বঙ্গীয় বদ্বীপ


বঙ্গীয় বদ্বীপ (Bengal Delta)  দুটি হিমালয়ী নদী গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র, সম্মিলিত স্রোতোধারায় বিশ্বের যে-কোন নদী-ব্যবস্থার তুলনায় সবচেয়ে বেশি অবক্ষেপ বঙ্গোপসাগরে এনে ফেলছে। এই দুই নদী অপর অহিমালয়ী নদী মেঘনার সহযোগে বিশ্বের সর্ববৃহৎ যে বদ্বীপটির সৃষ্টি করেছে, সেটি গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপ বা বঙ্গীয় বদ্বীপ নামে পরিচিত। গঙ্গানদী তার উত্তরপূর্বমুখী যাত্রায় কয়েকটি বদ্বীপের সৃষ্টি করে পরে সেগুলোকে পরিত্যাগ করে বর্তমান অবস্থান গ্রহণ করেছে। জেমস রেনেলের মানচিত্রে দেখা যায়, ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথ ছিল পূর্বমুখী যা ময়মনসিংহের কাছে আদি ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপ গঠন করেছিল। বর্তমানে এই নদের গতিপথটি সোজা দক্ষিণমুখী। অবশ্য পূর্বে এই দুটি নদী আলাদা আলাদাভাবে বঙ্গোপসাগরে পতিত হতো, বর্তমান গঠনে এরা পরিশেষে সম্মিলিতভাবে সাগর সঙ্গমে মিলিত হচ্ছে। নদীসমূহের এই বদ্বীপ গঠন কার্যক্রম বাংলাদেশের উপকূল রেখার প্রায় শতকরা ৬০ ভাগ গঠনে অবদান রেখেছে। নদীর গতিপথ ও স্থানান্তরিত ডিপোসেন্টারের ওপর ভিত্তি করে সাধারণভাবে সমগ্র বদ্বীপীয় উপকূল রেখাকে পশ্চিমাঞ্চলীয় নিষ্ক্রিয়  বদ্বীপ (inactive delta) এবং পূর্বাঞ্চলীয় সক্রিয় মেঘনা বদ্বীপীয় সমভূমিতে (active delta) বিভক্ত করা হয়েছে। পশ্চিমাঞ্চলীয় নিষ্ক্রিয় বদ্বীপ  তুলনামূলকভাবে প্রবীণ হলেও মেঘনা বদ্বীপীয় সমভূমি ভূতাত্ত্বিকভাবে খুব নবীন। প্রকৃতপক্ষে গড়াই-মধুমতি নদীর পশ্চিমে অবস্থিত অঞ্চলকে পশ্চিম নিষ্ক্রিয় বদ্বীপ ও পূর্বে অবস্থিত অংশকে পূর্ব সক্রিয় বদ্বীপ ধরা হয়। পশ্চিমাঞ্চলীয় নিষ্ক্রিয় বদ্বীপকে সাধারণভাবে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়, যথা- মৃত বদ্বীপ (moribund delta), পরিণত বদ্বীপ (mature delta) এবং জোয়ারভাটা সমৃদ্ধ সক্রিয় বদ্বীপ (tidally active delta/saline-tidal delta)।

BengalDelta.jpg

বঙ্গীয় বদ্বীপ বঙ্গীয় অববাহিকার এক বিরাট অঞ্চল জুড়ে রয়েছে, যা সমগ্র বাংলাদেশের প্রায় ৩৫%। পশ্চিমে ভারতীয় শিল্ড, উত্তরে বরেন্দ্রভূমির দক্ষিণ প্রান্ত ও পূর্বে তিপারাপৃষ্ঠ এর সীমানা। বদ্বীপটির মূল বিকাশের মাত্রা দক্ষিণ দিকে বঙ্গোপসাগরে অব্যাহত আছে।

