ফতোয়া


ফতোয়া (ফাত্ওয়া)  ইসলামি আইনবিধান (ফিকাহ) সম্পর্কে কোনো আইন-বিশেষজ্ঞ কর্তৃক প্রদত্ত অভিমত বা ব্যাখ্যা। ফাতওয়া একটি বিশুদ্ধ আরবি শব্দ। কতেক অভিধান রচয়িতার মতে এটি আল-ফুতুয়া শব্দ হতে গৃহীত যার অর্থ হলো অনুগ্রহ, বদান্যতা, মনুষ্যত্ব, শক্তি প্রদর্শন। এই অভিমত প্রদানের এরূপ নামকরণ হয়েছে যেহেতু ফতোয়াদাতা মুফতি নিজের বদান্যতা ও প্রজ্ঞা দ্বারা কোনো দ্বীনি বিষয়ে সুষ্ঠু সমাধানকল্পে ‘ফাতওয়া’ প্রদান করে থাকেন।

জটিল বিষয়ের সুষ্ঠু সমাধান দেওয়ার নামই ফাতওয়া। ইবনু’ল আসীরের মতে কোনো বিষয়ের অনুমতি বা বৈধতা বর্ণনা করে দেওয়ার নামই ফাতওয়া। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের মতে ফাতওয়া প্রকৃতপক্ষে আল-ফাতাহ হতে গ্রহণ করা হয়েছে, যার অর্থ হলো প্রতিষ্ঠিত ও মজবুত। আকস্মিক বা নব উদ্ভাবিত কোনো ঘটনার নিষ্পত্তির লক্ষ্যে পেশকৃত দ্বীনি সিদ্ধান্তকে যেহেতু একজন ফাতওয়া দানকারী প্রামাণিক দলীলাদির দ্বারা মজবুত ও সুদৃঢ় করে থাকেন তাই ফাতওয়া এক স্বতঃসিদ্ধ বিধানরূপে পরিগণিত হয়। পবিত্র কুরআনে এ শব্দের একাধিক অর্থ ব্যবহূত হয়েছে, যেমন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা, রায় (সুরা নিসা ১৪৭) বা অভিমত (সুরা য়ূসুফ ৪৩), সিদ্ধান্ত, ব্যাখ্যা (সুরা য়ূসুফ ৪৬) ও কোনো বিষয়ের সমাধান প্রদান করা ইত্যাদি। ফাতওয়াদাতাকে বলা হয় মুফতী এবং ফাতওয়া জিজ্ঞাসাকারীকে বলা হয় সাইল অথবা মুসতাফ্তী।

রিসালাতের যুগ হতেই ফাতওয়া দানের ধারা অব্যাহত রয়েছে। তবে পরবর্তীকালে ফাতওয়া দান ও ফাতওয়া জিজ্ঞাসার নিয়ম-পদ্ধতি এবং ফাতওয়া সংকলনের কার্যবিধির ধরন বিভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করেছে মাত্র। রাসূল (সাঃ) এবং সাহাবা-ই-কিরামের যুগ পর্যন্ত ফাতওয়ার ক্রমধারা স্মৃতিশক্তির মাধ্যমেই সংরক্ষিত হয়েছে। তখনকার যুগে এ নিয়ম প্রচলিত ছিল যে, যখনই কোনো জটিল বিষয়ের উদ্ভব হয়েছে তখনই মুসলমানগণ তা রাসুলের (সাঃ) খিদমতে পেশ করেছেন। দ্বীনের ব্যাখ্যাদাতা ও সকল ফাতওয়ার ব্যাপারে তিনিই সকলের নির্ভরযোগ্য ছিলেন। সাহাবা-ই-কিরাম যেসব দ্বীনি বিষয়ে রাসূলকে (সাঃ) জিজ্ঞাসা করেছেন তার কোনোটির সমাধান কুরআনের আয়াতের মাধ্যমে পাওয়া যেত। যেমন কুরআনের কতক স্থানে এরূপ বর্ণিত হয়েছে, তারা তোমাকে ফাতওয়া জিজ্ঞাসা করে, বলে দাও যে, আল্লাহতা’আলা তোমাদের ফাতওয়া দিচ্ছেন (সুরা নিসা ১২৭)। আবার কখনো কখনো তিনি ইলহাম ও আল্লাহপ্রদত্ত জ্ঞানের আলোকে ইজতিহাদ করে ফাতওয়া প্রদান করতেন। এ ছাড়াও রাসূলের (সাঃ) সময়ে কোনো কোনো সাহাবী নিজের ইজতিহাদের মাধ্যমে দ্বীনের বিভিন্ন জটিল বিষয়ের উপর ফাতওয়া দান করতেন। তাদের মধ্যে আলী ইবন আবী তালিব (রা), আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা), মুআয ইবন জাবাল (রা), হুযায়ফা ইবনুল-ইয়ামান (রাঃ), সালমান ফারসী (রা), আমর ইবনুল আস (রা) প্রমুখ সাহাবীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁরা নিজেদের ইজতিহাদের মাধ্যমে যেসব বিষয়ে ফাতওয়া প্রদান করেছেন তা রাসূল (সাঃ) শুধু পছন্দই করেন নি, বরং সঠিক ইজতিহাদ করার প্রশংসাও করেছেন এবং এর প্রতিদান ও পুরস্কার প্রাপ্তিরও সুসংবাদ প্রদান করেছেন। নবুওয়াতের যুগের সমাপ্তির পরেও সাহাবা-ই-কিরামের যুগে ফাতওয়ার ব্যাপারে প্রশ্ন করা ও এর উত্তর দানের ধারা অব্যাহত ছিল। সে সময় অধিকাংশ বর্ণনাই স্মৃতিনির্ভর ছিল, তবে বেশ কিছুসংখ্যক বর্ণনা লিপিবদ্ধও হয়েছে। এর মধ্যে কতক খোলাফা-ই-রাশেদীনের নির্দেশে লিপিবদ্ধ হয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে ও শহরে প্রেরিত হয়েছে। আর কতক ফাতওয়া ব্যক্তিগত উদ্যোগে লিখিত হয়েছে। কেননা প্রথম হিজরীর শেষার্ধ হতে ফিকাহর সংকলনের কাজ শুরু হয়। মৌখিক ও লিখিতভাবে ফাতওয়া প্রদানের ধারা যেহেতু সাহাবা-ই-কিরামের যুগ হতেই চলে এসেছিল, তাই সে যুগে বিশিষ্ট সাহাবাগণ ফাতওয়া দানের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন।

