ফজল গাজী


ফজল গাজী ভাওয়ালের জমিদার এবং বাংলার বিখ্যাত বারো ভূইয়াদের একজন। তিনি চৌরার গাজী বংশোদ্ভূত। গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জের দুই কিলোমিটার উত্তরে শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত চৌরায় এ পরিবার প্রথম বসতি স্থাপন করে। এ বংশের আদি পুরুষ পাহলোয়ান শাহ ইসলাম প্রচারের লক্ষ্যে ভাওয়াল এলাকায় আসেন এবং  চৌদ্দ শতকের গোড়ার দিকে এখানে বসতি স্থাপন করেন। পাহলোয়ান শাহের পুত্র কারফর্মা ছিলেন একজন দরবেশ প্রকৃতির লোক। তিনি দিল্লির সুলতানের নিকট থেকে এক সনদের মাধ্যমে ভাওয়াল পরগনার জায়গির লাভ করেন। ফজল গাজী ছিলেন পাহলোয়ান শাহের অধস্তন অষ্টম পুরুষ।

ফজল গাজী ছিলেন খুবই প্রতাবশালী এবং গাজী বংশের জমিদারদের মধ্যে সর্বাধিক সুবিদিত। তাঁর একটি স্থায়ী স্থল বাহিনী এবং বিপুল সংখ্যক রণতরী সম্বলিত শক্তিশালী নৌবহর ছিল। ফজল গাজী দিল্লির সম্রাট শেরশাহের (১৫৪০-১৫৪৫) সঙ্গে কুটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। তিনি ১৫৪২ খ্রিস্টাব্দে (৯৪৫ হি.) শেরশাহের নিকট বহুমূল্য উপঢৌকন পাঠান। সেই উপঢৌকনের অন্তর্ভুক্ত একটি কামান এখন ঢাকা জাদুঘরে রক্ষিত আছে। সোনারগাঁয়ের দেওয়ানবাগে মাটির তলা থেকে উদ্ধারকৃত সাতটি কামানের অন্যতম এটি। কামানটির গায়ে শেরশাহের নামের সঙ্গে খোদিত আছে : ‘আয্ ফজল গাজী’ (ফজল গাজী থেকে প্রাপ্ত)। ভাটির শাসক ঈসা খান মসনদ-ই-আলার সঙ্গে ফজল গাজীর প্রগাঢ় মিত্রতা ছিল। বাংলায় আগত আফগানদের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল বলেও শোনা যায়। সম্রাট আকবরের বাহিনীর বাংলায় প্রথম অভিযানকালে (১৫৭৪) ফজল গাজী ভাওয়ালের জমিদার ছিলেন। তিনি মুগল বাহিনীর সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছিলেন কিনা তা জানা যায় নি, তবে তাঁর পুত্র বাহাদুর গাজী ভাটির শাসক মুসা খানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে স্বীয় নৌবহর নিয়ে মুগলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন।

তাঁর রাজ্য চাঁদ প্রতাপ (চাঁদ গাজী), তালিপাবাদ (তালা গাজী) ও ভাওয়াল (বড় গাজী) এ তিনটি পরগনায় বিস্তৃত ছিল। তাঁর জমিদারিতে অনেক অধীনস্থ তালুকদার ছিলেন যারা তাঁর কোষাগারে রাজস্ব জমা দিতেন। ফজল গাজী দীর্ঘকাল শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন বলে ধারনা করা হয়। সম্ভবত ১৫৮৮ খ্রিস্টাব্দে  ফজল গাজীর মৃত্যু হয়।  [মুয়ায্‌যম হুসায়ন খান]