ফারগাসন, জেমস


জেমস ফারগাসন

ফারগাসন, জেমস (১৮০৮-১৮৮৬)  স্কটল্যান্ডের অধিবাসী। স্থাপত্যবিদ্যা ও স্থাপত্যবিদ্যার ইতিহাস-এর লেখক। সম্ভবত তিনিই ছিলেন প্রথম লেখক, যিনি বৈজ্ঞানিক পন্থায় ভারতীয় স্থাপত্যবিদ্যার ওপর তাঁর গবেষণালব্ধ ফলাফল লিপিবদ্ধ করেছেন।

জেমস ফারগাসন ১৮০৮ সালের ২২ জানুয়ারি স্কটল্যান্ডের আয়ার-এ জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন সামরিক বাহিনীর একজন চিকিৎসক। প্রথমে এডিনবার্গের রয়েল হাই স্কুলে পড়াশুনা শুরু করলেও পরে তিনি হন্সলোর একটি বেসামরিক স্কুলে ভর্তি হন। পরবর্তীতে কলকাতাস্থ ফেয়ারলি, ফারগাসান এন্ড কোম্পানির একজন কর্মচারি হিসেবে কলকাতায় তাঁর কর্মজীবনের সূচনা করেন। ফারগাসনের বড় ভাই উইলিয়ম ছিলেন উক্ত কোম্পানির একজন অংশীদার। ইতিপূর্বে কলকাতায় অবস্থানকালেপ্রত্নতাত্ত্বিকদের দৃষ্টি পড়েনি ভারতের এমন প্রাচীন নিদর্শনসমূহের প্রতি তিনি আগ্রহী হয়ে উঠেন। নীল উৎপাদনকারী কারখানায় কাজের পাশাপাশি প্রথমেই তিনি গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র ব-দ্বীপাঞ্চলীয় ভৌগোলিক পরিবর্তনের ওপর গবেষণা শুরু করেন। তাঁর এ গবেষণার সার্বিক তথ্য ধারাবাহিকভাবে Journal of the Geographical Society (August-1863) তে প্রকাশিত হতে থাকে।

ভাই উইলিয়মের সঙ্গে কলকাতায় পৃথক ব্যবসা শুধু করলে ফারগাসান আরো স্বাধীনভাবে তিনি তাঁর গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ লাভ করেন। ১৮৩৫ ও ১৮৪৫ সালের মধ্যবর্তী বছরগুলোতে তিনি ভারতের প্রাচীন স্থাপত্যিক নিদর্শনের ওপর কাজ করার উদ্দেশ্যে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক ভ্রমণ করেন। ফারগাসান প্রথমবারের মতো ভারতীয় স্থাপত্যিক ধারা সম্পর্কে বিশ্লেষণী পদ্ধতিতে তা ছাপার রীতিতে পাঠকের সামনে তুলে ধরার প্রয়াস পান ও সেই সঙ্গে নিদর্শনমূহের তারিখ ও ঘটনাপ্রবাহও নির্ধারণ করেন। ভারতীয় স্থাপত্য বিষয়ে ফারগাসানের পর্যবেক্ষণের ফলাফল ১৮৪৫ সালে The Rock-cut Temples of Indian গ্রন্থে প্রকাশিত হয়। ফারগাসনের নিজের অলংকৃত প্রথম গ্রন্থটি Picturesque Illustrations of Ancient Architecture in Hindustan  নামে ১৮৪৭ সালে প্রকাশিত হয়। তিনি ছিলেন একজন দক্ষ নকশা অঙ্কনকারী।

