ৮০° পূর্ব ও ১০০° পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে বঙ্গোপসাগর অবস্থিত। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ এ উপসাগরটি পশ্চিমে ভারত ও শ্রীলংকার পূর্ব উপকূল, উত্তরে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদীপ্রণালী সৃষ্ট বদ্বীপ এবং পূর্বে মায়ানমার উপদ্বীপ থেকে আন্দামান-নিকোবর শৈলশিরা (ridges) পর্যন্ত বিস্তৃত ভূভাগ দ্বারা বঙ্গোপসাগর তিনদিকে আবদ্ধ। বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ সীমা শ্রীলংকার দক্ষিণে দন্দ্রা চূড়া (Dondra Head) থেকে সুমাত্রার উত্তর প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। সর্বমোট প্রায় ২২ লক্ষ বর্গ কিমি আয়তনের বিশাল এলাকা জুড়ে বঙ্গোপসাগর বিস্তৃত। এর গড় গভীরতা প্রায় ২,৬০০ মিটার এবং সর্বোচ্চ গভীরতা ৫,২৫৮ মিটার। বঙ্গোপসাগরের সর্বউত্তর প্রান্তে বাংলাদেশ অবস্থিত।

BayOfBengal.jpg

তলদেশীয় ভূসংস্থান (Bottom topography)  বিস্তীর্ণ ইউ-আকৃতির (U-shaped) অববাহিকা দ্বারা বঙ্গোপসাগরের তলদেশ বৈশিষ্ট্যমন্ডিত যেটি দক্ষিণে ভারত মহাসাগরে উন্মুক্ত। একটি সমরূপ অতল সমভূমি (abyssal plain) বঙ্গোপসাগরের প্রায় সমগ্র তলদেশ জুড়ে রয়েছে যেটি ৮-১০° কোণে দক্ষিণমুখী সুষম ঢালবিশিষ্ট। স্থানে স্থানে এই সমভূমি উপত্যকা দ্বারা কর্তিত।

মহীসোপান (Continental Shelf)  বাংলাদেশের উপকূলে বঙ্গোপসাগরের মহীসোপানের প্রশস্ততা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বিভিন্ন। দক্ষিণ উপকূলে হিরণ পয়েন্ট ও সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডের (Swatch of no Ground) মধ্যে এটি ১০০ কিলোমিটারেরও কম প্রশস্ত, আবার কক্সবাজার উপকূলের সম্মুখে ২৫০ কিলোমিটারেরও অধিক প্রশস্ত। সমুদ্র অভিমুখে এবং পশ্চিম অভিমুখের পলল মিহি ও অবসামুদ্রিক (submarine) গিরিখাত সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডের নিকটে সর্বাধিক পুরুত্ববিশিষ্ট কর্দমের সঞ্চয়ন ঘটেছে। চট্টগ্রাম ও টেকনাফ উপকূল অভিমুখী মহীসোপানের অগভীর (২০ মিটারেরও কম) অংশ বালি দ্বারা আবৃত এবং আন্তজোয়ারভাটা এলাকাসমূহ সুগঠিত বালুময় সমুদ্রতট প্রদর্শন করে থাকে। অপরদিকে সুন্দরবন, পটুয়াখালী ও নোয়াখালী উপকূল অভিমুখী মহীসোপানের দক্ষিণ ভাগের অগভীরতর অংশটি পলিকণা ও কর্দম দ্বারা আবৃত এবং উপকূলরেখা বরাবর একটি বিস্তীর্ণ কর্দমাক্ত কটাল সমভূমি (muddy tidal flats) গড়ে উঠেছে। মহীসোপানের এই অংশে অবস্থিত কিছু কিছু মগ্নচরা (shoal) ও বালির মগ্নগিরি (sand ridges) অবসামুদ্রিক গিরিখাত সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডের দিকে সম্প্রসারিত।

সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড  গঙ্গা খাত (Ganga Trough) নামেও অভিহিত। এর তলদেশ তুলনামূলকভাবে সমতল যা ৫ থেকে ৭ কিমি প্রশস্ত এবং এর প্রাচীরসমূহ ১২° কোণে হেলানো। সোপানের প্রান্তভাগে খাতের গভীরতা প্রায় ১,২০০ মিটার। সাগর অভিমুখে এই খাত প্রায় ২,০০০ কিমি পর্যন্ত অবিচ্ছিন্নভাবে বিস্তৃত হয়েছে। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপের মোহনায় বালুচরা এবং শৈলশিরাসমূহ সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডের দিকে মুখ করে গড়ে উঠছে যা থেকে বোঝা যায় যে, নদীবাহিত পললসমূহ এই খাতের মধ্য দিয়ে বঙ্গোপসাগরের গভীরতর অংশে গড়িয়ে পড়ছে। অর্থাৎ সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড-এর মাধ্যমে বঙ্গীয় গভীর সমুদ্র উপবদ্বীপে (Bengal Deep Sea Fan) পলিসমৃদ্ধ ঘোলাটে স্রোত সরবরাহ হয়ে থাকে।

