ফতহীয়া-ই-ইবরীয়া


ফতহীয়া-ই-ইবরীয়া ইবনে মুহম্মদ ওয়ালী কর্তৃক রচিত ইতিহাস গ্রন্থ। গ্রন্থটি তারিখ-ই-আসাম নামেও পরিচিত এবং এর গ্রন্থকার শিহাবুদ্দীন তালিশ নামে সমধিক প্রসিদ্ধ। তালিশ রচয়িতার কাব্যিক নাম। তিনি সুবাহদার মীরজুমলার (১৬৬০-১৬৬৩) অধীনস্ত কর্মচারী ছিলেন। মীরজুমলা তাঁর সুবাহদারির অধিকাংশ সময়ই কুচবিহার ও কামরূপ বিদ্রোহ দমনে এবং আসাম রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনায় অতিবাহিত করেন। তালিশ যুদ্ধকালীন সময়ে মুন্সি বা কেরানি হিসেবে সবসময় সুবাহদারের সঙ্গী ছিলেন এবং পুরো অভিযানকাল তিনি তাঁর মনিবের শিবিরে কাটান। কিন্তু মনিব তাঁকে নির্ধারিত কাজের অতিরিক্ত যুদ্ধের ইতিহাস লেখার গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেন। এভাবেই তালিশ কর্তৃক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে যুদ্ধের ঘটনাবলি লিপিবদ্ধ হয়েছিল। তিনি মীরজুমলার সঙ্গে আসাম হতে রাজধানী ঢাকা অভিমুখে রওনা হলে পথিমধ্যে মীরজুমলার মৃত্যু হয়। মীরজুমলার শবদেহ নিয়ে অন্যান্যদের সঙ্গে তিনিও বর্তমান নারায়ণগঞ্জের অনতিদূরে মুগল সামরিক কেন্দ্র খিজিরপুর পর্যন্ত এসেছিলেন। অন্ততপক্ষে শায়েস্তা খান কর্তৃক ১৬৬৬ সালে চট্টগ্রাম বিজয় পর্যন্ত তালিশ বাংলায় অবস্থান করেছেন।

তালিশের বইটির নামকরণ ফতহীয়া-ই-ইবরীয়া খুবই তাৎপর্যবহ, যার অর্থ ‘বিজয়’। গ্রন্থটি দুখন্ডে বিভক্ত। ফতহীয়া নামে প্রথম খন্ডটি অনেক পূর্ব থেকেই সকলের কাছে পরিচিত ছিল। এর একটি কপি কলকাতা এশিয়াটিক সোসাইটি এর গ্রন্থাগারে এবং অপর দুটি কপি বিহারের বাকিপুরে ওরিয়েন্টাল লাইব্রেরিতে রক্ষিত ছিল। গ্রন্থের এ অংশে মীরজুমলার আসাম বিজয়ের বর্ণনা আছে এবং এ কারণে এটি তারিখ-ই-আসাম নামেও পরিচিত। বিশ শতকের প্রথম দশকে স্যার যদুনাথ সরকার অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বোডলিয়ান লাইব্রেরিতে দ্বিতীয় খন্ডটি আবিষ্কার করেন। এখানে শায়েস্তা খান কর্তৃক চট্টগ্রাম বিজয়ের ইতিহাস লিপিবদ্ধ আছে। এ অংশের কোন পৃথক শিরোনাম নেই, তাই ধারণা করা হয় যে, এটি ফতহীয়া-ই-ইবরীয়ার ক্রমবিবরণী, বা পরবর্তী ধারাবাহিক বর্ণনা।

সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশে সংঘটিত যুদ্ধবিগ্রহ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা জানানোর জন্য মুগল সম্রাটগণ ওয়াকিয়ানবিস নিয়োগ করতেন। মীরজুমলা অবশ্য ‘ওয়াকিয়ানবিস’দের বিবরণ নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না এবং এ কারণে তিনি উক্ত বিষয়াবলির উপর পৃথক ও স্বাধীনভাবে তথ্য পরিবেশনার জন্য তালিশকে নিযুক্ত করেছিলেন। তালিশ সুবাহদার ও তাঁর সেনাবাহিনীর অগ্রযাত্রার প্রতিদিনের বিবরণ লিপিবদ্ধ করতেন। কালানুক্রমিক যে ব্যাপক বর্ণনা তিনি দেন তা আর কোথায়ও পাওয়া যায় না। তিনি বর্ণিত স্থানের ভূমি গঠন ও জলবায়ুর বিবরণ দেন, কুচবিহার ও আসামের রাজা ও অমাত্যদের খবর পরিবেশন করেন। এ ছাড়াও আসামের জনগণ সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে তাদের আচার আচরণ, সংস্কৃতি ও যুদ্ধ কৌশল বর্ণনা করতেও ভুলেন নি। তিনি জানান যে, অহোমীয়রা, যদিও বেশ সাহসী ও পরাক্রান্ত তবে তারা শুধু রাত্রে যুদ্ধ করে, যুদ্ধাশ্বের সম্মুখে পড়লেই তারা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে এবং তারা মুগল অশ্বারোহী বাহিনীর সম্মুখীন হতে পারত না। সরকারি উদ্যোগে সংকলিত আলমগীরনামায় তালিশের বর্ণনার বেশির ভাগ সমর্থন পাওয়া যায়। এ দুই গ্রন্থে ভাষা প্রয়োগ ও শব্দ চয়নে অপূর্ব মিল পরিলক্ষিত হয়, এমন কি সময়ে সময়ে হুবহু মিলে যায়। এতে প্রতীয়মান হয় যে, আলমগীরনামা প্রণেতা মীরজুমলা কর্তৃক সম্রাটের নিকট প্রেরিত তালিশের বিবরণাদি কোন পরিবর্তন ও পরিবর্ধন না করেই ব্যবহার করেন।