তিনি তাঁর পর্যবেক্ষণলব্ধ ফলাফল নিজেই অঙ্কন করতেন এবং তা প্রকাশ করে ভারতীয় স্থাপত্যবিদ্যায় তাঁর একচ্ছত্র অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। ভারতের প্রাচীন স্থাপত্যিক নিদর্শনসমূহের ঐতিহাসিক ও নান্দনিক দিকগুলোর বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে তিনি নিদর্শনসমূহের সার্বিক বিষয়ের তুলনামূলক জরিপে প্রতি উৎসাহী হয়ে ওঠেন এবং ওই সকল তথ্য তিনি তাঁর Handbook of Architecture (১৮৫৫) গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেন। ১৮৬৫ সালে গ্রন্থটি বর্ধিত কলেবরে History of Modern Architecture নামে পুনঃমুদ্রিত হয়। ভারতীয় স্থাপত্যের ওপর তাঁর সকল গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ ১৮৭৬ সালে প্রকাশিত History of Indian and Eastern Architecture গ্রন্থে লিপিবদ্ধ হয়। শিল্পকলার ইতিহাসের ক্ষেত্রে ফারগাসানের The True Principles of Beauty in Art এক অনবদ্য অবদান। History of Architecture গ্রন্থটিই স্থাপত্যবিদ্যার উপর লিখিত তাঁর অনবদ্য সৃষ্টি। বইটি ফারগাসানের বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গী, পরিকল্পনা ও তাঁর প্রয়াস ধারণ করার জন্য উল্লেখযোগ্য হয়ে আছে।

১৮৭১ সালে জেমস ফারগাসান রয়্যাল ইন্সটিউটিউট অব ব্রিটিশ আর্কিটেক্টস কর্তৃক গোল্ড মেডেল পান। ফারগাসানের রচিত অন্যান্য গ্রন্থসমূহ The History of the Pointed Arch, Architecture of Southern India, A study of Indian Mythology and Art in the Early Centuries of the Christian Era; The Illustrated Handbook of Architecture (1855) ইত্যাদি। Tree and serpent worship (১৮৬৮) নামক গ্রন্থে ফারগাসান সাঁচী ও অমরাবতীতে অবস্থিত বৌদ্ধ প্রত্নতাত্ত্বিক নির্দশন সম্পর্কে ব্যাখ্যা প্রদান করেন। তিনি তাঁর রচিত Rude Stone Monuments of Many Lands (1872) নামক গ্রন্থে প্রকাশ করেন যে, ভারতের মেগালিথিক স্তম্ভসমূহ প্রাগৈতিহাসিক যুগের না বরং ঐতিহাসিক যুগের নিদর্শন। ফারগাসান-এর তত্ত্বাবধানে ভারতীয় শিল্পের বিভিন্ন নিদর্শন ১৮৬১ সালে সিডেনহামে অবস্থিত ইন্ডিয়ান কোর্ট অব দি ক্রিস্টাল প্যালেস-এ (Indian Court of the Crystal Palace) এবং প্যারিসের এক্সপোজিশন ইন্টারন্যাশনাল এ (Exposition International) প্রদর্শিত হয়। ভারত সম্পর্কে ফারগাসান মন্তব্য করেন যে, ‘‘ভারতভূমি নিজেই এক মহাজগৎ। অন্য যে কোন স্থান অপেক্ষা এখানেই প্রত্যেক সমস্যার সমাধান সম্ভব। এখানকার প্রত্যেক শিল্পকর্মের মধ্যে রয়েছে ভারতকে প্রতিনিধিত্বকরী জীবন্ত উপাদান।’’

ভারত বিষয়ক গবেষণাকর্মের পথদ্রষ্টা আলেকজান্ডার কানিংহাম এর কাজ সমূহের সঙ্গেই কেবল ফারগাসানের অবদানের তুলনা করা যেতে পারে। ফারগাসান ছিলেন কানিংহামের সমসাময়িক ও সহযোগী। ১৮৮৬ সালের ৯ জানুয়ারি ইংল্যান্ডে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত ফারগাসান তাঁর গবেষণার বহুমুখী কর্মকান্ড চালিয়ে গিয়েছেন। ইংল্যান্ডের হাইগেট-এর সমাধি ক্ষেত্রে ফারগাসান সমাহিত আছেন।  [নাসরীন আক্তার]

গ্রন্থপঞ্জি  Charles Edward Buckland, Dictionary of Indian Biography; Classic Encyclopedia, Based on the 11th edition of Encyclopedia Britannica (pub. 1911); James Fergusson,  History of Indian and Eastern Architecture, London, 1910.; John William Cousin, A Short Biographical Dictionary of English Literature.