সুন্দা ট্রেঞ্চ (Sunda Trench)  জাভা ট্রেঞ্চ নামেও পরিচিত। নিকোবর ও আন্দামান দ্বীপপুঞ্জদ্বয় সৃষ্ট বাঁকের পশ্চিম পার্শ্বে সমান্তরাল বরাবর এই ট্রেঞ্চ বিস্তৃত হয়েছে। উত্তর অভিমুখে এই ট্রেঞ্চ উপসাগরে ১০° উত্তর অক্ষাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে এবং হিমালয় পর্বতমালার পূর্বসীমার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ভূগাঠনিকভাবে (tectonically) ভারতীয় প্লেট এবং মায়ানমার প্লেটদ্বয়ের মিলনস্থলে এই ট্রেঞ্চ উৎপন্ন হয়েছে।

নাইনটি ইস্ট রিজ (Ninety East Ridge)  উত্তর-দক্ষিণে মোটামুটি ৯০° পূর্ব দ্রাঘিমাংশ বরাবর বিস্তৃত ভারত মহাসাগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবয়ব। বঙ্গীয় উপবদ্বীপ (Bengal Fan) এবং নিকোবর উপবদ্বীপের (Nicobar Fan) মধ্যবর্তী স্থানে সুন্দা ট্রেঞ্চের অতি নিকট প্রান্তে এটি অবস্থিত। বঙ্গোপসাগর গঠিত হওয়ার প্রাথমিক কালেই নাইনটি ইস্ট রিজ অস্তিত্ব লাভ করেছে। এই শৈলশিরাটি একটি নির্দিষ্ট উষ্ণস্থানের চিহ্ন। এটি ভারতীয় প্লেট এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক ভূত্বকের উভয় দিকে মহীসঞ্চারের (drift) সময় গঠিত হয়েছিল।

এইটি ফাইভ রিজ (Eighty-five Ridge)  বঙ্গোপসাগরে ৮৫° পূর্ব দ্রাঘিমাংশ বরাবর বিদ্যমান একটি শৈলশিরা। শৈলশিরার উভয় পার্শ্বে ৫ কিলোমিটারেরও অধিক পুরু পলল সঞ্চিত হয়েছে। পলল দ্বারা আবৃত শৈলশিরার একেবারে নিকট পূর্বে অর্ধবায়ব (subaerial) নিষ্কাশন প্যাটার্নের প্রধান ঘোলাটে স্রোতবিশিষ্ট নদীখাত অবস্থিত।

বঙ্গীয় গভীর সমুদ্র উপবদ্বীপ (Bengal Deep Sea Fan)  বিশ্বের দীর্ঘতম অবসামুদ্রিক উপবদ্বীপ বঙ্গীয় উপবদ্বীপ (Bengal Fan) নামেও পরিচিত। পশ্চিম প্রান্তীয় অঙ্গ নিকোবর উপবদ্বীপ (Nicobar fan) সহ এর মোট আয়তন ৩ × ১০৬ বর্গ কিমি। বঙ্গীয় উপবদ্বীপ ২,৮০০ থেকে ৩,০০০ কিমি দীর্ঘ, ৮৩০ থেকে ১,৪৩০ কিমি প্রশস্ত এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরের তলদেশে ১৬ কিলোমিটারেরও অধিক পুরু। বদ্বীপীয় সম্মুখখাত সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডের মধ্য দিয়ে পলিরাশি এই উপবদ্বীপে সঞ্চিত হয়। বঙ্গীয় গভীর সমুদ্র উপবদ্বীপকে তিনটি অংশে বিভক্ত করা যায়: উচ্চতর উপবদ্বীপ (upper fan), মধ্যবর্তী উপবদ্বীপ (middle fan) এবং নিম্নতর উপবদ্বীপ (lower fan)। ইয়োসিন যুগে (৫ কোটি ৮০ লক্ষ থেকে ৩ কোটি ৭০ লক্ষ বছর পূর্বে) প্রথম আন্তঃপ্লেট সংঘর্ষের পরিণতি হিসেবে প্রারম্ভিক বঙ্গীয় উপবদ্বীপে দ্রুতগতিতে স্থলভাগ থেকে আসা পলল সঞ্চিত হতে থাকে যা বর্তমান সময়কালেও অব্যহত রয়েছে।  [মাহমুদ আলম]

ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যসমূহ পানিতাত্ত্বিক অবস্থা  বঙ্গোপসাগরের পৃষ্ঠতলীয় পানিতত্ত্ব মূলত মৌসুমি বায়ুপ্রবাহ দ্বারা নির্ণীত হয় এবং কিছু পরিমাণে ভারত মহাসাগরের উন্মুক্ত অংশের পানিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য দ্বারাও নিয়ন্ত্রিত হয়। বঙ্গোপসাগরে আপতিত নদীসমূহের মিঠা পানি বা স্বাদুপানি সাগরের উপকূলবর্তী উত্তরাংশকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। বাংলাদেশের নদীসমূহ থেকে বাষ্পীভবন ও চোয়ানোজনিত হ্রাস প্রভৃতি বাদ দিয়ে বছরে ১২২ কোটি ২০ লক্ষ ঘনমিটার স্বাদুপানি সাগরে গিয়ে পতিত হয়। বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণাংশ মহাসাগরের উন্মুক্ত অংশে অবস্থিত হওয়ায় এখানকার তাপমাত্রা, লবণাক্ততা এবং পানির ঘনত্ব মোটামুটি একই প্রকৃতির। বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় অঞ্চল এবং আন্দামান সাগরের উত্তর-পূর্ব অংশে যেখানে নদনদীর সরবরাহকৃত পানির তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব বিদ্যমান সেখানে পানির তাপমাত্রা ও লবণাক্ততায় উপসাগরের উন্মুক্ত অংশ অপেক্ষা ভিন্ন বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়। উপসাগরের দক্ষিণাংশ থেকে আসা তরঙ্গ ও উর্মিমালা (ripples) পানির মিশ্রণের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি যোগায় এবং এই প্রক্রিয়া রাসায়নিক ও ভৌত গুণাবলীতে সমতা আনয়নে সহায়তা করে। অগভীর উপকূলীয় অঞ্চলে জোয়ারভাটার ক্রিয়াও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তাপমাত্রা  বঙ্গোপসাগরের পানিরাশির ঊর্ধ্বপৃষ্ঠের গড় বার্ষিক তাপমাত্রা প্রায় ২৮° সে। সর্বোচ্চ তাপমাত্রা থাকে মে মাসে ৩০°সে এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা থাকে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে ২৫°সে। তবে তাপমাত্রার বার্ষিক পার্থক্য খুব একটা বেশি নয়, উপসাগরের দক্ষিণাংশে মাত্র ২°সে এবং উত্তরাংশে ৫°সে।

লবণাক্ততা  বঙ্গোপসাগরের পানিরাশির উপরের অংশে লবণাক্ততা ৩২% হতে ৩৪.৫% পর্যন্ত ওঠানামা করে এবং উপকূলীয় অঞ্চলে এর ব্যাপ্তি ১০% থেকে ২৫% পর্যন্ত। কিন্তু নদীর মোহনায় পানিরাশির ঊর্ধ্বপৃষ্ঠের লবণাক্ততা থাকে মাত্র ৫% কিংবা তার চেয়েও কম। যদিও কেবলমাত্র শীতকালে নদীগুলোর পানি যোগান দেয়া ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়, উপকূল এলাকার পানিরাশি সারা বছরই ঘোলাটে থাকে। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপীয় উপকূলে গ্রীষ্মকালে লবণাক্ততা কমে মাত্র ১%-তে নেমে যায় এবং শীতকালে বৃদ্ধি পেয়ে তা ১৫ থেকে ২০%-তে পৌঁছায়। বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় অঞ্চল থেকে উন্মুক্ত অংশের দিকে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেতে থাকে। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, ইরাবতী এবং পূর্ব ভারতীয় কয়েকটি নদী যেমন, কৃষ্ণা, গোদাবরী, কাবেরী, মহানদী প্রভৃতির মোহনা এলাকায় বঙ্গোপসাগরের উপরের স্তরের পানিরাশির লবণাক্ততা প্রতিদিন ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়। বিশেষ করে, গ্রীষ্মকালে এই ঘটনা বেশি ঘটে। বৃষ্টিপাত এবং নদীসমূহ থেকে নির্গত পানিরাশির আয়তনের ওপরও মোহনা ও উপকূলীয় এলাকায় সাগরজলের লবণাক্ততার পরিবর্তন বহুলাংশে নির্ভর করে। সাগরে স্বাদুপানির প্রভাব ২০০ থেকে ৩০০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত পরিলক্ষিত হয়। শীতকালের তুলনায় গ্রীষ্মকালে লবণাক্ততা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কম হয়ে থাকে, বিশেষ করে, উপসাগরের উত্তর এবং উত্তরপূর্ব অংশে। প্রাথমিক পর্যায়ে পানিরাশির ঊর্ধ্বপৃষ্ঠ থেকে গভীরতা বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লবণাক্ততার হার ধীর গতিতে বৃদ্ধি পেতে থাকে। বঙ্গোপসাগরে ২০০-৩০০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত এই মাত্রা হচ্ছে প্রায় ৩৫%, ৫০০ মিটার গভীরতায় লবণাক্ততা ৩৫.১০% বা তার কিছু বেশি। আবার অতি গভীরতায় লবণাক্ততা অল্প অল্প করে কমতে থাকে; ১,০০০ মিটার গভীরতায় লবণাক্ততা ৩৪.৯৫% এবং ৪,৫০০ মিটার গভীরতায় তা ৩৪.৭%-তে পৌঁছে।

