পোনাবালিয়া হত্যাকান্ড


পোনাবালিয়া হত্যাকান্ড ঔপনিবেশিক ভারতে সত্যাগ্রহ আন্দোলনের তুমুল অবস্থায় ১৯২৭ সালের ৭ মার্চ ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার কুলকাঠিতে অবস্থিত পোনাবালিয়া মসজিদের সম্মুখে সংঘটিত হয়।

হিন্দুদের একটি বিরাট দল মসজিদের সম্মুখ দিয়ে ঢাকের বাদ্যসহকারে সংকীর্তন করতে করতে পোনাবালিয়ায় অবস্থিত শিব মন্দিরের দিকে যাচ্ছিল। মসজিদে নামাজের জন্য জমায়েত মুসলমানগণ উঁচু আওয়াজ বন্ধ করার জন্য শোভাযাত্রাকারীদেরকে  অনুরোধ জানায়। শোভাযাত্রাকারীগণ কর্ণপাত না করায় এটা থামাতে মুসলমানগণ মানবব্যূহ গড়ে তোলে। সত্যাগ্রহ আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী সতীন্দ্রনাথ সেনের প্ররোচনায় হিন্দুরা উচ্চস্বরে তাদের সংকীর্তন চালিয়ে যেতে থাকে।

দুই সম্প্রদায়ের লোকজন বিশৃঙ্খলভাবে সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়ার উপক্রম হয়। সতীন্দ্রনাথ সেনের ইঙ্গিতে এ ধরনের পরিস্থিতি উদ্ভবের ব্যাপারে ইতঃপূর্বেই বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়ে পুলিশ বরিশালের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ওয়াকিবহাল করেছিল। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ই.এন ব্ল্যান্ডি ও পুলিশ সুপার টেইলর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছেন। যেহেতু অশিক্ষিত মুসলমানগণ ইংরেজিতে ঘটনা প্রকাশে অক্ষম ছিল, তাই তারা গলার কাছে হাত দিয়ে সংকেত প্রদানের মাধ্যমে ব্রিটিশদের বুঝানোর চেষ্টা করে যে, নামায পড়ার সময় বাধা সহ্য করার চেয়ে তারা বরং মৃত্যু বরণকে শ্রেয় মনে করে। শিক্ষিত হিন্দুগণ এর ভুল ব্যাখ্যা করে ইংরেজ অফিসারদের বোঝায় যে, তারা যদি সামনে এগিয়ে যায় তবে মুসলমানগণ তাদের জবাই করবে। এভাবে বিভ্রান্ত হয়ে ব্ল্যান্ডি গুলিবর্ষণের আদেশ দেন, যার ফলে ১৯ জন (মতান্তরে ২০ জন) মুসলমানের মৃত্যু হয় এবং অসংখ্য ব্যক্তি আহত হয়।

এ ঘটনাটি এতই ভয়াবহ ছিল যে, এটাকে দ্বিতীয় জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ড হিসেবে অভিহিত করা হয়। কিছুদিন পর বরিশালে অনুষ্ঠিত নিখিল বঙ্গ মুসলিম কনফারেন্সের দাবির মুখে এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিশন গঠিত হয়। তবে তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট কখনও প্রকাশিত হয় নি।

পোনাবালিয়ার সহিংস ঘটনা এ কথাই প্রমাণ করে যে, অসহযোগ আন্দোলন এর পর গ্রাম্য সমাজেও হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিরোধের অস্তিত্ব ছিল। ব্রিটিশরা হিন্দু-মুসলিম ধর্মীয় বিদ্বেষের সুযোগ নেয়। মুসলমানদের বিচ্ছিন্নতাবোধের সঙ্গত কারণ ছিল। ব্রিটিশরা ভারত থেকে চলে গেলে পূর্ব বাংলার মুসলমানদের সম্ভাব্য পরিণতি কি হতে পারে এ ব্যাপারে পোনাবালিয়ার ঘটনা তাদের চোখ খুলে দেয়। [মোঃ আবদুল হালিম]