ফ্যাক্টরি আইন ১৯৬৫ (১৯৩৪-এর ২৫নং আইন)


ফ্যাক্টরি আইন ১৯৬৫ (১৯৩৪-এর ২৫নং আইন)  কারখানায় শ্রমিক নিয়োগ, তাদের মজুরি এবং কাজের পরিবেশ, যথা স্বাস্থ্যকর ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কর্মস্থল, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা, কল্যাণমূলক ব্যবস্থা, কর্মঘণ্টা, সাপ্তাহিক ও অন্যান্য সব ধরনের ছুটির সুযোগ এবং আইনভঙ্গের কারণে মালিক ও শ্রমিক উভয়ের জন্যই শাস্তি ও জরিমানা ইত্যাদি বিষয়ক আইন। পূর্ব পাকিস্তান ফ্যাক্টরি আইন ১৯৬৫ (১৯৬৫-এর পূর্ব পাকিস্তান আইন নং ৪) নামে এই আইন ১৯৬৫-এর সেপ্টেম্বরে ঢাকা গেজেট এক্সট্রা অর্ডিনারিতে প্রকাশিত হয়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকার আইনটি গ্রহণ করে এবং সমগ্র দেশে তা কার্যকর হবে বলে ঘোষণা দেয়।

ফ্যাক্টরি আইনে ১১টি অধ্যায় এবং ১১৬টি বিভাগ আছে। আইনে তরুণ, বয়স্ক, শিশু, কর্মদিবস, বিস্ফোরক দ্রব্য, ফ্যাক্টরি, যন্ত্রসরঞ্জাম, উৎপাদন প্রক্রিয়া, দখলদার, মুখ্য চালিকা শক্তি, কাজের শিফট, মজুরি ইত্যাদি শব্দের সংজ্ঞা ও ব্যাখ্যা দেওয়া আছে। সরকার এই আইন ব্যবহারের যে ক্ষমতা সংরক্ষণ করে এবং প্রয়োজনে যেসব স্থান/প্রতিষ্ঠানকে এই আইনের আওতা থেকে অব্যাহতি দিতে পারে তার বর্ণনা আছে। বলা হয়েছে যে, সরকার কোন ফ্যাক্টরি উৎপাদন চালু করার পূর্বেই প্রধান পরিদর্শক বরাবর নোটিশ পাঠাতে পারেন এবং কোন ফ্যাক্টরি বছর ও নির্দিষ্ট ঋতুতে কতদিন চালু থাকে তার ভিত্তিতে তাকে মৌসুমি বলে ঘোষণা দিতে পারে। সকল ফ্যাক্টরিকেই প্রতিষ্ঠার পূর্বে তার জন্য প্রণীত পরিকল্পনা ও ডিজাইন অনুমোদন করিয়ে নিতে হবে, প্রধান পরিদর্শকের দ্বারা তার ধরন ও বিবরণ অনুমোদিত হতে হবে এবং নির্ধারিত হারে লাইসেন্স ও নিবন্ধন ফিস দিতে হবে।