জোয়ারভাটা  বঙ্গোপসাগরে অর্ধ-আহ্নিক (semi-diurnal) ধরনের জোয়ারভাটা সংঘটিত হয়ে থাকে, অর্থাৎ প্রতি ২৪ ঘণ্টা ৫২ মিনিট সময়কালে দুবার জোয়ার এবং দুবার ভাটা পর্যায়ক্রমে সংঘটিত হয়। জোয়ারভাটার ওপর তলদেশের ভূপ্রকৃতি এবং উপকূলের গঠন প্রকৃতির প্রভাব লক্ষণীয়। অগভীর এলাকা, উপসাগরীয় এলাকা এবং মোহনা এলাকায় জোয়ারভাটা সর্বোচ্চ পরিলক্ষিত হয়। জোয়ার তরঙ্গের গড় উচ্চতা শ্রীলংকা উপকূলে ০.৭ মি এবং গাঙ্গেয় বদ্বীপ উপকূলে ৪.৭১ মি। বঙ্গোপসাগরে কয়েকটি নদীর মুখে জোয়ারভাটা স্রোত (tidal current) সৃষ্টি হয়, যেমন হুগলী এবং মেঘনা নদী।

পানির বর্ণ ও স্বচ্ছতা  বঙ্গোপসাগরের উন্মুক্ত অংশের পানির বর্ণ গাঢ় নীল এবং উপকূলের দিকে পানির বর্ণ ক্রমান্বয়ে পরিবর্তিত হয়ে হাল্কা নীল থেকে সবুজাভ বর্ণের হয়ে থাকে। পানির স্বচ্ছতা যথেষ্ট, কোন কোন স্থানে ৪০ থেকে ৫০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত দেখা যায়। গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর মোহনায় সীমিত এলাকায় কম স্বচ্ছ অঞ্চল এবং অত্যন্ত ঘোলা পানি পরিলক্ষিত হয়।

সমুদ্রপৃষ্ঠের ঋতুগত পরিবর্তন  মৌসুমি বায়ু পরিবর্তন এবং সেইসঙ্গে পানিতাত্ত্বিক অন্যান্য বৈশিষ্ট্যসমূহ, যেমন সমুদ্রজলের লবণাক্ততা, উষ্ণতা, পানির ঘনত্ব প্রভৃতি সমুদ্রপৃষ্ঠের ঋতুগত পরিবর্তনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। বিশ্বের সবগুলো সমুদ্র থেকে সংগৃহীত উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের ঋতুগত পরিবর্তনের মতো এত ব্যাপক পরিবর্তন আর কোন সাগর মহাসাগরের বেলায় দেখা যায় না। এই পরিবর্তন তথা ওঠানামার পরিসীমা খিদিরপুরে ১৬৬ সেমি, কলকাতায় ১৩০ সেমি এবং চট্টগ্রামে ১১৮ সেমি। তবে দক্ষিণপশ্চিম উপকূলের দিকে মাদ্রাজ ও বিশাখাপত্তমে সমুদ্রপৃষ্ঠের ঋতুগত পরিবর্তন উপসাগরের উত্তর ও উত্তরপূর্ব উপকূলের তুলনায় অনেক কম। বঙ্গোপসাগরের উত্তর ও উত্তরপূর্ব উপকূলে সমুদ্রপৃষ্ঠের সর্বোচ্চ উচ্চতা পরিলক্ষিত হয় দক্ষিণপশ্চিম মৌসুমি  বায়ু প্রবাহকালীন সময়ে, জুলাই থেকে অক্টোবর মাসে এবং সর্বনিম্ন উচ্চতা পরিলক্ষিত হয় শীতকালে, জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারি মাসে। ভারতের দক্ষিণপূর্ব উপকূলে উপসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের সর্বনিম্ন পরিবর্তনের কারণ হচ্ছে ভৌগোলিক অবস্থান তথা তুলনামূলকভাবে গভীর সমুদ্রের সন্নিকটে এই উপকূলের অবস্থিতি।

