প্রতিবন্ধিতা


প্রতিবন্ধিতা  বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে কোনো ব্যক্তির শারীরিক অক্ষমতা, কর্মে সীমাবদ্ধতা কিংবা কোন কাজে অংশগ্রহণে বাধার সম্মুখীন হওয়ার মত সার্বিক অবস্থাকে বোঝায়। প্রকৃতপক্ষে, গর্ভকালীন, জন্মের সময় বা জন্মের পরবর্তী সময়ে কোনো দূর্ঘটনাজনিত কারণে কোন ব্যক্তি শারীরিক, মানসিক ও বৌদ্ধিকভাবে ত্রুটিগ্রস্থ হলে এবং এর ফলশ্রুতিতে সাধারণ জীবনযাপনে অক্ষমতা প্রকাশ পেলে সেই অবস্থাকে প্রতিবন্ধিতা বলা যেতে পারে।

২০০১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধে আহত ব্যক্তিসহ বাংলাদেশে প্রতিবন্ধীর সংখ্যা প্রায় ১৪ মিলিয়ন। মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যা, অত্যধিক দারিদ্র, নিরক্ষরতা, সচেতনহীনতা এবং সর্বোপরি সুচিকিৎসার অভাবে প্রতিবন্ধিত্বের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চলেছে। এখনও পর্যন্ত প্রতিবন্ধীদের উপর জাতীয় পর্যায়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কোনো জরিপ কার্য সম্পাদন না হলেও স্বল্পসংখ্যক তথ্য পাওয়া সম্ভব।

প্রশিক্ষন গ্রহণ ও কর্মরত প্রতিবন্ধী

১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ সরকার জাতিসংঘের ‘The United Nations Standard Rules on the Equalization of Opportunities for Persons with Disabilities’ নীতিমালা গ্রহণ করে। ২০০২ সালের মে মাসে ESCAP ‘Promoting an inclusive, barrier-free and rights-based society for persons with disabilities in Asia and the Pacific’ নামক প্রস্তাবনা গ্রহণ করে। বাংলাদেশ, জাতিসংঘের সদস্য হিসেবে প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে অঙ্গীকারবদ্ধ এবং ‘United Nations Charter of Children’s Rights’ সনদে স্বাক্ষরের মাধ্যমে প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং পুর্নবাসনে  অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশও বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আন্তর্জাতিক পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ সরকার সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রতিবন্ধী বিষয়ক জাতীয় সমন্বয় কমিটি (National Coordination Committee on Disability) গঠন করে। ১৯৯৫ সালে সর্বপ্রথম প্রতিবন্ধী বিষয়ক জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন করা হয় যেখানে জাতীয় কর্মসূচি হিসেবে প্রতিবন্ধীতার প্রতিরোধ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পুনর্বাসন এবং নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই নীতিমালার মাধ্যমেই প্রতিবন্ধীদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রথম আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেয়া হয়। ১৯৯৫ সালের প্রতিবন্ধী বিষয়ক জাতীয় নীতিমালার (National Action Policy on Disability) ভিত্তিতে ১৯৯৬ সালে প্রতিবন্ধী বিষয়ক জাতীয় কর্ম পরিকল্পনা (National Action Plan on Disability) গ্রহণ করা হয় যদিও এই পরিকল্পনা এখনও পর্যন্ত পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।

বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নে ব্যাপক উৎসাহী এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে বেসরকারি বিভিন্ন পর্যায়েও কাজ করে চলেছে। আন্তর্জাতিক চুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৮ সালে জাতীয় প্রতিবন্ধী দিবস পালনের ঘোষণা দেয় যা পরবর্তী সময়ে ১৯৯৯ সালের এপ্রিল মাস থেকে কার্যকরী করা হয়। প্রতিবন্ধীদের প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং দেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে তাদের আইনানুগ অধিকারকে স্বীকৃতি প্রদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার ২০০০ সালে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে জাতীয় প্রতিবন্ধী কল্যাণ ফাউন্ডেশন-এনএফডিডিপি (National Foundation for the Development of Disabled Persons) স্থাপন করে।