বাংলাদেশে পশ্চিম নিষ্ক্রিয় বদ্বীপ (২১°১৫´ ও ২৪°৪০´ উত্তর অক্ষাংশ থেকে  ৮৮°০´ ও ৯০°০´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ) প্রায় ৩১,৫০০ বর্গ কিমি এলাকাজুড়ে বিরাজমান। সাধারণভাবে ভারতের মুর্শিদাবাদ (শুধু ভাগীরথীর পূর্ব দিকের অংশ), নদীয়া ও ২৪ পরগনা এবং বাংলাদেশের মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, যশোর, নড়াইল, খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলা এর অন্তর্গত। পূর্বাঞ্চলীয় সক্রিয় বদ্বীপ ২৩°৫০´ উত্তর অক্ষাংশ থেকে ২১°৫৫´ উত্তর অক্ষাংশ পর্যন্ত এবং ৮৯°১০´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ থেকে ৯০°৫০´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থিত এবং এর আওতাধীন এলাকার পরিমাণ প্রায় ১৫,০০০ বর্গ কিমি। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপের এই অংশ উত্তর-দক্ষিণ মুখে প্রায় ৩০০ কিমি লম্বা এবং বদ্বীপটির ঊর্ধ্ব ও মধ্য মুখ যথাক্রমে প্রায় ১০০ কিমি ও ১৩০ কিমি চওড়া। পূর্বাঞ্চলীয় সক্রিয় গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপে বাংলাদেশের রাজবাড়ী, ফরিদপুর, শরিয়তপুর, মাদারীপুর, লক্ষ্মীপুর, গোপালগঞ্জ, পিরোজপুর, বরিশাল, ঝালকাঠি, পটুয়াখালী, বরগুনা ও ভোলা জেলা অন্তর্ভুক্ত।

গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপ বাংলাদেশের অন্যতম ভূ-প্রাকৃতিক বিভাগ। এলাকাটি প্রধাণত একটি সমভূমি যার উচ্চতার মাত্রা উত্তরে ১৫ মিটার থেকে দক্ষিণে প্রায় এক মিটার। বদ্বীপটির পৃষ্ঠদেশের নতিমাত্রা প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ০.০১৬ মিটার। বদ্বীপের গড় উচ্চতা খুলনা, বরিশাল, ফরিদপুরের দক্ষিণাঞ্চল ও নোয়াখালী জেলার পূর্বাঞ্চলে ২ মিটারেরও কম। বদ্বীপটির দক্ষিণাঞ্চলে এ উচ্চতা আরও কম, মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার। বাংলাদেশে বদ্বীপীয় মাটির উচ্চ উর্বরতার কারণে কৃষি কার্যক্রমের প্রাধান্য অঞ্চলটিকে ঘন বসতিপূর্ণ করে তুলেছে। অধিকাংশ লোকের জীবিকা জমি চাষ, মাছ ধরা, নৌ-পরিবহণ, সাধারণ সম্পদের সদ্ব্যবহার (যেমন সুন্দরবনের গরান বনভূমি) ও অন্যান্য অর্থনৈতিক কার্যক্রমের নিরিখে বদ্বীপের পরিবেশগত অবস্থার ওপর নির্ভর করে। এই সুবৃহৎ ও সদা বিবর্তিত বদ্বীপে অব্যাহত ভূমি পরিবৃদ্ধি ও ভূমিক্ষয় বাংলাদেশের জনবসতির ধরন ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিন্যাসকে প্রভাবিত করছে।

বদ্বীপের বিবর্তন  আদি ক্রিটেসিয়াস যুগে গন্ডোয়ানাল্যান্ডের খন্ড-বিখন্ড হওয়ার পর থেকে বিগত ১২ কোটি ৫০ লক্ষ বছর ধরে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপ অঞ্চলের গঠন প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে। বদ্বীপ কমপ্লেক্সটির বিকাশের ইতিহাস গন্ডোয়ানাল্যান্ডের বিভাজন, ভারতীয় প্লেটের বিচলন, ভারতীয় প্লেটের সঙ্গে বার্মা ও ইউরেশিয় প্লেটের সংঘর্ষ, বিশাল পর্বতশ্রেণী হিমালয়ের সৃষ্টি, গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র নদীপ্রণালীর বিকাশ, বিভিন্ন সময়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের পরিবর্তন এবং কোটি কোটি বছর ধরে ভূ-গাঠনিক ক্রিয়াকর্মের সঙ্গে ওতপ্রোত হয়ে আছে।

