প্রোটোজোয়া


Mukbil (আলোচনা | অবদান) কর্তৃক ১৪:৫৭, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ পর্যন্ত সংস্করণে

(পরিবর্তন) ←পুর্বের সংস্করণ | সর্বশেষ সংস্করণ (পরিবর্তন) | পরবর্তী সংস্করণ→ (পরিবর্তন)

প্রোটোজোয়া (Protozoa)  Protista-র বৃহৎ এক প্রাণি-দল (subkingdom), যাদের সাধারণ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হলো মাত্র একটি কোষে দেহ গঠিত। প্রকৃত নিউক্লিয়াস, সুচিহ্নিত কোষকাঠামো এবং একটি বিপাকীয় প্রক্রিয়ার নির্দিষ্ট ধরন দ্বারা প্রোটোজোয়া অন্যান্য প্রটিস্টা থেকে স্বতন্ত্র, যদিও কোন কোন ক্ষেত্রে এই বিভাজন খুব স্পষ্ট নয়। এই এককোষী প্রাণীরা জীবনের জন্য জরুরি যাবতীয় কাজকর্ম কোষের মধ্যেই চালাতে পারে, যা অনেক উচ্চতর শ্রেণীর প্রাণীর ক্ষেত্রে বিশেষ অঙ্গ বা অঙ্গতন্ত্র সম্পাদন করে। প্রাণিজগতের এ উপসর্গটি নিশ্চিতই বহুজাতিজ (polyphylletic)। এটি জীবরাসায়নিক বিশ্লেষণ দ্বারা প্রমাণিত এবং তা দেখিয়েছে যে প্রোটোজোয়ার কোন কোন পর্ব (phylum) অন্যান্য প্রোটোজোয়ার চেয়ে সুনির্দিষ্ট এককোষী উদ্ভিদের সঙ্গেই অধিকতর ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। ইতিহাসের হিসাবে ১৭শ শতকের শেষে ফন লিউয়েনহুক (Van Leeuwenhoek) এটি আবিষ্কার করলেও প্রোটোজোয়াঘটিত রোগের তথ্য চীন দেশের সুঙ-বংশের শাসনকালেও জানা ছিল। বর্তমানে এদের জানা প্রজাতি সংখ্যা প্রায় ৪০,০০০, তবে সংখ্যা অনেক বেশি হবে।

প্রোটোজোয়ার বর্তমান পর্ব সংখ্যা পাঁচ। অনেক বছর যাবৎ সংখ্যাটি ছিল ৮। বর্তমানে ফ্লাজেলাবাহী (flagellated) প্রোটোজোয়া ও অ্যামিবাদের একই পর্বে (Sarcomastigophora) অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আরও দেখা গেছে যে Myxozoa ও Ascetospora পর্বদুটি আসলে Myxozoa পর্বেরই বিকল্প চক্রমাত্র। এই পর্বটিতে কিছু পর্যায় বহুকোষী জীবের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হওয়ার ঘটনা ধরা-পড়ায় জীবরাসায়নিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সম্প্রতি প্রোটোজোয়া থেকে এটিকে পৃথক করা হয়েছে। একইসঙ্গে যেসব প্রজাতি সম্প্রতি গঠিত কোন পর্বের সঙ্গেই সঠিক লাগসই নয় সেগুলি নিয়ে ভবিষ্যতে হয়ত নতুন নতুন পর্ব গঠিত হবে। বর্তমান পুনর্গঠিত পর্বগুলি Sarcomastigophora, Labrinthomorpha, Apicomplexa, Microspora, Ciliophora। অধিকাংশ প্রোটোজোয়াই মুক্তজীবী এবং স্থলীয় ও জলীয় উভয় বাস্ত্ততন্ত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।  [গ্লেন এ ব্রিস্টো]

মুক্তজীবী প্রোটোজোয়া  মুক্তজীবী প্রোটোজোয়ারা নিঃসঙ্গ (Amoeba) বা দলবদ্ধভাবে (Volvox) বাস করে। উভয় ধরনের প্রজাতিগুলির অনেকেই কোন বস্ত্তর সঙ্গে সংলগ্ন থাকে। প্রোটোজোয়ার সিংহভাগই আণুবীক্ষণিক, কোন কোনটি খালি চোখে দেখা যায় (Spirostomum প্রায় ৩ মিমি), কতক বিলুপ্ত Foraminiferan প্রোটোজোয়া, যেমন Nummulites ছিল ১৯ সেমি লম্বা।