বঙ্গোপসাগরের অনন্য ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে উপরের স্তরে তরলীকৃত পানিরাশি (diluted watermass) গঠনের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এই তরলীকৃত পানিরাশির পুরুত্ব ঋতুভেদে শীত ও গ্রীষ্মকালে কম বেশি হয়ে থাকে। গ্রীষ্মকালে এই পানিরাশির গড় পুরুত্ব ৩০০ মিটার এবং শীতকালে তা ২০০ থেকে ২৫০ মিটার-এ হ্রাস পায়। গ্রীষ্মকালে অত্যধিক বৃষ্টিপাত এবং নদীবাহিত পানির প্রাচুর্যের কারণে এই অবস্থা হয়ে থাকে। বঙ্গোপসাগরের উচ্চ লবণাক্ততা বিশিষ্ট মধ্যস্তরের পানিরাশির উৎপত্তিস্থল হচ্ছে মূলত লোহিত সাগর এবং পারস্য উপসাগর। এই পানিরাশি বঙ্গোপসাগরে প্রবেশের পূর্বে আরব সাগরের পানিরাশির সঙ্গে মিশ্রিত হয় এবং একক উচ্চতর লবণাক্ত স্তর হিসেবে বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করে। বঙ্গোপসাগরের গভীর তলদেশের পানিরাশির ভৌত বৈশিষ্ট্যে ঋতুগত তেমন কোন পরিবর্তন সংঘটিত হয় না।

সমুদ্রস্রোত  জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত সমুদ্রপৃষ্ঠের পানি সাধারণত ঘড়ির কাঁটার দিকে ঘুরতে থাকে। অপরদিকে, সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মৌসুমি বায়ুর গতিপ্রবাহ অনুসারে ঘড়ির কাঁটার উল্টো দিকে ঘোরে। সমুদ্র প্রবাহ কখনোই স্থির থাকে না, উপরন্তু এই প্রবাহ নির্ভর করে বায়ুর শক্তি ও স্থায়িত্বের ওপর। উপর্যুপরি কয়েকদিন ধরে প্রবহমান শক্তিশালী বায়ুপ্রবাহ পানি সঞ্চালন হারের ওপর অত্যধিক প্রভাব বিস্তার করে। উত্তরপূর্ব অভিমুখী স্রোত সাধারণত শক্তিশালী দক্ষিণপশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবের ফলে অনেকদিন ধরে তীব্র গতিতে চলতে থাকে। বঙ্গোপসাগরের পানিরাশির গুরুত্বপূর্ণ উল্লম্ব সঞ্চালন হচ্ছে পানির ঊর্ধ্বপ্রবাহ (upwelling)। এই প্রক্রিয়ায় অন্তঃপৃষ্ঠীয় (sub-surface) পানিরাশি সমুদ্রপৃষ্ঠের দিকে প্রবাহিত হয়, আবার বিপরীতক্রমে পানিরাশির নিম্নমুখী প্রতিস্থাপনকে নিম্নপ্রবাহ (down-welling) বা অবনমন (sinking) প্রক্রিয়া বলা হয়।

পানিরাশির ঊর্ধ্বপ্রবাহ ও নিম্নপ্রবাহ ঋতুভিত্তিক এবং মৌসুমি বায়ুপ্রবাহ দ্বারা সৃষ্টি হয়, যা গ্রীষ্মকালে দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে প্রবাহিত হয়। অতঃপর শীতকালে বিপরীত দিক থেকে অর্থাৎ উত্তর-পূর্বদিক থেকে প্রবাহিত হয়। মৌসুমি বায়ুপ্রবাহের স্থায়িত্ব, বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে প্রবাহিত মৌসুমি বায়ুপ্রবাহ ভারতের পূর্ব উপকূলভাগের অধিকাংশ স্থান জুড়ে পানির ঊর্ধ্বপ্রবাহ সৃষ্টি করে। এভাবে গ্রীষ্মকালে ভারতের পূর্ব উপকূলে পানির ঊর্ধ্বপ্রবাহ এবং শীতকালে নিম্নপ্রবাহ সংঘটিত হয়। অপরদিকে, বঙ্গোপসাগরের পূর্বাংশ এবং মায়ানমারের উপকূলে শীতকালে পানির ঊর্ধ্বপ্রবাহ ঘটে এবং গ্রীষ্মকালে নিম্নপ্রবাহ ঘটে। বঙ্গোপসাগরের পানির ঊর্ধ্ব ও নিম্নপ্রবাহ ভারত মহাসাগরের সোমালী পানি প্রবাহ বা উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলের পানি সঞ্চালনের মতো দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্রতাসম্পন্ন হয়। তবে সমুদ্রের অর্থনৈতিক সুবিধা ও সামুদ্রিক খাদ্য আহরণের জন্য বঙ্গোপসাগরের পানিরাশির ঊর্ধ্বপ্রবাহ ও নিম্নপ্রবাহ তার রাসায়নিক ধর্ম ও জীবকূলের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। [সুভাষ চন্দ্র দাস]

জীবতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যসমূহ (Biological characteristics)  সমুদ্রে উদ্ভিদ ও প্রাণী উভয় প্রকার জীবের প্রজাতির উপস্থিতি প্রধানত সামুদ্রিক জলরাশির ভৌত-রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যাবলী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। স্থলভূমি থেকে সমুদ্রে পতিত নদনদীসমূহ প্রচুর পরিমাণে পলি বহন করে আনে যার সঙ্গে বিদ্যমান থাকে প্রচুর পুষ্টি উপাদান। এসকল পুষ্টি উপাদানসমৃদ্ধ পলিরাশি মোহনার নিকটবর্তী তটরেখা অঞ্চলে (near shore region) প্রধানত সঞ্চিত হয়ে থাকে। প্রচুর পুষ্টি উপাদানের উপস্থিতির ফলে বঙ্গোপসাগরের এ এলাকা একটি উর্বর সামুদ্রিক মৎস্যক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। নিকট উপকূলবর্তী ঊর্ধ্বপ্রবাহ অঞ্চল কেবলমাত্র অধিক পরিমাণে পুষ্টিকর বস্ত্তই উৎপন্ন করে না, সেইসঙ্গে প্রচুর উদ্ভিদকণা (phytoplankton) ও জৈবকণা (zooplankton) উৎপাদনের প্রাথমিক ক্ষেত্র হিসেবেও ভূমিকা পালন করে থাকে।

BayOfBengalFishingZones.jpg

মৎস্যক্ষেত্র  বঙ্গোপসাগরের পানিতাত্ত্বিক পরিবেশ অসংখ্য প্রজাতির চিংড়ি ও মাছের অনুকূল আবাসস্থল। যদিও উপসাগরের সর্বত্রই জলজ প্রাণী বিশেষ করে কাঁকড়া, শামুক জাতীয় ছোট ছোট সামুদ্রিক প্রাণী, ঝিনুক, শেল, হাঙ্গর ও মৎস্য সম্পদ ছড়িয়ে থাকে, তবে কিছু কিছু বিশেষ স্থানে মৎস্য ঘনত্ব অধিক হারে বজায় থাকে যে স্থানগুলি গুরুত্বপূর্ণ মৎস্যক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত। বঙ্গোপসাগরে এ পর্যন্ত চারটি মৎস্যক্ষেত্র শনাক্ত করা গিয়েছে। এগুলি হচ্ছে দক্ষিণের মৎস্যক্ষেত্র (south patches), দক্ষিণের দক্ষিণ মৎস্যক্ষেত্র (south of south patches), মধ্যভূমি (middle ground) এবং সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড মৎস্যক্ষেত্র।

দক্ষিণের মৎস্যক্ষেত্র  ৯১.৩০° পূর্ব দ্রাঘিমাংশ থেকে ৯২.১০° পূর্ব দ্রাঘিমাংশ এবং ২০.৫৫° দক্ষিণ অক্ষাংশ থেকে ২১.৫২° দক্ষিণ অক্ষাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত ৩,৬৬২ বর্গ কিলোমিটার এলাকা। এই মৎস্যক্ষেত্রের গভীরতা ১০ মিটার থেকে ১০০ মিটার, তবে ৯০ ভাগ মৎস্যক্ষেত্রই ৪০ মিটারেরও কম গভীর। তলদেশের পলল বালুময় অথবা সামান্য কর্দমমিশ্রিত বালুময়। চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার থেকে এই মৎস্যক্ষেত্রের নিকটতম দূরত্ব যথাক্রমে ৪০ কিমি এবং ১০ কিমি। পৃষ্ঠভাগের পানির লবণাক্ততা ২৬% থেকে ৩২% পর্যন্ত হয়ে থাকে এবং নিম্নস্তরের পানির লবণাক্ততা ৩০% থেকে ৩৫% পর্যন্ত হয়ে থাকে। পানির তাপমাত্রা ২০°সে এবং ২৮°সে-এর মধ্যে ওঠানামা করে থাকে।