১৯৯৫ সালের জাতীয় প্রতিবন্ধী আইনের ধারাবাহিকতায় জাতীয় সংসদ ২০০১ সালের ৪ এপ্রিল প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইন (Disability Welfare Act) পাশ করে। এ আইনে জাতীয় পর্যায়ে সর্বপ্রথম প্রতিবন্ধিতার সর্বজনস্বীকৃত সংজ্ঞা এবং প্রকারসহ তাদের অধিকার, সমসুযোগ এবং সরকারি পর্যায়ের আইনগত সহায়তার কথা উল্লেখ রয়েছে।

২০০২ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশ সরকার প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এগুলো হলো:

দেশের সর্বস্তরে প্রতিবন্ধীদের যোগাযোগ ও যাতায়াতের সুব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে রেলওয়ে ষ্টেশন, বাস টার্মিনাল, নদীর ঘাট, লঞ্চ-স্টিমার ঘাট, বিমানবন্দর এবং বিমান অফিসে আলাদা টিকেট কাউন্টার স্থাপন করা;

প্রতিবন্ধীদের জন্য বাস, ট্রেন, লঞ্চ এবং স্টিমারে বিশেষ আসন ব্যবস্থা সংরক্ষণ করা;

সরকারি চাকুরীতে এতিম এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য ১০% কোটা পূর্ণ করা;

প্রতিবন্ধীদের হয়রানি বন্ধ করার লক্ষ্যে সমাজ কল্যাণ বিভাগে একটি অভিযোগ বাক্স খোলা;

প্রত্যেক সরকারি অফিসে প্রতিবন্ধীদের যাতায়াতের সুবিধার্থে ঢালু পথ (র‌্যাম্প) এর ব্যবস্থা করা;

১ম ও ২য় শ্রেনির সরকারি চাকুরির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সকল প্রতিন্ধকতা দূর করা;

প্রতিবন্ধীদের জন্য রাষ্ট্রীয় সকল ব্যাংকে ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্প চালু করা;

প্ললাস্টিক দ্রব্যাদি ক্রয় করে থাকে এরূপ প্রত্যেক সরকারি সংস্থা কোন টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই সমাজ কল্যাণ বিভাগের অধীনে মৈত্রী শিল্প সংস্থা কর্তৃক উৎপাদিত পণ্য কিনবে তা নিশ্চিত করা;

জাতীয় প্রতিবন্ধী কল্যাণ ফাউন্ডেশনের জন্য সরকারি আর্থিক তহবিল ২০% এ উন্নীত করা।

জাতীয় প্রতিবন্ধী আইন এবং প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইন বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ সরকার ২০০৬ সালে ৫ বছরের জন্য জাতীয় কর্ম পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এই পরিকল্পনায় প্রতিবন্ধিতার দ্রুত সনাক্তকরণ এবং প্রতিকার ব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ, শিক্ষা এবং এর আনুষাঙ্গিক শিখন উপকরনের উন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, চাকরি এবং পুনর্বাসন, মানব সম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা, আত্ম-কর্মসংস্থানের উন্নয়ন এবং সর্বোপরি জাতীয় পর্যায়ে সমন্বয়সাধন প্রভৃতি ক্ষেত্রসমূহ অন্তর্ভূক্ত রয়েছে। এছাড়া সরকারিভাবে প্রাপ্ত সুযোগ সুবিধা প্রতিবন্ধীদের জন্য নিশ্চিত করার লক্ষে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে প্রতিবন্ধীদের সহায়তা করার জন্য একজন ফোকাল ব্যক্তির (Focal Person) নিয়োগ দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ২০০৭ সালে জাতিসংঘ প্রতিবন্ধী অধিকার সনদ (United Nations Convention on the Rights of Persons with Disabilities)-এ স্বাক্ষর করে। ২০০৯ সালের ২৬ ডিসেম্বর ১৮ তম আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী দেশের সকল বিদ্যালয়ে প্রতিবন্ধী শিশুদের ভর্তির সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য সকল বিদ্যালয়ের প্রতি আহবান জানিয়েছেন এবং যে সকল ব্যক্তিমালিকানাধীন বা যৌথ সংস্থা প্রতিবন্ধীদেরকে চাকরির সুযোগ দিবে, সরকার সে সকল প্রতিষ্ঠানকে কর আরোপ থেকে অব্যাহতি প্রদান করবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি চাকরিজীবি প্রতিবন্ধী নারী এবং পুরুষের জন্য আবাসিক হোস্টেল, তথ্য ও সাহায্য কেন্দ্র, ভ্রাম্যমান সেবাকেন্দ্র এবং অটিজম রিসোর্স সেন্টার স্থাপনেরও ঘোষণা প্রদান করেন।

