ফুতুহ-উস-সালাতীন


ফুতুহ-উস-সালাতীন  সুলতান মাহমুদ হতে শুরু করে ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত অর্থাৎ দিল্লির সুলতান মুহম্মদ বিন তুগলকএর রাজত্ব শেষের পূর্ব পর্যন্ত মুসলিম শাসকদের একটি ছন্দোবদ্ধ ইতিহাস। লেখক ছিলেন ইসামী। কেউ কেউ বলেন যে, তাঁর পূর্ণ নাম ছিল আবদুল মালিক ইসামী। তিনি ছিলেন অভিজাত পরিবারের সন্তান। সম্ভবত আরব বংশে জন্মগ্রহণকারী তাঁর পূর্বপুরুষগণ সুলতান শামসুদ্দীন ইলতুৎমিশ (১২১০-১২৩৬ খ্রিস্টাব্দ)-এর রাজত্বকালে ভারতে আগমন করেন। তাঁর পূর্বপুরুষগণ দিল্লির সুলতানদের অধীনে উচচ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি অল্প বয়সে পিতৃহারা হন এবং তাঁর পিতামহ ইজ্জউদ্দীন ইসামী কর্তৃক লালিত পালিত হন। ষোলো বছর বয়সে তিনি দেওগির (দেবগিরি = দৌলতাবাদ) যাত্রায় তাঁর বৃদ্ধ পিতামহের সঙ্গী হন। দুর্ভাগ্যবশত গন্তব্যস্থলে পৌছানোর পূর্বেই পথিমধ্যে তাঁর পিতামহের মৃত্যু হয়। সম্ভবত দিল্লি ত্যাগের পূর্বেই তিনি তাঁর শিক্ষা সম্পূর্ণ করেছিলেন। ফুতুহ-উস-সালাতীন-এ তাঁর ইতিহাসের জ্ঞান এবং ফারসি ভাষা ও সাহিত্যে পারদর্শিতা লক্ষ করা যায়। ১৩৪৯ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে তিনি ফুতুহ-উস-সালাতীন লিখতে শুরু করেন এবং ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে শেষ করেন। তিনি তাঁর গ্রন্থ বাহমনী বংশের প্রতিষ্ঠাতা সুলতান আলাউদ্দীন হাসান বাহমন শাহ-এর নামে উৎসর্গ করেন।

ইসামীর ফুতুহ-উস-সালাতীন ভারতের উপর রচিত ১২৫৯ খ্রিস্টাব্দে লিখিত মিনহাজ-ই-সিরাজের তবকাত-ই-নাসিরী এবং ১৩৫৬ খ্রিস্টাব্দে লিখিত জিয়াউদ্দীন বরনী-এর তারিখ-ই-ফিরুজশাহীএর মধ্যবর্তী অবস্থানে রয়েছে। ইসামী এমন কিছু তথ্য প্রদান করেছেন যা তবকাত-ই-নাসিরী ও তারিখ-ই-ফিরুজশাহীতে পাওয়া যায় না। ইসামীর সাক্ষ্য যে সুলতান গিয়াসউদ্দীন বলবন তাঁর জামাতা এবং পৃষ্ঠপোষক সুলতান নাসিরউদ্দীন মাহমুদকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করেছেন তা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না।

দিল্লির অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতো ইসামী কখনোই বাংলায় আসেন নি। কিন্তু তিনি বাংলা সম্পর্কে কিছু তথ্য প্রদান করেছেন যা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। উদাহরণস্বরূপ তিনি বলেন যে, রাজধানী দিল্লির উদ্দেশে যাত্রা শুরু করার পূর্বে সুলতান গিয়াসউদ্দীন বলবন যখন তাঁর পুত্র বুগরা খানকে লখনৌতির শাসক নিযুক্ত করেন, তখন তিনি তাঁর পুত্রকে প্রশাসনে পরামর্শ প্রদানের জন্য দুজন দক্ষ কর্মকর্তা নিযুক্ত করেছিলেন, যাঁদের উভয়েরই নাম ছিল ফিরুজ। এ ব্যক্তিদ্বয়ের মধ্যে একজন ছিলেন খলজী এবং সুবিবেচনার মানুষ এবং অপরজন ছিলেন কোহ-জুদের অধিবাসী এবং একজন দুর্ধর্ষ যোদ্ধা। মুদ্রা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আধুনিক পন্ডিতগণ মত প্রকাশ করেছেন যে, এ দুজন ফিরুজের মধ্যে পরে উল্লিখিত ব্যক্তি  শামসুদ্দীন ফিরুজ শাহ (১৩০১-১৩২২ খ্রিস্টাব্দে) উপাধি ধারণ করে লখনৌতির সিংহাসন অধিকার করেছিলেন। ফুতুহ-উস-সালাতীন এ তথ্য প্রদান করে যে, জীবনের শেষ দিকে বলবন এই ইচছা প্রকাশ করেছিলেন যে, তাঁর পুত্র বুগরা খান দিল্লি সালতানাতের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। বুগরা খান আদেশ পালন করে দিল্লি গমন করেন। কিন্তু সেখানে দুমাস অতিবাহিত করার পর তিনি তাঁর পিতার কাছ থেকে অনুমতি গ্রহণ না করেই লখনৌতিতে চলে আসেন। লখনৌতিতে তিনি তাঁর পিতার মৃত্যু সংবাদ লাভ করেন। পিতার মৃত্যুতে তিনি সাত দিন শোক পালন করেন, এবং অতঃপর সুলতান নাসিরুদ্দীন মাহমুদ উপাধিসহ লখনৌতির সিংহাসনে আরোহণ করেন। বাংলায় তাঁর সার্বভৌম রাজক্ষমতা গ্রহণ এবং তাঁর উপাধি মুদ্রার সাক্ষ্য দ্বারা সমর্থিত।

ফুতুহ-উস-সালাতীন সম্পূর্ণ  হওয়ার পর এর প্রণেতা ইসামী সম্পর্কে আর কিছু জানা যায় না। সম্ভবত তিনি মক্কায় চলে যান যেখানে তিনি তাঁর শেষ জীবন যাপন করেন। ফুতুহ-উস-সালাতীন গ্রন্থটি আগা মাহদী হোসেন কর্তৃক সম্পাদিত হয়ে ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে আগ্রা থেকে প্রকাশিত হয়। একই পন্ডিত কর্তৃক এর একটি ইংরেজি অনুবাদও তিন খন্ডে আলীগড় হতে প্রকাশিত হয় (১৯৬৭-৭৭ খ্রি.)।  [আবদুল করিম]

গ্রন্থপঞ্জি  agha mahdi husain (ed), Agra, 1938; Agha Mahdi Husain, Tughlaq Dynasty, New Delhi, Reprinted 1967; ka nizami, On History and Historians of Medieval India, New Delhi, 1983.