দক্ষিণের দক্ষিণ মৎস্যক্ষেত্র  ৯১.৩০° পূর্ব দ্রাঘিমাংশ থেকে ৯২.২০° পূর্ব দ্রাঘিমাংশ এবং ২০.১৫° দক্ষিণ অক্ষাংশ থেকে ২০.৫০° দক্ষিণ অক্ষাংশ পর্যন্ত ভৌগোলিক অবস্থানে অবস্থিত। টেকনাফ থেকে এই মৎস্যক্ষেত্রের নিকটতম দূরত্ব ৫ কিমি। মোট আয়তন ২,৫৩৮ বর্গ কিলোমিটার এবং গভীরতা ১০ মিটার থেকে ১০০ মিটার। তবে ৭৫ ভাগেরও বেশি এলাকা ৪০ মিটারেরও অধিক গভীর। তলদেশ বালুময় অথবা কর্দমমিশ্রিত বালুময়। পৃষ্ঠভাগের পানির লবণাক্ততা ১৮% থেকে ৩৪% পর্যন্ত হয়ে থাকে এবং তলদেশের কাছাকাছি পানির লবণাক্ততা ২৮% থেকে ৩৮% পর্যন্ত হয়ে থাকে। পানির তাপমাত্রা ২২°সে থেকে ৩০°সে এর মধ্যে ওঠানামা করে।

মধ্যভূমি মৎস্যক্ষেত্র  ৯০.২০° পূর্ব দ্রাঘিমাংশ থেকে ৯১.৩০° পূর্ব দ্রাঘিমাংশ এবং ২০.২৫° দক্ষিণ অক্ষাংশ থেকে ২১.২০° দক্ষিণ অক্ষাংশ পর্যন্ত ভৌগোলিক অবস্থানে অবস্থিত। মোট আয়তন প্রায় ৪,৬০০ বর্গ কিলোমিটার। কক্সবাজার থেকে এই মৎস্যক্ষেত্রের নিকটতম দূরত্ব প্রায় ৬৫ কিলোমিটার। মোট এলাকার ৭০ ভাগের গভীরতা ৪০ মিটারের অধিক। এখানকার তলদেশ নরম কাদা অথবা কর্দম মিশ্রিত বালু দ্বারা গঠিত। পৃষ্ঠভাগের পানির লবণাক্ততা ২২% থেকে ৩৪% পর্যন্ত হয়ে থাকে এবং তলদেশের কাছাকাছি পানির লবণাক্ততা ২৮% থেকে ৩৫% পর্যন্ত হয়ে থাকে। পানির তাপমাত্রা ২৬°সে থেকে ২৮°সে এর মধ্যে উঠানামা করে।

সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড  ৮৯.৩৫° পূর্ব দ্রাঘিমাংশ থেকে ৯০.১০° পূর্ব দ্রাঘিমাংশ এবং ২০.৫৫° দক্ষিণ অক্ষাংশ থেকে ২১.৫৫° দক্ষিণ অক্ষাংশ পর্যন্ত ভৌগোলিক অবস্থানে অবস্থিত। উপকূলবর্তী দুবলারচর এবং সোনারচর থেকে এই মৎস্যক্ষেত্রটি যথাক্রমে প্রায় ৩০ কিমি এবং ৪০ কিমি দূরে অবস্থিত। মোট আয়তন প্রায় ৩,৮০০ বর্গ কিমি এবং ৭০ ভাগ এলাকার গভীরতা ৪০ মিটারের অধিক। সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডে অবস্থিত মৎস্যক্ষেত্রের সার্বিক গভীরতা ১০ মিটার থেকে ১০০ মিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। তলদেশের পলল কর্দম মিশ্রিত পলল দ্বারা গঠিত। পৃষ্ঠভাগের পানির লবণাক্ততা ২৮% থেকে ৩৪% পর্যন্ত হয়ে থাকে এবং তলদেশের কাছাকাছি পানির লবণাক্ততা ৩০% থেকে ৩৫% পর্যন্ত হয়ে থাকে। পানির তাপমাত্রা ২৪°সে থেকে ৩০°সে-এর মধ্যে ওঠানামা করে।

বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত বর্ণিত মৎস্যক্ষেত্রসমূহ মাছ এবং চিংড়ির উত্তম মজুতক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত। এ সকল মৎস্যক্ষেত্র থেকেই ট্রলার অথবা বিশেষায়িত মাছ ধরার নৌকার মাধ্যমে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে অধিকাংশ পরিচিত সামুদ্রিক মৎস্য ও চিংড়ি আহরণ করা হয়। বাণিজ্যিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক চিংড়ি ও মাছের প্রজাতির মধ্যে রয়েছে বাগদা চিংড়ি (tiger shrimp), কারুমা চিংড়ি, গোংরা মাছ (cat fish), লতিয়া (Bombay duck), চৌকা (snapper), ফ্লাউন্ডার (flounder), লাক্কা (Indian salmon), পোয়া (crocker), রূপবান (seabream), লেইয়া পোয়া (jawfish), মিউলেট (mullet), চান্দা (pomfret), ছুরি (ribbon fish), ফাইস্যা (anchovy), ইলিশ (hilsa), অয়েল সারডিন (oil sardine), টুনা (tuna), চাম্পা (mackerel) এবং স্কিপ জ্যাক (skipjack)।  [হোসেন জামাল]

দূষণ  বিভিন্ন ধরনের দূষক পদার্থের দ্বারা বাংলাদেশের সামুদ্রিক পরিবেশ প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে দূষণের শিকার হয়ে থাকে। সমুদ্র উপকূলে অবস্থিত সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উৎপাদন এবং কুতুবদিয়া উপকূলীয় গ্যাসক্ষেত্রের আবিষ্কারের উদ্দেশ্যে সমুদ্রবক্ষে খনিজ নিষ্কাশন ও বৃহৎ মাত্রার খননকাজ পরিচালনা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার উপকূলবর্তী দ্বীপসমূহে সঞ্চিত সৈকত বালি ভারি মণিক আহরণ প্রভৃতি কর্মকান্ডের ফলে বঙ্গোপসাগরের পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। সমুদ্রের পানি দূষণ রোধকল্পে উল্লিখিত কর্মকান্ডসমূহ পরিচালনার সময় মানসম্পন্ন নিয়মবিধি অনুসরণ করা হচ্ছে না। সাঙ্গু উপকূলীয় গ্যাসক্ষেত্রটি চট্টগ্রাম মহানগরী থেকে প্রায় ৫০ কিমি দক্ষিণপশ্চিমে এবং বঙ্গোপসাগরের ১০ মিটার পানির নিচে অবস্থিত। কুতুবদিয়া গ্যাসক্ষেত্রটি চট্টগ্রাম বন্দরের প্রায় ৯২ কিমি দক্ষিণপশ্চিমে অবস্থিত।

সাগরের বুকে পেট্রোলিয়ামবাহী ট্যাঙ্কার চলাচল, বন্দরে তেল খালাস ও বোঝাইকরণ প্রক্রিয়া এবং পেট্রোলিয়াম প্রক্রিয়াজাত কারখানা সমূহ থেকে নির্গত অপদ্রব্য প্রভৃতির মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে পেট্রোলিয়ামজনিত দূষণ ঘটে থাকে। কর্ণফুলি, পশুর ও বুড়িগঙ্গা নদীর মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে পয়ঃনিষ্কাশনের ফলে সাগরে জৈবরাসায়নিক অক্সিজেন চাহিদা-বিওডি (Biochemical Oxygen Demand/ BOD) অত্যধিক পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। বঙ্গোপসাগরে বিওডি-র রেকর্ড দূষণ বিস্তারকেই নির্দেশ করে। অধিকন্তু, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশ শিল্পবর্জ্য, কৃষি অবশেষ ও কীটনাশক, অন্যান্য মানবীয় কর্মকান্ড, যেমন: নির্বিচারে উপকূলীয় বনাঞ্চল ধ্বংস, উপকূলীয় চিংড়ি চাষের অপরিকল্পিত সম্প্রসারণ প্রভৃতি দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং সামগ্রিক প্রতিবেশগত অবনতি সাধিত হচ্ছে। মাত্রাতিরিক্ত মৎস্য আহরণ এবং উপকূলে মৎস্য বর্জ্য নিক্ষেপ বঙ্গোপসাগরের সমৃদ্ধ মৎস্যক্ষেত্রসমূহের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাগরের বিদ্যমান মৎস্যক্ষেত্রসমূহের যথাযথ ব্যবস্থাপনা এবং নতুন নতুন মৎস্যক্ষেত্র অনুসন্ধানই কেবলমাত্র বঙ্গোপসাগরের মৎস্যসম্পদ থেকে নিয়মিত মৎস্য আহরণকে নিশ্চিত করতে পারে। উপরন্তু বঙ্গোপসাগরের ওপর ওশানোগ্রাফি গবেষণা ও ম্যাঙ্গানিজসহ অন্যান্য খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানের কাজ যথেষ্ট পরিমাণে হচ্ছে না।  [সিফাতুল কাদের চৌধুরী]

আরও দেখুন জলবায়ু; প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মৌসুমি বায়ু