প্রবাসী


প্রবাসী  বাংলা সাময়িকী। নিয়মিতভাবে ষাট বছরেরও বেশি সময় ধরে এলাহাবাদ থেকে প্রকাশিত। রমানন্দ চট্টোপাধ্যায় (১৮৬৫-১৯৪৩) সম্পাদিত সাময়িকীটি ১৩০৮ বঙ্গাব্দের বৈশাখ (এপ্রিল, ১৯০১ সাল) থেকে প্রকাশিত হয়। রমানন্দ স্বল্পায়ু সাময়িকী প্রদীপ এবং দাসী নিয়মিতভাবে প্রকাশে ব্যর্থ হয়ে নিজে মাসিক প্রবাসী বের করেন। এলাহাবাদে ভারতীয় মুদ্রণযন্ত্রের স্বত্বাধিকারী চিন্তামণি ঘোষ তাঁকে এ বিষয়ে সহায়তা করেন। রমানন্দ স্থানীয় একটি কলেজে শিক্ষাদান করতেন। কিন্তু ১৯০৬ সালে তিনি পদত্যাগ করেন। তারপর তিনি এলাহাবাদ থেকে একযোগে একটি ইংরেজি মাসিক মডার্ন রিভিউ প্রকাশ শুরু করেন। এ সাময়িকীতে স্বদেশী আদর্শ প্রচারিত হওয়ার অভিযোগে দুবছর সময়ের মধ্যে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে এলাহাবাদ ত্যাগ করার আদেশ দেন। শেষে ১৩১৫ বঙ্গাব্দে রমানন্দ কলকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং সাময়িকী দুটি এ শহর থেকে প্রকাশিত হতে থাকে। রমানন্দ প্রায় আমৃত্যু সাময়িকী দুটি সম্পাদনা করেন। প্রবাসী যে খ্যাতি অর্জন করে তা কোন বাংলা সাময়িকী অতিক্রম করেছে বলে মনে হয় না।

প্রারম্ভিক দু-তিন বছরের পর থেকে প্রবাসী নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হতে থাকে। দ্বিতীয় বছর থেকে এটি সু-সম্পাদনায় ও বহুরঙা চিত্রে শোভিত হয়ে প্রকাশিত হয়। প্রবাসী শিল্পকলা এবং শিল্পীদের উপর লিখিত নিবন্ধসমূহ এবং বাংলার শিল্প-গোষ্ঠীর কাজসমূহ নিষ্ঠার সঙ্গে ও নিয়মিতভাবে প্রকাশ করে। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নন্দলাল বসু এবং অন্যান্যদেরকে জনপ্রিয় করার জন্য রমানন্দ যথেষ্ট সাহায্য করেন। এমনকি ইউরোপীয় শিল্পীদের চিত্রকর্মও প্রবাসীতে প্রথম প্রকাশিত হয়। রমানন্দ নিজে শিল্পকলা বিষয়ে উৎসাহী ছিলেন এবং প্রথম সংখ্যায় অজন্তা গুহার চিত্রসমূহ নিয়ে একটি নিবন্ধ লিখেন। সম্পাদক ছাড়াও ও.সি গাঙ্গুলী এবং সিস্টার নিবেদিতা এ ধরনের অনেক নিবন্ধ লিখেন।

১৩১৪ বঙ্গাব্দ থেকে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর লেখা প্রায় নিয়মিতভাবে প্রবাসীতে প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথের প্রধান সৃষ্টিসমূহ বাঙালিদের ঘরে পৌঁছেছে প্রবাসী সাময়িকীর মাধ্যমেই, এ মন্তব্যে কোন অত্যুক্তি নেই। প্রবাসীর বিষয়বৈচিত্র্য সমসাময়িক অন্য কোন সাময়িকীতে দেখা যায় না। রমানন্দ বাংলার বাইরে বসবাসরত বাঙালিদের উপর লেখার জন্য জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসকে উৎসাহিত করেন যা বঙ্গের বাহিরে বাঙ্গালী নামে দুখন্ডে প্রকাশিত হয়। যদিও সৃজনশীল রচনা ছিল পত্রিকাটির মূল ধারা, তা সত্ত্বেও এতে নিয়মিতভাবে ইতিহাস, শিল্পকলা, পুরাতত্ত্ব, সমাজতত্ত্ব, শিক্ষা, সাহিত্য, সাহিত্যনির্ভর মতাদর্শ, বিজ্ঞান বিষয়ক রচনা ও ভ্রমণ কাহিনী প্রকাশিত হতো। সাময়িকীটিতে সমসাময়িক সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক বিষয়ের ওপর আলোচনা থাকতো। ‘বিবিধ প্রসঙ্গ’ নামে একটি সেকশনে রমানন্দ সমসাময়িক জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ঘটনাবলি কালানুক্রমিকভাবে গ্রন্থনা করতেন। সংক্ষেপে বলা যায় যে, বিশ শতকের প্রথমার্ধে বাঙালি সংস্কৃতি প্রবাসীর পাতায় যথেষ্ট প্রতিফলিত হয়েছে। প্রথম চল্লিশ বছরে প্রবাসী পত্রিকার লেখক সংখ্যা ৩৫০ জন অতিক্রম করে। তৎকালীন সকল প্রধান কবি এবং গদ্য লেখকের রচনা প্রবাসীতে প্রকাশিত হয়। এ ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যতিক্রম ছিলেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। এটা বিস্ময়ের কিছু নয় যে, প্রবাসী তার মর্যাদাকর অবস্থান ক্ষুণ্ণ না করেও অতুলনীয় জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল।

প্রবাসীর প্রায় সম্পূর্ণ প্রকাশনা বিভিন্ন গ্রন্থাগারে পাওয়া গেলেও কোন নির্ঘন্ট অদ্যাবধি প্রকাশিত হয় নি।  [ইন্দ্রজিৎ চৌধুরী]