শিক্ষাক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীদের প্রবেশগম্যতা খুবই কম। আর এই সীমাবদ্ধতার জন্য অসামাঞ্জস্য শিক্ষাব্যবস্থা, কঠোর এবং অনমনীয় শিক্ষাক্রম ও শিক্ষা পরিবেশ, পিতামাতার অজ্ঞতা এবং সচেতনহীনতা, শিক্ষকদের বৈষয়িক জ্ঞানের অভাবই দায়ী। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাত্র ৫% প্রতিবন্ধী শিশুরা সাধারণ শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার স্বল্প মাত্রার প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য একীভূত শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করেছে। প্রকৃতপক্ষে অধিক সংখ্যক প্রতিবন্ধী শিশুদেরকে শিক্ষাব্যবস্থার মূলধারায় আনার ক্ষেত্রে এটা উৎসাহমূলক একটা বাস্তব পদক্ষেপ। একই সময়ে এই কার্যক্রম প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদেরকে বৃত্তি প্রদানও করে আসছে। এছাড়া, বর্তমান সময়ে সরকারের সাথে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে একাধিক জাতীয় ও আর্ন্তজাতিক এনজিও প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে।

সমাজ কল্যাণ বিভাগের অধীনে প্রধান চারটি বিভাগ অর্থাৎ ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী এবং খুলনায় দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য একাধিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। এই সকল বিদ্যালয় সর্বমোট ৫০০ শিশুকে শিক্ষা কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে এবং ১৮০ শিশুকে সরকারি অর্থায়নে বিনামূল্যে আবাসনের সুবিধা দিতে সক্ষম। এছাড়াও সমাজ কল্যাণ বিভাগ দেশের সর্বত্র ৬৪টি সাধারণ বিদ্যালয়ে সাইটেড শিক্ষার্থীদের (Sighted Peer) সহযোগিতার মাধ্যমে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের সাধারণ শিক্ষার আওতায় আনার লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এই কর্মসূচির আওতায় দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা অর্জনে যেকোন সমস্যা সমাধানে সহায়তা করার জন্য প্রত্যেক বিদ্যালয়ে একজন রিসোর্স শিক্ষক (Resource Teacher) এবং একটি রিসোর্স রুমের (Resource Room) ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। American Foundation for Overseas Blind-এর অর্থায়নে এই কার্যক্রমের অধীনে ঢাকায় একটি ব্রেইল প্রেসও স্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সকল বিদ্যালয়ের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদেরকে বিনামূল্যে ব্রে্ইল বই (Braille Books) সরবরাহ করা হয়।

এছাড়াও, যে সকল এনজিও দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের সহায়তা প্রদান করে থাকে, সেগুলোর মধ্যে উলেখযোগ্য হচ্ছে:

নাম প্রতিষ্ঠা সাল
ন্যাশনাল ফেডারেশন অব দ্যা ব্লাইন্ড ১৯৬৪
সাইট সেভারস্ ইন্টারন্যাশনাল ১৯৭৩
দ্য ব্যাপ্টিস্ট মিশন ইন্টিগ্রেটেড স্কুল ১৯৭৭
অ্যাসিসটেন্স ফর ব্লাইন্ড চিলড্রেন (এবিসি) ১৯৭৮
বাংলাদেশ দৃষ্টিহীন ফাউন্ডেশন (বিডিএফ) ১৯৮৯
বাংলাদেশ ব্লাইন্ড মিশন ১৯৯২

শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের জন্য সমাজ কল্যাণ বিভাগের অধীনে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, চাঁদপুর, ফরিদপুর এবং সিলেটে ৭ টি বিদ্যালয় রয়েছে। এ সকল বিদ্যালয় ৭০০ শিশুকে ভর্তি এবং ১৮০ শিশুকে আবাসিক সুবিধা প্রদান করতে সক্ষম। এখানে শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিশুদেরকে প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষা প্রদান এবং চিত্রাঙ্কনসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় দক্ষতার প্রশিক্ষণ দেয়া হয়ে থাকে। জাতীয় পর্যায়ে সরকারের সঙ্গে শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের জন্য যে সকল এনজিও বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করে চলেছে সেগুলো হচ্ছে:

নাম প্রতিষ্ঠা সাল
বাংলাদেশ ন্যাশনাল ফেডারেশন ফর দ্য ডেফ ১৯৬৯
হাই-কেয়ার ১৯৮২
দ্য সোসাইটি ফর অ্যাসিসটেন্স টু হেয়ারিং ইমপেয়ারড চিলড্রেন (সাহিক) ১৯৮৭
দ্য ডেফ চিলড্রেন’স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ১৯৯৮

Norwegian Association এর সহায়তায় সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে সমাজ কল্যাণ বিভাগ ১৯৯১ সালে শ্রবণ, দৃষ্টি এবং বুদ্ধি প্রতিবন্ধীদের জন্য জাতীয় বিশেষ শিক্ষা কেন্দ্র স্থাপন করে। এখানে দৃষ্টি ও শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের জন্য ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত এবং বুদ্ধি প্রতিবন্ধীদের জন্য ৭ম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করার সুযোগ রয়েছে। এছাড়া, সরকারের সঙ্গে একাধিক এনজিও বুদ্ধি প্রতিবন্ধীদের বিভিন্নভাবে সহায়তা প্রদান করে আসছে। সেগুলো হচ্ছে:

বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন (বিপিএফ)  বুদ্ধি প্রতিবন্ধী, সেরিব্রাল পলসি (Cerebral Palsy) এবং অটিস্টিক (Autistic) শিশুদের জন্য বিশেষ বিদ্যালয় পরিচালনা করে থাকে। ঢাকায় এ সংস্থার দুইটি বিশেষ বিদ্যালয় (Special School) রয়েছে যেখানে এই সকল শিশুদের প্রতিবন্ধিতার মাত্রা পর্যবেক্ষণ ও সনাক্ত করে তাদের বয়স অনুযায়ী শিক্ষা এবং  প্রশিক্ষণের জন্য বিভিন্ন শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

দ্য সোসাইটি ফর দ্য ওয়েলফেয়ার অব দ্য ইনটেলেক্চুয়াল ডিজএবল্ড-বাংলাদেশ  ১৯৭৭ সালে স্থাপিত হয়। এ সংস্থা সুইড-বাংলাদেশ নামে সমধিক পরিচিত। এখানকার অধিকাংশ শিশু এবং কিশোর-কিশোরীদের সেরিব্রাল পল্সি ও অটিজ্ম এর সাথে বুদ্ধিগত সমস্যাও রয়েছে।

অন্যান্য প্রতিষ্ঠান যেমন-অটিজ্ম ওয়েলফেয়ার সেন্টার, সোসাইটি ফর দ্যা ওয়েলফেয়ার অব দ্যা অটিস্টিক চিলড্রেন, সোসাইটি ফর দ্যা এডুকেশন অব দ্য ইনটেলেক্চুয়াল ডিজএবল্ড-ট্রাস্ট, কেয়ারিং গ্লেলারি, স্কুল ফর দ্য গিফটেড প্রভৃতি অটিস্টিক শিশুদের সাথে সাথে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী এবং সেরিব্রাল পলসি শিশুদের প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধা প্রদান করে থাকে।