শিহাবুদ্দীন তালিশ একজন বিচক্ষণ পর্যবেক্ষক ছিলেন। তিনি স্বচক্ষে দেখা ঘটনার বর্ণনা দেন। যে সকল ঘটনাস্থলে তিনি উপস্থিত ছিলেন না এবং ঘটনাবলি প্রত্যক্ষ করেননি সেগুলি যাদের মাধ্যমে জোগাড় করেন যথাস্থানে তিনি তাদের নাম উল্লেখ করেছেন। তাঁর লেখা যুদ্ধের বর্ণনা মোটামুটি সত্য বলে অহোম বুরঞ্জিতে (আসামের স্থানীয় ও দেশজ ইতিহাস) সমর্থন পাওয়া যায়। নিরপেক্ষতার জন্য তালিশ কৃতিত্বের দাবীদার। অহোমদের প্রাপ্য কৃতিত্ব স্বীকার করতে তিনি কখনও কার্পণ্য করেননি। তাঁর দেওয়া আসামের নৌ-যুদ্ধ সমূহের বর্ণনার সঙ্গে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একজন নাম না জানা ডাচ নাবিকের বর্ণনা প্রায় সম্পূর্ণ মিলে যায়। মধ্যযুগে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষের নিকট আসাম ছিল অচেনা রাজ্য। মুগলেরাই সর্বপ্রথম রাজধানী গরগাঁওর চারপাশের এলাকায় প্রবেশ করে। এ কারণে শিহাবুদ্দীন তালিশ প্রদত্ত আসামের সমাজ, অর্থনৈতিক অবস্থা, যুদ্ধকৌশল, প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য, রীতি-নীতি, অহোমদের দুর্গতির কারণ বিভিন্ন রোগ ও মহামারী, প্রভৃতির বর্ণনা আধুনিক গবেষক ও ঐতিহাসিকদের নিকট খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

মীরজুমলার মৃত্যুর পর শিহাবুদ্দীন তালিশ সম্ভবত তাঁর পরবর্তী সুবাহদারদের অধীনে চাকরি নিয়ে বাংলায় অবস্থান করছিলেন। তিনি মীরজুমলার উত্তরসূরি দাউদ খানের শাসনকাল বর্ণনা করেন। তবে ফতহীয়া’র ক্রমবিবরণীর ধারাবাহিকতায় সুবাহদার শায়েস্তা খান কর্তৃক চট্টগ্রাম বিজয়ের বিবরণ সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এ অংশে তিনি শায়েস্তা খানের প্রশাসনিক সংস্কার, তাঁর চট্টগ্রাম অভিযানের প্রস্ত্ততি, সন্দ্বীপের ভৌগোলিক অবস্থান এবং বিজয়, পর্তুগিজদের সমর্থন লাভ, ডাচদের নিকট সাহায্যের আহবান, এবং পরিশেষে চট্টগ্রাম জয়ের কাহিনী আলোচনা করেন। ফতহীয়ার এ অংশের বর্ণনাও ছিল যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য। আলমগীরনামার বর্ণনার সঙ্গে এ অংশের বর্ণনার ব্যাপক মিল পাওয়া যায়। আবার  ডাচ ও ইংরেজ উৎসে প্রাপ্ত সাক্ষ্য এ বর্ণনাকে সমর্থন যোগায়। ইতিহাসের এই অংশ প্রণয়নের সময় গ্রন্থকার তালিশ সম্ভবত রাজধানী ঢাকায় শায়েস্তা খানের দরবারে অবস্থান করছিলেন।

শায়েস্তা খানের সুবাহদারির তৃতীয় বছরে হঠাৎ করে ফতহীয়ার ধারাবাহিক বর্ণনায় ছেদ পড়ে। এ গ্রন্থে বর্ণিত সর্বশেষ ঘটনা হলো চট্টগ্রাম দুর্গে বুযুর্গ উমেদ খান এর গৌরবদীপ্ত প্রবেশ। দুর্গটি আরাকানিদের হাত থেকে তিনি ছিনিয়ে নেন। সম্ভবত এ ঘটনার পর পরই তালিশের মৃত্যু হয়।  [আবদুল করিম]

গ্রন্থপঞ্জি H Blochmann, Journal of the Asiatic Society of Bengal, XLI, 1872; JN Sarkar, Journal of the Bihar and Orissa Research Society, I; JN Sarkar, Journal of the Asiatic Society of Bengal, II, No 16, 1906; III, No 6, 1907; SN Bhattacharya, Mughal North-Eastern Frontier Policy, Calcutta 1929, Jagadish Narayan Sarkar, The Life of Mir Jumla General of Aurangzib, Calcutta, 1979; Abdul Karim, History of Bengal, Mughal Period, II, Rajshahi, 1995.