উমাইয়া ও আববাসীয় আমলে প্রখ্যাত ও জ্ঞানী ধর্মবেত্তাদের পুরোভাগে আসা পর্যন্ত ইসলামের প্রথম যুগে কাযীগণ ফাতওয়া জারি করতেন। আধুনিককালে কোনো কোনো মুসলিম রাষ্ট্রে ইসলামের খ্যাতনামা আইন ব্যাখ্যাকারীদের নিয়ে ফাতওয়া কমিটি গঠন করা হয়েছে। মিসর, তুরস্ক, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মরক্কো, জর্দান, সুদান, সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের কমিটিগুলির অভিজ্ঞতা ফাতওয়া অনুশীলনের কিছু বৈশিষ্ট্য উদ্ঘাটন করেছে। প্রথমত শুধু ব্যক্তির মতের উপর নির্ভর করে ফাতওয়া দেওয়া হয় নি, দ্বিতীয়ত এগুলি জারীর ক্ষেত্রে যখন প্রয়োজন হয়েছে তখনই কেবল ফাতওয়া দেওয়া হয়েছে; তৃতীয়ত, উল্লিখিত দেশগুলির চলমান আইনের সঙ্গে ফাতওয়াগুলি সঙ্গতিপূর্ণ। বিখ্যাত কয়েকটি ফাতওয়া গ্রন্থের নাম হলো: ফাতওয়ায়ে কাযীখান, ফাতওয়ায়ে শামী, ফাতওয়ায়ে আলমগীরী।

ভারত উপমহাদেশে সর্বপ্রথম দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসায় দারুল ইফতা বা ফাতওয়া বিভাগ চালু করা হয়। ইসলামি বিধিবিধান সম্পর্কে নির্দেশনার জন্য দূরদূরান্ত থেকে লোকজন ফাতওয়ার জন্য মাদ্রাসার আলেমদের শরণাপন্ন হতেন। মাদ্রাসায় শিক্ষাদানের ব্যস্ততার মধ্যে তাদের পক্ষে সবসময় আগত লোকদের উত্থাপিত প্রশ্নের জবাব সময়মত দেয়া সম্ভব হতো না। এ অবস্থার মোকাবেলার জন্য মাদ্রাসায় ফাতওয়ার ফয়সালার জন্য মাদ্রাসার শিক্ষক ইয়াকুব নানুতবীকে (রহ) দায়িত্ব প্রদান করা হয়। তাঁর ইন্তেকালের পর বিভিন্ন শিক্ষকের দ্বারা এ গুরুত্বপূর্ণ কাজ সুষ্ঠুভাবেই পরিচালিত হতে থাকে। কিন্তু ফাতওয়া-প্রার্থীর সংখ্যা দিনে দিনে বৃদ্ধি পেতে থাকলে ১৩১০ হিজরিতে মাদ্রাসায় ‘দারুল ইফতা’ নামে পৃথক একটি ফাতওয়া বিভাগ খোলা হয়। হযরত মওলানা মুফতী আজীজুর রহমান সর্বপ্রথম এ বিভাগে মুফতী নিযুক্ত হন। শুরুতে ফাতওয়ার নকল রাখার কোনো নিয়ম পালন করা না হলেও ১৩২৯ হিজরির যিলকদ মাস থেকে সকল ফাতওয়ার নকল সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। প্রথম ৪৭ বছরের অসংখ্য ফাতওয়া সংরক্ষিত না থাকলেও ১৩২৯ থেকে ১৩৪৬ হিজরি পর্যন্ত সংরক্ষিত ফাতওয়ার সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৭৫৬১। পরবর্তী সময়ে ফাতওয়ার বিশাল ভান্ডারকে বিষয়ভিত্তিক পৃথক পৃথক অধ্যায় ও পরিচ্ছেদে বিন্যাস করে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করার ব্যবস্থা নেয়া হয়। মওলানা জহীরুদ্দীন এই বিন্যাসের কাজে নিয়োজিত হন।