প্রতিবন্ধীদেরকে শিক্ষাব্যবস্থায় এবং সর্বোপরি সমাজে একীভূতকরণের লক্ষ্যে- 'দ্য সেন্টার ফর রিহেবিলিটেশন অব দ্য প্যারালাইজ্ড (সিআরপি)'  ১৯৯৩ সালে সেরিব্রাল পল্সি শিশুদের জন্য প্রাথমিকভাবে একটি বিশেষ বিদ্যালয় স্থাপন করে। স্বতন্ত্র শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা উপলব্ধিস্বরূপ বিশেষ শিশুদের একীভূত শিক্ষার আওতায় আনার লক্ষ্যে সিআরপিতে শিক্ষার মূলধারার সঙ্গে বিশেষ শিশুদের ক্লাস একত্র করা হয়েছে। কিন্তু বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের শিখন মূল্যায়ন এবং যে সকল শিশু স্বাভাবিক শিক্ষার ধারায় আসতে সক্ষম নয় কেবল মাত্র তাদের জন্য স্বতন্ত্রভাবেও এখানে দুইটি বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সিআরপি প্রতিবন্ধীদের উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এবং পুনর্বাসনের সাথে সাথে প্রতিবন্ধিতার কারণসমূহের প্রতিকার, সমাজে সম সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সর্বোপরি সচেতনতা বৃদ্ধিতে সহায়তা প্রদান করে থাকে।

বাংলাদেশ রুরাল অ্যাডভান্সমেন্ট কমিটি (ব্র্র্যাক)  একীভূত শিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান এবং প্রতিবন্ধী শিশুদের উপানুষ্ঠানিক বিদ্যালয়ে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য উৎসাহিত করে থাকে। বর্তমানে ব্র্যাকের অধীনে পরিচালিত বিদ্যালয়সমূহে  প্রায় ১৪,০০০ বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী শিশু শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ এবং সহায়তার করার মাধ্যমেই স্থানীয় এবং ব্র্যাকের শিক্ষাব্যবস্থার আওতাধীন প্রতিবন্ধী শিশুদের অধিকার রক্ষা তথা এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছে।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নে সুপরিচিত অন্যান্য যে সকল প্রতিষ্ঠান কাজ করে চলেছে। সেগুলো হচ্ছে:

নাম প্রতিষ্ঠা সাল
দ্য আনডারপ্রিভিলাইজ্ড চিলড্রেন এডুকেশন প্রোগ্রাম (ইউসেপ) ১৯৭২
গ্রাম বিকাশ সংস্থা ১৯৯১
ডিস্এবিলিটি রিসোর্স এন্ড ডকুমেন্টেশন সেন্টার (ডিআরডিসি) ১৯৯৪
সেন্টার ফর সার্ভিসেস এন্ড ইনফরমেশন অন ডিস্এবিলিটি (সিএসআইডি) ১৯৯৭

এছাড়াও ভলান্টরি হেল্থ সার্ভিসেস সোসাইটি (ভিএইচএসএস), বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতি (বিপিকেএস), ঢাকা আহছানিয়া মিশন (ডিএএম), ডিস্এবিলিটি রিহেবিলিটেশন এন্ড রিসার্চ এসোসিয়েশন (ডিআরআরএ) প্রভৃতি সংস্থাও প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

আন্তর্জাতিকভাবেও একাধিক এনজিও প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে বাংলাদেশে কাজ করে চলেছে, এগুলো হচ্ছে:

অ্যাকশন এইড বাংলাদেশ  ১৯৭২ সাল থেকে বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করলেও সমাজের দরিদ্র এবং প্রতিবন্ধীদের মত সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের দারিদ্র নিরসন এবং জীবনযাপনের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে ১৯৮৩ সাল থেকে কাজ করে চলেছে। প্রতিবন্ধীদেরকে সহায়তা করার জন্য ১৯৯৩ সালে এ সংস্থায় একটি ইউনিট গঠন করা হয়। বর্তমানে প্রতিবন্ধিতার সাথে সাথে সামাজিক সমস্যা সম্পর্কিত বিষয়সমূহ নিয়েও এ সংস্থা কাজ করে যাচ্ছে।