ফ্যাক্টরি আইনে সরকার কর্তৃক প্রধান পরিদর্শক, পরিদর্শক ও সনদ প্রদানকারী সার্জন-এর নিয়োগ সংক্রান্ত নিয়ম এবং শ্রমিকরা কর্মক্ষম কিনা তা প্রত্যয়নের পদ্ধতি লিপিবদ্ধ আছে। ফ্যাক্টরি আইন অনুসারে, প্রতিটি ফ্যাক্টরি এমনভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে যাতে তা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে, এখানে যেন আশপাশের ড্রেনের পচা দুর্গন্ধ না থাকে এবং এর পরিবেশ নোংরা করতে পারে এমন কোন বিরক্তিকর বস্ত্তর অস্তিত্ব না থাকে। প্রতিটি ফ্যাক্টরিতে ময়লা ও বর্জ্য নির্গমনের পথ থাকতে হবে, ধুলা ও ধোঁয়া পরিষ্কার করার ব্যবস্থা থাকতে হবে, সব ঘরে যথাযথ বায়ু চলাচল ব্যবস্থা ও তাপমাত্রা রক্ষার ব্যবস্থা থাকতে হবে। সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী ফ্যাক্টরিতে পর্যাপ্ত আলো ও পানি সরবরাহের সুবিধা থাকতে হবে। ফ্যাক্টরি আইন সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, কোম্পানির শ্রমিক-কর্মচারীদের নিরাপত্তার জন্য অগ্নি দুর্ঘটনার সময় সহজে ফ্যাক্টরি থেকে বেরিয়ে যাবার পথ এবং দুর্ঘটনাপ্রবণ কলকব্জার চারপাশে নিরাপত্তা বেষ্টনী থাকা অবশ্য প্রয়োজন। কোন শ্রমিককে বিপজ্জনক কোন যন্ত্রে কাজে লাগানোর আগে তাকে যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে নিতে হবে। ক্রেন বা অন্যান্য ভারি মালামাল উত্তোলনের যন্ত্র, লিফট ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণের কলকব্জা খুবই ভালভাবে নির্মিত হতে হবে এবং এগুলি যাতে সহজে অকেজো না হয় ও দুর্ঘটনার কারণ না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। একইভাবে, ফ্যাক্টরির মেঝে বা প্রাঙ্গণে খানাখন্দক যাতে বিপদের কারণ না হয় সেজন্য সেগুলিকে সুচারুরূপে আচ্ছাদন দিয়ে রাখতে হবে। যেসব স্থানে প্রয়োজন সেখানে শ্রমিকদের চোখ রক্ষার জন্য কালো চশমা বা যথাযথভাবে তৈরি চোখের ঢাকনা সরবরাহ করতে হবে। প্রতিটি ফ্যাক্টরিতে টয়লেট ও গোসলের সুব্যবস্থা থাকতে হবে, এছাড়াও থাকতে হবে প্রাথমিক চিকিৎসার প্রয়োজনীয় সকল উপকরণ ও ঔষধপত্র। কেন্টিন, বিশ্রাম কক্ষ ও শিশুদের কক্ষগুলি সুচারুভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে এবং যেসব কারখানায় শ্রমিক-কর্মচারীর সংখ্যা ৫০০-এর বেশি সেগুলিতে উপযুক্তসংখ্যক সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা নিয়োগ দিতে হবে।

ফ্যাক্টরি আইনে বলা আছে যে একজন প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিককে ফ্যাক্টরির কাজে সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করানো যাবে না, এবং অন্যভাবে নির্দেশিত না হলে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে তাকে কাজ থেকে অব্যাহতি দিতে হবে। বিকল্প সময়ে ছুটির ব্যবস্থা রেখে বাৎসরিক বিভিন্ন ছুটিতে কর্মচারীদের কাজ করানো যাবে। এছাড়া ফ্যাক্টরি আইনে, দৈনিক কর্মঘণ্টা, বিশ্রাম বা খাবারের জন্য বিরতি, কাজের সময় বণ্টন, রাতের শিফট বা একাধিক শিফটে কাজ, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা কাজের জন্য বাড়তি মজুরি, একসঙ্গে একাধিক চাকরিতে নিয়োগের ওপর নিষেধাজ্ঞা, কাজের মেয়াদ সংক্রান্ত নোটিশ এবং প্রাপ্ত বয়স্ক শ্রমিকদের নিবন্ধন সম্পর্কে বিস্তারিত বলা আছে। ফ্যাক্টরি আইন অনুযায়ী ১৪ বছরের কম বয়সের শিশুদের ফ্যাক্টরিতে নিয়োগ নিষিদ্ধ। কমবয়সী কিশোরদের, ফ্যাক্টরিতে নিয়োগ দিতে হলে তারা যে কর্মক্ষম এতদসংক্রান্ত একটি সনদপত্র লাগবে। এ ধরনের কিশোরদের জন্য কর্মসময় হচ্ছে দিনে সর্বোচ্চ পাঁচ ঘণ্টা এবং তাদের সন্ধ্যা ৭টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত সময়ে কোন অবস্থাতেই কাজ করানো যাবে না। প্রতিটি ফ্যাক্টরিতে কিশোরদের কর্মসময় সংক্রান্ত তালিকা টাঙানো থাকতে হবে, তাদের একটি রেজিস্ট্রারও সংরক্ষণ করতে হবে। ফ্যাক্টরিসমূহের পরিদর্শক প্রয়োজনে কিশোরদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে পারেন।