মুক্তজীবী প্রোটোজোয়ারা পুকুর, হ্রদ, নদী, মাটি ও অনুরূপ আবাসস্থলে বাস করে। পুষ্টি ও খাদ্যাভ্যাসের নিরিখে এগুলি মৃতভোজী, প্রাণিভোজী, উদ্ভিদভোজী ও আবর্জনাভুক হতে পারে। Mastigophora, Sarcodina, এবং Ciliata-এর সদস্যরা মুক্তজীবী বা পরজীবী হতে পারে, কিন্তু সব Sporoza একান্তভাবে পরজীবী।

অনেক মুক্তজীবী Flagellate উদ্ভিদবিদদের বিবেচনায় উদ্ভিদরাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। সামুদ্রিক Dinoflagellate অগভীর পানির (২০০ মিটার পর্যন্ত) বাসিন্দা; Foraminiferan ও অন্যান্য Rhizopod প্রোটোজোয়ারা প্রধানত উপকূলীয় তলবাসী। স্বাদুপানির প্রোটোজোয়া বহমান পানিতে প্রায় না থাকলেও স্থির পানিতে পর্যাপ্ত। Flagellate প্রোটোজোয়া জলীয় পরিবেশে জীববস্ত্তর প্রাথমিক উৎপাদক হিসাবে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। অনেক প্রোটোজোয়া ব্যাকটেরিয়াভুক এবং সেজন্য খাদ্যশৃঙ্খলের উল্লেখযোগ্য উপাদান। তাই ব্যাকটেরিয়াভুক প্রোটোজোয়া মাটি ও দূষিত পানির ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ববহ। Radiolarian সম্ভাব্য পেট্রোলিয়াম ড্রিলিং স্তরের সংকেত যোগায়। ভূমিজ প্রোটোজোয়া (Ciliates, Amoeba) উপকারী ব্যাক্টোরিয়াভুক বিধায় জমির উর্বরতার পক্ষে ক্ষতিকর। কিছু প্রোটোজোয়া মাটিতে অ্যামোনিয়া ও নাইট্রোজেন বন্ধনের প্রক্রিয়া ত্বরিত করে।

বাংলাদেশের মুক্তজীবী প্রোটোজোয়া সম্পর্কে তথ্য অপ্রতুল। এই বর্গের সামুদ্রিক প্রজাতিগুলি Tintinnidae গোত্রভুক্ত Flavella taraikensis ও Helicostomella species। স্বাদুপানিরও ভিন্ন বর্গভুক্ত কিছু প্রোটোজোয়া শনাক্ত করা গেছে যেমন Pleodorina, Protococcus, Phacus, Euglena, Trachelomonas ইত্যাদি।

পরজীবী প্রোটোজোয়া  অধিকাংশ প্রোটোজোয়া মুক্তজীবী হলেও কিছু প্রোটোজোয়া পরজীবী, যেগুলি মানুষ ও গৃহপালিত পশুর অনেকগুলি প্রধান রোগের কারণ। Sarcomastigophora পর্বের Trypanosoma প্রজাতিগুলি Chagas disease ও sleeping sickness এবং Leishmania প্রজাতি কালাজ্বর (Kala-azar) ও সংশ্লিষ্ট কিছু রোগ ঘটায়। Diplomonad Giardia lamblia ততটা প্রাণঘাতী না হলেও সর্বত্র বিদ্যামান এই প্রোটোজোয়াটি পুষ্টিহীনতা ও অন্যান্য রোগে দুর্বল লোকদের নির্জীব করে ফেলে। একই পর্বভুক্ত Sarcodina উপপর্বের Entamoeba গণের প্রজাতি মারাত্মক ও বিপজ্জনক অ্যামেবিক আমাশয় রোগ সৃষ্টি করে। Apicomplexa-র মধ্যে সুপরিচিত Plasmodium গণের প্রজাতিরা ম্যালেরিয়া এবং Toxoplasma প্রোটোজোয়া গর্ভজাত শিশুর অন্তঃগর্ভফুলের ক্ষয়রোগ ঘটায়। মানুষ, শূকর ও অন্যান্য স্তন্যপায়ীর অন্ত্রবাসী পরজীবী Balantidium coli (Ciliata) দ্বারা অ্যামেবিক আমাশয়সদৃশ রোগ সৃষ্টি হয়। ছোট Labrinthomorpha পর্বের পুরোটাই এককভাবে শৈবালের (macro-algae) পরজীবী।

Labrinthomorpha ছাড়া উপরোক্ত সবগুলি বর্গেরই কিছু কিছু প্রজাতি নানাপ্রকার পোষকের পরজীবী এবং গরু, ভেড়া, ছাগল, মুরগি, মাছ, মৌমাছি ও অন্যান্য গৃহপালিত প্রাণীর মহামারী ঘটিয়ে ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতিসাধন করে। প্রাণিদেহের স্বাভাবিক পরজীবী প্রোটোজোয়াদের অন্তত একটি দল পোষক হিসেবে উদ্ভিদের সদ্ব্যবহারের অভ্যাসও রপ্ত করে ফেলেছে। এটি হলো trypanosomid জাতের Phytomonas, যার প্রজাতিরা কফি, নানা জাতের পামগাছ, এমনকি টমেটো ফসলেরও ব্যাপক ক্ষতি ঘটায়।