প্রথমে সংকলিত ফাতওয়াগুলির সাথে কোনো উদ্ধৃতি ছিল না। মওলানা জহীরুদ্দীন নির্ভরযোগ্য ফিকাহর কিতাবসমূহ ঘেটে উদ্ধৃতি বের করে ফাতওয়ার সাথে তা সংযুক্ত করেছেন। উদ্ধৃতি কিতাব ও অধ্যায়ের পাশাপাশি মাসআলাটির এবারতও লিপিবদ্ধ করেছেন। ফাতওয়াগুলির সাথে দিন তারিখেরও উল্লেখ করা হয়। ফাতওয়া গ্রন্থকারে সংকলনের সময় ফিকাহর নিয়মে মাসঅলাগুলো বিন্যাস করা হয়। ফাতওয়ায়ে-দারুল উলূম প্রথম খন্ড প্রকাশিত হয় ১৩৮২ হিজরি সনে। পরবর্তীকালে আরো নয়টি খন্ড বেরিয়েছে। কয়েকটি খন্ড এখনো প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে। এ কিতাব প্রশ্নাতীত গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। মাওলানা আবুল কালাম আযাদ ১৩৭০ হিজরি সনে দারুল উলূম দেওবন্দে আগমন করেন। সে সময় ফাতওয়ার এই বিপুল ভান্ডার দেখে তিনি মন্তব্য করেছিলেন: ‘এর দ্বারা আরেকটি ফাতওয়ায়ে তাতারখানি প্রস্ত্তত করা যেতে পারে। দ্বীনের এই বিরাট খিদমত আপনারা আঞ্জাম দিচ্ছেন। এতে মানুষের অনেক সমস্যার সহজ সমাধান দেয়া সম্ভব হবে’।

ইসলামি আইনবিধানের উৎস কুরআন, হাদীস, ইজমা ও কিয়াসের উপর ভিত্তি করে শর্ষিণা দারুচ্ছুন্নাত আলিয়া মাদরাসা, সরকারি মাদরাসা-ই-আলিয়া, ঢাকার বিজ্ঞ ফকীহ মুফতীবৃন্দ ফাতওয়া প্রদান করে আসছেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশনে ‘দারুল ইফতা’ নামে একটি বিভাগে ফাতওয়া প্রদান করা হয়। এ ছাড়া হাটহাজারী দারসে নিযামী মাদরাসা ও চট্টগ্রাম মাদরাসার ফাতওয়া বিভাগ থেকেও ফাতওয়া প্রদান করা হয়।

নববইয়ের দশকের শেষভাগে এদেশে ফতোয়ার বিপক্ষে ব্যাপক জনমত তৈরি হয় এবং এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২০০১ সালের ১ জানুয়ারি হাইকোর্ট ফতোয়াকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ২০০১ সালের রায়ে বলা হয়েছিল, ‘বাংলাদেশে একমাত্র আদালতই মুসলিম বা অন্য কোন আইন অনুযায়ী আইন সংক্রান্ত কোন প্রশ্নে মতামত দিতে পারে। কেউ ফতোয়া দিলে তা ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯০-এর ধারা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ হবে’। ২০১১ সালের ১২ মে হাইকোর্টের সেই ঘোষণা আপিল বিভাগের রায়ে আংশিক পরিবর্তন হয়, এবং কিছু শর্ত সাপেক্ষে ফতোয়াকে বৈধ ঘোষণা করে। আপিল বিভাগের মতে, ধর্মীয় বিষয়ে ফতোয়া দেওয়া যেতে পারে, তবে যথাযথ শিক্ষিত ব্যক্তি তা দিতে পারবেন এবং ফতোয়া গ্রহণের বিষয়টি হতে হবে স্বতস্ফূর্ত। এমন কোন ফতোয়া দেওয়া যাবেনা যা কারো অধিকার ক্ষুন্ন করে। ফতোয়ার মাধ্যমে কাউকে শারীরিক এবং মানসিক শাস্তি দেওয়া যাবে না।  [এ.কে.এম ইয়াকুব হোসাইন]