বদ্বীপীয় কমপ্লেক্সটির বিকাশ ভারতীয় প্লেটের নিষ্ক্রিয় ডান প্রান্তে শুরু হয় যখন অবক্ষেপের হার খুব মন্থর ছিল। ভারতীয় প্লেটের উত্তরমুখী সঞ্চার ও ইউরেশিয় প্লেটের সঙ্গে এর সংঘর্ষের কারণে বদ্বীপীয় কমপ্লেক্সটিতে বিপুল অবক্ষেপ স্তূপীকৃত হয়ে তা আদি বদ্বীপ (proto-delta), পরিবর্তনমূলক বদ্বীপ (transitional delta) ও আধুনিক বদ্বীপ (modern delta) এই তিন স্তরে বিবর্তিত হয়েছে। বদ্বীপ গড়ে তোলা  প্রক্রিয়া সেনোযোয়িক যুগের টারশিয়ারি ও কোয়াটারনারি আমলে খুবই সক্রিয় ছিল।

আদি বদ্বীপ (১২ কোটি ৬০ লক্ষ বছর থেকে ৪ কোটি ৯৫ লক্ষ বছর আগে) কার্বোনেট-ক্লাসটিক সংপৃক্ততার চারটি গুরুত্বপূর্ণ স্তরক্রম যা প্রাথমিক পর্যায়ে উচ্চ অক্ষাংশ নিয়ন্ত্রিত সামুদ্রিক পরিবেশে এবং পরবর্তীতে নিম্ন অক্ষাংশীয় অবাধ সামুদ্রিক নিরক্ষীয় পরিবেশে অবক্ষেপিত হয়েছিল। চারটি স্তরক্রমের সঙ্গে বোলপুর স্তরসমষ্টি, ঘাটাল স্তরসমষ্টি, জালাংগী স্তরসমষ্টি ও সিলেট চুনাপাথর স্তরসমষ্টি পরস্পর সম্পর্কযুক্ত।

পরিবর্তনমূলক বদ্বীপ  (৪ কোটি ৯৫ লক্ষ বছর থেকে ১ কোটি ৫০ লক্ষ বছর আগে) ভারতীয় প্লেট ও ইউরেশিয়ান প্লেটের মধ্যে সংঘর্ষ এবং পরবর্তীতে বৃহত্তর হিমালয়ের উত্থানের ফলে সৃষ্ট নাটকীয় পরিবর্তনসমূহ পরিবর্তনমূলক বদ্বীপীয় যুগ অতিক্রম করেছে। ক্লাসটিক বা বিচূর্ণিত অবক্ষেপসমূহ হয়তবা কোপিলি স্তরসমষ্টির সমসাময়িক ছিল এবং ঘোলাস্রোত (turbidity current) অতিরিক্ত অবক্ষেপের স্ত্তপকে গভীরতর পানিতে টেনে নিয়ে যাওয়ায় বঙ্গীয় উপবদ্বীপ (Bengal fan) এই সময়ে গঠিত হতে শুরু করে।

আধুনিক বদ্বীপ  প্রায় ১ কোটি ৫০ লক্ষ বছর পূর্ব থেকে বর্তমান আকার ধারণ করে। সে সময় পৃথিবীব্যাপী সমুদ্রপৃষ্ঠ নেমে যাওয়ার কারণে পূর্বেকার অবক্ষেপ স্তরক্রমসমূহ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। অপেক্ষাকৃত সুস্থিত জোয়ারভাটা নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে বদ্বীপটির বিকাশ আজও অব্যাহত আছে। গঙ্গানদীর প্রভাব অবক্ষেপ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে শুরু করে। নব-ভূগাঠনিক ক্রিয়াকর্ম (neotectonic activity) এবং কোয়াটারনারি পর্যায়ভুক্ত সমুদ্রপৃষ্ঠের হ্রাসবৃদ্ধি বঙ্গীয় অববাহিকার বদ্বীপীয় চাপ (arc) গঠনে ব্যাপকভাবে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করছে। বিদ্যমান নদীসমূহ কর্তৃক বদ্বীপ গঠন প্রক্রিয়া কোয়াটারনারী পর্যায় জুড়ে অব্যাহত থাকে যা তটরেখাকে পূর্ব ও দক্ষিণপূর্ব অভিমুখে বিস্তৃত করে। এই অঞ্চলের অব্যাহত উত্থানের কারণে প্রতিটি নতুন স্তর পূর্ববর্তী স্তরের চাইতে আরও বেশি সমুদ্রের দিকে অবক্ষেপিত হয়।