নিবিড় মৎস্যচাষের প্রসারের ফলে প্রোটোজোয়ার কোন কোন বর্গের সদস্যরা মাছ, চিংড়ি ও শেলফিসের জন্য মারাত্মক বিপদ সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশের আরেকটি বাড়তি সমস্যা হলো বিদেশি মাছ প্রবর্তন, ফলে সেসঙ্গে বিদেশি পরজীবীদেরও আগমন ঘটছে, যেগুলি স্থানীয় মৎস্য প্রজাতিগুলির ব্যাপক বিনাশ ঘটাতে পারে।

অনেক প্রোটোজোয়া সুনির্দিষ্ট একটি পোষকদেহে পরজীবী হলেও এদের কোন কোনটির একাধিক পোষক প্রজাতি থাকতে পারে এবং সেটি দ্বিতীয় আশ্রয় বা আধার হিসাবে থাকায় এদের সৃষ্ট রোগ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে ওঠে। উদাহরণস্বরূপ, কালাজ্বরের জীবাণু Leishmania donovani donovani সাধারণত থাকে মানুষ, কুকুর ও শিয়ালের শরীরে; নিদ্রারোগের Trypanoplasma gambiens জীবাণুর বাস মানুষ, বানর, কুকুর, শূকর, antelope ও অন্যান্য প্রাণীতে; নিদ্রারোগের আরেকটি জীবাণু T. rhodesiense মানুষ ছাড়াও আছে বন্যপ্রাণী ও শূকরে এবং Cryptosporidium species থাকে মানুষ, বানর, গরু, ভেড়া, ছাগল, শূকর, মুরগি, বিড়াল ও ইঁদুরে। অধিকন্তু, অন্যান্য প্রাণীর স্বাভাবিক দেহবাসী আরও কিছু প্রোটোজোয়া মানুষকে কখনও কখনও আক্রমণ করতে পারে। প্রায়শ যখন তা ঘটে তাতে তখন মানুষের নানা রোগ দেখা দেয়।

মানুষের শরীরে সাধারণত দেখা যায় না এমন কিছু পরজীবী প্রোটোজোয়া immuno-suppressed লোকের মৃত্যুর কারণ ঘটায়। এটি বিশেষভাবে Sporozoa শ্রেণীর Coccidia উপশ্রেণীর কিছু প্রোটোজোয়ার ক্ষেত্রে সত্য, যেমন Cryptosporidium ও Pneumocystis carinii থেকে নিউমোনিয়া হতে পারে।

বিভিন্ন প্রোটোজোয়ার জীবনচক্রে চারিত্রিক জটিলতা বেশ প্রকট। অনেক প্রজাতির ক্ষেত্রে যৌন ও অযৌন পর্যায়ক্রম রয়েছে, আবার কোন কোনটিতে যৌন পর্যায় নেই। অযৌন প্রজননের ধরনগুলিও বহুবিধ। বেশির ভাগ প্রজাতিরই একটি নিউক্লিয়াস থাকে। কোন কোন দল আবার বহু নিউক্লিয়াবিশিষ্ট। কয়েকটি কলোনিবদ্ধ প্রজাতিও আছে। খাদ্যগ্রহণ ও রেচন কয়েকটি পদ্ধতিতে সম্পন্ন হয়। পরজীবী প্রজাতির কোন কোন জীবনচক্র প্রত্যক্ষ অন্যরা জীবনচক্র সম্পূর্ণ করে একাধিক মধ্যবর্তী পোষকে। মুক্তজীবন পর্যায় থাকে বা থাকে না। কোন কোন প্রজাতিতে সিস্ট আছে, আবার একই গণের অন্যান্য নিকট প্রজাতিতে সেটি নেই। কারও আছে একটি পোষক, কারও থাকে বিকল্প পোষক। পরজীবী প্রজননচক্র পোষকের হরমোন তন্ত্র দ্বারা পরিচালিত হয় অথবা পরজীবীই পোষকের স্বভাব বা সার্মথ্য বদলে দেয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক লিপিবদ্ধ পৃথিবীর অত্যন্ত ভয়ঙ্কর ১০টি রোগের মধ্যে অন্তত ৪টি প্রোটোজোয়াঘটিত। [গ্লেন এ ব্রিস্টো এবং ক্বামার বানু]