আইনের বিভিন্ন অংশে যেসব শর্ত ও পরিস্থিতি দেওয়া আছে সেই অনুযায়ী শ্রমিকদের নির্দিষ্ট কয়েক দিনের জন্য বার্ষিক সবেতন ছুটি নেওয়ার সুযোগ আছে। তারা উৎসব উপলক্ষে এবং নৈমিত্তিক ও চিকিৎসাজনিত ছুটি পেতে পারে। এছাড়াও শ্রমিকরা বিনা বেতনে কিছু ছুটি পেতে পারে। সরকারকে ফ্যাক্টরি শ্রমিকদের ছুটি-সংক্রান্ত সকল নিয়মাবলি প্রণয়নের অধিকার দেওয়া আছে। ফ্যাক্টরি আইনে ফ্যাক্টরিতে কোন ধরনের কাজ বিপজ্জনক সে সম্পর্কে ধারণা দেওয়া আছে এবং বিশেষ কিছু দুর্ঘটনা, বিপজ্জনক পরিস্থিতি ও বেশকিছু রোগব্যাধি সম্পর্কে নোটিশ প্রদানের বিধান আছে। আইনে নিয়োগদাতাদের শাস্তি ও জরিমানার কথা বলা আছে: যেমন, ফ্যাক্টরি পরিদর্শকের কাজে বাধা দিলে, ভুল বা ইচ্ছাকৃতভাবে সংকুচিত বা বিকৃত তথ্য দিলে এবং আইন ভেঙে শিশুশ্রমিক নিয়োগ করলে নিয়োগদাতাকে শাস্তি পেতে হবে।

ফ্যাক্টরি সম্পর্কে কোন বিচারের রায় বা সিদ্ধান্ত কোন পক্ষের অধিকার ক্ষুণ্ণ করেছে বা কোন পক্ষের প্রতি অবিচার করেছে বলে মনে হলে সংশ্লিষ্ট পক্ষ যাতে আপিল করতে পারে ফ্যাক্টরি আইন সে বিধান রেখেছে। ফ্যাক্টরিসমূহ তাদের আর্থিক বিবরণী কিভাবে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের নিকট জমা দেবে সে বিষয়ে সরকার নিয়মকানুন প্রণয়ন করতে পারে। ফ্যাক্টরির কিংবা এখানে কর্মরত শ্রমিকদের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে এমন কোন কাজে কোন শ্রমিক নিয়োজিত হতে পারে না। ফ্যাক্টরি আইন তার কোন ধারা রহিত রাখা বা বিশেষ পরিস্থিতিতে বিকল্প ব্যবস্থার পথ বের করার সুযোগ রেখেছে এবং বলা হয়েছে যে এ জাতীয় অবস্থায় কোন পদক্ষেপ নেওয়া হলে তাতে সাময়িক ব্যত্যয় ঘটলেও ফ্যাক্টরি আইন তার অন্যসব বিধান নিয়ে উদ্ভূত বিশেষ পরিস্থিতির কারণ ছাড়া সকল বিধান নিয়ে সম্পূর্ণভাবে বহাল থাকবে। [আবুল কালাম আজাদ]