উচ্চ সমুদ্রপৃষ্ঠ বিশিষ্ট প্রবীণ প্লাইসটোসিন যুগ, অববাহিকার অভ্যন্তরের চারপাশে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বদ্বীপের একটি বলয় দ্বারা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত ছিল। সমুদ্রপৃষ্ঠ প্রতিবার নেমে যাওয়ার সময় অসংহত বদ্বীপীয় অবক্ষেপসমূহ গভীরভাবে ব্যবচ্ছেদের শিকার হয়েছিল, হিমপর্যায়ে (glacial stage) সমুদ্রপৃষ্ঠ সম্প্রসারিত হয় এবং নদীসমূহ অগ্রমুখীন কিংবা উপত্যকাছেদন (valley cutting) পর্যায়ে ছিল। বঙ্গীয় বদ্বীপটি যেহেতু জোয়ারভাটা প্রভাবিত ও সঙ্গে সঙ্গে নদী নিয়ন্ত্রিত, অবক্ষেপসমূহ তাই সামুদ্রিক তরঙ্গ ও স্রোতের টানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে না গিয়ে বেশিটাই সমুদ্র তলদেশে থিতিয়ে যায়। ফলে তলদেশটি জেগে ওঠে। পরবর্তী অন্তঃহিম যুগে, উত্থিত সমুদ্রপৃষ্ঠের কারণে, নদীসমূহ ক্ষয়মূলক বা উপত্যকা ভরাট পর্যায়ে ছিল। এ সময়ে নদী প্রক্রিয়া সামুদ্রিক প্রক্রিয়ার দ্বারা অধোগামী ছিল। নদীমুখে তাই অধিকতর অবক্ষেপ জমা পড়ে। উভয় ক্ষেত্রেই বদ্বীপ গড়া প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এগিয়ে যায়। এটি আজ সুস্পষ্ট যে মেঘনা বদ্বীপীয় সমভূমির উচ্চ গতিশীল প্রকৃতি বদ্বীপ গড়া প্রক্রিয়ার দুটি শক্তিশালী বিপরীত উপাদান, নদীজ ও সামুদ্রিক প্রক্রিয়ার মিথস্ক্রিয়ার (interaction) ফল। নদীজ  প্রক্রিয়াসমূহ হচ্ছে পানি ও অবক্ষেপের ব্যাপক মৌসুমি প্রবাহ, আর প্রধান সামুদ্রিক প্রক্রিয়াটি হচ্ছে পক্ষকালীন ভিন্নতাসহ জোয়ারভাটার প্রভাব। সন্দ্বীপ ও সংলগ্ন অঞ্চলসমূহের ভূ-প্রাকৃতিক পরিবর্তনের মূল কারণ প্রবল সামুদ্রিক স্রোত হলেও ভোলার ক্ষেত্রে একই পরিবর্তনের মূলে প্রধানত নদীর স্রোত। তাই ভোলায় ভাঙন অতিমাত্রায় ঋতুভিত্তিক। হাতিয়া দ্বীপ ও সংলগ্ন অঞ্চলসমূহে সামুদ্রিক ও নদী উভয় স্রোতের প্রভাব সক্রিয় থাকলেও কিছু এলাকায়, যেমন- উড়িরচরের ভূ-প্রাকৃতিক পরিবর্তন সমূহ জোয়ারের গতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল, যা হাতিয়া ও সন্দ্বীপ চ্যানেলের মধ্য দিয়ে আগত দুটি স্রোতের মধ্যেকার বিস্তার ও পর্যায়গত পার্থক্যের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। পশ্চিমবঙ্গের চারটি বদ্বীপীয় চাপ বাংলাদেশের তিনটি বদ্বীপীয় চাপের সমান। এগুলো হচ্ছে সাম্প্রতিক বদ্বীপীয় সমভূমি, নবীন বদ্বীপীয় সমভূমি, প্রাচীন বদ্বীপীয় সমভূমি এবং পশ্চিমবঙ্গের ল্যাটেরাইট উচ্চভূমি। বাংলাদেশে এদের সমার্থক চাপগুলো হচ্ছে সুন্দরবন (সাম্প্রতিক গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপ), চান্দিনা বদ্বীপীয় সমভূমি (আদি গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা বদ্বীপ) ও বরেন্দ্র-মধুপুর গড়। ল্যাটেরাইট উচ্চভূমির সমতূল্য কোন চাপ বাংলাদেশে নেই।  [সিফাতুল কাদের চৌধুরী ও মোঃ কামরুল হাসান]