পৃষ্ঠমৃত্তিকা


পৃষ্ঠমৃত্তিকা (Topsoil)  মৃত্তিকার পৃষ্ঠস্তর। কর্ষিত মৃত্তিকার ক্ষেত্রে কর্ষিত স্তর এবং এর নিচের স্তরের প্লাউপ্যান (লাঙ্গল দ্বারা চাষের ফলে সৃষ্ট শক্তস্তর - যদি বিদ্যমান থাকে); অকর্ষিত মৃত্তিকার বেলায় জৈবপদার্থ সমৃদ্ধ কালো বর্ণের সর্বোচ্চ স্তর অথবা স্তরসমূহ পৃষ্ঠমৃত্তিকার অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশে কৃষ্ণ তরাই মৃত্তিকার পৃষ্ঠমৃত্তিকা অত্যধিক কালচে বাদামি থেকে কালো বর্ণের হয়ে থাকে। এই পৃষ্ঠমৃত্তিকার গভীরতা এক মিটারের এক-তৃতীয়াংশ থেকে এক মিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। চুনবিহীন বাদামি প্লাবনভূমির ক্ষেত্রে পৃষ্ঠমৃত্তিকা সচরাচর গাঢ় বাদামি অথবা গাঢ় ধূসর বাদামি বর্ণের হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে পৃষ্ঠমৃত্তিকার গভীরতা প্রায় ৩০ সেমি হয়ে থাকে এবং এর অন্তর্মৃত্তিকা হলদে বাদামি বর্ণ ধারণ করে। চুনযুক্ত বাদামি প্লাবনভূমির রয়েছে নিরপেক্ষ থেকে পরিমিত মাত্রার ক্ষারীয় পৃষ্ঠমৃত্তিকা। ধূসর প্লাবনভূমির কর্ষিত পৃষ্ঠমৃত্তিকা এবং প্লাউপ্যান মূলের চ্যানেল এবং কিছু ফাটল বরাবর প্রবল হলদে অথবা বাদামি বর্ণের ছোপ ছোপ দাগবিশিষ্ট ধূসর বর্ণের। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে অব্যহত জলাবদ্ধ থাকলে এই পৃষ্ঠমৃত্তিকা নিরপেক্ষতার কাছাকাছি পর্যায়ে চলে আসে, তবে পানি শুকিয়ে গেলে তা পরিমিত থেকে প্রবল অম্লধর্মী হয়ে যায়। চুনযুক্ত গাঢ় ধূসর প্লাবনভূমি মৃত্তিকাও একই আচরণ প্রদর্শন করে থাকে। অম্ল অববাহিকীয় কর্দমের পৃষ্ঠমৃত্তিকা ধূসর থেকে গাঢ় ধূসর বর্ণের এবং প্রায়ই মূলের পথ ও ফাটল বরাবর লোহিত অথবা বাদামি বর্ণের শক্তিশালী ছোপবিশিষ্ট বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। এক্ষেত্রেও পৃষ্ঠমৃত্তিকা দুই সপ্তাহের জলাবদ্ধতায় প্রায় নিরপেক্ষ হয়ে পড়ে। বদ্বীপ এলাকার কেন্দ্রভাগে মৃত্তিকায় নিয়মিত পিট বিদ্যমান থাকে যার উপরিভাগ কর্দমযুক্ত পৃষ্ঠমৃত্তিকা দ্বারা আবৃত। গভীর লোহিত-বাদামি সোপান মৃত্তিকা বাদামি দোঅাঁশ পৃষ্ঠমৃত্তিকা দ্বারা গঠিত যার অন্তর্মৃত্তিকা ক্রমশ লালচে বাদামি থেকে হলদে বাদামি ভঙ্গুর মৃত্তিকায় পরিবর্তিত হয়ে থাকে। মধুপুর গড়ের অগভীর লোহিত-বাদামি সোপান মৃত্তিকার পৃষ্ঠভাগ সচরাচর ধূসর এবং মিশ্র বাদামি বর্ণের। অন্যদিকে, বাদামি কর্বুরিত সোপান মৃত্তিকার পৃষ্ঠমৃত্তিকা এবং প্লাউপ্যান মিশ্র ধূসর এবং বাদামি মৃত্তিকা দ্বারা গঠিত যাতে লাল অথবা লালচে-বাদামি কর্বুরের প্রাধান্য বিদ্যমান। অন্যান্য অনেক মৃত্তিকার মতোই এই মৃত্তিকাও বিক্রিয়ার ক্ষেত্রে দুই সপ্তাহের জলমগ্নতার পরে প্রায় প্রশমিত হয়ে পড়ে। বাদামি পাহাড়ি মৃত্তিকার বেলায় পৃষ্ঠমৃত্তিকার বৈশিষ্ট্যসমূহ উদ্ভিজ্জের বৈশিষ্ট্য অনুসারে পরিবর্তিত হয়ে থাকে। বন আচ্ছাদিত বাদামি পাহাড়ি মৃত্তিকার পৃষ্ঠমৃত্তিকা গাঢ় ধুসর বাদামি থেকে ধূসর বাদামি বর্ণের হয়ে থাকে এবং পৃষ্ঠের ৫ থেকে ৭ সেমি পর্যন্ত গঠনে কেঁচোর (earthworm cast) প্রাধান্য বিদ্যমান থাকে। চা বাগান এলাকার আওতায় পৃষ্ঠমৃত্তিকা অধিকতর গাঢ় এবং অধিকতর পুরু। চাষযোগ্য শস্য অথবা তৃণভূমির আওতায় পৃষ্ঠমৃত্তিকা বিবর্ণ হয়ে থাকে। [সিফাতুল কাদের চৌধুরী]