হ্যান্ডিক্যাপ ইন্টারন্যাশনাল ১৯৯৭সাল থেকে বাংলাদেশে প্রতিবন্ধিদের অধিকার নিশ্চিত করা এবং জীবনের প্রত্যকটি ক্ষেত্রে তাদের অনুপ্রবেশ ঘটানোর লক্ষ্যে কাজ করে চলেছে। সেন্টার ফর ডিসঅ্যাবিলিটি ইন ডেভেলপমেন্ট (সিডিডি) এর সাথে যৌথ উদ্যোগে ২০০০ সালে এ সংস্থার বাংলাদেশ শাখার উদ্বোধন করা হয় এবং ৫টি স্থানীয় কমিউনিটি উন্নয়ন সংস্থার (Local Community Development Organizations) মাধ্যমে এর কর্মকান্ড পরিচালনা শুরু করে। সিডিডি এর সঙ্গে সমন্বয়সাধনের মাধ্যমে প্রতিবন্ধীদের জীবনমান উন্নয়ন, তাদের অধিকার রক্ষা এবং উন্নয়ন কর্মকান্ডে পরিপূর্ণ অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে কমিউনিটি অ্যাপ্রোচেস টু হ্যান্ডিক্যাপ ইন ডেভেলপমেন্ট-সিএএইচডি (Community Approaches to Handicap in Development) নামক প্রকল্প গ্রহণ করেছে।

হেলেন কেলার ইন্টারন্যাশনাল  ক্ষতিগ্রস্থ এবং সুবিধাবঞ্চিত অধিকাংশ মানুষের দৃষ্টিশক্তি এবং জীবনমান রক্ষা জন্য ১৯৭৪ সাল থেকে বাংলাদেশে তাদের কর্মকান্ড পরিচালনা করা শুরু করে। এই সংস্থা দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা ও পুনর্বাসনের জন্য পুষ্টিজ্ঞান শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, এ কর্মসূচির মূল্যায়ন ও পরিসংখ্যানভিত্তিক ডাটা সংরক্ষণ এবং আনুষাঙ্গিক কারিগরী সহায়তা প্রদান করে থাকে।

প্রতিবন্ধী শিশুদেরকে শিক্ষাব্যবস্থায় সার্বিকভাবে একীভূত করতে হলে শিক্ষকদের শিশুর বিকাশ এবং শিখন প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবশ্যই জানতে হবে। আর একারণে প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প ১ এবং ২ (পিইডিপি ১ এবং ২)-এর অধীনে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষক এবং প্রধান শিক্ষকদের জন্য প্রাথমিক স্তরে শিক্ষাদান কৌশলের উপরে স্বল্পমেয়াদী কোর্স প্রবর্তন করেছে। এর অধীনে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কোর্সের পাঠ্যক্রমে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের একীভূতকরণ এবং শিক্ষণ কৌশলসমূহ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে শিক্ষক মান উন্নয়ন-মাধ্যমিক শিক্ষা প্রকল্প (Teaching Quality Improvement-Secondary Education Project) বাংলাদেশের মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের শিক্ষাদান প্রক্রিয়ার মান উন্নয়নের জন্য প্রশিক্ষণ পরিচালনা করে থাকে। মূলত মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের শিক্ষাদান এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার মান উন্নয়নের উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই ২০০৫ সালের এপ্রিল মাসে এই প্রকল্প শুরু করা হয়। এই প্রকল্পের অধীনে দেশের মাধ্যমিক স্তরের অপ্রশিক্ষিত শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। প্রধান শিক্ষক, সভাপতি এবং বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির (এসএমসি) অন্যান্য সদস্যরাও শিক্ষণবিজ্ঞান ও শিক্ষা ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ পেয়ে থাকে। এছাড়া শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের পেশাগত মান উন্নয়নের জন্য কোর্স চলাকালীন সময়ে এবং কোর্স পরবর্তী সময়ে অব্যহত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাও রয়েছে।

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রতিবন্ধিদের সুযোগ সুবিধার মানসম্মত ব্যবস্থাপনা এবং তাদের জন্য বিশেষজ্ঞ তৈরির লক্ষ্যে প্রতিবন্ধীত্বের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেমন-বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতা, দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা, শ্রবণ প্রতিবন্ধিতা, অটিজম, সেরিব্রাল পল&&স, শারীরিক প্রতিবন্ধিতা এবং শিখন প্রতিবন্ধিতা (Learning Disability) ইত্যাদির উপর বিষয়ভিত্তিক স্নাতক, স্নাতকোত্তর, ডিপ্লেলামা ডিগ্রি এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিয়েছে। যেমন:

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা গবেষণা ইনস্টিটিউট-এর বিশেষ শিক্ষা বিভাগ, বিশেষ শিক্ষার (Special Education) উপর চার বছর মেয়াদি স্নাতক ডিগ্রি প্রদান করে। এছাড়া একই বিষয়ের ওপর স্নাতকোত্তর, এমফিল এবং পিএইচ.ডি ডিগ্রি অর্জনেরও সুযোগ রয়েছে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে জাতীয় বিশেষ শিক্ষা কেন্দ্র (The National Centre for Special Education) বিশেষ শিক্ষার উপর শিক্ষক প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠান এক বছর মেয়াদি পোস্ট-গ্রাজুয়েট ডিপ্লেলামা প্রদান করে থাকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ের অধিভুক্ত বাংলাদেশ স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ইনস্টিটিউটের সাভার পক্ষাঘাতগ্রস্থ পুনর্বাসন কেন্দ্রে শারীরিক প্রতিবন্ধীদের দিকে লক্ষ্য রেখে একীভূত শিক্ষার উপর এক বছর মেয়াদি সার্টিফিকেট ইন এডুকেশন (সি ইন এড) কোর্স এর ব্যবস্থা আছে। এই কোর্সটি প্রাথমিক স্তরের শিক্ষকদের জন্য  বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমী (ন্যাপ) কর্তৃক নির্ধারিত। শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক এবং বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির (এসএমসি) জন্য এখানে স্বল্পমেয়াদি ওরিয়েন্টেশন কোর্সেরও ব্যবস্থা আছে। এছাড়াও এ কেন্দ্র স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের জন্য ফিজিওথেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি এবং স্পিচ থেরাপির উপর চার বছর মেয়াদি স্নাতক ডিগ্রি প্রদান করে থাকে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশনের একটি সংস্থা হচ্ছে বাংলাদেশ বিশেষ শিক্ষা ইনস্টিটিউট (বিআইএসই) যা এ বিষয়ে শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ হিসেবে কাজ করে। এই ইনস্টিটিউট বিশেষ শিক্ষায় ডিপ্লোমা এবং এক বছর মেয়াদি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি প্রদান করে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত বুদ্ধি প্রতিবন্ধী কল্যাণ সংস্থাও (সুইড-বাংলাদেশ) বিশেষ শিক্ষায় এক বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা (বিএসইডি) ডিগ্রি প্রদান করে আসছে।

প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইন (The Disability Welfare Act)  ২০০১ সালে জাতীয় সংসদে পাশ করা হলেও গেজেট আকারে ২০০৮ সালে প্রকাশ করা হয়। বাংলাদেশ সরকার জাতীয় বাজেটে প্রতি বছরই প্রতিবন্ধীদের জন্য অর্থ বরাদ্দ করে থাকে। এছাড়াও সমাজ কল্যাণ বিভাগের অধীনে শারীরিক প্রতিবন্ধিদের জন্য ক্ষুদ্রঋণের ব্যবস্থা ছাড়াও মাসিক প্রতিবন্ধীতা ভাতা প্রদান করা হয়। সাধারণত স্বল্প উন্নত দেশসমূহেই প্রতিবন্ধীদের সংখ্যা বেশি কারণ এ সকল দেশের জনসাধারণ তাদের মৌলিক চাহিদার মত অন্যান্য সুযোগ সুবিধা পূরণ করতে অক্ষম। প্রকৃতপক্ষে, দারিদ্রতার সঙ্গে প্রতিবন্ধিতার একটি ঘনিষ্ট সম্পর্ক রয়েছে। দরিদ্র পরিবারে প্রতিবন্ধিতার সম্ভাবনা যেমন অনেক বেশি ঠিক তেমনি প্রতিবন্ধীরাও পরিবারের উপরে অত্যধিক নির্ভরশীল থাকায় পরিবারকে দারিদ্রের সম্মুখীন করে। সমাজে সব সময়ই জনগণের একটি নির্দিষ্ট অংশ প্রতিবন্ধী থাকবে কিন্তু তাদেরকে কর্মক্ষম করে তুলতে হবে। আশার কথা এই যে বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার প্রতিবন্ধীদের সক্ষমতার উপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে প্রতিবন্ধীদের জন্য কাজ করে চলেছে।  [শারমিন হক এবং তানিয়া রুবাইয়া]